কবি ও গবেষক হিমেল বরকত, দেখা হবার অপেক্ষা করলে না, বন্ধু!

হাফিজ রশিদ খান

কবি ও গবেষক হিমেল বরকত। তাঁকে আমি চাক্ষুষ করিনি কোনোদিন। তবে জানতাম তাঁর কবিতা ও গবেষণাকর্মের সুবাদে। সেসব লেখাজোখায় তাঁর সুবেদী মনটা প্রায়শই উঁকিঝুঁকি দিত। আমাকে টানত খুব। তাঁর অগ্রজ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কবিতাকলাচর্চায় আমার পূর্বসূরি ছিলেন। তাঁর দ্রোহীকণ্ঠ ও কবিতার চরণাবলি আশি’র দশকে স্বৈরাচার সরানোর আন্দোলনে আমাকে সর্বক্ষণ জাগিয়ে রাখত। তাঁরই অনুজ হিমেল বরকত। নিজস্ব লেখালেখির সমতালে তাঁর আগ্রহ ছিল বাংলাদেশের আদিবাসীদের নিয়ে ভাবনাচিন্তায়। এ বিষয়ে আমার কবিতা ও আদিবাসীবিষয়ে আমার রচনাকর্মের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধান্বিত মনোভাব তাঁকে আমার মনের স্বজনে উন্নীত করেছিল। এ মনোভঙ্গির একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেলাম ২০১৩ সালের প্রথম দিকে, আমার বাড়ির ঠিকানায় কুরিয়ারে তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের আদিবাসী কাব্যসংগ্রহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৩) বইটি এবং সঙ্গে একটি হাতে লেখা চিঠি (১৫/০৩/২০১৩) পাওয়ার পর।
ওই বইটির পরিশিষ্টে এবং পার্বত্য অঞ্চল থেকে আমার সংগৃহীত ও অনূদিত আদিবাসীদের কবিতার সূত্রে আমার নাম বারবার উল্লেখ করেছেন। এ নিশ্চয় তাঁর সচেতনমন ও মননের বহিঃপ্রকাশ। বইটির ‘সম্পাদনা প্রসঙ্গে’ অংশেও তাঁর বিনতি মুগ্ধতা ছড়ায়। এমন সম্ভ্রান্ত শিক্ষক (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়), মাধুর্যমণ্ডিত কবি আর সজাগ গবেষক হিমেল বরকতকে ভোলা যাবে না কখনো। তাঁর গুণবত্তা ও সৃজনীসত্তা এ আমার কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে বিনয়ের পরাকাষ্ঠায়। ওই বইটির সঙ্গে প্রেরিত চিঠিটি ছিল নিম্নরূপ :

১৫/০৩/২০১৩
হাফিজ ভাই,
অনেক অনেক শুভেচ্ছা নিবেন।
‘আদিবাসী কাব্যসংগ্রহ’ বইটা পাঠালাম। আদিবাসীদের নিয়ে আপনার কাজ, লেখালেখি ভীষণ প্রেরণাদায়ক। আমার ভেতরে সচেতনতা-সৃষ্টিতে আপনার ভূমিকা অনেক। সে কারণে আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। ‘অরণ্যের সুবাসিত ফুল’ (২০০৯) সংকলনটির জন্যও কৃতজ্ঞ।
আমার সম্পাদিত বইটা সম্পর্কে কোনো মতামত, পরামর্শ বা ত্রুটি চোখে পড়লে জানাবেন। সেগুলো পরবর্তী সংস্করণ যদি বের হয় সংশোধন করে নেব। ভাল হয়, আপনি যদি একটা রিভিয়্যু করেন। আদিবাসী কবি ও কবিতার স্বীকৃতির জন্য প্রচারণা বেশি জরুরি। বিশেষ করে একাডেমিক পর্যায়ে এই প্রসঙ্গের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। আমার এই কাজটা সেই লক্ষ্যেই মূলত।
ভালো থাকবেন নিরন্তর। ঢাকায় এলে আমাকে জানাবেন। আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে ভালো লাগবে।
হিমেল বরকত

দুই

২২ নভেম্বর ২০২০। বিহানের একটু পর ঘুমজড়ানো চোখে ফেসবুকের পর্দায় ওই শ্মশ্রুমণ্ডিত হাসিমুখটি ভেসে উঠলে চমকে উঠি, মৃত্যুসংবাদ যুক্ত থাকায়। ভেতরটা মুষড়ে গেল স্বজনহারানোর বিহ্বলতার মতো। ওই দিনটা গেল। বিমর্ষতা আমাকে ছাড়ে না। তাই এই চিঠি ও বইটা বের করলাম অনেক খুঁজেপেতে।
আল্লাহ তাঁকে শ্রেষ্ঠতম স্বর্গসকাশে রাজসিক হালে থিতু করুন।
হে আলোকমণ্ডিত অনুজ, ভালো থেকো ভাই।

২৩/১১/২০২০
দক্ষিণ শুলকবহর চট্টগ্রাম

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।