কক্সবাজারে ভাষা শহীদদের সম্মান জানানোর সংস্কৃতি ও প্রথম শহীদ মিনার

ছবি: সংগৃহীত

কালাম আজাদ
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে একুশের ভাষা শহিদদের ফুল দিয়ে সম্মান জানানোর সংস্কৃতি। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ যতদিন পর্যন্ত থাকবে ততদিন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে।
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকাতে একুশের ভাষা শহিদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর সংস্কৃতি চালু হলেও প্রান্তিক জেলা কক্সবাজারে তা শুরু হয়েছে দীর্ঘ কয়েক বছর পরে।

১৯৫৯-৬০ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা দিবস পালন করা হতো। এ সময়ে রামু থেকে ছাত্র প্রভাতফেরি করতে ট্রাকযোগে মহকুমা সদরে আসতেন। তবে ১৯৬১ সালেই সর্বপ্রথম রামুতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা দিবস পালিত হয়। মহকুমা সদর এবং রামু থানা সদর ছাড়া অন্য কোনো স্থানে এ সময়ে ভাষা দিবস উদযাপনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার আগপর্যন্ত কক্সবাজার মহকুমায় কোনো শহিদমিনার নির্মাণ হয়নি। শাসকগোষ্ঠীর গোয়েন্দাদের নীরব নির্যাতনের কারণে তা স্থাপন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে প্রতিবছর মহকুমা সদরে বিভিন্ন স্থানে অনাড়ম্বরভাবে ভাষা দিবস উদযাপন করা হতো।

১৯৬২ সালে কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র মনিটরের সেক্রেটারী Kamal Hossen Chowdhury একঝাঁক সংগ্রামী ছাত্র-জনতা নিয়ে কক্সবাজার পাবলিক ইনিষ্টিটিউশন অঙ্গনে আমতলায় গাছ-বাঁশ দিয়ে রাতারাতি একটি শহীদ মিনারের অবকাঠামো নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে কক্সবাজার সরকারি কলেজের প্রথম জিএস কামাল হোসেন চৌধুরী তাঁর কেবিনেট ও সহযোগী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কক্সবাজার কলেজে প্রথম শহীদ দিবস পালন করেন।

১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট মাঠে ভাষা দিবস পালিত হয়। মৌলভী ফরিদ আহমদ, কামাল হোসেন চৌধুরী, নজরুল ইসলাম চৌধুরীসহ আরো কয়েকজন ছাত্রনেতা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। মূলত স্বাধীনতার পরে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নির্মিত শহিদমিনারটি মহকুমার সর্বপ্রথম শহিদমিনার স্বীকৃত।

তবে এখন তার অস্তিত্ব নেই। ১৯৬৯ সালের দিকে কমরেড ইদ্রিস আহমদ, সুভাষ দাশ, সিরাজুল মোস্তফা প্রমুখ ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পালের দোকানস্থ শহিদমিনার। যেটি এখন পুরাতন শহিদমিনার নামে পরিচিত। এ শহিদমিনারটি কক্সবাজার পৌর মেয়র ১৮ জুন ২০০৬ সালে নতুনভাবে সংস্কার করেন। এ শহিদমিনারে ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা প্রথম একুশের পালন করে করে বলে জানিয়েছেন কমরেড ইদ্রিস আহমদ। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে শহিদ দিবস পালনের জন্য কোনো চেষ্টাও পরিলক্ষিত হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধে কক্সবাজারের বহু মানুষ শহিদ হয়েছেন। তাদের জন্য কোনো স্মৃতি ফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বশির আহমদ ও মাস্টার শাহ আলম নামে ২ জন শিক্ষক শহিদ হওয়ায় মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ ছাত্রদের চৈতন্যের মধ্যে আশায় তারা উদ্যোগী হন।

এরইপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি শহিদমিনার নির্মাণের জন্য জায়গা এবং অনুমতি প্রদানের জন্য তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদের অনুরোধ করে মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে। প্রথমে সরকারি অনুমতি ছাড়া শহিদ মিনার নির্মাণের অনুমতি প্রদানে আবদুল কাদের অপারগতা প্রকাশ করায় কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি, আওয়ামীলীগের তরুণ নেতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কামাল হোসেন চৌধুরী প্রমুখকে দিয়ে অনুমতি প্রদানে রাজি করানো হয়।

১৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদেরের সভাপতিত্বে শিক্ষক পরিষদ এবং পরবর্তীতে ছাত্রদের নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বকারী ছাত্র এবং প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদেরকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ১৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি ‘শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন―মাস্টার আবদুল রাজ্জাক, বদরুল আলম, সৈয়দ আহমদ, লতিফ, সুগত বড়ুয়া, দ্বীননাথ রায়। ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন―মো. আলী, আলতাফ হোসেন, মুজিবুর রহমান, আবদুল কাদের, কবির আহমদ, সমীর পাল, খোরশেদ আলম, বিপুল সেন ও বিশ্বজিত সেন বাঞ্চু। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সামাদকে দিয়ে জাতীয় শহিদ মিনারের আদলে একটি শহিদমিনার এবং স্মৃতিস্তম্ভের ২টি নকশা তৈরি করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভ দুটি হল স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত বিদ্যালয়ের শিক্ষক শহিদ শাহ আলম ও শহিদ বশির আহমদের জন্য। তারা দু’জনই ঢাকায় বি.এড প্রশিক্ষণরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহিদ হন। তাদের স্মৃতিস্বরূপ কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মিলনায়তনের নাম ‘শহীদ শাহ আলম-বশির আহমদ মিলনায়তন’ নামকরণ করা হয়। অপর স্মৃতিস্তম্ভটি হল স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত অত্র বিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য। ছাত্রদের মধ্যে স্বপন ভট্টাচার্য, সুভাষ দাশ, শামসুল আলম, , শিশির বড়ুয়া স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হন। প্রস্তুতকৃত শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভের নকশা অনুযায়ী ঘোনারপাড়া নবী হোসেন মিস্ত্রিকে দিয়ে প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদের এবং কামাল হোসেন চৌধুরীসহ অন্যান্যের দ্বারা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে স্কুলের পশ্চিম গেইটের পার্শ্বে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। শিক্ষক ও ছাত্র সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলে এবং স্টেডিয়াম কমিটির কাছ থেকে কিছু পরিত্যক্ত ইট সংগ্রহ করে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়।

তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য এডভোকেট নুর আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা এ.কে.এম মোজাম্মেল হক, ছাত্রলীগ নেতা নজরুল ইসলাম চৌধুরী, কামাল হোসেন চৌধুরী, দিদারুল আলম, হাবিবুর রহমান কক্সবাজারে প্রথম শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ২১ শে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপনকালে জাতীয় পরিষদ সদস্য এডভোকেট নূর আহমদ, মহকুমা প্রশাসক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, কামাল হোসেন চৌধুরী, ম্যাজিস্ট্রেট চাকমা বসবু এবং স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে শহীদ মিনার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। একই দিনে শহিদ মাস্টার শাহ আলমের বৃদ্ধ পিতা একই স্থানে শিক্ষক-ছাত্রদের জন্য নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের শুভ উদ্বোধন করেন। উল্লেখ্য যে, স্বাধীনতাত্তোর কক্সবাজারে এটিই ভাষা শহিদদের জন্য নির্মিত প্রথম স্থায়ী শহিদ মিনার, এ এলাকায় স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত শহিদদের স্মরণে প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ এবং শহিদদের স্মৃতিস্বরূপ তাদের নামে প্রথম কোনো স্থাপনার নামকরণ।

উদ্বোধনের পর কক্সবাজারের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠন, বিদ্যালয়, কলেজ, পুলিশ বাহিনী, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহিদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদমিনার নির্মাণ না হওয়ায় পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শহিদমিনার কেন্দ্রীয় শহিদমিনার হিসাবে পরিগণিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহিদ সরণিস্থ শহিদমিনারটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পরিণত হয়েছে। মাঝে বেশ কিছু দিন শহিদমিনারটি কক্সবাজার পৌরসভার অধীনে থাকলেও বর্তমানে কক্সবাজার জেলা পরিষদের তত্বাবধানে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় শহিদমিনার পরিচালিত হচ্ছে।
টেকনাফে স্বাধীনতার পরই নির্মিত হয় শহিদমিনার। এ ছাড়া উখিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালীতে আলাদা ব্কেন্দ্রীয় শহিদমিনার এবং জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহিদমিনার নির্মাণ করা হয়েছে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, রাইজিং কক্স 

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।