কবি মৃধা আলাউদ্দিনের জন্মদিন আজ

মৃধা আলাউদ্দিন

অনলাইন ডেস্ক : গল্প কবিতা ও ছড়ার অনেক আড্ডা-আসরই সরগরম ছিল কবির পদচারণায়। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের রবীন্দ্র-নজরুল পাঠচক্র, রাইটার্স ক্লাব ও বাংলা সাহিত্য পরিষদ ছিল কবির সাহিত্য আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান স্যারের বাসার মাসিক সাহিত্য আড্ডা, পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিংসহ শহরের আরো অভিজাত সাহিত্য আড্ডায়ও তার যাতায়াত ছিল উৎসবমুখর। আমরা বলছি নব্বই দশকের কবি মৃধা আলাউদ্দিনের কথা; যিনি এখন অনেকটাই নিভৃতচারী। তাকে নিয়ে লিখেছেন সৈয়দ আহসান কবির তুষার।

আপনার ফেলে আসা ছেলেবেলার মধুময় সেই স্মৃতির কথা, কেমন ছিল আপনার শৈশব-কৈশোর এমন প্রশ্নের জবাবে মৃদু হেসে কবি মৃধা আলাউদ্দিন বললেন, খুব মধুর ছিল না আমার শৈশব-কৈশোর। তিক্ততায় ভরা ছিল। বাবা ছিলেন না। মায়ের কষ্টের কথা আজও আমাকে পীড়া দেয়। আমাদের দুটো ভাইবোনকে লেখাপড়া ও ডাল-ভাত খাওয়াতেই মায়ের সে প্রাণান্ত কষ্টের কথা আমরা আজীবন ভুলব না। আমাদের নানির কাছে রেখে মা এসে ঢাকার পিজি হাসপাতালে চাকরি নেন, পরে মা আমাদেরও ঢাকায় নিয়ে আসেন। ভর্তি হই ঢাকার সেগুন বাগিচা ইউসিইপি স্কুলে। পরে আমরা চলে আসি রমনা থানার পাশে পিডবিøউডির চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী কোয়ার্টারে। ভর্তি হই সিদ্ধেশ্বরী বয়েস হাইস্কুলে; সেখান থেকে আবার চলে যাই মধুবাগ হাইস্কুলে। ছয় মাস পড়েছিলাম ইস্কটান গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ে।

সাহিত্য জগতে প্রবেশসংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে চায়ের কাপে পর পর দুবার চুমুক দিয়ে তিনি একটু আয়েসী ভঙ্গিতেই বললেন, ছন্দে হাতে খড়ি সব্যসাচি লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কাছে কাঁটাবন, নীলক্ষেত হাইস্কুলে। বন্ধুর বাবার পুরনো বইয়ের দোকান ছিল নীলক্ষেতে। বন্ধু আফজালের সঙ্গে সেখানে যাই, ফেরার সময় পানি খেতে ঢুকি ঐ স্কুলে। তখন বিকেল, দেখি অনেক লোকের সমাগম। ছোটরাও ছিল। আমরাও সেখানে বসলাম। বুঝতে পারলাম গল্প-কবিতার আড্ডা। মন বসছে না। বন্ধুর তো মোটেই না। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও পয়ার ছন্দের আমরা কি বুঝি? আমার সঙ্গি রাগ করে শেষমেশ আমাকে ফেলেই চলে গেল। … সৈয়দ হকের এ রকম দুটো ক্লাস পেয়েছিলাম। কিছু না বুঝলেও সৈয়দ হকই ছিলেন আমার ছন্দের হাতে খড়ি। সালাম সৈয়দ শামসুল হক আপনাকে।
তারপর সন্ধান পেলাম বাংলা সাহিত্য পরিষদের। আবদুল মান্নান সৈয়দের। জনাব সৈয়দ আমাকে পেছনের বেঞ্চ থেকে নিয়ে আসলেন সামনের বেঞ্চে। আবার সেই একই কথা, একই ছন্দ। ‘দানব নন্দিনি আমি রক্ষ-ক‚ল-বধূ, রাবণ শ^শুরসম মেঘনাদ স্বামী, আমি কি ডরাই সখি ভিখারী রাঘবে?’ বলো এটা কোন ছন্দে লেখা। ভাটা মাছের মতো ড্যাব ড্যাব চোখে থাকিয়ে আছি স্যারের দিকে, স্যার বুঝলেন আমি কিছুই বুঝিনি। বললেন, শোন, এটা অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ প্রমীলার ভাষ্য। এই ছন্দে মাইকেল লিখেছেন। আমরাও লিখেছি। তোমাদেরও লিখতে হবে। বুঝালেন ৮+৬ ও ৮+১০-এর পর্ব। জোড়ে জোড়, বেজোড়ে বেজোড়। অতিপর্ব। অন্তমিল। একক শব্দ। রুদ্ধ সিলেবল শব্দের শুরুতে ও মাঝে বসলে একমাত্রা। শেষে বসলে দুই মাত্রা। নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মাত্রাবৃত্ত ছন্দে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। জীবননান্দ দাশ ‘সূর্যাস্ত’-কে আজীবন চার ধরে কবিতা লিখে গেছেন। গদ্য ও স্বরবৃত্ত ছন্দ (কত কি শিখেছি সেই ছন্দেও ক্লাসে তার ইয়ত্তা নেই। জসীমউদ্দীন এক লেখায় দুই ছন্দ ব্যবহার করে তাক লাগিয়ে দিলেন আমাদের। লিখলেন, ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই, ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই।’ এখানে একই সঙ্গে কাজ করেছে স্বরবৃত্ত ও পাঁচ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দ। মান্নান সৈয়দ না হলে এ আমরা কিভাবে জানতাম? মান্নান সৈয়দ আমার কবিতার শব্দ ধরে ধরে শুধরে দিয়েছেন। আজ একটা কবিতা দেখলে বা দুএকবার পড়লেই আমি বলে দিতে পারি এটা কোন ছন্দে। এটা মান্নান সৈয়দের অবদান। তিনি না হলে আজ আমার কবিতা লেখাই হয়ে উঠত না। যেখানেই থাকেন, যতদূরেই থাকেন শ্রদ্ধা আর বিনম্র সালাম আবদুল মান্নার সৈয়দ আপনাকে।
বই প্রকাশ নিয়ে জানতে চাইলে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কবি বলেন, না, সে অর্থে আমার কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। বন্ধুরা মিলে (জাকির ইবনে সোলায়মান, আল হাফিজ, আরিফ নজরুল) রেলগাছ সিরিজ থেকে কিছু বই প্রকাশ করেছিল। তাতে আমারও একটা বই ছিল। যা আজ আর আমার সংগ্রহে নেই। তাছাড়া সেটা ছিল ভুলে ভরা, একটা অসমাপ্ত কবিতার বই। দুতিনটে পান্ডুলিপি রেডি আছে। প্রকাশক পাচ্ছিলাম না। এমন সময় মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি নামল আমার উঠোনজুড়ে (সমস্ত হৃদয়ে। ফেসবুক বন্ধু রাজুব ভৌমিক জানতে চাইলেন, সামনের মেলায় আপনার কি বই আসছে? আমি বললাম, না ভাই, একটু সমস্যা যাচ্ছেÑ এ মেলায় বোধ হয় আর বইটা বের করতে পারব না। পান্ডুলিপি তো রেডি।
কেনো বের হবে না?
ওই যে বললাম, আর্থিক একটু সমস্যা যাচ্ছে।
আরে এটা কোনো ব্যপার না। আপনি কম্পোজ-প্রæফ দেখে রেডি করে ফেলেন।
হুম, ওসব করা আছে। অর্থাৎ, সব রেডি।
আপনার বই হবে।
কিভাবে?
হবে।
বলবেন তো, কিভাবে, কে বের করে দেবে আমার বই?
বললাম তো, আপনার বই এ মেলায় বের হবে।
একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, কে বের করবে, আপনি? আপনি কি বই বের করতে আমাকে টাকা দেবেন?
না।
তবে? আমার কথায়, চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ।
বললাম তো আপনার বই বের হবে।
প্লিজ খুলে বলুন, আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি।
ঢাকা নয়, দিল্লি-কলকতা নয়; একেবারে নিউইয়র্ক থেকে আপনার বই বের হবে।
দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল আমার। তবুও নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললাম, তবে কি আপনি আমার বই বের করে দিবেন?
হুম, আপনার লেখা, গদ্য-পদ্য, দোঁহাকাব্য (আপনার ব্যবহার, সর্বোপরি আপনার সবকিছুই আমার ভালো লেগেছে। আমি নিউইয়র্ক থেকে প্রথমে অনলাইন ভার্ষণে আপনার বই বের করে দেব। পরে প্রিন্ট আকারে বের করব।
হাতের কাছে পানি ছিল। গলা ভিজিয়ে আমি আবার বললাম, সত্যি?
সত্যি। তিন সত্যি।
এভাবেই নিউইয়র্কের ম্যানহাটন (ফিফথ এভিনিউ, ৩০ স্ট্রিট ম্যানহাটন, নিউইয়র্ক) থেকে বের হলো আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রš ‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে’। বইটার প্রকাশক রাজুব ভৌমিক নিজেই। পরিবেশক বার্ন এন্ড নোবল। হাউস : ১২২ ফিফথ এভিনিউ # ২ নিউইয়র্ক, ১০০১১।
এর কিছুদিন পর পৃথিবীজুড়ে নেমে এলো মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস। নইলে এতোদিনে আমি আমার কবিতার বইয়ের প্রিন্ট কপিও হাতে পেতাম। … যাক সে কথা, এবার বইমেলায় বের হলো আমার দুটি কবিতার বইÑ ১. সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে ও ২. প্রজাপতি হয়ে গ্যাছে কোনো কোনো মাছ। এরপর প্রকাশক পেলে বের করব, শিশুতোষ ছড়ার বই ‘চড়—ইয়ের চিড়িপ্ চিড়িপ্ শব্দ’ এটিও রেডি আছে। রেডি আছে গল্প ও প্রবন্ধের পান্ডুলিপি।
অলঙ্কার নিয়েও আপনার কিছু কাজ আছে। সে সম্পর্কে কিছু বলুন। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কবি আবার বলতে লাগলেন, মান্নান সৈয়দের পরে কবি হাসান আলীমের কাছেও আমার কিছু কিছু অলঙ্কার শেখা হয়েছে। যদিও মানুষ শেখাতে চায় না। সেখানে মান্নান সৈয়দ ছিলেন আকাশের মতো উদার। সমুজ্জ্বল। স্যারকে ভোলা যায় না। যদিও খুব একটা ভালো হয়নি, তবুও অলঙ্কার নিয়ে আমার দুএকটা উদাহরণ এরকম (চিনেছি তোমারে দেহভরা পাকা ফলে আজ তনুদেহখানি চিনি
আমারে ছুঁয়েছো যেনো কামনার রসে-জলে চিনি।
এখানে ‘চিনি’ শব্দটি দুই অর্থে দুবার ব্যবহার হয়েছে। একবার চিনি, চেনাজানা। আরেকবার চিনি, মিষ্টি। এটাকে কবিতায় জমজ শব্দ বলে।
বিরোধাভাস-৩
হাত দিয়ে ধরে দেখি কমলার কোষ
মনোরম লাল, পাশাপাশি যেনো দুটি চোখ (তবু মনে হয় দূরে, বহু দূরে
শত সহ¯্ররে পথ, অথবা অচিন অন্ধপুরে।
তুমি
তুমি ত আমার কাছে/ আদি আয়নার মতো/ সাত রঙ. ষড়ৈশ^র্য।
উপমেয় (উপমার বিষয় বা উপমিত হয়েছে এমন) = তুমি। উপমান (যার সাথে তুলনা করা হয়) = আয়না। সাধারণ ধর্ম = ষড়ৈশ^র্য। তুলনাবাচক শব্দ = মতো।
অল্পক্ষণ
সেদিন তোমাকে দেখলাম/ গোধূলীবেলার মতো/ আয়নায়, অল্পক্ষণ।
উপমেয় (উপমার বিষয় বা উপমিত হয়েছে এমন) = তোমাকে। উপমান (যার সাথে তুলনা করা হয়) = গোধূলীবেলা। সাধারণ ধর্ম = অল্পক্ষণ। তুলনাবাচক শব্দ = মতো।
কান্না আসে
চোখদুটো আষাঢ়ের মতো (এখনো হৃদয়ে কান্না আসে/ সারাদিন, সর্বক্ষণ।
উপমেয় (উপমার বিষয় বা উপমিত হয়েছে এমন) = চোখ। উপমান (যার সাথে তুলনা করা হয়) = আষাঢ়। সাধারণ ধর্ম = কান্না। তুলনাবাচক শব্দ = মতো।

আপনার সম্পাদনা নিয়ে কিছু বলুন। বললেই কবি মিষ্টি হেসে বলতে লাগলেন (‘কাব্যভাঁজ’ আমার সম্পাদনায় প্রথম কবিতাপত্র। এর কয়েকটা সংখ্যা বের হলেও এখন একেবারে বন্ধ। কয়েক বছর আগে আমি একটা বড় কাজ করেছি। সিলেটের মরহুম কবি মিছবাহুল ইসলাম চৌধুরী। তার ‘শেরশাহ’ মহাকাব্যটি আমার সম্পাদনায় বের হয়। এই শেরশাহ সম্পাদনার জন্য আমি কবি মোহন রায়হান ও মো. সুফিয়ান উস সামাদ ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ। নারা না হলে এ বড় কাজটি আমি করতে পারতাম না। ধন্যবাদ ভ্রাতৃদয় আপনাদের। জানিনা, এ মুগ্ধতা ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না।

 

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।