নিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

রাইজিং কক্স ডেস্ক: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আজ থেকে দু’শো বছর আগে, একদিকে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, অশিক্ষা অন্যদিকে ক্ষুধা, দারিদ্র আর হৃদয়হীন লোকাচারের নিগড়ে বন্দী অন্ধকারাচ্ছন্ন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বড় হয়ে সেই অচলায়তন ভেঙ্গে নতুন মানুষের চাষ করতে চেয়েছিলেন পার্থিব মানবতাবাদের পথিকৃৎ মহান এই মানুষটি। সত্যিকারের সেই মনুষ্যত্বের আবাদের জন্য ‘পুরাতন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি,র সাতপুরু মাটি উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন তিনি৷ যুক্তি ও সত্যের শক্তিতে বলিয়ান সেই নতুন মানুষ গড়ার লক্ষ্যে তাঁর প্রতিপল ব্যস্ততা। আমৃত্যু একাগ্র সাধনা। ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক-বৈজ্ঞানিক শিক্ষা প্রবর্তন, স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা, পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক রচনা, আধুনিক ও উন্নত বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সৃষ্টি, বিধবাবিবাহ প্রচলন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রদ ইত্যাদির মতো সমাজ প্রগতির ক্ষেত্রে নির্ণায়ক বহু দুরূহ ও দুঃসাহসিক কাজে হাত দিয়েছিলেন তিনি। যারা গরিব দুঃখী অনাথ আর্ত তাদের সকলের প্রতি তাঁর মমতা ছিল প্রবাদপ্রতিম। ক্ষুধার্ত ভিক্ষুক, লাঞ্ছিত বাল্যবিধবা, অবহেলিত বৃদ্ধ কিংবা রোগী সকলের দুঃখে ব্যথায় তাঁর চোখে জল আসতো। এই বেদনাবোধের জন্যই আজীবন নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ আরাম আয়েস বৈভব বিলাসিতার দিকে ফিরে তাকানোরও অবকাশ পাননি। বিলিয়ে দিয়েছেন তাঁর শেষ কপর্দক পর্যন্ত।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০ – ২৯ জুলাই ১৮৯১) ঊনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার। তাঁর প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই লাভ করেন বিদ্যাসাগর উপাধি। সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল তাঁর। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ করে তোলেন ও অপরবোধ্য করে তোলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয় সহ, একাধিক পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহু রচনা।

অন্যদিকে বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারকও। বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণে তাঁর অক্লান্ত সংগ্রাম আজও স্মরিত হয় যথোচিত শ্রদ্ধার সঙ্গে। বাংলার নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনই তাঁর দ্বার থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে পরোপকার করেছেন। তাঁর পিতামাতার প্রতি তাঁর ঐকান্তিক ভক্তি ও বজ্রকঠিন চরিত্রবল বাংলায় প্রবাদপ্রতিম। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি।

বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগর আজও এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। জন্ম ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রয়াত হন ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই, বাংলা ১২৯৮ সনের ১৩ শ্রাবণ, রাত্রি দুটো আঠারো মিনিটে তাঁর কলকাতার বাদুড়বাগানস্থ বাসভবনে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর ১০ মাস ৩ দিন।

Comment here