করোনা পরবর্তী বিশ্ব: মুক্তিযুদ্ধ, প্রজন্ম ও আদর্শযোগ-১

আজিজ কাজল 

সময় হয়েছে মূলে ফেরার। আমরা একটি দেশ পেয়েছি। সমানভাবে তেমনি একটি রাষ্ট্রও পেতে চাই; মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী আত্মপরিচয়ের সংকট এখনো কাটেনি। বাঙালি জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য অবশ্যই লজ্জার। সুতরাং বস্তুগত-অবস্তুগত কিছু আরাধ্য বিষয়ের দিকেও আমাদের চোখ ফেরাতে হবে। ফিরতে হবে সোনালু অতীত ইতিহাসের দিকে। এখান থেকেই বের করতে হবে আমাদের মূল এবং শেকড়কে।

বাঙালির রক্তের মধ্যেই আছে দ্বিচারিতা। আছে দ্বান্দ্বিক গুণ। এটা ইতিহাস সত্য। একমাত্র সুশিক্ষায় পারে একটা জাতির মজ্জাগত রক্তদোষকে ভাল গুণে প্রশমিত করতে। সুশিক্ষার ধারালো ক্ষমতায় নেতিবাচকতাকে ইতিবাচকতায় পরিণত করতে হবে। আমাদের বড়ো একটা দুর্বল দিক হলো আত্মবিশ্বাসের সাথে শাদাকে শাদা বলতে না পারা। কালোকে কালো বলতে না পারা। মানসিকতায় কতো সংকীর্ণ হলে আমরা এমন আচরণ করতে পারি।

আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সোনালু মূল্যবোধের অন্তর্নিহিত অস্তিত্বের বিষয়গুলো বিলীন করতে বিশাল ষড়যন্ত্র মহিরুহ আকার ধারণ করছিলো। মোটামুটি ৪৭ থেকে শুরু করে ৫২, ৫৪, ৬৬, ৬৭, ৬৯, ৭০ এর বিভিন্ন স্তর এবং ঘটনাবহুল নানা আন্দোলনের ফলে বাঙালি যে বিশাল মহাকাব্য রচনা করেছিলো, সেই মহাকাব্যের নাম হলো মুক্তিযুদ্ধ। এভাবেই এক সাগর তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি; এই আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার মহিমাকে আরো গৌরবান্বিত করার লক্ষে তরুণ প্রজন্ম, তারুণ্য-সম্ভাবনা ও বাঙালি জাতির পথপ্রদর্শককে মেনে নেয়ার অনিবার্য বাস্তবতা বিষয়ে মূলত-কথার আলো ফেলতে চাই।

বলছিলাম জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর কথা। বঙ্গবন্ধু এমন একজন কালজয়ী পুরুষ যিনি একটি দেশকাল, ভূগোল পেরিয়ে, একটি ভূখণ্ডই শুধু নন।পুরো বিশ্ব-ইতিহাসের শিক্ষা ও দৃষ্টান্ত—একটা জাতিকে একত্রীকরণের বড়ো মহাকর্তা। সুতরাং ৭১ এর ৭ ই মার্চের ভাষণের ধ্রুপদী ধ্বনি—দেশ, রাষ্ট্র ও কাল পেরিয়ে পুরো বিশ্বকালের বড়ো এক মহা স্লোগান। বড়ো একটি ইতিহাস। উল্লেখযোগ্য তথ্য কোড বা লেখনিতে এর মমার্থ যেভাবে পাই—‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বাঙালি
যেন হঠাৎ করে তার হাজার বছরের জড়তা, দৈন্য
ও গ্লানি অতিক্রম করে এক মহাচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজন্ম সাধনার ধন, আজন্ম-অধরা স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদাত্ত দীক্ষা পেল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি বিক্ষিপ্তভাবে জাগার চেস্টা করলেও তা পূর্ণতা পায়নি। ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাংলাদেশের সাতকোটি মানুষকে ধর্ম বর্ণ শ্রেণি, বিত্তবৈভবের বিভাজন নির্বিশেষে
মহান ঐক্যে জাগ্রত করলেন তাঁর ভাষণের মাধ্যমে।এই মহাভাষণের পটভূমি তিনিই তৈরি করেছিলেন তার দীর্ঘ তেইশ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে…'[‘৭ ই
মার্চের ভাষণ: বিশ্ব-ইতিহাসের স্বাধীনতার
শ্রেষ্ঠ ভাষণ’- অনুপম সেন।] এছাড়াও—’মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চার কোটি বাঙালি নির্মাণ
করিতেছিলেন, সেখানে হঠাৎ দুই একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।”-[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ‘রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড)-সুলভ বিশ্বভারতী]। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে এই মহামূল্যায়ন যেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান এর পক্ষে হুবহু মিলে যায়। দারুণ এই অমূল্য বচন। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হেগেল বলেন—’প্রত্যেক সত্তার যৌক্তিক পরিণতি হলো স্বাধীনতার মধ্যে দিয়ে তার অর্ন্তনিহিত সম্ভাবনাকে পূর্ণতা-দেওয়া’… সুতরাং বাঙালি
জাতির এই মহান নেতাও ৭ ই মার্চের অমূল্য অগ্নিভাষণে— তার অন্তর্নিহিত সত্তা এবং চেতনাকে
এক নতুন সম্ভাবনায় উস্কে দিয়েছিলেন।

ভারতবর্ষে এমনিতেই কোন জীবন দর্শন ওভাবে দাঁড়ায় নি। ইউরোপের ইতিহাসে প্রাচীনকাল থেকে দর্শন চর্চা আর ধর্ম সাধনার মধ্যে সুস্পষ্ট কিছু প্রভেদ আছে; অথচ আমাদের নেই। আমাদের এখানে সেটা স্পষ্ট বা ক্লিয়ার নয়। এতোসব ভাঙন, অপূর্ণতা আর বিভেদের মধ্য দিয়েই আমরা অনেকগুলো শাসন আর শোষণের কালাকাল পেরিয়ে গেছি। এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দাঁড়িয়ে আছি এমন একটা ক্লান্তি লগ্নে—আমরা সঠিক ভাবে নিজেদের বুঝার বা নিজেদের চেনার জায়গাটিকে অস্পষ্ট রেখে।

অবস্তুগত বিষয়ের পাশাপাশি বস্তুগত বিষয়ের মধ্যে থেকেও খুঁজতে হবে, আমাদের বাঙালি মিথ ও কিংবদন্তীর শৌর্যকে। বাংলার আনাচে কানাচে রয়েছে নিজস্ব কিছু সরল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বস্তুগত এসব সৌন্দর্য ও সংস্কৃতি এবং আমাদের আচরণের সৌন্দর্য ও সংস্কৃতি আমাদের অনুধাবন করতে হবে। আমাদের এমন নিজস্ব কিছু সুন্দর বা অনন্য সরল নান্দনিক জিনিস আছে, যা অন্যদেশের প্রকৃতি বা ভূগোলের সাথে খুব একটা মেলে না।আমাদের পলিময় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের যথেষ্ট ফার্টিলিটি বা উর্বরা শক্তি আছে। এটাও অন্যতম কারণ। আমাদের ভূ-প্রকৃতি, পলিময় আর্দ্র বাতাস, সব কিছু মিলে মাটির গঠন বা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে গেছে আলাদা রূপ ও চিহ্ন। বাইরের অন্যদের সাথে অনেক কিছু মিললেও চোখের সৌন্দর্যের বা দেখার সৌন্দর্যে তাদেরটা আমাদের মতো করে এতো প্রাণবন্ত ও স্বতস্ফূর্ত হয়ে ধরা দেয় না। কেননা আমাদের দেহকাঠামোতেই নিংড়ে আছে নিজ দেশের আবহাওয়া, মাটি, জল ও বাতাসের সমষ্টি। আমাদের চোখ রাঙিয়ে ওঠে, একেবারে নিজস্ব কিছু বিষয়—নিসর্গ প্রকৃতি, গাছপালা-লতাপাতা, ঝোপ-ঝাঁড় মায়া আর ছায়ার দিকে। একটা আদর্শ গ্রামের দিকে। একটা গোয়াল ঘরের দিকে। একটা নান্দনিক খড়ের গম্বুজের দিকে। শতো সবুজ শাকপাতার লাবণ্য বা ভাদাম লতার ঝাঁকের দিকে। ক্ষেতখোলার সৌন্দর্য বা ঘাস-বিচালীর দিকে। পরিবেশ বান্ধব গরুর গোবরের জ্বালানির দিকে। কলসভরা দুধের কারিগর, গোয়ালা-গোয়ালিনীর দিকে। এক পেয়ালা মাটির ভাণ্ড ভরা আদর্শ দুধের দিকে। কলস ভরা খেজুর রসের দিকে। বাঙালির শত শত নিজস্ব পিঠাপুলি তথা দুগ্ধজাত মজাদার রসনার দিকে। পেট মোটা বড় মটকা বা জালার দিকে। গ্রামে গঞ্জে ঘটা করে আয়োজন করা কোন মেজবান বা ভরপুর বিয়ের আয়োজন, মহোৎসবের দিকে। বলেন তো? কোথায় পাই না এরকম হাজারো চমকপ্রদ বাঙালি কড়চা? রান্নার পাঁচালী, রুপকথার কড়চা-মড়চা! কোন স্থাপথ্য বা দালান ঘরবাড়ি করবেন তো সবুজকে বাদ দিয়ে মোটেই নয়। যা করার সবুজকে রেখেই করতে হবে।পরিকল্পিতভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায় মাথায় রেখে করতে হবে। আমাদের ইতিহাস বা রক্ত মাংসই বলে, আমাদের পূর্ব পুরুষ কেমন ছিলেন, কেমন তাদের ইতিহাস। সুতরাং অযথা বাড়তি কৃত্রিমতা থেকে সবসময় নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। সময়ের খাতিরে যতোটুকু দরকার ঠিক ক ততটুকুই নিজের মধ্যে ধারণ করুন। শুধু বাইরের নিসর্গ প্রকৃতির কথাও আমি এখানে বলছি না। বলছি নিজের শারীরিক-প্রকৃতি বা স্বাস্থ্য-প্রকৃতির কথাও। শরীরে যেমন অতিরিক্ত প্রসাধনী খুবই ক্ষতিকর। এটা আপনার জীবন শক্তি, যৌবন শক্তি কমিয়ে আপনাকে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে নিয়ে যাবে; তেমনি নিজের দেশ, মাটি, নিসর্গ-প্রকৃতি এবং নিজের শারিরীক প্রকৃতির সাথেও নিজের আচরণের দিকটা লক্ষ রাখুন। বেশি আর্টিফিশিয়াল বা আর্টিফিশিয়ালিজম খুবই ক্ষতিকর।

আমরা যারা শহুরে বা আধা-শহুরে মানুষ। জীবন যাপনের তাগিদে যারা শহরে আছি বা শহরমুখী। সবাইকে বিষয়গুলো অনুধাবন করতে হবে। আমরা এখনো চেতনে-অবচেতনে, অস্তিমজ্জায় একখণ্ড সবুজ গ্রামকে সবসময় হৃদয়ে ধারণ করি। অনেকসময় নিজে দেখতে না পেলেও সেটা হৃদয়ে অনুভব করছি। বিভিন্ন ডিভাইস, টেলিভিশন, মোবাইল, ক্যালেন্ডার, বইপত্র, ম্যাগাজিন থেকেও দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন মিডিয়ায় সবুজ নিয়ে সুন্দর বিজ্ঞাপন, ফটোগ্রাফি থেকেও নানা কল্পনায় নানা দৃশ্যকল্প নিজের মতো ধারণ করছি। অনুধাবন করছি। তেমনি একটা জাতিকে উল্লেখিত (বস্তুগত আর অবস্তুগত) বিষয়ের মৌলিক দিকগুলো নিয়েই সামনের দিকে এগুতে হবে। ফিরতে হবে হাজার বছরের বাঙালি ইতিহাসের জীবন পরম্পরার দিকে। বাঙালি মহা মনিষী-পণ্ডিত-তাপস, মহামানব, নেতা—বাঙালির জাতিগত আত্মপরিচয়ের আইকন হিসেবে, অনিবার্য ভাবে নিজেদের সামনে আনতে হবে।

এখন আমার, আপনার, বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ের জেনারেশন বা প্রজন্মের দায় কি? তরুণ সমাজকে আলাদা করতে চাই; কেননা যুগে যুগে এদের হাত দিয়েই এসেছে কতো সোনালী বিপ্লব। কতো বিনির্মাণ। আর তারুণ্য? এই শব্দটিও আলাদা করে চিহ্নিত করার গুরুত্ব অনুধাবন করছি—কারণ একজন অশীতিপর বৃদ্ধও তারুণ্যকে ধারণ করতে পারেন। লালন করতে পারেন। সুতরাং যার যার জায়গা থেকে কমবেশি সমানে এটা অনেকেরই দায়। তরুণদের শারীরিক শক্তির ভেতরেই যদি এই ধ্রুপদি তারুণ্য থাকে, তাহলেতো আর কথাই নেই! সুতরাং আবারো বলতে চাই, বাঙালি জাতির মহান নেতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর কথা। বঙ্গবন্ধু এমন একজন কালজয়ী পুরুষ; যার বীরত্বগাথা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। শুধু ৭-ই মার্চের ভাষণের তেজোদীপ্ত অশ্ববাক শক্তি—সরবে পুরো একটা মহাকাণ্ডই ঘটিয়ে ফেলেছে!

অনেক দেশ আছে। যাদের ধর্ম ও ভাষা এক, কিন্তু এক জাতি নয়। বাঙালিরা এমন একটি জাতি, ধর্ম বর্ণ নিবির্শেষে যেখানে রয়েছে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান। বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা, এমন একজন মহান পুরুষ, যিনি ৭ ই মার্চের সেই উত্তাল ভাষণেই— জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, শাসনতন্ত্রের এই চারটি মূল স্তম্ভের অনন্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সেই ভাষণে, অনুভূতিময় (অন্তর্নিহিত) সুন্দর ব্যাখ্যা আছে। সুতরাং একটা জাতিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার একটি আদর্শ। সেই আদর্শের নাম শেখ মুজিব। (চলমান…)

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক এবং শিক্ষক

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।