করোনা পরবর্তী বিশ্ব: বাংলা ভাষা-আঞ্চলিক ও প্রমিতযোগ

আজিজ কাজল

বাংলা ভাষা নিয়ে খুব বেশি ট্র্যাডিশনাল বা কেতাদুরস্ত আলোচনায় না গিয়ে তাকে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছি। বাংলার বিবিধ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার শক্তি—শব্দ, বাক্য, টোন, আচরণের ভঙ্গি থেকে শুরু করে উচ্চারণের কিছু মৌলিক পার্থক্য ধরার চেষ্টা করেছি। সেই সাথে একটি দেশের জাতীয় বিকাশমানতায় শুদ্ধ বা প্রমিত ভাষার শক্তির সাথে উল্লিখিত লোকাল ভাষার প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি।

বাংলাদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও তার প্রকৃতি আবহাওয়া, জলবায়ু ও মাটির উর্বরতাভেদে সব জায়গায় কমবেশি এক ধরনের। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের গলার টোন, শব্দ, বাক্য ও ভাবে আছে কিছু পার্থক্য আবার বড়ো ধরনের পার্থক্য ও ব্যবধান। অঞ্চলভেদে এমন কিছু ভাষা আছে। বলার ভাষা এক হলেও আপাত কিছু শব্দ বা টোনের ভঙ্গির মাঝেও আছে ব্যবধান। মোটাদাগে উদাহরণ হিসেবে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা উপজেলার কিছু আঞ্চলিক ভাষায় এমন পার্থক্য দেখতে পাই। যেমন, বুড়ো লোককে আমরা লোকাল টোনে বলতে শুনি বুইজ্জা। আবার কিছু জায়গায় বলতে শুনি বুইরগা। ছোট্ট একটি মজাদার উদাহরণে (চট্টগ্রামে, বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বেশি শুনা যায়) বলতে পারি—বুইরগা ওগ্গা কুইরগাত্তুন গইরগায় গইরগায় দইরগাত্ পরি মইরগে। আবার—বুইজ্জা ওগ্গা কুইজ্জাত্তুন গইজ্জায় গইজ্জায় দইজ্জাত্ পরি মইজ্জে। ভাত খাওয়া কে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলে ভাত হা-আই, আর দক্ষিণ চট্টগ্রামের কিছু ভাষায় আঞ্চলিক টোনে সেটাকে বলে ভাত হাইয়ি। আবার চট্টগ্রামের অনেক মানুষ লোকাল টোনে রাস্তাকে লাস্তা, রাতকে লাত বলতে অভ্যস্ত। সবমিলিয়ে বস্তু আর অবস্তুগত এমন অনেক ধ্বনি, শব্দ, বাক্যে বড়ো ধরনের অথবা সামান্য ধরনের কিছু পার্থক্য আছে। ভাব বিনিময়ের জন্য বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার বলার ঢঙ বা ভঙ্গিগত (সামান্য পার্থক্য ছাড়া) কিছু ভাষা প্রায় কাছাকাছি। পুরুষবাচক শব্দ শুধু ‘ছেলে’ শব্দটা নিয়েই যদি বলি, পুরো বাংলাদেশে এই শব্দটার কেমন রূপ দাঁড়ায় দেখুন—পোয়া, পোআ, পুয়ো, হোলা, পোলা, ছেলে, ছাওয়াল, ছেমড়া ইত্যাদি। এতো গেলো কিছু শব্দ, বাক্য, টোন বা ভঙ্গিগত পার্থক্য ও আপাত-পার্থক্যের ব্যবধান। খুব সম্প্রতি ‘কেনে চলর’ (কেমন চলছো) কথাটি পুরো বাংলা মুলুক ছড়িয়ে বহির্বিশ্বের বাঙালি ও অনেক বিদেশীর কাছে বেশ জনপ্রিয়তা (ক্ষেত্রবিশেষে এখনো) পেয়েছিলো। এমন কিছু আঞ্চলিক ব্রহ্মধ্বনি ও শক্তিময় বাক্যও যে, কৌতুকপ্রিয় বাঙালির রসনাকে একটা সমন্বিত আবেগে রূপান্তর করতে পারে, যা সত্যি অভাবনীয়। এর আগেও আশি বা নব্বই পরবর্তীতে পঁডত গেইয়ে, (পঁটে গেছে বা নষ্ট হয়েছে) মার কবিরা!, মার বদি আলম! জামাই লেস্কেরসহ এমন অনেক আঞ্চলিক ধ্রুপদি বচন শুনা গিয়েছিলো—যা নির্দিষ্ট অঞ্চল ছাড়িয়ে দেশের অনেক জায়গায় তার বিস্তৃত ঘটেছিলো। পুরো বাংলাদেশে বহুল জনপ্রিয় ব্রহ্মধ্বনি বা বচন ‘কেনে চলর’ কে অনেক বড়ো একটা আবেগের শক্তি নিয়ে হাজির হতে দেখি। যদিও এর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে, প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ (ফেবু) মাধ্যমের মতো মিডিয়া বিপ্লব। যা শুধু বাংলাদেশ নয়, পৌঁছে গেছে সুদূর বিশ্বের বাংলা ভাষী ও বিদেশিদের কাছেও।

‘কেনে চলর’ বচনটি একটি অঞ্চলের জনসাধারণের লোকাল এক্সেন্টকে (এই উৎস ধ্বনি) জাতীয়তাবাদী বচন বা নীরব ব্রহ্ম শক্তিতে (চেতনে-অবচেতনে এখনো) পরিণত করেছে। যেটা প্রান্তিক সীমা পেরিয়ে বাংলার সর্ব সাধারণ বা একেবারে অভিজাত শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আমি মনে করি বিভিন্ন জেলা উপজেলার এইসব আঞ্চলিক ভাষাশক্তি (ধ্রুপদি লোকায়ত বচন বা কথামালা) আমাদের বাংলা ভাষার পক্ষে, এই ভাষার বড়ো একটা রক্ষা কবচ হিসেবে অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই ভাষার শব্দ, বাক্য বা টোন গুলো প্রমিত বাংলা বিকাশে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও আগ্রহের জায়গাটাকে দারুণ ভাবে উস্কে দিতে পারে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে আমরা এই বচন বা কথা গুলো কমবেশি জেনে আসছি। যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাণসঞ্চারী ও প্রাণদায়িণী রূপে বিভিন্ন ভাবে এখনো সেবা দিয়ে চলেছে।

ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে। এই বগাকে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় মানবঅঙ্গের (পুরুষাঙ্গ) লিঙ্গবৈশিষ্ট্য নির্ধারণের প্রতিকী হিসেবেও ধরা হয়। যেমন চট্টগ্রামে ‘পুরি’ বলতে আমরা ডালপুরি বা বিশেষ কোন খাবারকে বুঝাই। সিলেটে এই পুরি অর্থে কোন ফিমেল বা নারীকে বুঝায়। ‘বজা’ বা ‘বদা’ শব্দটা বৃহত্তর চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলে ডিম অর্থ বুঝায়। আবার পুরুষাঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করতে ও বলতে শুনা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলে ধোন, গোঁয়া বা পুটকিসহ এমন শব্দ আছে যা আলাদা জেন্ডার বৈশিষ্ট্যকে যেমন চিহ্নিত করে, তেমনি আবার গালি অর্থেও বিষয় গুলোকে দেখা হয়। কথায় বলে এক দেশের গালি, আরেক দেশের বুলি। এসব বিষয় আমরা নিজেরাও প্রাত্যহিক বা ব্যবহারিক যাপনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষদর্শী।

বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবীদ আবুল ফজল’র ‘রেখাচিত্র’ এ পাওয়া যায়, এক সময় তিনি শিক্ষক হিসেবে উত্তরবঙ্গে গেছেন। শিক্ষার্থীরা তার কথা বুঝতে পারছেন না আর তিনি তাদের কথা বুঝতে পারছেন না। এ নিয়ে শিক্ষার্থীরা নাকি বেশ হাসাহাসি করছেন….তখন তার ভাষ্যে, লন্ডনেও প্রাইমারি ও হাইস্কুলে শিক্ষকদের প্রমিত ভাষা শিক্ষার উপর বিশেষ ট্রেনিং দেয়া হয়। জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাথমিক স্তরে প্রমিত শুদ্ধ উচ্চারণকে বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানে, শিক্ষা কার্যক্রমের সর্বস্তরে
বাংলা ভাষার শিক্ষা কার্যক্রমের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এতো কথার প্রেক্ষিতে বলা যায়, একটি দেশের প্রমিত ভাষাও যে একটা জাতিকে নানাভাবে একতায় সমন্বিত করতে পারে; এতে করে আমরা একটি দেশ তথা রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী শক্তির স্বরূপ ও সম্ভাবনার মর্মার্থ ধরতে পারি। একটি ভাষাকে প্রমিত করণের মাধ্যমে তার মান এবং উঁচুতা সম্পর্কেও বুঝতে পারি। বাংলাদেশে যতো জেলা, উপজেলা পাড়া গ্রাম বা মহল্লা আছে, সেই সব জায়গার ভাষার শব্দ, বাক্য, মুখভঙ্গি বা ইশারা যে কতো শব্দবৈচিত্র এবং ইমেজ তৈরি করতে পারে সত্যি অভাবনীয়। এই ভাষার মাধ্যমেই শুধু একটি অঞ্চলের জীবন যাপন—
সুখ-দু:খ-কষ্ট-বেদনা-দারিদ্র্য বা মৃত্তিকালগ্ন অভিজাত রূপগুলো ফোটে ওঠে অনায়াসে।

একটি অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া, ভূগোল মানুষের ভাষার আবেগ ও আচরণের উপর অনেক বড়ো একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যেমন রুক্ষ্ম অঞ্চলের মানুষের আচরণ হয়, কিছুটা রুক্ষ্ন বা অবস্থাভেদে অনেকাংশে বেশি রুক্ষ্ম। আবার যে অঞ্চলের আবহাওয়া ও জলবায়ু ঠাণ্ডা বা কোমল, সেখানকার মানুষের আচরণও কিছুটা কোমল বা অনেকটা কোমল। আবহাওয়া, জলবায়ু, মাটির আর্দ্রতা আর শুষ্কতাভেদে মানুষের আচরণের ভাষাও কমবেশি রুক্ষ্ন, শান্ত বা কোমল প্রকৃতির হয়। সর্বোপরি এই ভাষা-ই আপন ছন্দে গতিময় হয়ে নতুন নতুন ধ্বনি-শব্দ-বচনকে গ্রহণ করে উদ্ভাবনের অন্তর্গত ইশারাকে উস্কে দেয়। এটি একটি দেশ তথা রাষ্ট্রের ভাষাগত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে (বহু অনুষঙ্গ বা উপসর্গ তৈরিসহ) সমৃদ্ধ করে।

পৃথিবীর কোন শব্দভাণ্ডারে, সেই ভাষার মূল শব্দ উৎপাদনে ইংরেজিসহ পাশ্চাত্যের কোনো ভাষাতেই উত্তরাধিকারের স্মৃতি নেই। অথচ বাংলা ভাষা এমন একটি ভাষা তার হাতে শব্দ উৎপাদনের সেই স্মৃতির উত্তরাধিকার আছে; যে ভাষায় সব ধরনের শব্দ, বাক্য, ধ্বনি, ইশারাসহ বিশাল একটি সমন্বিত শক্তি রয়েছে। বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক ও গবেষক কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী’
মনে করেন—‘যে ভাষায় সবরকমের শব্দসম্ভার রয়েছে এবং সেগুলির ব্যবহারও জনসাধারণ্যে প্রচলিত রয়েছে, সেই ভাষাই সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে সম্পদশালী, সর্বাধিক ‘প্রকৃত-সম্পদ’-এর অধিকারী’। তথ্য: [কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী’র যৌথ প্রকাশিত ’বাংলা বাঁচলে সভ্যতা বাঁচবে’ গ্রন্থ’র ‘বাংলা ভাষার সম্পদ কোথায়’ প্রবন্ধ]। উভয়ের ভাষ্যে সারমর্ম হিসেবে বলতে পারি একটি দেশের শুদ্ধ বা প্রমিত ভাষার অনেক বড়ো উৎস বা শক্তি লৌকিক ভাষা। যা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার গ্রাম-পাড়া মহল্লার ধ্বনি,শব্দ বা বাক্যের নানা বৈচিত্র্যে সংরক্ষিত আছে।

ব্যাকরণের তাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় অথবা উল্লিখিত গবেষকদের উদাহরণ থেকে বুঝতে পারি, এই ভাষা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। একটি দেশের মান ভাষার সাথে অনেক বড়ো প্রভাবক হিসেবে কাজ করে সেই দেশের লোকাল ভাষা। সেই ভাষার ধ্বনি, শব্দ, বাক্য, নানা ভঙ্গি ইশারাসহ নানাবিধ (অন্যতম) অনুসঙ্গ। এর সাথে জড়িয়ে আছে, ভূগোল, গাছপালা, লতাপাতা, নিসর্গ-প্রকৃতি, নদ-নদী, খাল-বিল, ছড়া-জলা-জংলা-শ্যাওলা-শালুক-পদ্মপাতাসহ (সবধরনের প্রাকৃতিক অনুসঙ্গ বা উপায়) বহুবিধ সৌর্ন্দয বা নান্দনিকতা।

হাজার বছরের বাংলা নিয়ে একটু পেছনের দিকে তাকালেই বিভিন্ন মনিষী-পণ্ডিতের লেখায় এর আরো কিছু সত্যতা আমরা অনুধাবন করতে পারি। যেমন—সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর মতে, ‘বাংলা’ এই নামের সঙ্গে বাংলার নদ নদী জড়িয়ে আছে- ‘আল’ শব্দের মধ্যে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। এছাড়াও ওয়াকিল আহমদ এর মতে, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানব সংস্কৃতির তিনটি স্তর—বন্যাবস্থা, বর্বর অবস্থা ও সভ্য অবস্থা’। মো: জাহাঙ্গির সম্পাদিত ‘জাতীয়তাবাদ বিতর্ক’ সংকলিত লেখা থেকেও কিছু তথ্যসূত্র বা ধারণার সামান্য চুম্বকাংশ যেমন—…আমাদের জাতীয় বিকাশ আজও শেষ হয়ে যায় নি। জাতীয় বিকাশের প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়ে গেলেও তা সম্পূর্ণ হয়ে যায় নি আজও। আজকের পরিস্থিতি এই প্রক্রিয়া সম্পাদনের কাজ ভবিষ্যত বিকাশের পথ বেছে নেবার প্রশ্নের সাথে সরাসরি যুক্ত। রাষ্ট্রীয় তাপমাত্রা স্বাধীনতার পর লক্ষ্য হিসাবে ঘোষিত হয়েছিল। সেই লক্ষ্যের বাস্তবায়নের ভিতর দিয়েই সম্ভব জাতীয় সংহতি। এর কোন বিকল্প নেই। অন্য পথ অনুসরণ করা গেলে তা জাতীয়তার ভিত্তিমূলই দুর্বল হবে। সুতরাং এ থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি, একটি দেশ তথা রাষ্ট্রের বিকাশমানতায়, শুধু নির্দিষ্ট কোন অনুসঙ্গই জড়িত নয়। তার সাথে জড়িয়ে আছে তথ্য, তত্ত্ব ও একটি জনপদ থেকে শুরু করে জলবায়ু, ভূগোল, আবহাওয়া-আবহ ইত্যাদি। এমনকি আপাত দৃষ্টিতে ঠুনকো! এমন বস্তুগত এবং অবস্তুগত বিষয়ও অনিবার্যভাবে এর সাথে জড়িয়ে যায়।

তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলা প্রচলন আইন চালু হয়েছে। সরকারি দাপ্তরিক জায়গাগুলোতে সরকারি নথিপত্র, চিঠি, প্রজ্ঞাপনসহ কিছু বিষয় এখন বাংলায় করা হচ্ছে। আগের ইংরেজি এবং সরকারি ওয়েবসাইট গুলোতেও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং আপাতভাবে প্রমিত বাংলার আন্দোলন বা বিপ্লবের পক্ষে এটা আমাদের জন্য আশার বাণী বা সংবাদ হতে পারে। কারণ এই প্রমিত বাংলায় কথা বলার শক্তি অর্জন করা মানে, আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষার শৌর্য, মর্যাদা আর মহিমাকে রক্ষা করা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের একাত্মতায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালনে সচেষ্ট থাকা।

এবার বাংলা প্রমিত রূপের কিছু উদাহরণে, আমাদের যাপিত প্র্যাকটিসের মধ্য থেকে মোটাদাগে একটি এক্সাম্পল তুলে ধরতে চাই। বাংলা ব্যাকরণে আমরা বাক্যের আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি আর যোগ্যতা সর্ম্পকে জানি; যেখানে এর সঠিক ব্যবহার সুন্দর করে দেয়া আছে। আমরা কোন শব্দ, ধ্বনি, ইশারা বা বাক্য নিয়ে পারস্পরিক ভাব বিনিময় করি। যেমন, আমরা দুধের গুণাগুণ বা খাটিত্ব প্রমাণে বলে থাকি, গরুর খাঁটি দুধ। অনেক সময় আমরা এ কে খাঁটি গরুর দুধ বলি। যা ব্যাকরণগত ভুল। হাইস্কুল বা উচ্চ বিদ্যালয় প্রমাণে, আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় না বলে অনেকসময় উচ্চআদর্শ বিদ্যালয় বলি। এভাবে ভাঙতি হয়ে যায় বাঙতি, ফ্যামিলি হয়ে যায় প্যামিলি, ফ্যাশন হয়ে যায় প্যাশন! অনেকে এর সঠিক বানানটি জানেন, কিন্তু উচ্চারণে (মহাপ্রাণ ও অল্পপ্রাণ ধ্বনি) গিয়ে লোকাল বা আঞ্চলিক টোনে বিষয়টাকে গুলিয়ে ফেলেন! ফলে দেখা যায় একটার জায়গায় আরেকটার উচ্চারণে, শব্দের অর্থও চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং রাস্তা-ঘাটে, অফিসে, দোকানে, ঝুপড়ি গলি, চিলেকোঠার সারি, অন্ধগলির চিপাচাপা যেখানে যাই না কেনো একটা না একটা ভুলের সমাহার আমাদের চোখে পড়ে। যেমন- এখানে ময়লা ফেলবেন, না ফেলিলে একশো টাকা জরিমানা। ব্যবহারে ভংশের পরিচয় হবে? না ব্যবহারে বংশের পরিচয়? এভাবে ভুল বানান, ভুল বাক্য এবং ভুল বিরামচিহ্নের ব্যবহারে ছেয়ে গেছে পুরো বাংলাদেশের (প্রত্যন্ত জেলা উপজেলা গঞ্জগ্রাম) সর্বত্র। এমন অমার্জনীয় অনেক ভুলের ভেতরে দেখছি, আমাদের প্রাণের প্রিয় বাংলা ভাষার দিব্যি যথেচ্ছ ব্যবহার! সবচেয়ে দু:খজনক হচ্ছে বহুতল বা হাইরাইজ বিল্ডিং, মার্কেট, শিল্পএলাকা, দোকান, শপিংমল বা ফ্যাক্টরিতে ইংরেজি নামের যথেচ্ছ ছড়াছড়ি। ইংরেজি তে লেখা সাইনবোর্ডে আমার কোন আপত্তি নেই। আপত্তি সেই জায়গায় যেখানে ইংরেজি লেখাকে বড়ো করে বাংলাকে ছোট করে দৈন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়। এখন সময় এসেছে বাঙালির এ জাতীয় সংকীর্ণ বা হীনম্মন্যতার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়ার। প্রয়োজনে সময়োপযোগী কোন স্টাইল বা ফন্ট চেঞ্জ হতে পারে। তবুও যেনো মূল ভূমিকায় বাংলা প্রাধান্যতা পায় বা বাংলা-ই আরাধ্য থাকে। (চলবে)

লেখক : কবি-প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

আজিজ কাজলের করোনা পরবর্তী বিশ্ব ধারাবাহিক পর্বের অন্যান্য পর্ব পড়তে ক্লিক করুন
করোনা পরবর্তী বিশ্ব : কেমন হতে পারে
করোনা পরবর্তী বিশ্ব : বিজ্ঞান ও দেশযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব : মাছে-ভাতে বাংলা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব: মাছে-ভাতে বাংলা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব : মাছে-ভাতে বাংলা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব : বাগধারা, প্রবাদ, প্রবচন ও খনাযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব: বাগধারা, প্রবাদ, প্রবচন ও খনাযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব: বাগধারা, প্রবাদ, প্রবচন ও খনাযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব : পুরাণ ও কিংবদন্তিযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব: বাংলা নববর্ষ ও ঋতুযোগ
করোনা পরবর্তী বিশ্ব: বাংলা নববর্ষ ও ঋতুযোগ

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।