একুশের কবিতা

ভাষা ভালোবাসা
মুহম্মদ নূরুল হুদা

ভালোবাসা ভাষা-জন্ম তোমার আমার,
ভালোবাসা জ্ঞান-জন্ম সব মানুষের;
শুভ হোক ভাষা-জন্ম সব চেতনার
শুভ হোক ভাষা-জন্ম জাতি ও গোত্রের;
ভাষা-মা আমার মা, ভাষা-মা তোমার,
ভাষায় ভাষায় সেতু স্বর-ব্যঞ্জনের।

জন্ম যার ধ্বনিযোগে, বৃদ্ধি স্বরে-সুরে,
বুকের গভীরে সৃষ্টি, জিহ্বায় স্বীকৃতি;
মানুষপাখিরা আসে সব মেরু ঘুরে,
শ্রুতিতে সঙ্গীত শোভা, সচিত্রে নিষ্কৃতি;
সব প্রাণী ধ্যানী-জ্ঞানী বোধের বলয়ে,
ধ্যানসিদ্ধি ভাষা-জন্মে হৃদয়ে হৃদয়ে।

মনোভাষা মৌনভাষা, মনের গহনে
উচ্চারণহীন ভাষ্যে বিলীন স্বভাব;
দেহভাষা অধিভাষা ভঙ্গি-সঞ্চরণে
দেহে মনে যুক্তভাষা প্রমুক্ত প্রভাব;
মানুষ করেছে রপ্ত সেই মুক্ত ভাষা,
বিচিত্র অক্ষরে-সখ্যে ভাষা-ভালোবাসা।

নতুন অক্ষর আছে বিশ্বে সবখানে
আকাশ-জমিন-মাটি-জল-অগ্নি-বায়ু
মুহূর্তে বদলরত রূপ আর মানে,
ভালোবাসা দেয় যাকে চির পরমায়ু;
যুগলাঙ্গে নবভাষা নয় সর্বনাশা,
ভালোবাসা জন্ম দেয় ভিন্ন এক ভাষা।

ভালোবাসা সর্বভাষা কায়ায় ছায়ায়,
রতিতে ও আরতিতে মুগ্ধ মায়ারূপ;
উৎস তার স্বর্গে-মর্ত্যে, আদম-হাওয়ায়
সকল ভাষার রূপ যে ভাষায় চুপ;
আদিনর আদিনারী আদিম দুজন –
বুকে-মুখে চোখে-চোখে ভাষিক কুজন।

যখন সুমুখে আসো, এই মনে ভাসো,
আমাকে ভালো না বেসে কাকে ভালোবসো?
তোমার অরূপ রূপ আমার অক্ষর,
ভাষা মানে আমাদের মিলন-স্বাক্ষর।
ভালোবাসা প্রাণীভাষা, প্রাণ-সরোবর,
ভালোবাসা সর্বভাষা, অধরে অধর

অক্ষরে অক্ষরে ভাষা, অধরে অক্ষর।

একুশের গান
রাহগীর মাহমুদ

অমর একুশ আমার কাছে
আমার মায়ের মুখ!
অমর একুশ আমার কাছে
অশ্রুকাতর শোক!
অমর একুশ আমার মায়ের
নম্র মধুর হাসি,
অমর একুশ আমার মায়ের
আদর রাশি রাশি!
অমর একুশ মায়ের ভাষায়
লেখা কবিতা গান,
অমর একুশ চেতনারই
দীপ্ত মুক্ত প্রাণ!
অমর একুশ আমার মায়ের
অপার ভালোবাসা,
অমর একুশ আমার মায়ের
স্বপ্ন আলো আশা!
অমর একুশ আমার মায়ের
মমতা ভরা মন,
অমর একুশ মায়ের মতোই
চির অমূল্য ধন!
অমর একুশ আমার মায়ের
ব্যথিত দীর্ঘশ্বাস,
অমর একুশ আমার মায়ের
প্রত্যয় বিশ্বাস!

ঝরা পাতা মরা পাতা
জ্যোতির্ময় নন্দী

ঝরা পাতা উড়ে উড়ে কখন কোথায় যাবে
সে তো শুধু হাওয়ার ঝলকগুলো জানে।

মাঘের শেষে উত্তুরে হাওয়া ঘুরছে উল্টোদিকে
দখিন হাওয়ার পরশ আনে প্রাণে।
বিগতপ্রায় শীতে ঝরা সর্বশেষ পাতাটা
বাতাসে ভেসে কোথায় গেলো কে জানে!

পুরোনো একটি পাতা তবু শ্যামলিমা ধরে রাখে
কষ্টেসৃষ্টে, আঁকড়ে থাকে শব্দতরুর শাখা।
এভাবে তো এ বছরও গেলো পথের বাঁকে
একপায়ে খাড়া, হাওয়ার মুখে জোড়হস্তে থাকা।

এ পাতা থাকুক পাতা বইয়ে, খাতায়, নোটবুক
কিংবা ফেসবুকে, মানুষ ও মানুষীর বুকে বুকে।
এ পাতা চায় না যেতে অনির্দেশ্য উড়ে দূরে দূরে
আত্মসমর্পিত হয়ে বাতাসের পালাবদলের সম্মুখে।

কেন তুমি হঠাৎ করে খাপছাড়া এক প্রশ্ন করছো —
‘কী বুঝলে এই অনির্দেশ্য ওড়াউড়ির মানে?’
জবাব কী দেবো? কার কোন্ নির্দেশে ঝরা পাতা
মরা পাতা উড়ে দূরে কোথায় যে যায় — কে জানে?

ভাষা
প্রবালকুমার বসু

কেউ কেউ অনুবাদের ভাষা বলে
কেউ বলে সীমান্ত পারের
কেউ কেউ শীতকালের ভাষা বলে
কারো ভাষা শুধু বিকেলের
কারো কারো ভাষা ভালোবাসা
কেউ তাকে ভাবে প্রতিবাদ
কারো ভাষা রাজনীতি হলে
অনবধানে ভাঙ্গে তা বিশ্বাস
কেউ বলে পাখিদের ভাষা
কেউ কেউ দুর্বিপাকের
নদীর ভাষায় কেউ বলে
কারো ভাষা শুধুই শোকের
সমুদ্রের ভাষা বলে কেউ
কেউ কেউ নিয়ম মাফিক
কেউ শুধু বলে সেই ভাষা
যেই ভাষা আন্তর্জাতিক
কেউ কেউ সাংকেতিক বড়
কারো ভাষা ভীষণ অচেনা
অনেকে এমন ভাষা বলে
যেন তার ভাষাই ছিল না

আমি তো চেয়েছি সেই ভাষা
যে ভাষায় ফুল ফুটে ওঠে
ভাষার আড়ালে খুঁজে দেখি
নিজের ভাষাই সংকটে

একুশ তুমি আসো বারবার
সুলতান আহমেদ

একুশ তুমি আসো বারবার
রক্ত স্বাক্ষরের সনদ বয়ে,
একুশ তুমি আসো বারবার
অশ্রুসিক্ত শোকবার্তা লয়ে।

স্মৃতির আবহে দাও যে দোলা
দগ্ধ হৃদয় কাঁদে বেদনায়,
শহীদি আত্মার বিলাপ শুনি
বিষণ্ণ ম্লান এ বরবেলায়।

বাংলায়-“আ মরি বাংলা আমার”
শ্বাশ্বত হৃদয়ের আর্তস্বর,
এখনো শুনি ভুলিতে পারিনা
মহান একুশ তুমি অমর।

সালাম, জব্বার, রফিক আরো
বরকতের মতো তাজা প্রান,
স্মৃতির মিনারে রক্তিম সূর্যে
জ্বলে প্রদীপ্ত শিখা অনির্বাণ।

অনন‍্যা তুমি সংগ্রাম-প্রসূতি
চেতনায় দিয়ে আমূল নাড়া,
মিছিলে শ্লোগানে কম্পিত বাংলায়
বাজালে যুদ্ধের কাড়ানাকাড়া।

“আ মরি বাংলাভাষা”-রূপ নিল
বাংলায়,-‘ভাষা শুধু নয় দেশে’,
রক্তাক্ত অশ্রু সাগর পেরিয়ে
প্রার্থিত স্বাধীনতা এলো শেষে।

প্রভাতফেরিতে স্মৃতি রোমন্থন
শ্রদ্ধা স্মরণ নগ্নপায়ে হেঁটে,
গানের আসর,- বজ্র শপথ
ক্ষুধার আগুন জ্বলিছে পেটে।

সন্ত্রস্ত জীবন বৈরী হাওয়া
তবুও অম্লান মহান একুশে,
রুদ্ধ আত্মা ও বন্দী বিবেক
স্বদেশে যে আছি পরবাসে।

দুঃখ যন্ত্রণায় বিক্ষত হৃদয়
বিপন্ন বোধ বেদনা অপার,
বসবাস করি যে বৈরী সমাজে
একুশ তুমি জাগাও বারবার।

গুলি
রুহুল কাদের বাবুল

ভাষার দাবিতে মিছিল হয়েছে
সেখানে হয়েছে গুলি
মাটির জমিনে লুটিয়ে পড়েছে
ছাড়েনি মায়ের বুলি।

স্বাধীন স্বাধীন অামরা স্বাধীন
একথা বললে গুলি
জনতার ঢলে মিশে রাতদিন
উড়ছে দেশের ধূলি।

কোটি জনতার কন্ঠে অাওয়াজ
মনের পর্দা খুলি
মুক্তিযুদ্ধের সেই রণ-সাজ
মিছিলে সবাই তুলি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অামার
কবিতা, রঙের তুলি
মিছিলে সভায়, ছুটছে সবাই
আবারো ফুটছে গুলি।

একুশ তোমার অরুণ আলোয় রাঙিয়ে দাও
শাহেদ ইকবাল

একুশ তোমার অরুণ আলোয় রাঙিয়ে দাও
যুগান্তরের ভ্রান্তিবিলাস ভাঙিয়ে দাও।
একুশ তোমার হাত দুটো আজ বাড়িয়ে দাও
বিস্মরণের বন্ধ দুয়ার নাড়িয়ে দাও।

আকাশ থেকে জংলী শকুন হটিয়ে দাও
তারায় তারায় দৃপ্ত শ্লোগান রটিয়ে দাও
বর্ণমালার শালিক যত উড়িয়ে দাও
রিক্ত প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে দাও।

একুশ তোমার অগ্নিবীণায় জাগিয়ে দাও
অসুরপুরে সুরের কাঁপন লাগিয়ে দাও
জীবন দিয়ে জ্বাললো যারা আলোর দীপ
আজ ফাগুনে পরাই তাদের রক্তটিপ।

ভাষাবীজ
তুষার গায়েন

সেই গান ভেসে আসে দ্রোহকরুণ সুরে,
দূর-দূরান্ত থেকে অগণন মানুষের কণ্ঠস্বরে —
একটা চাপা কান্নার স্বর সম্মিলিত অবয়বে
বয়ে নিয়ে আসে অজস্র ফাল্গুন, তুষের আগুনে জ্বলা
ধিকিধিকি অতীত চুল্লির গহ্বর হতে চিরায়ত নিষ্কম্প শিখা
আমাদের আজো জাগিয়ে রাখে আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব
থেকে নিজেদের চিনে নিতে বারংবার,
নগ্ন পদবিক্ষেপে প্রভাতফেরির গান
সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার …
গুলি নিয়ে বুকে অক্ষর হয়ে ঝরেছিল রাজপথে
আর সহসাই অক্ষরবীজ জন্ম নিয়েছিল
কোটি কোটি বাঙালির দেহকোষে,
সংক্রামক চেতনার রঙে জ্বলে ওঠে দাবানল —
কত সহস্র কাল নিজদেশে পরবাসী ঘুম ভেঙে দেখে নেয় উন্মত্ত
পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জলরাশি বঙ্গোপসাগরের বিক্ষুব্ধ বুকে গিয়ে মেশে আবর্তে আবর্তে পলির সঞ্চয়ে গড়ে তোলে ভাষার বদ্বীপ, পলাশ কিংশুকে
ভাষাগর্বী জাতির স্পন্দিত স্বদেশ —

ফেটেছে ভাষার ফুল নিদাঘ ফাল্গুনে
বাতাস উড়িয়ে নিয়ে চলে বিচ্ছুরিত বীজ
দূর কোনো ভাষা বিস্মরণের দেশে
মুমূর্ষ ভাষার সেই ভিনদেশি মানুষেরা দেখে
বাংলা অক্ষরের বীজ নেমে এসে তাদের মাটিতে
কীভাবে মৃতপ্রায় অক্ষরগুলোকে অংকুরিত হতে বলে
দেশে দেশে ভাষাবৃক্ষ উপনিবেশের মেঘ সরিয়ে
ঝলমলে একুশের রোদ্দুরে হাসে।
ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১

একুশে ফেব্রুয়ারি
মাসুদুল হক

পলাশ শুধু ফুল নয়;বাতাসে রক্ত-‌ভাসা প্রতিবাদ।
বুকের রক্ত পলাশ হয়ে ঝরে পড়লে
ওঠে চিৎকার…
চেতনার ধ্বনিপুঞ্জ
শহীদের রক্তে মিশে গড়েছে মিনার

ফাগুনের আগুনে
মিছিলে হেঁটে চলে বর্ণমালা…

বাঙালির একুশে ফেব্রুয়ারি
যেন আজ
বিশ্ব ভাষার কনজাংশন

নানা রঙের মানুষ
যে যার ভাষায় একুশের গান গায়!

তোমার ছেলেরা মাগো
আমিনুল ইসলাম

তোমাকে ভালোবেসে মাগো
একতারা হাতে গান বেঁধেছে তোমার লালন:
‘বাড়ির পাশে আরশিনগর-
এক ঘর পড়শি বসত করে
আমি একদনিও না দেখিলাম তারে…’

ঘরের ছেলেরে মানুষ করোনি-
এই অপবাদ সইতে পারেনি ঠাকুর তোমার;
তোমাকে ভালোবেসে মাগো
বিশ্বজয়ীর মালা এনে
পরিয়ে দিয়েছে গলায় তোমার;
আহা ছেলে! আহা মালা!

তোমাকে ভালোবেসে মাগো
উন্নতশির কাজী নজরুল
জ্বালিয়ে দিয়েছে অত্যাচারীর কঠিন প্রাসাদ
অগ্নিবীণার তীব্রদহনে দাউদাউ।

পরধনলোভেমত্ত মধু, হতচ্ছাড়া, কে না জানে–
জগত চষে ফিরেছে সেও তোমারি টানে,
কুঁড়েঘরের রত্নে গেঁথে মহামালা
আহা, লক্ষ্মীছেলে ভরিয়ে দিয়েছে মায়ের আঁচল।

জীবননান্দ দাশ– আরেক অভিমানী তোমার
সারাবেলা উঠোনে বসে আঁকতো শুধু আল্পনা কথার,
সাধ মেটেনি তার,
কথা দিয়ে গেছে-
কার্তিকের কাক হয়ে আসবে আবার–নবান্নের দিন।

ধুলিমাখা জসীমউদ্দীন,
ভুলেছো কি তাকে?
তোমার পরাণের গান কান পেতে শুনে
রঙিলা নায়ের পাল আর নকশীকাঁথার মাঠে মাঠে
ছড়িয়ে দিয়েছে সে অবিকল হৃদয়ের মত।

তুমি তো জানো মা, তোমার শ্বাসরোধে বারুদে বিষাক্ত হলে
বাহান্নোর বাতাস,
সোনার মানিকেরা বুকের লালকালিতে
জননীর স..ব কথা-
বাংলার আকাশে বাতাসে প্রচ্ছদে পোস্টারে
লিখে দিয়েছে;
মুছে ফেলতে পারেনি তা কেউ ।

মাগো, আজ তুমি সকল মাতার মাতা,
তোমার সোনার অঙ্গ জড়িয়ে আজ
বিশ্বরঙের ঘাসপেড়ে শাড়ি,
তোমার মুখের কথা শুনতে দেবে না বলে মা
যারা একদিন চেপে ধরেছিলো মুখ,
মাগো, মা-ডাকে বরণ করে নিতে, দ্যাখো-
তারাও আজ পথের দু’ধারে নতশিরে দাঁড়িয়ে।

যাও মা, জগতের সালাম নিয়ে এসো-
ভুলো না যেন মা-
তোমার সন্তানেরা আর শুধুই বাঙালি নয়,
মানুষও আজ—– হাজার সৃষ্টির মিছিলে।

একুশ
নুরুল ইসলাম খান

একুশ এলেই সবার মুখে বাংলাভাষার গর্জন ,
একুশ গেলেই তওডবা পড়ে বাংলাভাষা বর্জন ।
বাংলা খেয়ে কুটুস -কুটুস ,
ইংরেজি কই ফুটুস – ফুটুস ।
এই আমাদের ভাষার কদর , এই আমাদের অর্জন ।

২.
বাংলাভাষার দুর্বলতা হয়তো আছে ম্যানি ,
বাংলা ছেড়ে ইংরেজি কয় সেই মনে হয় জ্ঞানী ।
আরেক কথা শোনো
সন্দেহ নাই কোনো
পানিকে যে হানি বলে তাদের বাড়ি হেনি ।

একুশ আছে বুকের ভিতর
আলেক্স আলীম

একুশ দিলো ভাষায় আমায়
একুশ দিলো দেশ
একুশ আছে বুকের ভিতর
কাটেনি তো রেশ।

একুশ আমায় শক্তি দিলো
শত্রু দিতে রুখে
একুশ আমার চেতনাতে
একুশ আমার ভীতে।

একুশ আমার পরিচয় আর
একুশ অহংকার
বিশ্ব জুড়ে মায়ের ভাষার
খুলে দিলো দ্বার।

পলাশ শিমূল রঙ পেয়েছে
একুশ তোমার কাছে
বাংলাদেশের সংস্কৃতি
গড়া তোমার ছাঁচে।

একুশ তোমায় প্রশ্ন করি
মোঃ নাছির উদ্দিন

একুশ তোমায় প্রশ্ন করি
দাওতো সঠিক জবাব
তুমিকী ঐ শহীদ মিনার
নিরব থাকা স্বভাব?

নগ্নপায়ে ফুলের তোড়া
পেয়ে তুমি খুশি
মনে তোমার কোন ভাবনা
রাখছ সদা পুষি?

সারাবছর তোমার কথা
থাকে সবাই ভুলে
তুমি তখন থাকো কোথায়
লজ্জাবতি ফুলে?

উচ্চারণের যাঁতাকলে
পিষ্ট যখন হও
অপমানের কষ্ট সয়ে
নিরব কেন রও?

ভিন্ন ভাষার ছুরি যখন
অঙ্গে তোমার ঢুকে
প্রতিবাদের অগ্নিহাতে
দাওনা কেন রুখে?

আর কতকাল থাকবে তুমি
ইটের মিনার হয়ে
প্রাণে প্রাণে ছড়াও আবির
শত্রু পালাক ভয়ে।

বাঙালির অহংকার
হাসানাত লোকমান

একুশ তুমি
সত্তার মৃত্তিকায় উজ্জীবিত সুখের অনুভূতি।
একুশ তুমি
হিরন্ময় উপলব্ধির দীর্ঘ পাথার।
একুশ তুমি
মা-মাটি প্রেমে উল্লসিত সংস্কৃতির আনন্দ চিৎকার।
একুশ তুমি
ভাষার সম্ভ্রম রক্ষার অনন্ত মিছিল।
একুশ তুমি
সংগ্রামী ইতিহাসের দুয়ারে আঁকা সোনালি ফলক।
একুশ তুমি
সাহসে উজ্জ্বল অঙ্গীকারে শাণিত অনন্য সময়।
একুশ তুমি
আদিগন্ত চেতনায় আছড়ে পড়া সমুদ্র-উচ্ছ্বাস।
একুশ তুমি
নিত্য সুন্দর নতুন সৃষ্টি
পৃথিবীর পথে পথে বাঙালির অহংকার।

একুশ মানে
মোছাম্মৎ শফিকা আকতার ছিদ্দিকা

উনিশ শত বায়ান্ন সালের বায়ান্নতম দিন,
ঝাঁপিয়ে পড়ে লড়েছিল,হৃদয়ে বাজিয়ে বীণ।
কত সাহসে জীবন বাজি রেখেছিল না করে ভুল,
রক্তের ঋণে জাতি আজো কাঁদে,তাই দেয় ফুল।
সালাম,বরকত,রফিক কত নাম না জানা তরুণ,
মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ দিল, হাসলো অরুণ।
তাজা রক্তে ভেজা রাজপথ আজো বারেবার স্মরি
আসে যবে ফিরে নব জীবনে, ২১ শে ফেব্রুয়ারি।
আছে বিশ্বে খ্যাতি, শত আবিস্কারের তরে ভরে,
নেই কোন জাতি, মায়ের ভাষার জন্য যুদ্ধ করে।
মাথা নত না করে, বাঁচতে শেখাল তরুণদল,
দেশকে ভালোবাসতে যেন, মোরা না করি ছল।
শহীদ ভাইদের স্মরণে,আজো ব্যথা মনে অনুভবে,
তাঁদের রক্তের বিনিময়ে মধুর ভাষা পেলেম ভবে।
আমার ভাষা, তোমার ভাষা, বাংলাভাষা ভাই,
হরেক শব্দে তৃষ্ণা মেটাই, অস্তিত্ব খুঁজে যেন পাই।
কবি কয় আকুলি, যেওনা কভূ মায়ের ভাষা ভুলি,
এই ভাষায় পাগলিনী ও কাঁদে, দিয়ে চুল খুলি।
ভাষার তরে দিল যারা প্রাণ, নিজেরে অনাদরে,
তাঁদের তরে, জাতি ধর্ম বর্ণ, নিত্যি বিলাপ করে।

খোকার প্রশ্ন
সোহেল ইকবাল

ছোট্ট ছেলে শুধায় মাকে,
‘একুশ’ মানে কী?
কেন সবাই ঐ দিনেতে
স্কুলেতে কীসব করে
বলতে পারো কী?
প্রশ্ন শুনে ছোট্ট খোকার,
মা তারে কয়, “শুন,
ঐদিনেতে মোদের দেশের
কিছু ছেলে দিয়েছিল খুন।”

“খুন? সেটা কী?”
প্রশ্ন করে খোকা।
“খুন মানে যে রক্ত,
জানিস না তাও বোকা?”

খোকা তখন সত্যি সত্যি
বোকার মতো হাসে
কারণ ছাড়া কেউকি কভু
রক্ত দিতে আসে?

মা’টি তখন তার ছেলেরে
শুনায় কালের কথা
শাসক নামের শোষক শ্রেণির
ভীষণ বর্বরতা।

গল্প শুনে ছোট্ট খোকন
অবাক হয়ে ভাবে
সত্যি কখন বাংলা ভাষা
রাষ্ট্র ভাষা হবে?

একুশ মানে
জোৎস্না ইকবাল

একুশ মানে প্রভাত ফেরি
বাংলা ভাষার গান
একুশ মানে শহীদ মিনারে
পুষ্পমাল্য দান।
একুশ মানে কোটি মানুষের
শ্রদ্ধা ভরা দিন
একুশ মানে লক্ষ লোকের
স্বপ্ন অমলিন।
একুশ মানে সোনার বাংলা
কোটি মানুষের প্রাণ
একুশ মানে বাংলা মায়ের
সন্তান হারানো গান।
একুশ মানে বায়ান্নতে
হারিয়ে যাওয়া প্রাণ
একুশ মানে সালাম জব্বার
রফিকের আত্মদান।
একুশ মানে ভাষা শহীদের
রক্তভেজা প্রাণ
একুশ মানে বাংলা মায়ের
মুক্ত সুরে গান।
একুশ মানে বাংলা মায়ের
মুক্তোঝরা হাসি
একুশ মানে সোনার বাংলা
তোমায় ভালোবাসি।

এগইশর গল্প
জালাল উদ্দিন মো. আকবর

অ বাঙালি পোয়াইন ছোয়াইন,
এগইশর গল্প ফুইন্ন নে?
এগইশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস
তোঁয়ারা বেগগুন জানঅ নে?
.
ভাষার গল্প হইর্ তোঁয়ারারে
হান্ ভরি ফুনঅ।
রফিক, সালাম রক্ত দিয়্যে ভাষাল্লাই
বাংলিশ মারিবানে হনঅ?
অবাজিঅল্ পাকিঅলে উর্দু ভাষা
দিতঅ চাইল্ চাপাই।
বাঙালি সুলোগান ধৈজ্জে “রাষ্ট ভাষা বাংলা আঁর/
উর্দু ভাষা না হাই”।
জিন্নার ঘোষণা-“উর্দুই হবে, বাংলা না”।
ছাত্রসমাজ গর্জি উইঠ্যে -“মানি না মানি না”।
১৪৪ জারি গইজ্জে নুরুল আমিন সরকার।
বাংলার দামাল পঅলে গইল্ল ছারহার!

ডরুল্লৌ সরকার অর্ডার দিলো মিলিটারি
“বাঙালি দমন গর্ যেন্ পারছ্ এঙ্গরি”।
তেঁই ন’জানে বাঙালি হনঅ দিন ন’হারে।
ভাষাল্লাই তাজা রক্ত উদৌ বাঙালিই ঢালিত্ পারে!

অ আঁর্ ভাষা শহিদ
দামাল বীর অক্কল,
তোঁয়ারারে সালাম জানাই
সমস্ত বাঙালি অল্।
.
আজিয়াত্তোন ছৌন গইল্লাম,
বাংলার মান রাইখ্যম।
শুদ্ধ বাংলা গইজ্জম চর্চা,
বাংলিশ বাদ দিয়্যম।

একুশের ভোরে
রওনক জাহান

প্রভাতফেরির ভীড়ে
আমি খুঁজেছি ৫২-কে
যে ৫২ রক্ত ঢেলে দেয় স্বাধীনতার বর্ণ এঁকে!
যে ৫২ প্রাণের দামে কিনলো মুখের কথা
বুকের ভাষার, সুখের আশার আনলো পূর্ণতা!
দু’শ বছর ভাষার দ্বারে জিঞ্জির ছিলো পরা
৫২ এসে খুললো শিকল;ভাঙলো ভাষার কারা
পাকিস্তানি শাসক-গোষ্ঠী অন্যায় দাবী করে
আমাদের সব ভাষার অধিকার জোর করে নিলো কেড়ে!
ভয়হারা বীর বাঙালি গর্জে ওঠলো তাতে
নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢাললো রাজপথে।
সালাম,রফিক,জব্বার,বরকত প্রাণ দিলো অকাতরে
কোটি বাঙালির প্রাণ তাদের ভক্তি ভরে স্বরণ করে!
আজও একুশের মিছিল চলে শহীদ মিনার মূলে
শুধু নেই তারা যাদের দানে আমাদের বুল খুলে
আজ একুশের ভোরে
লাখো জনতার ভীড়ে
আমি খুঁজি শহীদ ভাইদের মুখ
যাদের ত্যাগে গলা ছেড়ে বলি,’বাংলা অমর হোক।’

সমর্পণ
মাহমুদ সীমান্ত
বেদির সামনে রুদ্ধ, আত্মকণ্ঠ দাঁড়িয়ে ছেলেটি
নিষ্পলক ভাষায় তাকিয়ে
খুঁজে যাচ্ছে বেদিমূল, অমর একুশে
সালাম, রফিক, বরকত
আরো শত না জানা ব্যাকুল ভাষা শহীদের নাম।

বেদিতে কিছুই নেই—
চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে
গোধূলি কল্যাণ সংঘ, সিলভানা সোসাইটি
অগ্রদূত, বিদ্যা শতদল…
পাশে পড়ে আছে রাত বারোটায় দেয়া
অমর একুশে সমর্পণ
আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো…
জাগরণ সাহিত্য সমাজ
অরুণোদয়, তরুণ একুশে সংগঠক।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।