অন্ধকারে টনি রিয়ান

আহমেদ জামিল

টনি রিয়ানের ঢাকার ওল্ড টাউনে একটা মদের বার ছিল। বেশ ভালোভাবে চলতো তার এই বারটা।… বাস ড্রাইভার থেকে শুরু করে কবি-সাহিত্যিক, আমলা-নেতা, বিজনেসম্যান, সরকারি কর্মচারী, আর্টিস্ট-লেখক, মুক্তবাজারের লোকজন, ম্যানেজার-কেরানি, ভবঘুরেসহ হরেক রকম মানুষ আসত তার এই বারে। সবাই মদ খেতে আসত। হঠাৎ করেই টনি রিয়ান কোনো এক কারণে তার বার বন্ধ করে দেয়। কেন বন্ধ করে দিল কেউ তা জানত না। তবে বন্ধ করার এক মাসের মধ্যে তিনি আমেরিকা চলে এলো লিসা আর নিনাকে নিয়ে। লিসারা ছিল যমজ। তাদের বয়স প্রায় দশ বছর। দুজন কয়েক মিনিটের ছোট বড়। জন্মের পরপরই তাদের মা মারা যান।

দুুই

বার বিক্রি করে রিয়ান ভালো টাকা নিয়ে এসেছিল। একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিনে নেয় এখানে। চাকরি করতে হয়নি এদেশে। বিয়ে করেছিল অ্যাংলো মেয়ে ফারজানাকে। দুজনে খুব সুখি। টাকা কামাচ্ছিল প্রচুর। মেয়েরা এদেশে স্কুলে লেখাপড়া করছিল। সবই ভালো চলছিল। বেশ কয়েক বছর পর লিসা স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হয়। কিছুদিন পর তার হাবভাব বদলে গেল। সেই লম্বা চুল কেটে ফেলল, ছোট চুল করল আর পুরুষের মতো শুরু হলো কথাবার্তা ও হাঁটা। পুরুষের শার্ট-প্যান্ট পরা, পুরুষের জুতো কেনা, জিমে গিয়ে পুরুষদের মতো হাতের মাসল বাড়ানো সে অনেক ব্যাপার। টনি রিয়ান ও ফারজানা একদিন লিসাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি বদলে যাচ্ছ। লিসা বলল, আমার আঠারো বছর পেরিয়ে গেছে। এখন আমি যা খুশি তাই করব। বাবা তুমি কি বলবে, আমি মেয়ে হয়েও মেয়ে পছন্দ করি, পুরুষ নয়। টনি রিয়ান বলল, মা দেখ, তোমরা এডুকেশন নিবে, বড় হবে এইতো আমাদের স্বপ্ন। লিসা বলল, আমাকে মা ডেকো না, আমি তোমার মা নই।

বাবা বললো, কি লেসবিয়ান হয়ে গেলে কেন?
মাঝপথে লিসা থামিয়ে দিল বাবাকে। আমার কথা শোনো বাবা, তোমার যদি দেশে থাকতে, আমরা দেশি কালচারে বড় হতাম, হয়ত নষ্ট হতাম না। তোমাদের অতিরিক্ত লোভের কারণে আজকে আমাদের এই দশা। আমরা এই দেশের কালচারে বড় হয়েছি। আমরা যা শিখছি প্রত্যেকটা বাঙালিই তাই শিখছে। এদেশে সবাই ফ্রি সেক্স করতে পারে আঠারো বছর বয়স হওয়ার আগে থেকে। হাইস্কুলে ছেলেমেয়েদের কনডম দেয়া হয়, সেক্সের শিক্ষা ক্লাসে দেয়া হয়, তুমি কি তা জানো। কেউ লেসবিয়ান হচ্ছে, কেউ বয়ফ্রেন্ড চেঞ্জ করছে, কোনো মেয়ের অনেক বয়ফ্রেন্ডে আছে। প্রচুর বাঙালি ছেলেমেয়ে এদেশে থাকছে, তারা এই দেশি ছেলেমেয়েদের সাথে এক সাথে ক্লাস করছে। বিছানায় যাচ্ছে। শারীরিক মিলন হচ্ছে। যে কোনো ছেলেমেয়ে তাদের পরিচিত ক্লাসমেটের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করছে। এটা আপসে, সুন্দরভাবে হচ্ছে। বন্ধুত্বসুলভভাবে হচ্ছে। এটা দীর্ঘদিন থেকেই এই আধুনিক ইউরোপ-আমেরিকাতে লিগ্যালভাবে আইন করা আছে এবং হয়ে আসছে। প্রচুর বাঙালি গার্জিয়ানরা তা জানতেও পারছে না। তাদের সন্তানরা স্কুল-কলেজে গিয়ে বা ঘুরতে গিয়ে কী করছে।

তিন

স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে তাদের সাথে মিশতে মিশতে গে বা লেসবিয়ান হয়ে যেতে পারে এমন হওয়া ‘লিগ্যাল রাইট’ এদেশে কিছু করার নেই। এখানে থাকতে হলে আমরা এই দেশি কালচারে অভ্যস্ত হবো, যা আমরা দেখছি বা শিখছি। একটানা অনেকক্ষণ কথা বলে, একটু থেমে লিসা আবার বলল, বাবা তুমি রাগ করলে আমার ওপর কিছু করার নেই। আমি আমার গার্লফ্রেন্ডকে চুমু খাচ্ছি। তুমি দেখছো। তুমি সেকেলে, এই দেশের আধুনিকতার সাথে তুমি পরিচিত নও। তোমার মাথায় রক্ত উঠে যেতে পারে। কিছু করার নেই। এই দেশে আসতে না। টাকা ও শিক্ষার জন্য এসেছ। এটা অন্য দেশ এখানে তোমার দেশি আইন চলবে না। তুমি আমার ওপর রাগ হয়ে লাভ নেই। একসাথে অনেকগুলো কথা বলল লিসা।

টনি বললো, আমরা বাংলাদেশি, আমরা আমাদের নিয়মের ভেতরে থাকা বাঙালি স্টাইল ফলো করব এটাই নিয়ম। লিসা হাসল, তুমি কিভাবে আমেরিকাতে বাঙালি কালচার চালু করবে, তোমাকে ফলো করতে হবে আমেরিকান সংস্কৃতি। ‘বাঙালি কালচার’ ফলো করলে, বাংলাদেশে চলে যাও। লিসা আবার হাসল এবং সে তার মিঞাওটাকে একটু আদর করল। অনেকক্ষণ ধরে মিঞাওটা তার পেছনে ঘুরঘুর করছে।
লিসা আবার বলল, এসেছ কেন এই দেশে? বাংলাদেশে থাকতে, দেশের স্টাইলে বড় হতাম আমরা। লিসা তার গলার স্বর একটু চেঞ্জ করে সে আবার বলল, তোমরা যদি বাধা দাও আমি পুলিশে ফোন করে এরেস্ট করিয়ে দেব তোমাদের। এটা ফ্রি কান্ট্রি। ফ্রি সেক্সের দেশ। এখানে যে যার ইচ্ছেমতো চলার স্বাধীনতা আছে। বাবা তুমি চুপ হয়ে যাও, আমার গার্ল ফ্রেন্ড লিন্ডা একটু পরে আসবে। তুমি আমার স্বাধীনতার ওপর কোনো বাধা দিবে না। বাবা আমি ও লিন্ডা বিয়ে করছি। আগামী সপ্তাহে আমরা আলাদা অ্যাপার্টমেন্টে উঠবো…!

চার

অন্যদিকে নিনা কলেজে পড়ছে। তার বয়ফ্রেন্ডের নাম জোসুয়া। কালো ছয় ফুট চার ইঞ্চি লম্বা। কলেজ ছুটির দিন শনি ও রবি নিনা জোসুয়ার বাড়িতে থাকে। মাঝখানে গর্ভবতী হয়েছিল অন্য এক ফ্রেন্ডের সাথে মিশে।
টনি ও ফারজানা যেন বোবা হয়ে গেল ফ্যালফ্যাল করে অসহায় হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। জানালার বাইরে কয়েকটা কাক উড়ে গিয়ে বসল মরা চেরি ফুল গাছের ডালে এবং অল্পক্ষণের মধেই কাকগুলো নিজেরাই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিল।

শেষ কথা
লিসা তার গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করেছে। এখন লিসা স্বামী ও লিন্ডা স্ত্রী। নিজেদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকে তারা। দুজনে চাকরি করে এবং একটা শিশু দত্তক নিয়েছে। নিনা তিন নম্বর বয়ফ্রেন্ডের সাথে থাকে নিউজার্সিতে। বাবা টনি রিহান আর ফারজানার আর কোনো সন্তান হয়নি। তবে প্রচুর টাকার মালিক টনি রিয়ান। দুই মেয়ে লিসা আর নিনাকে হারিয়ে যেন কেমন হয়ে গেছেন তারা। কেন এলো এই দেশে? এই আমেরিকায়? আজ সব হারাল, অর্থ সম্পদ থাকলে তো সুখী হওয়া যায় না। তারাও সুখি হলো না। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো টনি রিয়ানের বুকের ভেতর থেকে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস…

 

লেখক: কবি ও গল্পকার।

আমেরিকান প্রবাসী, জন্ম পুরান ঢাকা।    

 

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।