অবিভক্ত বাংলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী

কালাম আজাদ

তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার এমএলএ খান বাহাদুর জালাল আহমদ চৌধুরী (১৮৮১-১৯৫৭) যে সময় জন্ম সে সময় অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশের দোর্দণ্ড প্রতাপ। ভারতে তখন তাদের সোয়াশত বৎসরেরও অধিক শাসনকাল অতিবাহিত। ব্রিটিষ শাসনের পূর্বে সুদীর্ঘ কয়েক শতাব্দী এক নাগাড়ে ভারতের শাসক ছিল মুসলিম জাতি। কিন্তু বাংলার মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর মীর জাফরগীরির কারণে ব্রিটিশের হাতে তারা দীর্ঘকালীন এ শাসনভার হারিয়ে সুযোগ-সুবিধা থেকে দূরে সরে পড়ে। ব্রিটিশ শাসনের গোড়া থেকেই তারা নিজেদেরকে ব্রিটিশের সাথে মানিয়ে নিতে পারে নি।
১৯৪৭ সনে ভারত উপ-মহাদেশ থেকে ব্রিটিশের বিদায় কিংবা ভারত-বিভক্তির ৬৫ বৎসর আগে ১৮৮১ সালে জন্মগ্রহণকারী খান বাহাদুর জালাল আহমদ চৌধুরী তাঁর কর্মজীবনের মূল্যবান সময় প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করেই কাটিয়েছেন। এ সময় দেশের বিশেষত অনুন্নত ও অনগ্রসর বৃহত্তর চট্টগ্রামের সামগ্রিক উন্নতি এবং এলাকাবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন কাজে তাঁকে বিবিধ অন্তরায়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
বাংলার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিকাশে যে কয়েকজন বাঙালি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তার মধ্যে অন্যতম চকরিয়ার খান বাহাদুর জালাল আহমদ চৌধুরী। হার্মাদের কেল্লা নামে খ্যাত হারবাং গ্রামে কোনো ভালো স্কুল না থাকায় সেরেস্তার বাবা সোয়াজান চৌধুরীর কর্মস্থল চট্টগ্রামে লেখাপড়া শুরু করেন। সোয়াজান চৌধুরী চট্টগ্রাম আদালতের সেরেস্তার হওয়ার আগে কক্সবাজার মহকুমা আদালতের সেরেস্তার ছিলেন। ওই সময় তিনি কক্সবাজারের জমি কিনে বাসা তৈরি করেছিলেন। যেটা কক্সবাজার শহরের ঝাউতলাস্থ জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর বাংলো নামে পরিচিত ছিলেন এক সময়। পরে তৎকালীন টাউন হল ময়দানে ( প্রাক্তন ইপিআর ফিল্ড ও বর্তমানে কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ ও ডিজিএফ কক্সবাজারের অফিস) নামে পরিচিত হন। অল্প বয়সে জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী মাতাকে হারান। পিতার চাকুরীর সুবাদে চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠেন তিনি এবং ওই খান থেকে ম্যট্রিক পাশ করেন। ১৯০৩ সালে হাই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। কলকাতা শিক্ষা বোর্ড এর আওতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে সাফল্যের সাথে ১৯০৫ সালে এফ এ পাশ করেন। এফ এ পাশের পর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ওখান থেকে ১৯০৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এ এবং ১৯১০ সালে বিএল পাশ করেন। শিক্ষার মাধ্যম ছিল উর্দু। সমগ্র কক্সবাজার এলাকার দ্বিতীয় গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারী (প্রথম ছিলেন বরইতলীর গোলাম কাদের ডেপুটি)।
শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে কিছুদিনের জন্য পটিয়ায় এক স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরে চট্টগ্রাম জজ আদালত ও ঢাকা হাইকোর্টে আইন-ব্যবসায় অল্প দিনের মধ্যে সুনাম অর্জন করেন। তিনি প্রায় জটিল মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আদালতের রায় তার পক্ষে নিতে সক্ষম ছিলেন বিধায় তার সুনাম ও যশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি চট্টগ্রাম আাদালতের থেকে হাই কোর্ট এবং কলকাতা আদালতেও ওকালতি করেন। সেখানে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। আইন পেশার পাশাপাশি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে সমাজ সংস্কারের দিকে মনোনিবেশ করেন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকার মুসলমান সমাজে ইংরেজী শিক্ষা প্রচলনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান।
চট্টগ্রাম মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির স্থপতি খান বাহাদুর আবদুল আজিজ এর সাথে মিলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের শিক্ষার উন্নয়নে ইসলামিয়া ভিক্টোরিয়া ছাত্রাবাস, এম ই এস স্কুল এণ্ড কলেজ, চট্টগ্রাম নাইট কলেজ, চট্টগ্রাম উইমেন কলেজ, চট্টগ্রাম ল কলেজ, ইসলাম পাঠাগার, জালালুদ্দিন পাঠাগারসহ অসংখ্য স্কুল মাদ্রাসা কলেজ এবং দূর দূরান্ত থেকে আগত শিক্ষার্থীদের থাকা জন্য ছাত্রাবাস স্থাপন করেন খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
১৯২৬ সালে খান বাহাদুর আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির হাল ধরে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ওই সোসাইটি থেকে চট্টগ্রামে শিক্ষার উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেন। অত সব প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য চিরস্মরণীয় থাকবেন বৃহত্তর চট্টগ্রামবাসী হিসেবে প্রথম মন্ত্রী হওয়ার গৌরবের অধিকারী খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীও।
মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারে ভারতবর্ষে স্যার সৈয়দ আহমদ এর নাম যেমন চিরস্মরণীয়, তেমনি বৃহত্তর চট্টগ্রামের শিক্ষাবিস্তারে খান বাহাদুর আবদুল আজিজ, খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মৌলভী শহীদুদ্দিন মাহমুদের অবদানও স্মরণীয়। তারা শুধু মুসলামনদের শিক্ষা বিস্তারের দিকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষকে কীভাবে শিক্ষিত করে তোলা যায় সে দিকেও নজর দিয়েছিলেন। তাদের প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম জেলায় শিক্ষা বিস্তার লাভ করে এবং তারা শিক্ষার ব্যাপারে উৎসাহ সৃষ্টি না করলে চট্টগ্রামসহ কক্সবাজার অনেক পিছিয়ে থাকতো বলে মনে করেন অনেকেই।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম প্রবাসী কক্সবাজারবাসীদের কল্যাণে ১৯৩৭ সালে কক্সবাজার সমিতি চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন বহু বছর এ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং প্রাদেশিক সড়ক বোর্ডের সদস্য ছিলেন। প্রাদেশিক সড়ক বোর্ডের সদস্য থাকাকালে আরাকান সড়ক নির্মাণ করতে কর্তৃপক্ষকে রাজী করান এবং আরাকান সড়ক সংস্কার ও চট্টগ্রাম থেকে লোহাগাড়ার আধুনগর পর্যন্ত সড়ক সংস্কার করা হয় তারই তত্বাবধানে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকে লোহাগাড়ার আধুনগর পর্যন্ত মোটরগাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করেন তিনি। সমাজ হিতৈষী এবং জনহিতকর কাজ করায় এসময়েই ব্রিটিশ সরকার তাঁকে খান বাহাদুর উপাধি দেন। পরে তিনি রাজনীতির প্রতি উৎসাহী হয়ে উঠেন । এ সময় ভারত উপমহাদেশে সর্বত্র এক আওয়াজ ‘ভারতবষের্রর স্বাধীনতা’।
ইংরেজ সরকারের যুদ্ধের বিপক্ষে ভারতবর্ষের সবাই একমত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশরা কথা দিয়েছিল যুদ্ধে তাদের সহযোগিতা করলে যুদ্ধের পর তারা এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু যুদ্ধের পর ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া তো দূরের কথা উল্টো তিল পরিমাণ লজ্জিত না হয়ে সমগ্র এশিয়ায় বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের ঔপনিবেশিক শোষণ চাপিয়ে দেয়। যার ফলে তখনকার মুসলিম ও হিন্দু নেতৃবৃন্দ যুদ্ধের বিপক্ষেই মত দিতে লাগলেন। আরো দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ায় উদ্দেশ্যে সূদুর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে বৃটিশরা। বৃটিশ এ নীতির বিরুদ্ধে তথা যুদ্ধের বিপক্ষে তৎকালিন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী (১৮৮১-১৯৫৭) ও স্বাধীনতা সংগ্রামী পীর নুর আহমদ, চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান নুর আহমদ, মহিম চন্দ্র দাশ, কাজেম আলী মাস্টারসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি প্রদান করে।১ ইংরেজ সরকার বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মুসলিম ও হিন্দু নেতাদেরকে বশ আনার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু দেশপ্রেমিক খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী তার সিদ্ধান্তে অবিচল রইলেন। তৎপর চট্টগ্রামের তৎকালিন ব্রিটিশ জেলা প্রশাসক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এক বৈঠকের আহ্বান করেন। ওই সময় খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী অসুস্থ ছিলেন। তাকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হয় জেলা প্রশাসকের অফিসে। তিনি জেলা প্রশাসক এর প্রস্তাব নাকচ করে বিরোধিতা এবং চরম বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (জেলা প্রশাসক) ক্ষিপ্ত হয়ে খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে জেলে পাঠানোর হুমকি দিয়ে বলেন :
‘জানেন, আপনাকে আমি এখন কারাগারে পাঠাতে পারি।’
এ সময় অসম সাহসী অসুস্থ জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনপূর্বক রক্ত চক্ষু রাঙিয়ে বাঘের মতো গর্জে উঠে জেলা প্রশাসকের উদ্যতপূর্ণ আচরণের জবাব দেন এভাবে,
‘মনে রাখবেন, আপনি যদি আমাকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠান তবে জেল হাজত থেকেই আমি আপনাকে ভারত উপমহাদেশ থেকে বিতাড়িত করব।’২
ম্যাকডোনাল্ড রোয়েদাদ অনুযায়ী শাসন সংস্কারের ব্যবস্থা করে বৃটিশ সরকার। তারই ফল ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন (এড়াঃ. ড়ভ ওহফরধ অপঃ ড়ভ ১৯৩৫)’র অধীনে ভোটাধিকার ও আইন সভার সদস্য সংখ্যার যথেষ্ট বৃদ্ধি এবং স্বায়ত্বশাসন প্রবর্তন প্রাদেশিক পর্যায়ে সরকার গঠনের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৭ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রাদেশিক ও বঙ্গীয় বিধান সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বাংলায় মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত ১১৭টি আসনে এ কে ফজলুল হকের (১৮৭৩-১৯৬২) নেতৃত্বাধীন কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮)’র নেতৃত্বে মুসলিম লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ নির্বাচনে কক্সবাজার আসনে চকরিয়ার খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী ‘কৃষক প্রজা পার্টি’(কেপিপি)৩ থেকে এবং অবিভক্ত বাঙলার মুসলিম সাহিত্য ও সাংবাদিকতার অন্যতম অগ্রদূত মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী৪ (১৮৯৪-১৯৫১) মুসলিম লীগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যদিও খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র নিয়েছিলেন বলে উরষরঢ় ইধহবৎলবব তার ‘ঊষবপঃরড়হ জবপড়ৎফবৎ-অহ অহধষুঃরপধষ জবভবৎধহপব, ২০১২, কড়ষশধঃধ : ঝঃধৎ চঁনষরংরহম ঐড়ঁংব. ঢ়-৬৬ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। পরে একে ফজলুল হক এর ‘ কৃষক প্রজা পাটি’র সমর্থন পেলে তার ব্যানারে তিনি নির্বাচন করে জয়যুক্ত হন।
১৯৩৭ সালের শুরুতে এ কে ফজলুল হক কক্সবাজারে খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন। কক্সবাজার শহরের ঝাউতলাস্থ জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর বাংলোতে বিশ্রামের পর বিকেলে তৎকালীন টাউন হল ময়দানে (প্রাক্তন ইপিআর মাঠ ও বর্তমানে কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ ও ডিজিএফ কক্সবাজারের অফিস) নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেন এ কে ফজলুল হক। ৫
কক্সবাজার মহকুমার ২৮ হাজার ৩৮৭ ভোটের এ আসনে মুসলিম লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ছিদ্দিকীকে ৩০৫ ভোটে হারিয়ে খান বাহাদুর জালাল আহমদ চৌধুরী জয় লাভ করেন। খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর প্রাপ্ত ভোট ৩৭৫৮ আর মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ছিদ্দিকীর প্রাপ্ত ভোট ৩৪৫৩।৬ অত ভোটার থাকতে কেন উভয়ে এত কম ভোট পেয়েছেন তা জানার বাইরে। তবে হতে পারে ওই সময় কক্সবাজারের মানুষ তেমনটা সচেতন না হওয়ায় ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়নি নতুবা তেমন গুরুত্ব ছিলো না এ সময়ে।
ল্যাণ্ডহোল্ডারদের জন্য নির্ধারিত ৫টি আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম আসনে (ওই সময় কক্সবাজারও তার অন্তর্ভূক্ত ছিলো) রায় বাহাদুর ক্ষিরোদ চন্দ্র রায়কে পরাজিত করে খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৬২) নির্বাচিত হন।
ওই নির্বাচনে একে ফজলুল হকের দল ‘কৃষক প্রজা পার্টি’(কেপিপি)ও ৩৯টি আসন পায়। ৩৭ জন স্বতন্ত্র সদস্যের মধ্যে ১৬জন ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ তে যোগদান করায় কেপিপির সদস্য সংখ্যা দাঁড়ালো ৫৫-তে। ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (কেপিপি) সংখ্যাগরিষ্ট অর্জন করতে না পারায় প্রথমে কংগ্রেসের সাথে মন্ত্রীসভা গঠনের ইচ্ছে প্রকাশ করলেও অল ইণ্ডিয়া কংগ্রেস এর বিরোধিতার কারণে মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠনে বাধ্য হয়। কিন্তু ১৯৩৭ সালের ১৫ অক্টোবর এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করলে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (কেপিপি)’র জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। যদিও ফজলুল হক অফিসিয়ালি কৃষক প্রজা পার্টি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালের ২১ জুলাই ভাইসরয় ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিল (জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিল)-এ যোগদান এবং সরকারি যুদ্ধ প্রচেষ্টার সঙ্গে সহেযাগিতা দান প্রশ্নে জিন্নাহর সঙ্গে ফজলুল হকের মধ্যে মতবিরোধ এবং মুসলিম লীগের পার্লামেন্টিয়ান সদস্যদের বিরোধিতার মুখে একই বছরের ২৮ অক্টোবর এ কে ফজলুল হক সমর পরিষদ ত্যাগ করলে তার প্রথম মন্ত্রীসভার পতন ঘটে। পরে একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর গঠিত দ্বিতীয় মন্ত্রীসভা তথা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাথে শ্যামা-হক মন্ত্রী সভা গঠন করেন একে ফজলুল হক। কিন্তু শ্যামাÑহক মন্ত্রী সভা গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে মুসলিম লীগের অনবরত বিরোধিতার মুখে ১৯৪৩ সালের ২৮ মার্চ এ কে ফজলুল হকের পদত্যাগের মাধ্যমে দ্বিতীয় মন্ত্রীসভারও পতন ঘটে। ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রীসভা পতনের পর বাংলার গর্ভনর স্যার জন হাবার্ট ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের কথা বলে ফজলুল হককে পদত্যাগে বাধ্য করে। সর্বদলীয় মন্ত্রী সভা গঠনের ধারণা দেওয়া হলেও কিছুদিনের মধ্যে মুসলিম লীগের নেতা খাজা নাজিমুদ্দীন (১৮৯৪-১৯৬৪) কে মন্ত্রীসভা গঠনের আহ্বান জানানো হয় এবং ১৯৪৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি ১৩ সদস্য বিশিষ্ট এক মন্ত্রীসভা গঠন করেন। এই মন্ত্রীসভায় কক্সবাজার আসন থেকে নির্বাচিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে (ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করায় অন্যান্য বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এর মতো তিনিও মুসলিম লীগার হয়ে যান এবং শ্যামা-হক মন্ত্রী সভা গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে তুমৃল সমালোচনা করে খাজা নাজিম উদ্দিনের পক্ষালম্বন করেন) জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন বিষয়ক মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়।৭ উল্লেখ্য, ১৯৪৩-৪৫ সালের সেই সময়ে অবিভক্ত বাংলার গভর্নর ছিলেন অনারেবল রিচার্ড গার্ডিনার কেউজী এবং প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার ছিলেন যথাক্রমে সৈয়দ নওশের আলী ও সৈয়দ জালালুদ্দিন হাশেমী। খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ (জনস্বাস্থ্য ও স্বায়ত্বশাসন) ছাড়া মন্ত্রী পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যবর্গের মধ্যে ছিলেন খাজা স্যার নাজিমুদ্দিন (স্বরাষ্ট্র), এইচ.এস. সোহরাওয়ার্দ্দী (সিভিল সাপ্লাই), তুলসীচন্দ্র গোস্বামী (অর্থ), মৌলভী তমিজ উদ্দিন খান (শিক্ষা), খান বাহাদুর সৈয়দ মোয়াজ্জেমুদ্দিন হোসাইন (কৃষি), তারকনাথ মুখার্জী (রাজস্ব) প্রমুখ।
বঙ্গীয় প্রাদেশিক সভা ও কেন্দ্রিয় ভাইসরয় কাউন্সিলে ১৯২১ থেকে ১৯৪৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত মুসলমানদের পক্ষে খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার, খান বাহাদুর মকবুল হোসেন, খান সাহেব আমান আলী, মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), অলি আহমদ, কাজেম আলী মাস্টার, ব্যারিস্টার আনোয়ারুল আজিম, জালাল আহমদ (জগলুল নামে সমধিক পরিচিত), খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীসহ যে ২০ জন চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং সফল সভ্য ছিলেন কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার হারবাং এর কৃতি সন্তান খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ৮ যিনি ১৯৪৩ সালের ২৪ এপ্রিল খাজা নাজিমুদ্দিন নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভায় জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন বিষয়ক মন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামবাসী হিসেবে প্রথম মন্ত্রী হওয়ার গৌরব অধিকারী হন।
খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর আমলেই বাংলা প্রদেশের(বর্তমান বাংলাদেশ) সমস্ত থানা হাসপাতালে রোগীদের জন্য কমপক্ষে চার থেকে ৮টি বেডের ব্যবস্থা করা হয়। ওই মন্ত্রীসভাকে বেশ কয়েকটি সমস্যাকে মোকাবেলা করতে হয় তার মধ্যে অন্যতম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যটি সরকারের বিরোধিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান বাহিনী বার্মা (মিয়ানমার) দখল করে চট্টগ্রাম উপকূলে এসে পৌঁছলে ব্রিটিশ সরকার বাংলার পতন অত্যাসন্ন ভেবে জাপানকে ঘায়েল করার জন্য নৌ- যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল করে দেয় (যা উবহধরষ ঢ়ড়ষরপু নামে অভিহিত)। খাদ্য ভান্ডার অন্যত্র সরিয়ে নেয়। এ ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুতদারের ফলে ১৯৪৩ সালে বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময় বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯২-১৯৬৩) কলকাতায়, জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন বিষয়ক মন্ত্রী খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে ও চকরিয়া, কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত চট্টগ্রাম খাদ্য কমিটির আহ্বায়ক পূর্ণেন্দু দস্তিাদারের সহায়তায় কমরেড সুরেশ চন্দ্র সেন (১৯০৫-১৯৫১), ধীরেন শীল, রামুতে আবদুল মজিদ সিকদার, চকরিয়ায় জামাল উদ্দিন মিয়া চৌধুরী মাইজ্যা মিয়া, কক্সবাজারে এডভোকেট বদিউল আলম চৌধুরী লঙ্গরখানা ও রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেন। অনেকটা সফলও হন তারা। তারপরেও সারা বাঙলায় ৩৮ লক্ষাধিক লোক মৃত্যু বরণ করে। চট্টগ্রামে মৃত্যুবরণ করেন ২০ লাখ।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিনের পক্ষে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য খান বাহাদুর মোহাম্মদ আলী সে প্রশ্নটির জবাবে থানাওয়ারী একটি তালিকা পেশ করেন। তাতে সাতকানিয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার, রামু, উখিয়া, টেকনাফ ইত্যাদি থানাগুলোতে মৃতের সংখ্যা ’ঘওখ’ বলে দেখানো হয়। অধিবেশনে উপস্থিত চট্টগ্রাম প্রতিনিধি খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে খান বাহাদুর জালাল আহমদ চৌধুরীও সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারি হিসাবে শুভঙ্করের ফাঁকি তুলে ধরে বলেন, যেখানে কোন রেল লাইনই আদৌ নেই, সেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ’ঘওখ’-এর ব্যাপার আসে কীভাবে ?
১৯৪৫ সালের ২৮ মার্চ বাজেট বরাদ্দের সময় ২০ জন সরকার সমর্থক সদস্য বিরোধী দলে যোগ দিলে ১০৬-৯৭ ভোটে খাজা নাজিম্দ্দুীন মন্ত্রী সভার পতন ঘটে।
ওই মন্ত্রীসভা পতনের আগে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে কক্সবাজারে রাজনৈতিক সফরে এসে কক্সবাজার মিউনিসিপ্যালিটির উন্নয়নের জন্য তিনি ৬ হাজার টাকা সরকারি মঞ্জুরী করেছিলেন। ৯
খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী অত্যন্ত পরিশ্রমী, করিৎকর্মা এবং ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে সব সময় জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি উপমহাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর শীর্ষত্ব গ্রহণ করে ধর্ম-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এবং জীবন কাটিয়ে দেন।
একাধারে সার্থক আইনজীবী, সফল রাজনীতিবিদ, আপসহীন ও নীতিবান জনসেবক হিসেবে আজীবন মানুষের আদাযে ব্যতিব্যস্ত খান বাহাদুর জালাল আহমদ চৌধুরী ১৯৫৭ সালে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর অনেক পরে পাকিস্তান সরকারের আমলে হারবাং এলাকায় কে বি জালাল উদ্দিন সড়ক নামকরণ করেন। কিন্তু জালালুদ্দিন পাঠাগার নামে খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর নামে যে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো তা বর্তমানে আছে কিনা কিংবা আদৌ আছে কিনা সে ব্যাপারে আমার জানা নেই। তার খুঁজ নেবার দায়িত্ব তারই নেতৃত্বে প্রতিষ্টিত হওয়া কক্সবাজার সমিতি, চট্টগ্রাম কর্তৃপক্ষের।

তথ্যসূত্র :
১.ড. রাগেব আহসান ‘খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী’, ১৯৭০, ‘প্রবাল’, চট্টগ্রাম : কক্সবাজার সমিতি, পৃ : ২৭।
২.বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী। ‘বিচিত্র ভাবনা’। ফেব্র“য়ারি ২০১৪। ঢাকা : গুল নুর জাহান আরা ফাউণ্ডেশন। পৃ : ৫৫।
৩.১৯২৮ সালে বেঙ্গল অর্টিন্যান্স পাশের পর প্রজা ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার প্রয়াসে চাপ সৃষ্টিকারী একটি গ্রুপ গঠনের উদ্দেশ্যে লেজিসলেটিভ কাউন্সিল সদস্য এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আকরাম খাঁ, তমিজউদ্দিন খানসহ কয়েকজন মুসলিম সদস্য কাউন্সিল প্রজা সমিতি গঠন করেন। এ কে ফজলুল হক হন নেতা এবং সচিব হন তমিজউদ্দিন খান। কাউন্সিলের বাইরে থেকে সমর্থন আদায়ের জন্য ১৯২৯ সালে ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ (এনবিপিএস) গঠন করা হয়। সমিতির সভাপতি হন স্যার আবদুর রহিম ও সম্পাদক মাওলানা আকরাম খাঁ। ফজলুল হক হন অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট (Rangalal Sen, ÔPolitical Elites In BangladeshÕ, UPL-Dhaka, 1986, pp: 37-38)। ত্রিশের দশকের প্রথম দিকে নতুন এ সংগঠন কৃষি সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে মফস্বল এলাকায় সম্মেলন করে অর্থনৈতিক মন্দার সময় পূর্ব বাঙলায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা সব সমিতির প্রায় সবার সাথে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কৃষক নেতা হিসেবে নিজেদের পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত এবং কৃষকদের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয় তারা। এ সাফল্যের মধ্যেই সমিতির প্রেসিডেন্ট পদটি দখলের জন্য হক ও আকরাম খাঁ এর মধ্যে দুটো গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়-তারা উভয়ে সভাপতির পদটি দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। আবুল মনসুর আহমদ, নদীয়ার শামসুদ্দিন আহমদ, যশোরের নওশের আলীসহ র‌্যাড়িকেল ও প্রগতিশীল নেতারা ফজলুল হক এর পক্ষে নেন এবং আকরাম খাঁ গ্র“পে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নগরকেন্দ্রিক ক্ষমতাশীল নেতারা। অবশেষে সমিতির কর্তৃত্বের দখল নিয়ে বাঙালির মধ্যে যা হয় তা-ই হলো। সমিতি দু’ভাগ হল। হক সাহেব খণ্ডিত একটি অংশের নাম দেন ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (কেপিপি)। অন্যদিকে মাওলানা আকরাম খাঁ বিভক্ত নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং মুসলিম লীগের সাথে একীভূত না হওয়া পর্যন্ত ওই সমিতি টিকে থাকে। ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (কেপিপি) ক্ষতি পূরণ ছাড়াই জমিদারী প্রথার বিলোপ সাধন, খাজনা মওকুপ ও ঋণ রহিতকরণসহ কৃষকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হওয়ায় হাজারো গরীব ও নিম্ন শ্রেণির লোকদের উৎসাহিত করায় ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (কেপিপি) জনপ্রিয় সংগঠনে পরিণত হয়। এ সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আওতাধীন ১৯৩৬-১৯৩৭ সালের বঙ্গীয় লেজিসলেটিভ সদস্য নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিপুল আসন পেয়ে জয়ী হন এবং এ সংগঠনের প্রধান এ কে ফজলুল হক অভিবক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন এবং মন্ত্রীসভা গঠন করেন (জয়া চ্যাটার্জী, বাঙলা ভাগ হল : হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশভাগ ১৯৩২-১৯৪৭’, প্রথম বাংলা সংস্করণ মার্চ ২০০৩, ঢাকা : ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, পৃ: ৮২-৮৪)। কিন্তু ১৯৩৭ সালের ১৫ অক্টোবর এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করলে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (কেপিপি) এর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। যদিও ফজলুল হক অফিসিয়ালি কৃষক প্রজা পার্টি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন নি। মুসলিম লীগের শাসনকালে এবং দেশ বিভাগের পর একে ফজলুল হক রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না থাকলেও কিছুটা হতাশ হয়ে সাময়িকভাবে সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তারপরেও পূর্ব বাংলার সাধারণ মুসলিম জনগণের কাছে তিনি তখনও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ও স্বীকৃত নেতা ছিলেন। আবেগ প্রবণ, খাঁটি বাঙালি, বর্ষীয়ান এ নেতা ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে অবিভক্ত বাঙলার কৃষক শ্রমিকদের সেই পুরণো রাজনৈতিক সংগঠন ‘কৃষক-প্রজা পার্টি’ ( কেপিপি) কে ঢেলে সাজান। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই ঢাকায় একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে এর নতুন নাম দেন ‘কৃষক-শ্রমিক পার্টি’ (কেএসপি)। শেরে বাংলার ‘কৃষক-প্রজা পার্টি-র পুরনো সহকর্মী- আবু হোসেন সরকার (১৮৯৬-১৯৬৮), আজিজুল হক, আবদুল হাকিম প্রমুখ অবিভক্ত বাঙলার জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতারা ‘কৃষক-শ্রমিক পার্টি’ (কেএসপি)- তে যোগদান করেন। (ধনঞ্জয় দাশ, ‘আমার জন্মভূমি : স্মৃতিময় বাংলাদেশ’, প্রথম প্রকাশ- সেপ্টেম্বর ১৯৭১, মুক্তধারার তৃতীয় মুদ্রণ-জুলাই ১৯৭৪, পৃ : ৯৬-৯৭)। কৃষক-শ্রমিক পার্টি’(কেএসপি)এর নেতৃত্বে মুসলিম লীগকে ভরাডুবী করে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়।
৪.চকরিয়ার কাকারার কৃতিসন্তান মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সাহিত্য ও সাংবাদিকতার অন্যতম অগ্রদূত। তিনি ১৩২৬ বঙ্গাব্দের দিকে প্রথমে চট্টগ্রাম, পরে কলকাতা থেকে ‘সাধনা’ সম্পাদনা করেন। যে মাসিক সাহিত্য পত্রিকায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘আনোয়ার’, ‘রণভেরী’, ‘অবেলা’ কবিতা প্রথম ছাপা হয়। ছিদ্দিকী সাহেব, পরবর্তীতে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বৃটিশ বিরোধী সম্পাকীয় এবং আন্দোলনে জড়িত থাকার দায়ে তিন বার গ্রেফতার হন। তার সম্পাদিত পত্রিকার মধ্যে ‘আন্নেসা’ (১৩২৮ বঙ্গাব্দ), ‘মোসলেম জগৎ’ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ), মাসিক রক্তকেতু (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ), ‘কক্সবাজার হিতৈষী’ ( যেটি কক্সবাজারের প্রথম পত্রিকা)। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে-কাব্য- ‘রোস্তব সোহরাব’ (১৯১৬), ‘যবন-বধ-কাব্য’ (১৩৫১ বঙ্গাব্দ), ‘চিন্তার ফুল’, ‘পাকিস্তান বিজয়কাব্য’(১৩৫৫ বঙ্গাব্দ), অনুবাদ-‘মহাকোরান কাব্য’ (১৯২৭ খ্রি.), উপন্যাস- ‘জরিনা’ (১৩২৩ বঙ্গাব্দ), ‘নুরুন্নাহার’, ‘মেহেরুন্নেছা’, ‘উপেন্দ্রনন্দিনী’ (১৯১৯ খ্রি.), ‘প্রণয়-প্রদীপ’, গদ্য-আলোচনা: ‘চট্টগ্রামী ও রোমাইতত্ত্ব’, ‘চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত’¡ (১৩৫৩ বঙ্গাব্দ)। এ ছাড়া অমুদ্রিত ও অপ্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- চিত্তদর্পণ’, ‘কলির বাঙ্গালা’ (সমালোচনা), ‘সমাজচিন্তা’ (পদ্য), ‘মহাভুল সংশোধনী’ গন্ধব্য দুহিতা (উপন্যাস), ‘হযরত আমীর হামজা জীবনী’, ‘মুক্তার ছড়া,’ ‘আমীর হামজা’ (উপন্যাস), ‘সংক্ষিপ্ত জীবনী’। ১৯৩৬ সনে বৃহত্তর কাকারা ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯২৬ সালে জজ কোর্টের অবৈতনিক জোরার এবং আদালতের সালিশকারও ছিলেন। প্রচুর ভূ-সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। যদিও উনার সাহিত্য তেমনটা বাজারে পাওয়া যায় না।
৫.Dilip Banerjee, ÔElection Recorder – An Analytical Referance’, Sixed Revisied Edition in September 2012, Kolkata : Star Publising House, PP : 66.
৬.কালাম আজাদ, ‘মুক্তিসংগ্রামে কক্সবাজার : প্রসঙ্গ রাজনীতি, ‘বিজয় স্মারক ২০১৪’, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪, কক্সবাজার : জেলা প্রশাসন, পৃ : ১০৮।
৭.ড. হারুন-অর-রশিদ, ‘বাংলাদেশ: রাজনীতি সরকার শাসনতান্ত্রিক উন্নয়ন ১৭৫৭-২০০০’, ১ ফেব্র“য়ারি ২০০১, ঢাকা: নিউ এজ পাবলিকেশন্স, পৃ: ১১৭। /Dilip Banerjee, ÔElection Recorder – An Analytical Referance’, Sixed Revisited Edition in September 2012, Kolkata : Star Publising House, PP : 112
৮.মোহাম্মদ খালেদ সম্পাদিত ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’, নভেম্বর ১৯৯৪, চট্টগ্রাম : কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস, পৃ : ৩৫।
৯.অধ্যাপক নুর আহমদ, কক্সবাজারের ইতিহাস, দ্বিতীয় সংস্করণ-অক্টোবর ২০০৫, কক্সবাজার : মাহরুবা বেগম, পৃ : ১৯৭।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।