আকাশে ফুলের দাগ ৪৮

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

মানুষ মনে হয় ধরেই নেয় যে অন্তত ১০০ বছর বেঁচে থাকবে। তাই ৫০ বছর পূর্ণ হলে অর্ধেক জীবন পার হওয়ার একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে রক্তে। কেমন একটা অনুরণন তৈরি হয় শরীরে। রোম দাঁড়িয়ে যায়। ফলে নিজেকে শজারুর মতো লাগে যেন এইসব রোমের কাঁটায় বেষ্টনি গেড়ে কাটিয়ে দেবে আরো ৫০ বছর।

না, আমার ৫০ বছর হয় নাই। হয়েছে মানিকভাইয়ের। আমি অনুমান করছি মানিকভাইয়ের এমনই কোনো অনুভূতি হচ্ছে এই দিনে। যদিও তাকে আমি গত ৫ বছর ধরে প্রায় সময় বলে আসছি আপনি আর মাত্র বছর তিনেক বাঁচবেন।

মানিকভাই মানে কবি মানিক বৈরাগী। তাকে মানিক বৈরাগী নামে চিনি আমি বছর দশেক হলো। এর আগে মাঝখানে অনেকদিন কোনো খবর জানতাম না। কোথায় গেলেন, কী করছেন কিছুই জানতাম। নানা কাজে ও অকাজে একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিলাম, তাই খোঁজও করিনি।

মানিকভাইকে আমি ছোটবেলায় চিনতাম সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক নামে। ১৯৮৮ সাল থেকে চিনি। সেই হিশেবে তাকে চিনি ৩২/৩৩ বছর তো হবেই। তিনি আমার মেজআপার বন্ধু ছিলেন কলেজে। আমাদের বাড়িতে আসতেন মাঝে মধ্যে, হাতে থাকতে লালবই। কবিতা পড়তেন। তার বাড়ি আর আমাদের বাড়ির মাঝখানে একটা নদী ছিলো, নদীর নাম মাতামুহুরী। নদী এখনো আছে শুধু দুইকূলে আমাদের বাড়ি নেই।

কলেজে মানিকভাই ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। নেতা ছিলেন। আর করতেন খেলাঘর আসর। খেলাঘর আসরে আমিও মনে হয় কয়েকবার গিয়েছি মানিকভাইয়ের সঙ্গে। তখন আমার ৮/৯ বছর বয়স। সব স্মৃতি আজ ধোঁয়াশা হয়ে গেছে।

উদীচীর কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন মানিকভাই। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জননী জাহানারা ইমামের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির হয়ে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ডের দায়িত্ব গ্রহণ ও স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন।

পরে মানিকভাইয়ের মুখেই শুনেছি কলেজ পাশ করে ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র শিবিরের ক্যাডাররা ধরে নিয়ে গিয়ে তার ডান পায়ের রগ কেটে দেয়।

তারপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশে পুলিশ রিমান্ড, জেল ও বহু মামলার আসামী করা হয় তাকে। রিমান্ডে নির্যাতনের ফলে স্পাইনাল কর্ডে আঘাত পেয়ে এখন কী অবস্থা তা আর বলতে মন করছে না।

এত সব ঘটনার মাঝে কখন যে শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্নে বিভোর সেই বিপ্লবী সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক হয়ে গেলেন পুরোদমে কবি মানিক বৈরাগী, তা হয়ত তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি।

শৈশবে মানিকভাই ছিলো আমার চর্মচক্ষুতে দেখা প্রথম প্রথম স্মার্ট এবং সুদর্শন মানুষ। উজ্জ্বল রঙের হাফশার্ট পরতেন। প্যান্টের সঙ্গে ইন করা থাকতো। এখনো সেই দৃশ্য চোখে ভাসে।

আজ ২৮ জানুয়ারি। মানিকভাই অর্ধেক জীবনে এলেন। ১৯৭১ সালের এই দিনে আমার জন্মের ১০ বছর আগে তিনি জন্মেছিলেন। শুভ জন্মদিন, প্রিয় মানিকভাই। অনেক ভালোবাসা।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।