ইউসুফ শরীফের কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ

ইয়াহ্ইয়া মান্নান

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্য তথা ছোটগল্প ও উপন্যাসের ধারায় যে ক জন লেখক নিজস্বতায় বিশিষ্ট হয়ে আছেন তাদের মধ্যে ইউসুফ শরীফ (জন্ম : ১৯৪৮) অন্যতম।

ইউসুফ শরীফের লেখায় যুগচেতনা, জীবন চেতনা ও শিল্প চেতনার সমন্বয় ঘটেছে অত্যন্ত পরিশীলিত এবং বিশ্বস্ততার অবয়বে। তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, চরিত্র চিত্রণ দক্ষতা এবং আকর্ষণীয় গল্পরস ইতোমধ্যে পাঠক সমাজে হয়েছে আলোচিত ও নন্দিত। গ্রামীণ, নাগরিক এমনকি বিদেশ ভ্রমণলব্ধ অভিজ্ঞতা ও তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে নব নব ব্যতিক্রমী কাহিনীর বিন্যাস পরিলক্ষিত হয় তাঁর কথাসাহিত্য। ইউসুফ শরীফের অনেক গল্প-উপন্যাসের কাহিনী ও ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নির্ভর। এসব গল্প-উপন্যাসে রূপায়িত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড খণ্ড চিত্র; মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারদের দৌরাত্ম্য, অত্যাচার ও নিপীড়নের কাহিনী, মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীনতা পরবর্তীকালে রাজাকারদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণে ধর্ষণ ও অত্যাচারের শিকার গ্রামীণ নারীদের দুঃসাহসী কর্মকাণ্ডের আলেখ্য।

কথাশিল্পী ইউসুফ শরীফ উপন্যাস ও ছোটগল্প ছাড়াও আত্মজীবনী, কবিতা, নির্বাচিত কলাম ও ভ্রমণকাহিনী রচনায় সিদ্ধহস্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ তাঁর কথাসাহিত্যের একটি বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। তবে তিনি মধ্যষাটে কবিতা দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করলেও মুক্তিযুদ্ধের পর কবিতা ছেড়ে পুরোপুরি কথাসাহিত্যে মনোনিবেশ করেন।

মুুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক তাঁর রচিত উপন্যাস ও ছোটগল্পগ্রন্থগুলি নিম্নরূপ :
রুদ্ধনগরীর বালকেরা, ধ্বনির বিস্ফোরণ, পরম মাটি, স্বপ্নের চারুলতা, সুশোভন সমাচার, শিকড়, যেভাবে যৌবন, নীল জোছনায় দৃষ্টি ও নির্বাচিত গল্প।

ইউসুফ শরীফের গল্প-উপন্যাস মানব-চেতনা ও সমাজজীবনের গভীর পর্যবেক্ষণ, সৃজনমুখর গদ্যভঙ্গিমা ও শিল্প প্রয়োগশৈলীর নৈপুণ্যে সমৃদ্ধ। তাঁর শক্তির উৎসও নিজস্ব গদ্যভাষা-মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি- আধুনিক প্রকাশরীতি। বিদগ্ধ সমালোচকের ভাষায় – ‘ইউসুফ শরীফের উপন্যাস যতটা বিবরণধর্মী, তার চেয়ে বেশি চেতনা ও শিল্পপ্রবাহী । মানুষের অন্তর্জীবনের চেতনা ও বহিরাঙ্গিক বাস্তব সচেতনতা সমন্বিত শিল্প হয়ে ওঠে।’

মুক্তিযুদ্ধ জাতির শ্রেষ্ঠ সময় – স্বাধীনতা শ্রেষ্ঠ অর্জন। মহান মুক্তিযুদ্ধ শক্তিমান কথাসাহ্যিতিক ইউসুফ শরীফের চেতনায়-মননে- আচরণে অনির্বাণ। ইউসুফ শরীফ মনে করেন, একাত্তরই জাতির মাইলফলক। ওখান থেকে যে যাত্রা শুরু, তা-ই ভালো-মন্দ মিলিয়ে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে। তাঁর লেখালেখির বড় অংশই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেন্দ্রিক । রুদ্ধনগরীর বালকেরা, ধ্বনির বিস্ফোরণ, পরম মাটি, স্বপ্নের চারুলতা, সুশোভন সমাচার, শিকড়, যেভাবে যৌবন, নীল জোছনায় দৃষ্টি- এসব উপন্যাসে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ের মানুষের বদলে যাওয়া সমাজ।

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মনের কথাগুলো মুক্তিযোদ্ধা কথাশিল্পী ইউসুফ শরীফ স্বীয় চেতনা থেকে বাণীবদ্ধ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করেছেন। যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, সে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উল্টে যায় সমাজচিত্র। লেখক ইউসুফ শরীফ এসব বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাঙ্গা মনের নীরব বেদনার রূপায়ণ ঘটিয়েছেন তাঁর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস – ছোটগল্পগুলিতে । পরম মাটি উপন্যাসে হাসান শেক বলেন-
‘আরে ব্যাটা কি কমু । এই যে দেশটা, দেশটার কি দশা? এক্কেরে আমার লাহান-মুক্ত কিন্তু ল্যাংড়া- আমার লাহান আর কি!- এক পায়ে ভর আর এক পা অবশ-বুঝলা- তাকদ নাই। হায়রে! দেশের বেক্কল মানুষ!’

যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা হাসান শেক এক পা হারিয়েছিলেন। তিনি গ্রামের মানুষের কাছে ‘ল্যাংড়া মুক্তি’ নামে পরিচিত। স্বাধীন দেশ যেমন পায়নি তার স্বাধীনতার রূপ, তেমনি স্বাধীনতার জন্য ত্যাগী মানুষেরাও পায়নি তাদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার । বিপক্ষ শক্তি অপশক্তি গ্রাস করেছে মুক্ত বাংলার সমাজ জীবনকে।
সুশোভন সমাচার উপন্যাসে একদিকে স্বদেশপ্রেম প্রতীকীরূপে উদ্ভাসিত, অন্যদিকে অন্যায় ও পাপাচারের বিরুদ্ধে নীরব ও কুশলী প্রতিবাদ ধ্বনিত। সদ্য স্বাধীন দেশেও ইংরেজ সাহেবদের পরিচালিত এনজিও কর্মকর্তারা যে চাকরি প্রদান, প্রমোশন, বিদেশে পাঠানো ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা বাধ্য করে অনেক নারীর সর্বনাশ সাধন করে সে ট্র্যাজিক কাহিনি বিধৃত হয়েছে সুশোভন সমাচার উপন্যাস। ডেভিড সরকারের কন্যা এলির সঙ্গে সাহেবের অবৈধ মিলনের ফলে এলি গর্ভবতী হয় এবং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে জীবন থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু অপকর্মের নায়ক সাহেব রহস্যাবৃতই থেকে যায়। সাহেবদের হাত লম্বা অর্থাৎ তারা শক্তিধর হওয়ায় স্বাধীন দেশেও তাদের অপকর্ম ও পাপাচারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না।
রুদ্ধনগরীর বালকেরা উপন্যাসে লেখন মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধ প্রারম্ভে বিশেষ করে ২৫ মার্চ থেকে ২৭ মাচের্র নির্মম নিধনযজ্ঞের ট্র্যাজেডি অঙ্কন করেছেন। পরবর্তীতে রুদ্ধনগরীর চারজন বালকের সাহসিকতা ও তাদের জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত লাল-সবুজের মানচিত্র পাই। লেখকের ভাষায়,
‘আগুনে পোড়া ইত্তেফাকের বিধ্বস্ত স্ত‚পের সামনে এখানে সেখানে কিছু মাংস লেগে থাকা একটা প্রায় কংকাল রক্তাক্ত-রক্তের একটি লাল বৃত্তের মাঝেখানে এক অন্ধ কিশোর নয়ন নয়- নান্টু দেখল এক অন্ধ দেশের রক্তাক্ত এক মানচিত্র।’
এই সত্য উপন্যাসটিও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সামাজিক, নৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র, মূল্যবোধ বিনাশের চিত্র আলোচ্য উপন্যাসে অঙ্কিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মাস্টার ও মুক্তিযোদ্ধা বাতেন স্বাধীনতার পর রাজাকার চেয়ারম্যানের লেখক মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব তুলে ধরেছেন। মুক্তিযোদ্ধা বাতেন চোরাকারবার করতে রাজি না হওয়ায় এবং চেয়ারম্যান সম্পর্কে সরকারকে জানিয়ে দেয়ায় গভীর ষড়যন্ত্রে নিহত হন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা বাতেন মরেও মরেনি। বাতেনের উপলব্ধি লেখকের ভাষায়-
‘ডোমেরা লাশকাটা ঘরে আমার লাশটা ফালাইয়া রাইখ্যা যাইতাচে গা। ওগর আর দোষ কি, ওরা তো জানে না, লাশের বুকের মধ্যিখানে একটা দেশ আচে- এই বাংলাদেশটা আচে-’
ইউসুফ শরীফের অনেক গল্পের কাহিনী ও ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নির্ভর। তিনি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক কলমযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের পরমুহূর্তেই দেশপ্রেমিক, সাহসী সৎ ও নির্লোভ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নভঙ্গের দুঃসহ বেদনাই ইউসুফ শরীফকে গল্প লেখার প্রেরণা যুগিয়েছে।

‘বাবার ছবি’ , ‘এই সত্য’, ‘সুফিয়ার জন্য’, ‘বুনোরাত’, ‘মুখোমুখি’ ইত্যাদি গল্পসহ আরও কিছু গল্পে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানবিক অবস্থা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাহিনী ও চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ‘যুদ্ধের পর’, ‘লেডী হ্যামিলটন’, ‘ছোবল’ ইত্যাদি গল্পে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষের চারিত্রিক অধঃপতন, বিলাসী ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের আলেখ্য অঙ্কিত হয়েছে। পাশাপাশি কিছু গল্পে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন সংগ্রাম ও জীবনের করুণ পরিণতির আলেখ্য বিধৃত করেছেন।
ইউসুফ শরীফের নির্বাচিত গল্প সংকলনে মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎসংশ্লিষ্ট গল্পের সংখ্যাই বেশি। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবার ছবি কী করে একজন নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারে এই সত্যোপলব্ধি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘বাবার ছবি’ নামক গল্পে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালে দেশের প্রকতৃ যোদ্ধাদের অনেককেই জেল-জুলুমসহ নানা অত্যাচার অবিচার সহ্য করতে হয়। অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ সত্যেরই শিল্পিত প্রকাশ ঘটেছে ‘এই সত্য’ গল্পে।
‘সুফিয়ার জন্য’ গল্পটিও নবতর জীবন চেতনায় উজ্জীবিত মুক্তিযোদ্ধা সেলিমের যাপিত জীবনের একটি খণ্ডচিত্র। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যে প্রয়োজনে ’৭১- এর হাতিয়ারের মতোই পুনরায় গর্জে উঠতে পারে সেলিমের কর্মকাণ্ড তারই সাক্ষ্য দেয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনী নির্বিচারে ধর্ষণ করেছিল এ দেশের অনেক কিশোরী ও যুবতীকে। ধর্ষণের শিকার অনেক নারীই আত্মহত্যা করেছিল। আবার কেউ কেউ করেনি। তারা নিয়েছিল চরম প্রতিশোধ। ‘বুনোরাত’ গল্পের আমিনা তেমনি এক নারী। যে দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করে, ‘হারামীর পুত- সাধু সাজছো। নিজের হাতেই দেম- এমন শাস্তি, যা কেউ হুনেও নাই, দেহেও নাই।’
মানুষ অপরাধ করে বটে কিন্তু কোনো কোনো মানুষ আছে যারা অপরাধবোধের যন্ত্রণায় ভোগে। স্বেচ্ছায় শাস্তি পেতে চায়। ‘মুখোমুখি’ গল্পে এমনই এক শিক্ষক রাজাকারের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। ‘মোকাবিলা’ গল্পটিও মুক্তিযুদ্ধের স্পর্শে ধন্য । বিচিত্র পেশার সঙ্গে জড়িত আপামর জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে। তারই একটি খণ্ডচিত্র পাওয়া যায় ‘ঘন জোছনায়’ নামক গল্পে। একজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পেয়ে আর একজন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা বর্ণিত হয়েছে ‘পরম মাটি’ গল্পে। এই ছেলে, রুস্তমের কাছে মাটিই খাঁটি। পরম মাটি। কারণ তার পিতা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল স্বদেশের মাটি রক্ষার টানেই। ইউসুফ শরীফের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্পগুলো স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলার এক অক্ষয় দলিল।

বাংলা কথাসাহিত্যে ইউসুফ শরীফ স্বীয় অভিজ্ঞতার আলোকে মুক্তিযুদ্ধকে চিত্রিত করেছেন গল্প ও উপন্যাসে। তাঁর রচিত মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক কথাসাহিত্যে বাস্তবতার ছোঁয়া জীবন্ত হয়ে পাঠককে আকর্ষণ করে।

লেখক : গবেষক, অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।