গ্রন্থালোকশিল্প ও সাহিত্য

ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প : মহাকাব্যের একাংশ এবং কিছু পাথর-বৃষ্টি

মৃধা আলাউদ্দিন

গিজার পিরামিড, ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান, রোডস জিউসের মূর্তি, আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর, আমাদের তাজমহল, নায়েগ্রা জলপ্রপাত, লন্ডন ব্রিজ নিত্যই হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। আমাদের ডাকছে পাহাড়-নিসর্গ, ঝরনা ও নদী। নীল দিগন্ত এবং ওই আকাশ আমাদের নিত্যই ডাকছে। কেনো ডাকছে?

আকাশের একটা দৈব শক্তি আছে। এই শক্তিই আমাদের ডাকে। পৃথিবীর সুন্দর-ষড়ৈশ্বর্য শক্তিই আমাদের অহরহ ডাকছে। তবে আলেয়াও আমাদের কম ডাকে না। হিটলারও ডাকে।… একজন কবিকে অবশ্যই মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য ডাকে। ডাকবেÑ আনন্দচন্দ্র মিত্রের হেলেনাকাব্য, কবি কায়কোবাদের অশ্রুমালা, হামিদ আলির সোহরাববধ কাব্য, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর অনলপ্রবাহ, বাল্মীকীর রামায়ণ, ব্যাসদেবের মহাভারত, হোমারের ইলিয়াড, ওডিসি। নোবেল বিজয়ী কবি স্যাঁ-ঝন পের্সের মহাকাব্য আনাবাজ আমাকে বার বার ডাকে…। মার্কেজের নিঃসঙ্গতার একশ বছর আমাকে ডাকে…। এদের কোনো কোনো ডাকে আমি সারা দিয়েছি। আবার কোনোটায় এখনো আমার সারা দেয়া হয়নি। দেবো। বর্তমানে আমি একটা মহাকাব্যিক মেজাজে নির্মিত এবং আমাদের সময়ের কবি ও কথাশিল্পী, ভিন্নস্বরে ভেজা কবি মাসরুর আরেফিনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ, ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প আমাকে ডাক দিয়েছে। আমি তার ডাকে সারা দিয়েছি। পড়তে পড়তে আমি বুঁদ হয়ে আছি ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে। এ কি মহাকাব্য, রাজনীতি, সমাজনীতি না শুধুই কবিতাÑ এমন একটা দ্বন্দ্বে আমি হুঁশ হারিয়ে ফেলেছি। কিছুদিন আগে আমার আরেকবার এমন হয়েছিল, আমি বিরহের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে হুঁশ হারিয়ে ফেলেছিলাম। অবশেষে শুঁড়িখানার নিয়ন আলো, শান্ত বাতাস আমাকে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল।
যাক সে কথা, আমি পড়তে ছিলামÑ ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প। মেয়রের সমস্ত কাণ্ডকারখানা…। আমার সামনে ভেসে উঠলো সমগ্র বাংলাদেশ। এশিয়া। চীন, জাপান, ইউরোপ, আমেরিকা- তামাম পৃথিবী। পৃথিবীর মোড়লেদের চেহারা। যারা সাদা চামড়ার কুইনকেও ক্ষমা করতে পারেনি। কুইনের জন্ম হয়েছিলো কোনো এক নিগ্রোর ভালোবাসার পৌরুষে এবং না, কোনো ফেসবুক নয়; ইনবক্সের ভেতরে ভেতরে আমি হাঁটছিলাম। দেখছিলাম মানুষের আসল রূপ। বীভৎস, ক্লেদজ-কুসুম কুসুম চেহারা। স্টাচু অব লিবার্টি অথবা হাস্যকর লেনিনের সব মূর্তি। আমি ভাবছিলাম আক্ষরিক অর্থেই যখন পেন্টাগন ও টুইন টাওয়ার ধসে গেল, তখন কেমন লাগছিল বর্বর আমেরিকানদের। করোনা ভাইরাস আমাদের, আমাদের এই পৃথিবীকে কী শেখাচ্ছে। আমরা কী আদৌ কোনো সভ্য জাতি হতে পারবো না, নাকি ঈশ^নদীর মেয়রের মতোই বলবো- ‘যাও,/মেহগনি গাছের আগায় ছফাকে ঝুলাও,/গলায় দিয়ে ফাঁস/ডাশ-খাণ্ডারনাশ।’
কবি ও কথাশিল্পী মাসরুর আরেফিনের ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প যখন আপনি পড়বেন, তখন মনে হবে একটা ট্রেনের ভেতর দিয়ে হড়হড় করে চলে যাচ্ছে আপনার চেনা পৃথিবীর একটা গল্প। গল্পটা এমনভাবে গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে, যেমন করে যায় ঝরনার পানি এবং এই পানি যখন মানুষের কাছে যায়Ñ তখন মানুষ তাকে দূষিত করে। মাসরুর আরেফিন তার ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে মানুষের দূষিত-দলিত পানির আখ্যান, শঠতা, প্রতারণা, মিথ্যা ও অবিচারের গান গেয়েছেন বন্দুকের বাট হাতে নিয়ে এবং প্রকৃতির অভিশাপে আমরা আজ দিকশূন্য হয়ে পড়েছিÑ তিনি সে কথাই বলেছেন। মাসরুর তার কবিতার পরতে পরতে শ্লেষ, বক্রোক্তি, রূপক, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাস ও প্রতিয়োমানোৎপ্রেক্ষার ভেতর দিয়ে একটা বিষাদময়, যন্ত্রণায় জর্জরিত গল্পই আমাদের বলতে চেয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, সমাজের, দুর্বৃত্ত, বদমায়েশ, নিপীড়ক এবং নিপীড়িত মানুষের গল্প। পৃথিবীতে শোষকরা, ঈশ্বরদীর মেয়রা প্রতিদিন নিরীহ ও শান্তিপূর্ণ মানুষের জীবনযাপনের আড়ালে যুদ্ধ ও সন্ত্রাস কীভাবে আমাদের ক্রীতদাসের মতো নিচু করে রাখে তিনি সে কথাই বলতে চেয়েছেন তার ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে। মাসরুর বলতে চেয়েছেন, পৃথিবীতে ভীত-ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর কথা। তিনি বলতে চেয়েছেন, বাস্তব জীবনে সুবিচার বলতে কিছু নেই। আমরা শুরুতেই মেয়র ও তার তোষামোদকারীর কিছু কথা এখানে তুলে ধরতে চাই। মেয়র বলেন-
‘আজকের মিটিংয়ে যারা উপস্থিত নান্দীকর ও কবি, সকলেই জানেন, সামনে ভোটাভুটি, কার্তিকের প্রথম দিবসে। আরো জানেন নিশ্চয়ই, আমি ভোট পেতে ভালোবাসি। আর ভালোবাসি তার বাধাহীন ক্রয় ও বিক্রয়।
‘এখানে ইলেকশন কমিশনের চিফ প্রেজেন্ট রয়েছেন, তাকে বলি, এ গুরু দায়িত্ব আপনার। স্বচ্ছতা চাই সেলোফিনের পেপারের মতো… আপনারই কাছে। জাতির স্বার্থেই আপনার বোঝা প্রয়োজন কোথায় বস্তুর ভেলোসিটি আর কোথায় তার সেন্টার অব অপার গ্রাভিটি!…
‘বলি আজ আপনাদের কাছে, তুর্কমেন প্রেসিডেন্ট সাপরমুরাদ নিয়াজভ আমার গুরুদেব-তারই মতো আমিও চাই ভোট। মানুষ পাখি ও গাছের পাতাদের… অর্থাৎ নাইনটি নাইন পারসেন্ট অব দ্য টোটাল… নিশ্চিত করতেই হবে। বাকি এক পারসেন্ট ইলেকশন-ডেতে মারা যেতে পারে, খুবই স্বাভাবিক।
‘এ আমার বৈধ ক্লেম… দেখুন আমি ছাড়া আর কে পারবেন ইলেকশন-রেড রিডাকশন-সিক্সটি থেকে ফিফটি থ্রিতে? মানবেন নিশ্চয়ই আমার এই কুলীন অর্জন- অভূতপূর্ব আর ঐতিহাসিক বটে।’
মেয়রের তোষামোদকারীরা যা বললেন-
‘আজীবন কৃতজ্ঞ হবো শুধু সেই সুযোগটা যদি দেন, অতোটুকু আস্থা রাখেন এই কটকিনা প্রজাদের ’পরে। স্যার আপনারও যদি সামান্য এই ইলেকশন নিয়ে দুঃশ্চিন্তা থাকে, তবে তো আমাদের স্রেফ মরে যাওয়াই ভালো কুয়ায় ভাসিয়ে…
কী যে ভালোবাসি স্যার (এ-সময়ে তাদের চোখে বাঁধভাঙা পানি) আপনাকে স্যার আমরা সকলে… এমনকি বিশ্বাস করুন আপনার মনিংয়ের প্রথম লাদিও মাখিয়ে খেতে পারি যার যার পাউরুটির সাথে, ত্বরীয় খুশিতে।’
২.
মাসরুর আরেফিনের ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প পড়লে এইসব চিত্রকল্প ও ঘটনা খুব বেশি বেশি করে পাবেন। আরো পাবেন মেয়রের পাশে, ডানে-দক্ষিণে, ভ্রমণে কারা সবসময় পাশে থাকেন। আমরা মেয়রের পাশে কর্নেলকে দেখেছি। দেখেছি জলহস্তি, ব্রন্টোসরাসের নানা মেম্বারকে-আর তার প্রিয়ভাজন প্রচার মিনিস্টারকে। মেয়র তারে উপহার দেন উষ্ণ রুমাল। সার্ভ করেন- ফ্রায়েড খিচুড়ি ও গরম ভেলপুরি, কেউ কেউ শুধু লেমনেড, শুধু আইরিশ কফি কিংবা মোরব্বা আর চিলড্ মিল্কশেকসহ আরো কতো কি…। আর মজার ব্যাপার হলো যারা মেয়রের ভ্রমণে সাধারণ ডেকে বসে আছেন, তাদের আপ্যায়ন করা হচ্ছে শুধু সলটেড্ বিস্কুট ও সোডা ভরা কেক দিয়ে।… মেয়রের ফিরিস্তি দিলে আমি জানি এ লেখা কখনো শেষ হবে না। তবুও খানিকটা বলছি- ঈশ্বরদী (এখানে ঈশ্বরদী সারা পৃথিবীকে বহন করছে) মেয়র সম্পর্কে আহমদ ছফার ধারণা- তিনি বললেন, ‘এর পেছনে কু-মতলব আছে, মেয়র রাষ্ট্র বিক্রি করে দিতে চান কাজাক ও তুর্কমেন দস্যুদের কাছে। ঈশ^রদীর পোলট্রি তিনি ফ্রি সাপ্লাই দিতে চান বাকুর বাজারে, আর আপনাদের মা-বোনদের লাগাতে চান উজবেক লম্পটদের ব্যবহারে।’ অবশেষে এ জন্যই ছফাকে ঝুলতে হয়েছিল মেহগনি গাছের ডালের সাথে।
মাসরুর আরেফিন একজন আপাদমস্তক কবি। তিনি তার ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে বলেনÑ
‘তারপর সে কী বিক্ষোভ, সে কী র‌্যালি ও মিছিল
এমনকি রয়েল প্যালেসে মারা হলো পাম্পসু ও ঢিল।’
উপরোল্লিখিত লাইন দুটোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, ঘটনা, গাম্ভীর্য ও অন্তমিল যে কেউ দিতে পারবে না। এর জন্য একজন কবির দরকার হয়। একজন মাসরুর আরেফিনের দরকার হয়। তিনি কবি বলেই তার এ কাব্যগ্রন্থে শ্লেষ, বক্রোক্তি, রূপক, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাস, প্রতিয়োমানোৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পের ঠাসা বুনন রয়েছে। আমরা প্রথমেই ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প থেকে কিছু উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাস, প্রতিয়োমানোৎপ্রেক্ষা চিত্রকল্প তুলে ধরছিÑ
উপমা : ১. ঈশ^রদী গলি ও রাস্তায়Ñ ঝটিকাবর্তের মতো, ক্ষমতার পেডেস্টাল ফ্যানে, লোকচক্ষুর অন্তরালে, রাতের আঁধারে…
২. নদীযাত্রার মাত্র দুই দিন আগে আকস্মিক ঈশ^রদী আলোড়িত হলো তরঙ্গ বন্ধুর সাগরের মতো।
৩. আচার ও রীতির প্রতি মুগ্ধ ভাবাবেশ এবং রুচি ও প্রবৃত্তির ভেদ আর বন্যার জলের মতো আসা যৌবন চাঞ্চল্য কামলীলা সতীচ্ছেদ।
৪. হস্তরেখাবিশারত কোনোভাবে জেলির মতো ভিড়ের ফাঁকে জায়গা করে নিয়েছেন।
৫. উড়িয়ে দেয়া হলো এক লক্ষ ঘুড়িÑ তারা উড়ছে ঝিঁঝি কিংবা জোনাকী পোকার মতো…।
৬. আকবর, তার মারকুটে চরিত্রের কথা মিথের মতোন।
৭. ওদের কুকুর দাঁত বেড়িয়ে এসেছে আষাঢ়ে গল্পের মতো।
৮. পাতাবাহারের গাছে তখন স্প্রিংয়ের মতো লাফঝাঁপ দিচ্ছে হিরণ্যবর্ণ চড়ুইয়েে দল… জমিন কাঁপিয়ে।
উৎপ্রেক্ষা : ১. আজ যেনো বিদায় হজের দিনÑ এস্টাবলিস্টহলো মোকাব্বরি রাইয়তের জায়েদাদ, তাদের সভ্রেইনটি আর অখণ্ডদণ্ড।
২. কাল রাতে স্ব^প্নে দেখেছি জনকের মতো, যেনো আমি ঈশ^রদীর পাশ দিয়ে ট্রেনে যেতে যেতে, ফকিরান জমির সেই রাখালের সাথে কাজে মশগুল।
৩. দেখে মনে হয় যেনো, দত্যি ও দানো, অহিংস সংগ্রামে মত্ত হয়েছে।
প্রতিয়োমানোৎপ্রেক্ষা : ১. ওকে বেশি করে বোঝাবেন, পুরুষ হবে তো আপনার মতো অতিবিক্রম, মহাবীর্যবান…
২. এন্টিবডির কাজ কমে গেছে টিটিভ শকুনীর পাখার ঝাপটায়।
৩. এনামেল পেইন্টের ভেতর তোমাকে পর্যাপ্ত জঘণ্যই লাগছে।
চিত্রকল্প : ১. অবশেষে যাত্রা শুরু হলে এক শাবণের ভোরে। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী, তাতে ঘূর্ণমান আঁকাবাঁকা জল। আর খেয়া খাটে দুচ্ছেদ্য ভিড়। নগর-তহবিলের ম্যানেজার টোল জমা দেন খালাসির কাছে, আর লগি দিয়ে ঠেলে গয়নার নৌকাটাকে নেয়া হলো ফেঁপে ওঠা জলে… সুকানি দিয়েছে তার বাদাম উড়িয়ে। আর মাস্তুলের কাঠে-বিচিত্র সংস্কার বশে-ঠুকে রাখা আছে মৃত মহিষের মাথা (দ্যাখো, গলুইয়ের চারপাশে কেমন যাচ্ছে ভিজে পশুর লাল খুনে)… যাত্রীরা দ্রাক্ষারসে চুর, মোক্ষাভিলাষে ও নির্বাণের লোভে!
২. পাখি মানে যাযাবর পাখি, শিকারি পাখিরা আসে বেশি, আসে দূর থেকে। এইসব ছাদা নোটন পায়রা ও কাকাতুয়া ছাড়া, বলাকা জোটন আর কাকপাখি ছাড়া যতো পাখি-ক্রেঙ্কার গুইটার, টিটিভ শকুনি, ভরত দণেশ আর টার্কিশ ঘুঘু- সব আসে মুক্ত বায়ুর লোভে, আসে মিউনিসিপালটির নিজস্ব স্কলারশিপে…।
৩. ঈশ্বরদীতে তখন বিকেল, আকাশ কাঁপিয়ে ঘরে ফিরছে ধানশালিখের দল; অপরিনামদর্শী খোঁড়া কর্নেলের, যিনি খোঁজ নেই, খবর নেই ভুঁফোড়ের মতো সেনাক্যাম্পে দিলেন গণযযুদ্ধের ডাক, বুর্জোয়া বিপ্লবে রোমাঞ্চিত হয়ে (ফাঁসিকাষ্ঠের সামনে তিনি এখন গর্বিত, ব্যস্ত কাব্য রচনায়, আর বাইরে মেয়রের ফ্ল্যাগশিপ জেট-বম্বার নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিলো প্রেম-মন্থিত এই রেভুলেশনÑ থাকলো কমিশনড সকলের রক্তগঙ্গা শুরু); মিশনারি স্কুলের বেণী করা বালিকাদের, যাদের হাতে রিঠা-সাবান, ফুলঝাড়ু আর নানা বর্ণের ভাইব্রেটর…।
রূপক : … গোধূলী, শিরিশ কাগজে ঘষা কপারকালার।
অনুপ্রাস : গলায় দিয়ে ফাঁস/ডাশ-খাণ্ডারনাশ।
কবি মাসরুর আরেফিনের বাংলা ও ইংরেজির চমৎকার ব্যবহার; এর আগে এই ব্যবহার আমি পেয়েছি, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও কথাশিল্পী নিমাই ভট্টাচার্য্যরে লেখায়। মাসরুর বলেন-১. ইওর অনার, উই সলিসিটি ইওর অনার, সেইসব কথা আমরা ভুলে গেছি. ভুলেও বলি না। তবে এ কথা সত্যি যে সেইদিন তেকে- জাস্ট ফর আওয়ার কিউরিসিটি-সেইদিন থেকে ঈশ্বরদীর নদীগুলো হাই তোলে চরে আর মাছেরা বিড়ালের, মোরগেরা শেয়ালের শত্রু হয়ে গেছে। আর ফুলগুলে তেমন একটা ডেভেলপড বা তেমন একটা অঙ্কুরিত দেখতে পাই না। আর মিউলের দৌড়-বৃষ্টির অভাবে ক্লোজড সাইনেডাই? এ কথা ঠিক সেইদিন থেকে ঈশ^রদীর খুব সলিটুড, ঈশ^রদীর খুব অন্ধকার। ইউ উড বি কাইন্ড এনাঢ, তা যদি না হয় তাহলে আমাদের বলার… নো নাথিং, নাই কিছু নাই।
২. উই হ্যাভ হ্যাড নো রোল…/প্রিয় দেশবাসী, সেই রাতে, আগস্টের সেই নাঙ্গা ভোর রাতে/ বিলিভ মি আই ওয়াজ উইথ মাই বেডরোল-কম্বল/অ্যান্ড মাই ওয়াইফ অ্যান্ড মিলিটারি ঢোল।/ কারণ পরদিন কাড়া ও নাকাড়া/ দেয়ার ওয়াজ দিস সেরিমনিয়াল ড্রিল/এই অ্যাবসট্রাক্ট মার্চ পাস্ট, বেহাগ খাম্বাজ…/এই ফরমাল কুজ/নরমাল কা/ আর এই অ্যাবনরমাল গুলির আওয়াজ…।
৩. ডোন্ট বি ফ্যাসিস্ট, বি র‌্যাডিকেল, বাট উদার নৈতিক… আই বিলিভ ইন লেচে কেয়ার… আই
বিলিভ ইন টার্চ অ্যান্ড পোপ, ক্যাডার পলিসি।
৩.
আমি আগেই বলেছি কবি মাসরুর আরেফিনের ঈশ্বরদী একটা সিম্বল। এই সিম্বলের ভেতরে একটা দেশ আছে, যার নাম দেশ বাংলাদেশ। শুধু কী বাংলাদেশ? এই ঈশ^রদী হচ্ছে, আমাদের তামাম পৃথিবী। পৃথিবীর সময় এবং একটি ভিন্ন প্রেক্ষপট। এখানে আমি বর্তমান এই করোনাকালীন পৃথিবীর একটা খণ্ড চিত্র তুলে ধরতে চাইÑ আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন, হঠাৎ করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক তিক্তমধুর হয়ে উঠছে। উভয় দেশের নীতি-নির্ধারকদের জন্য বিষয়টি অস্বস্তিকর বলে মনে করছি আমরা। আমাদের মতে, চীনের প্রতি বাংলাদেশের ঝোঁক বেড়ে যাওয়া ভালোভাবে নেয়নি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু ভারত। তবে এ কথা সত্য, প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে ভারতের গড়িমসি এবং সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধ না হওয়ায় আমরা খুবই অসন্তুষ্ট। বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক নানা হিসাব-নিকাশও এর পেছনে থাকতে পারে। অবশ্য দেশ দুটির এই সম্পর্কে টানাটানির কথা স্বীকার করছে না কেউই। তারা বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক। বন্ধুত্বপূর্ণ এবং এই সম্পর্কে ভিত্তি অত্যন্ত মজবুতÑ এই ডাহা মিথ্যে কথার কী জবাব হতে পারে? আমরা মনে করছি, বাংলাদেশ সরকারের যে অংশটি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, সেই অংশটি এখন খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বরং পাকিস্তানের দিকে যাদের ঝোঁক বেশি, তারা ইদানীং অধিকতর সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। আমাদের আরো মনে হচ্ছে, সীমান্ত নিয়ে জেরবার ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের ভূমিকা। কিন্তু সেই বাংলাদেশের সঙ্গেই গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে চাইছে বেইজিং। আমরা দেখতে পাচ্ছি, চীনের সঙ্গে ভারতের সংঘাত যত বাড়ছে, ততই যেন প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার চেষ্টা করছে বেইজিং। তবে বাংলাদেশও ভারতের কর্মকাণ্ডে অখুশি। গত কয়েকবছরে ভারত যা চেয়েছে মোটামুটিভাবে সবই দিয়েছে বাংলাদেশ। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ কি পেয়েছে? অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সুরাহা হয়নি এখনো। মনে হয়, হবেও না কখনো। নেপাল, ভুটানের সঙ্গেও ভারতের সীমান্ত রয়েছে। কিন্তু সেই সীমান্তে নির্বিচারে মানুষ মারা হচ্ছ না। শুধু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশের মানুষ মারা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মানুষ মারা হবে না এরকম প্রতিশ্রুতি ভারত দিলেও তা কার্যকর করছে না ভারত। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও ভারতের কাছ থেকে যেরকম সহায়তা প্রত্যাশা করা করেছিল বাংলাদেশ, ভারত সেরকমটি করেনি। এসব কারণে ভারতের কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশও বর্তমানে বেশ উদ্বিগ্ন। যেমন উদ্বিগ্ন আমরা কবি মাসরুর আরেফিনের ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্পের মেয়রকে নিয়ে। সেখানকার বর্তমান পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে। ফরহাদ মজহাররা এখন পর্যন্ত কিছুই করতে পারছে না মেয়রের বিরুদ্ধে। ঈশ্বরদীর জনগণ মরতে মরতে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। যেমন রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
কেউ কেউ বলছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হলে তা অনেক দেশের কাছেই অস্বস্তির বিষয় হবে। এর আগেও তার প্রমাণ মিলেছিল। চীনের টাকায় চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছিল বাংলাদেশ। বেইজিং তাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়েও দিয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ই আমেরিকা, জাপান এবং ভারত চাপ তৈরি করে ঢাকার ওপর। বাধ্য হয়ে চীনের সাহায্য নেয়নি বাংলাদেশ। যদিও তার পরিবর্তে জাপান ওই প্রকল্পে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ায়। সবমিলিয়ে সীমান্ত নিয়ে একটা জেরবার অবস্থা ভারতের। পাকিস্তানকে নিয়ে নতুন করে কিছুর বলার নেই। চীনের ‘ছায়া’ পাকিস্তান বরাবরই ভারতকে বিরক্ত করে চলে। চীনের ঋণের ফাঁদে পা দিয়েছে শ্রীলঙ্কাও। নেপালের সঙ্গেও ভারতের ইদানীং সম্পর্ক তলানিতে। ভুটানের সঙ্গেও সম্পর্কে অস্বস্তি। মালদ্বীপের সঙ্গে আগের সম্পর্ক আর নেই। ইউরোপ-আমেরিকা-চীনের অবস্থা আরো ভয়ঙ্কর। কে হবেন বিশ্ব মোড়ল, এই নিয়ে ভেতরে ভেতরে চলছে স্নায়ুযুদ্ধ। যাক, সে কথা আরেকদিন বলবো। তুলে রাখলাম ভিন্নকোনো সময়ের জন্য। আজ বলি, কবি মাসরুর আরেফিনের কথাÑল! তিনি সমগ্র বিশ্বের খণ্ড খণ্ড যুদ্ধের কথাই বলতে ছেয়েছেন তার ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে। যা একটি মহাকাব্যের একাংশে রূপ নিয়েছে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। মহাকাব্য হচ্ছে দীর্ঘ ও বিস্তৃত কিছু কবিতা। যা মাসরুর আরেফিনের ঈশ^রদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে আমরা দেখতে পাই। ঈশ^রদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে দেশ কিংবা সংস্কৃতির বীরত্ব গাথা এবং ঘটনাক্রমের বিস্তৃত বিবরণ এতে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ যে কাব্যে কোনো অসাধারণ গুণসম্পন্ন পুরুষের কিংবা এক বংশোদ্ভব বহু নৃপতি বা রাজা-বাদশাহর বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়, যন্ত্রণার কথা লিপিবদ্ধ হয়, তাকেই মহাকাব্য বলে। মহাকাব্যে কবির আত্মবাণী অপেক্ষা বিষয়বাণী ও বিষয় বিন্যাসই আমাদের অধিকতর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যা ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে আছে। মহাকাব্যে প্রাকৃতিক বিবিধ দৃশ্যমালা ও পরিবর্তন বর্ণিত থাকে এবং এতে কমপক্ষে আটটি কিংবা ততোধিক সর্গ বা ভাগ থাকে। এখানে বারোটি সর্গ আছে। মহাকাব্যে কমপক্ষে তিনটি রস অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন : শৃঙ্গার, বীর ও শান্তরস। এখানে তা আমরা পেয়েছি। উদাহরণস্বরূপ তা নিচে তুলেও ধরা হয়েছে।
৪.
প্রসঙ্গক্রমে মহাকাব্যে বিভিন্ন ছন্দ (অক্ষরবৃত্ত ও পয়ার ছন্দেই বেশি লেখা হয়েছে। গদ্যছন্দেও মহাকাব্য লেখা হতে পারে। হয়েছেও) এবং ভাষা অবশ্যই গাম্ভীর্যব্যঞ্জক হতে হবে। মহাকাব্যে প্রকৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালের বর্ণনাও থাকতে পারে। মহাকাব্যের নায়কের জয় বা আত্ম-প্রতিষ্ঠার মধ্যে এর সমাপ্তি হবে। ট্র্যাজিডি মহাকাব্যের অন্যতম অংশ। মহাকাব্যে জটিল ঘটনাবর্তের সৃষ্টি এবং বহুবিধ চরিত্র-সন্নিবেশ থাকলেও সমগ্র কাব্যটিতে একটি অখণ্ড শিল্প-সঙ্গত সৌন্দর্যবোধ ও মহত্ত্বব্যঞ্জক গাম্ভীর্য থাকবে। যা মাসরুর আরেফিনের ঈশ^রদী, মেয়র ও মিউলের গল্পে আছে। মহাকাব্যে আদিরস, বীররস, করুণরস, অদ্ভুতরস, হাস্যরস, ভয়ানকরস, বীভৎসরস, রৌদ্ররস এবং শান্তরস থাকাটা ব্যঞ্ছনীয়। শ্লেষ, বক্রোক্তি, রূপক, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাস, প্রতিয়োমানোৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্প প্রভৃতি অলঙ্কার মহাকাব্যে থাকা উচিত। থাকে। যা কবি মাসরুর আরেফিনের ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্পেও আছে। নিচে তার কিছু কিছু উদাহরণ দেয়া হলোÑ
বীররস + শৃঙ্গাররস + উপমা : …এবং রেড আর্মি ফ্যাকশনের নেতা, দ্যাখো ফরহাদ মজহারের রামদা ধার নিয়ে, সমানে কেটে চলেছেন গলা, সহবাসে থাকা অ্যারিস্টেক্রেসিরÑ দ্যাখো মৃত মহিলাদের উরু বেয়ে এখনো গড়াচ্ছে রস আর পুরুষগুলোর মুণ্ডু নেই তবু বংশদণ্ড এখনো উত্থিত, দেখতে লাগছে অ্যানিমেশন ফিল্মের মতো।
শৃঙ্গাররস : বাণিজ্য করে ঘুরে ঘুরে টুপি ও চপ্পলের (দ্যাখো উইকএন্ডডে নৌকো চড়ে ঈশ^রদী ফেরে সে তার ডগডগে পত্নীর কাছে, আর দিনে আটবার মিনতিতে মাতে ধর্ষকামে, ওরাল-প্লেতে)… এবার এসেছি আন্দিজান থেকে কান্দাহার হয়ে, ওখানে দুধসাদা দুই কিরঘিজ মেয়ে বলেছে ফিরে যেতে, তাই কাল রাতে ফের নামবো সফরে।
বীররস + উপমা : আর ফরহাদ মজহার তার ব্রহ্মচুল মুঠো করে ধরে, লৌকিক ছন্দে মন্ত্রপাঠ করে জাহাজজুড়ে ছড়িয়ে দিলেন ধেঁড়ে ইঁদুগুলো (সমরনীতির বই থেকে তিনি ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করার শিক্ষা পেয়েছেন)- দ্যাখো ওগুলো কী পরিমাণ আঁকাবাঁকা হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ছিটিয়ে পড়ছে ঝাঁটা তারার মতো, মানমন্দিরের দেয়াল কাঁপিয়ে- এরা বাইশ ক্যারেটে মোড়া বিষুবরেখা খেয়ে ফেললেও আজ কারো বিস্মিত হবার কথা নয়।
বীররস : আপনাদের বলতে চাই বুর্জোয়া বিপ্লবের কথা, যাবতীয় গেরিলা যুদ্ধের গল্প আর সম্মুখ সমরের সঠিক ইতিহাস… আইন অমান্য করে মেয়রকে ঘেরাও করুন আর তার সব সাঙ্গপাঙ্গকে আজ দেখুন, কতখানি হীনবীর্য তারাÑ সন্ত্রাসবাদের চৌকাঠে। হাত তুলুন যারা এই বিভীষিকাপন্থার পক্ষে রয়েছেন।
বীররস + উপমা : ‘আমিই ছড়িয়েছি বিদ্রোহ, তোমাদের কোষের ভেতরে।’ গণশৌচাগারের ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে এলো ফরহাদ মজহারের মুখ আর তার কজন সঙ্গী ও সাগরেদ (সুলেমান বাউলকে চেনা যাচ্ছে বেশ আলাদা করে, তার তারপিন তেলে মাখা চুলের কারণে।) তারা অতিদ্রুত মার্কারির মতো ছড়িয়ে পড়লো পুরো নিচতলায়- চিড়িয়াখানার বিভিন্ন সেকশনে।
শান্তরস : হায়! ফরহাদ মজহারকে তারা চেনে সব থেকে উদ্ভট যাত্রী হিসেবে, সব থেকে ব্যতিক্রমী আর একসেনট্রিক; তারা সকাল থেকেই দেখছে এই ভদ্রলোক সাধক-বাউল আর নামপরিচয়হীন কজন যুবককে নিয়ে মেতে আছে দাবা আর তাসে…
ট্র্যাজিডি : ঈশ্বরদীর মেয়রের নদীযাত্রার একটা লিস্ট এই রকম-মেয়রের রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপনে সাথে যাবে সবকিছুÑ পেশাজীবী কিছু বৃত্তিভোগী অ্যামেচার লোক, আর অতি অবশ্যই বাই ডিফল্ট মেয়রের কুলের কেউ কেউÑ রাষ্ট্রীয় পাস নিয়ে, টিকেটবিহীন এবং জনাব ছফা ছিলেন নদীযাত্রার বিপক্ষে। উলঙ্গ, অশ্লীল এই বেহায়াপনার বিরুদ্ধে। তিনি ছিলেন, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে। আমজনতার পক্ষে। দেশ দরদী একজন শিক্ষিত মানুষ ছিলেন জনাব আহমদ ছফা। তিনি ছিলেন সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষের লোক। নদীযাত্রার পক্ষে জনাব ছফা বললেন, ‘বিলাসবহুল এই যাত্রার সাথে আমাদের ইকনোমিক অবস্থার কোনো সঙ্গতি নেই। আর সর্বাধিক জরুরি বিষয়, এই নদীযাত্রায় ঈশ^রদীর নদীগুলো আরো আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবেÑ মেয়রের এই ফ্যাসিস্ট প্ল্যান স্রেফ জুলুমবাজি গণমানুষের সাথে, অতএব তাকে, জাতিশত্রু ঘোষণা করে হাতে রাখুন হাত। শুধু মেয়রের বিরুদ্ধ এই কথা বলার কারণে, অকালেই চলে যেতে হলো জনাব ছফাকে। তিনি গেলেন (মেয়রের ইশারায়), ‘যাও,/মেহগনি গাছের আগায় ছফাকে ঝুলাও,/গলায় দিয়ে ফাঁস/ডাশ-খাণ্ডারনাশ।’Ñ আসুন সম্মিলিত হয়ে, এককাট্টা ঘণীভূত হয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করি। আর কাল জোহরের পরে, সাধু উদেশ্য নিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করি শোষককুলের এবং পরিশেষে স্মারকলিপি পেশ করা হবে হিউম্যান রাইটস ও ওয়াটার রাইটস কমিশনে ছাপা অক্ষরে…
৫.
কবি মাসরুর আরেফিনের ঈশ্বরদী মেয়র ও মিউলের গল্পে আছে অসংখ্য ধনী-গরিব, চাষা-ভুষা- নিত্য-সুন্দর মানুষ। কারো কারো ছিল শুধু একখণ্ড জমি, একটা কুঁড়েঘর, এক টুকরো জামা-জুতো; একপ্রস্থ লেপ-সোনার সকালে যে যার শস্যক্ষেতে যেতেন ধানের কর্ষণে। নিজের জমি, ভিটেবাড়িতে। কারো কারো ছিল রুপায় গড়া এক, দুইটি বা চারটি কচি সোনার ছেলেমেয়ে-যাদের ছিল বৃষ্টি বিষয়ে নানা অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান। কারো ঘরের পেছনে, পুকুরের পাড়ে বলক দিয়ে উঠেছে শোলাকচু। নটকানের বন, পালংশাক, ঝিঙা, পোষা মুরগি ও পাতিহাঁস- এলাচ-লবঙ্গের বাগানও ছিল কারো কারো। পানকৌড়ি থেকে হাড়গিলা, উটের মাংস থেকে গয়ালের পায়া, কুমিরের জিহ্বা থেকে পাঙাশের পেটি-এইসবই ক্ষেত ঈশ্বরদীর মানুষজন। তারা সুখেই ছিল। অথচ এই মানুষগুলো হঠাৎ করে মেয়রের সন্ত্রাস ও শঠতায় কতো অসহায় হয়ে পড়লো। নিয়মিতই তারা খুন ও ধর্ষণে পরিণত হয়ে গেল। হায়! কতো অবস্থায় বাস করা মানুষ, আছে কতো ধরনের- এই ঈশ্বরদীতে। কতো চরিত্রের মানুষ তারা, কতো না প্রকারের… কী এসে যায় এইসবে তাদের, মেয়রদের? মেয়রের আসঙ্গলিপ্সা ও দুষ্কর্মে ঈশ^রদীর মানুষের মগজ, ব্রহ্মতালু, অক্ষিগোলকÑ কর্ণলতিকা, আক্কেল দাঁত, কেশগুচ্ছ ও আলজিভ, পিত্তাশয়, কড়ে আঙুল, পায়ের খুর এখনো ছড়িয়ে আছে ঈশ^রদীর পথে-প্রান্তরে। তাতে কী এসে যায়, হাসিখুশি ভণ্ড মেয়রের। তাদের কী এসে যায় মেয়রের সঙ্গী-সাথী শ্যাম-গৌর-কৃষ্ণ নানা রঙের লোকদের। মেয়রের? … অবশেষে বীরবেশে ফিরে এলো ফরহাদ মজহার তার দলবলসহ ছফা তো আগেই শেষ হয়ে গেছে। মজহার বীরপুরুষের মতো মেয়রের বিরুদ্ধে ঘোষণা করলো এক অনিবার্য যুদ্ধ। আর ফরহাদ মজহার তার (মেয়র বা তার লোকদের) ব্রহ্মচুল মুঠো করে ধরে, লৌকিক ছন্দে মন্ত্রপাঠ করে জাহাজজুড়ে ছড়িয়ে দিলেন ধেঁড়ে ইঁদুগুলো (সমরনীতির বই থেকে তিনি ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করার শিক্ষা পেয়েছেন)-দ্যাখো ওগুলো কী পরিমাণ আঁকাবাঁকা হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ছিটিয়ে পড়ছে ঝাঁটা তারার মতো, মানমন্দিরের দেয়াল কাঁপিয়েÑ এরা বাইশ ক্যারেটে মোড়া বিষুবরেখা খেয়ে ফেললেও আজ কারো বিস্মিত হবার কথা নয়।… আর মেয়রের রয়েল স্যুইটের সামনে বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ করে টুলে বসিয়ে রাখা হলো হিংস্র শিম্পাঞ্জি ও তাসমিয়ান ডেডিলটাকে- ওদের দুগন্ধেই তো যে কারো মরে যাবার কথা। যেমন এখন, এই করোনাকালে খুনি, ধর্ষণকারী ও সন্ত্রাসীকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে করোনা রোগীর শয়নকক্ষে- প্রস্রাব খানায়…।
ঈশ্বরদীর মানুষদের বেঁচে থাকা আমরা সমর্থন করি প্রাচ্যের লিবারাল দৃষ্টিকোণ থেকে। আমাদের এই ফেক্সিবল স্বভাবের নামেই বরং উচ্চপ্রশংসাগীত রচনা করা হোক। রচনা করা হোক নতুন করে আরেকটি ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প। যেখানে শুধু শান্তির সু-বাতাস বইবে। দেখা যাবে অপূর্ব কোনো এক ভোর রাতে ঈশ^রকে। আমাদের মহান আহমদ ছফা ও ফরহাদ মজহারকে। ঈশ^রদীর আবারবৃদ্ধবনিতাদের-সেখানকার খেটে খাওয়া মানুষদের। যাদের আছে এক, দুইটি বা চারটি কচি সোনার ছেলেমেয়ে- এবং যাদের আছে বৃষ্টি বিষয়ে নানা অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান।

Comment here