গবেষণানিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

একাত্তরে চট্টগ্রামের প্রথম সারির শহীদ দীপক বড়ুয়া

শহিদ দীপক বড়ুয়া

কালাম আজাদ

একাত্তরে চট্টগ্রামের প্রথম সারির শহীদ দীপক বড়ুয়ার বাবা ব্যবসায়ী বিজয়শ্রী বড়ুয়া আওয়ামী লীগের সমর্থক। স্বাধীনতার উত্তাল দিনগুলোতে এনায়েত বাজার মন্দির সংলগ্ন তথা বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর পাশেরই বাসা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আস্তানা।

উখিয়া উপজলার রত্না পালং গ্রামে জন্মগ্রহণকারী দীপক বড়ুয়া পড়তেন চট্টগ্রাম সিটি কলেজে। ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন (এনএসএফ) নামে একটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসময় দোলন গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে কাজ করছিলেন তিনি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক শহীদ আবদুর রব ও বশরুজ্জামান, মাহবুবুল আলম চৌধুরী, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো বন্ধুত্বের কারণে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। লেখক খুরশীদ আনোয়ার চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার তাকে ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকা-ে জড়িত থাকতে দেখেছেন। খুরশীদ আনোয়ার ‘দীপক বড়ুয়া, স্বাধীনতার প্রারম্ভিক দীপ’ লেখায় বলেন, ‘কলেজে তখন ছাত্রলীগের জয় জয়কার। সেই সুত্রে আমি দেখেছি ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে। আমি তাকে কখনো প্রশ্ন করিনি সে ছাত্র হিসেবে ছাত্রলীগ না ছাত্রলীগের সমর্থক হিসেবে ছাত্রলীগ। তবে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠক হিসেবে সে যে একজন আওয়ামী লীগের নিখাদ সমর্থক এবং কর্মী ছিল তাতে সন্দেহ নাই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা দীপক বড়ুয়া। তাঁর স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগদান আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম গণহত্যার প্রতিবাদে ষোলশহর সেনানিবাসের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। তাঁরা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল (ইপিআর) বাহিনীর সঙ্গে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্য ও ইপিআর বাহিনীর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে রসদ সংগ্রহে নেমে পড়েন দীপক বড়ুয়া, জাফর আহমদ, বশরুজ্জামান চৌধুরী ও মাহবুবুল আলম চৌধুরী। সেনানিবাস থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা বিদ্রোহ করে বেরিয়ে পড়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী চট্টগ্রাম শহর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ এর ইতিহাস মতে, কাজীর দেউড়ী স্টেডিয়ামের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত নৌ ভবনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা পরপর দু’দিন দু’টি অঘটন ঘটায়। নৌ ভবনে অবস্থান নেয়া পাকিস্তানি সৈন্যরা ২৭ মার্চ ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন ও মোছলেম উদ্দিনকে আটক করার পর নির্যাতন চালায়। মুক্তিযুদ্ধের তৃতীয় দিনে ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি দল বিমান অফিসের পেছনের গলি দিয়ে মেথর পট্টি হয়ে এবং লাভ লেইন দিয়ে ডিসি হিলে উঠে অবস্থান নিয়ে শিকারের অপেক্ষায় ওঁৎপেতে বসে ছিলো। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলতে থাকা পাক হানাদার বাহিনী ও বাঙালি সৈন্যদের যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বহু সৈন্যকে খতম করে। যুদ্ধ যখন চলছিল তখন ২৮ মার্চ প্রতিদিনের মতো দীপক বড়ুয়াও তার তিন বন্ধু জাফর আহমদ-বশরুজ্জামান মাহবুবুল আলম চৌধুরী গাড়ি নিয়ে বশর-জাফরদের বাড়ি আন্দরকিল্লা থেকে মোমিন রোড হয়ে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন ইপিআর বাহিনীকে সরবরাহ করার জন্য। মোমিন রোডে চেরাগি পাহাড় চত্বর এলাকায় হঠাৎ পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি পড়ে যান তাঁরা। চেরাগী পাহাড়ের সামনে আসতেই হায়েনারা গুলি করে গাড়ি থামিয়ে দেয়। গাড়িতে থাকা চার তরুণ ইপিআরের সদস্য মনে করে জয় বাংলা বলে স্লোগান দিতে থাকেন। জয় বাংলা স্লোগান শুনেই হানাদার বাহিনী দীপক বড়ুয়া ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর ছুড়তে থাকে মুহুমুর্হু গুলি। । আর সেখানেই শহীদ হন তাঁরা। তাদের বুকে তাজা রক্তে ভেসে যায় রাজপথ।

দীপক বড়ুয়া স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করায় দালাল ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার সহযোগীরা দীপক বড়ুয়াবাবা বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সহ সভাপতি চট্টগ্রাম শহরের দোকান ও গ্রামের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

দীপক নামের পেছনে বড়–য়া পদবী থাকলেও কোনো ধর্মাবলম্বী মনে হতো না। একজন আপাদমস্তক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। চট্টগ্রাম সিটি কলেজে পড়ার সময় তার সাহসকে উপড়ে ফেলে আসা অনেকের পক্ষে ছিলো প্রায় দুঃসাহস।

লেখক খুরশীদ আনোয়ার দীপক বড়ুয়ার একজন বন্ধু হিসেবে তাকে মূল্যায়ন করেছেন বেশ। স্বাধীনতা উত্তর কালে খোরশেদ আনোয়ারের আবাসিক অবস্থান ও দীপকের আবাসস্থান ছিলো খুব কাছাকাছি। খোরশেদ আনোয়ার দীপক বড়ুয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি লিখেন, ‘স্বাধীনতা উত্তর কালে আমার আবাসিক অবস্থান ও দীপকের আবাসস্থল খুব কাছাকাছি ছিলো। সে সুবাদে পারস্পরিক আবদার আর অধিকারের সীমা ছিল অন্তহীন। প্রতিদিন দুজনের সাক্ষাৎ কোনো না কোনো ভাবে ছিল অবশ্যাম্ভাবী। সুতরাং জীবনের একাধিক ঘটনার স্মৃতি তার জীবনের সঙ্গে আমার জীবন এক হয়ে আছে। দীপক পাহাড় ভালোবাসতো। প্রতি সপ্তাহ অন্তে রাঙামাটি যেতে উদগ্রীব হয়ে উঠতো। আমি সঙ্গে না গেলে যেন তার কিছুই হবে না। আমিও পাহাড় বিলাসী। প্রকৃতি আমাকে ভাবাতো। ফলে এ ছিল যুগল আকাঙক্ষার মহান মিলন। এক চাকমা বাড়িতে আমরা উঠতাম দুজনে। পরিচয় দীপের কারণে, আমি কাউকে চিনি না। এক পরিবারের দুটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। খুব আবছা হলেও মনে পড়ছে, একজনের নাম সবিতা ও অন্যজনের নাম নমিতা। দুজনের মধ্যে নমিতা না সবিতা কাকে যে ভালোবাসতো, এ মুহুর্তে মনে পড়ছে না। আমকে সঙ্গে করে নেবার একটাই তার মূল উদ্দেশ্য; তা হলো আমি যেন তার দুঃখের ইতিহাসটুকু কখনো লিখি। তার দুঃখের কারণ আমি খুঁজে পাই নি। সম্ভবত এও হতে পারে যে সে হয়তো তার পরবর্তী পরিণতি আঁচ করতে পারতো। হয়তো সে রকম চিন্তা এসে যে সে দীর্ঘজীবী হবে না। নমিতা সবিতাকে নিয়ে সৃষ্ট প্রেম জড়িত ভাবনা আমাকে অনেক অপ্রার্থিত ঘটনার সঙ্গে একীভূত করেছে, বিব্রত হয়েছি তার অতিমাত্রায় আবেগ-তাড়িত কার্যকলাপে। তখন কিন্তু মনে হয়নি এই আবেগতাড়িত যুবকই একদিন হবে স্বাধীনতার সূচনা পর্বের প্রধানতম সৈনিক ।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী জানান, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ এই ৪ ছাত্রনেতার জন্য একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের আবেদন-নিবেদন নিয়ে সাবেক এমএনএ আবু সালেহ, অ্যাডভোকেট এমদাদুল ইসলাম, আমি, কালাম চৌধুরী, দীপক বড়ুয়ার ভাই বাপ্পী, মাহবুবুল আলমের ভাই শামসুল আলম চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রী, মেয়র, জেলা প্রশাসকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু চার শহীদের জন্য বিশ হাত জায়গাও পেলাম না। অবশ্য ২০১৪ সালে চেরাগী পাহাড় এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়। স্মৃতিফলক উদ্বোধন করেন চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান।