নিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

করোনা পরবর্তী বিশ্ব: লোক গান ও লোককথা-২

আজিজ কাজল 

“আউল বাউল লালনের দেশে মাইকেল জ্যাকসন আইলোরে আরে সবার মাথা খাইলোরে”… শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠে গাওয়া এই গান [১৯৮৬ তে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ঢাকা-৮৬’র একটি গান] একসময় বাংলাদেশ বেতার ছায়াছবির গানের আসরে প্রচুর শুনা যেতো। বিশ্বসংস্কৃতির সমান্তরালে বাংলা সংস্কৃতিতে মাইকেল যখন জুরালো ভূমিকা পালন করতে শুরু করলো, বাংলা সংস্কৃতি ডুবতে বসেছে বলে সুধীমহলের অনেকের কাছে বড়ো আক্ষেপ ছিলো। আমাদের সংস্কৃতি তবুও পারে নি বাইরের এই জ্যাকসনকে অস্বীকার করতে। বিশ্ব-মুলুক ছাড়িয়ে বাংলা মূলুকের আনাচে কানাচে এখনো ছড়িয়ে আছে মাইকেল জ্যাকসনের ভক্ত। ঝালমুড়ি, ভাঙারি, পান-সিগারেটের ক্ষুদে পেশা থেকে শুরু করে কেতাদুরস্ত স্মার্ট পেশার মানুষ পর্যন্ত সবাই জ্যাকসনকে (তার ভিন্ন রকম উপস্থাপনাকে বাংলার লোকজ গান, স্টাইল, ভঙ্গির আদলে) সমন্বয় করে নিজের পেশাকে অন্যরকম লাভের উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মাইকেল জ্যাকসনের মতো বিশ্ব সংস্কৃতির এমন কিছু নক্ষত্র, উজ্জ্বল প্রদীপকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই পৃথিবীবাসীর। কালজয়ী মার্কস, সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও চার্লস ডারউইনকে যেমন অস্বীকার করা যাবে না। সময়ের চেয়ে এগিয়ে এই মানুষেরা, নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তি এবং উপলব্ধিকে পুরো বিশ্ব-মানুষের চিরন্তন অনুভূতি, সংবেদন, চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যের সাথে মিলিয়ে নিতে পেরেছিলেন। এখানেই তারা সেরা। এখানেই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব।

১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন এর “অরিজিন অব স্পিসিস” প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিবর্তন তত্ত্বে নতুন চিন্তা পুরো বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলো।ঠিক এরপরেই ১৮৬১ সালে আমরা পেয়েছি—আন্তর্জাতিক চেতনাবোধ সম্পন্ন বিশ্বজয়ী বাঙালি প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি উপনিষদ এর মধ্য দিয়ে পাক-ভারত উপমহাদেশের (বস্তুগত চেতনা, অধ্যাত্ম, আধ্যাত্মসহ) স্পিরিচুয়ালিজমকে অস্বীকার করতে পারেন নি। এবং রোমান্টিকতায় রবীন্দ্রনাথ নানা প্রকরণে ইউরোপীয় রোমান্টিসিজম (রোমান্টিক আন্দোলন) এর অন্যতম এক্টিভিস্ট ওইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং এস টি কোলরিজসহ অনেকের দ্বারাও প্রভাবিত ছিলেন। বিষয়গুলো বলার আলাদা কারণ হলো ম্যাটেরিয়ালিজম (ইউরোপের আলোকিত বস্তুবাদ ও যান্ত্রিক জীবনের সাথে মিলিয়ে যে ম্যাটেরিয়ালিজম) আর স্পিরিচুয়ালিজমকে (প্রাচ্যের অধ্যাত্ম আর আধ্যাত্মের সাথে মিলিয়ে যে স্পিরিচুয়ালিজম) বুঝার জন্য। অর্থাৎ এতকিছুর মাঝেও কেউ তার ঘরের আঙিনা, পরিবেশ-পরিপার্শ্ব কে অস্বীকার করতে পারেন নি। হুমায়ুন আজাদ যেমন “আধুনিক বাংলা কবিতা”র উল্লেখযোগ্য সংকলনে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়েও যেমন তাকে এড়িয়ে যেতে পারেন নি। অনেক লেখায় তিনি নানা প্রকরণে রবীন্দ্রনাথ এর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তিরিশের ধী-সম্পন্ন শক্তিশালী প্রতিনিধি পঞ্চপাণ্ডব’র বেলায়ও যা সত্য। রবীন্দ্রনাথ তার জীবদ্দশায় লোক সাহিত্য, লোক গান, এবং লোকজ ধারার প্রতিও প্রবল আগ্রহী ছিলেন। সুধীমহলে লালন এবং হাসন রজা তার কল্যাণে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। এবং রবীন্দ্র সঙ্গীতসহ দেশাত্ববোধক অনেক গানেও তিনি ভাটি-বাংলার লোকজ আবহকে ধারণ করেছেন।

আমাদের বঙ্গে ইউরোপীয় কেতাদুরস্ত সাহিত্যের ভাণ্ড যখন আলগা করি, তখন পল্লীকবি জসীম উদ্ দীন কে আমরা অস্বীকার করি। শিল্পসাহিত্যে তার অবদানকে খাটো করে দেখি। “জালি লাউয়ের ডগার মতো বাহু দু’খান সরু,গা খানি তার শাওন মাসের যেমন তমাল তরু” বাংলার সবুজ কচিশ্রেষ্ঠ এমন লাউয়ের সবুজ বর্ণনা কী অসাধারণ! এই একটা লাইন থেকেই তৈরি হতে পারে গাঁওবান্ধব কতো সুন্দর কবিতা। এই মানসিক দৈন্য থেকেইতো আমরা আদর্শ পল্লীগ্রামকে অজপাড়া গাঁ বলে তাচ্ছিল্য করি। জসীম উদ্ দীনের কবিতায় পুঁথি সাহিত্য, লোককথা এবং লোক সঙ্গীতের প্রভাব ছিলো। বিশেষ করে কবিতার উপমা-উৎপ্রেক্ষাগুলো তিনি সবুজ ধানের সামান্য দুলুনি থেকেও বুনতে পারতেন। যার অস্তিমজ্জায় ছিলো সরল নিসর্গ-প্রভাবিত গ্রাম বাংলার অকৃত্রিম রূপ।

সাহিত্যে যখন রবীন্দ্র যুগ এবং নাগরিক সাহিত্যের দাপট চলমান, তখন এর সম্পূর্ণ বিপরীতে আরেকটি ধারাও কিন্তু সজীব ও চলমান ছিলো। যেটি সম্পূর্ণ ভূমিলগ্ন। সৃজনে মননে কেতাদুরস্ত সাহিত্যের চেয়ে এটি কম ঋদ্ধ ছিলো না। এমন শক্তিশালী প্রতিনিধিত্বশীল শিল্পীদের অন্যতম হলেন হরিচরণ আচার্য, মুকুন্দ দাস, রমেশ শীল, নিবারণ পণ্ডিতসহ অনেকে। ক্রমান্বয়ে এই মৃন্ময় অথচ ধী-পথে হেঁটেছেন আসকর আলী পণ্ডিত, রাধা রমণ, উকিল মুন্সী, জালাল উদ্দীন খাঁ, বিনয় বাঁশী, ফণী বড়ুয়া, এম এন আখতার, কুদ্দুস বয়াতী, কাঙ্গালিনী সুফিয়া, মমতাজ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, শেফালী ঘোষ, কল্যাণী ঘোষ, আব্দুল গফুর হালী, সৈয়দ মহিউদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম আজাদসহ আরো অনেকেই। ময়মনসিংহ গীতিকার অনেকগুলো পালা, কিংবদন্তি ও লোক কাহিনীর সাথে চট্টগ্রামের ভেলুয়া সুন্দরী পালা কে যেমন আমরা ঠিকই। সামগ্রীকভাবে মিলিয়ে নিতে পারি। সময় পরম্পরায় উল্লেখিত শিল্পী ও কারিগরদের বেলাতেও যা সমূহ সত্য বলে প্রতীয়মান করা যায়। কেউ গানে, কেউ সুরে, কেউ কথার ধ্রুপদি শক্তিতে একেকজন (কালের নিরিখে তাদের সময়ে তারা) একেকটা চিহ্ন বা দাগ লাগিয়ে দিয়েছেন। তাদের উৎপাদিত সুর, স্বর, শব্দব্রহ্ম’র উৎস এতই গভীরে প্রোথিত যে এদের বৈচিত্র্যায়নকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত লোকগান, লোকধ্যান, লোক কথা, লোক চিন্তার সৃজন ও মননের বিশাল ভাণ্ডারে, (লালন, হাছন, শাহ আব্দুল করিমের মতো বড়ো ফিগারের পাশাপাশি) এই মেধাবী শিল্পীদেরও প্রত্যেকটি জায়গায় রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। উল্লেখিত আর্টিস্টের মূলভাব কে আশ্রয় করে বাংলার আনাচে কানাচে বিভিন্ন ধারার আঞ্চলিক তথা লোকগান, লোক কথার বাজার এখনো সর্বত্র বিরাজমান।

নাগরিক অভিজাত শিক্ষিতের হাতে উল্লেখিত শিল্পী মহোদয়গণ কবি হিসেবে স্বীকৃতি পান নি। এবং নিজেদের হীনম্মন্যতায় তাদের কবি না বলে কবিওয়ালা/কবিয়াল দিয়ে এখনো ওয়ালা বা আল্ প্রত্যয় ব্যবহার করা হয়। তাদের প্রতি এমন অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য বিষয়ে যতীন সরকার এর প্রবল আত্মবিশ্বাসী আক্ষেপ ও বচনটি যথার্থ বলেই মনে হয়। তিনি বলেছেন—“আসলে শিক্ষিত নাগরিক মানুষেরা সহজে তাদের শিক্ষাভিমান ত্যাগ করতে পারে না, এক ধরনের উন্নাসিক ও উঁচু কপালে মনোবৃত্তির বৃত্তাবদ্ধ হয়ে থাকতেই তারা স্বস্তি বোধ করেন। তাদের পরিমণ্ডলের বাইরেকার মানুষদের কৃতিকে যখন স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন, তখনো নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার প্রাণপন চেষ্টা তারা করে যান”। যতীন সরকার, “বাংলা কবিতার মূলধারা ও নজরুল” গ্রন্থ’র ‘বাংলা কবিতার মূলধারা ও জালাল উদ্দীন খা’ গদ্য থেকে”]। এ বিষয়ে আরেকটি আক্ষেপ বা উদাহরণ আমি নিজেও যোগ করতে চাই। আমাদের লালনসহ অনেক বড়ো শিল্পীদের কৃতি ও সৃষ্টি-বৈচিত্র্য বিষয়ে জানার জন্য সুদূর বাইরের দেশ থেকে অনেক ভ্রমণ পিপাসু, কবি, লেখক শিক্ষার্থী বাংলাদেশে এসেছে, আসছে। তারা আমাদের হাঁটে, মাঠে ঘাটে যাচ্ছে।

কৃষক সমাজের সাথে মিশছে। লালনের মানবিক দর্শন কে বুঝার চেষ্টা করছে। তার মরমী দর্শন কে বহুমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করছে, গবেষণা করছে, পি এইচ ডি করছে। আর আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সামান্য ডিগ্রিধারী (তথাগত শিং গজালেই) হলেই নিজেকে মাটি থেকে আলগা করে ফেলি। আগ্রাসী পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থাপনায়, এটাই এখন আমাদের ধর্ম। শৈশবের খেলার সাথী, ধাত্রী মা, পড়শী-স্বজন, দুধ মাতা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষটিকে অবজ্ঞা করার একটা যোগ্যতা মোটামুটি আয়ত্ত করে ফেলি। যা মোটেই কাম্য নয়। অথচ আমরা বুঝি না প্রকৃত মানুষ হিসেবে এখানেই আমাদের বড়ো পরাজয়।

আমরা ঘরের কর্ম কাজের লোক দিয়ে করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বিশ্বের মানুষেরা এতো অর্থবিত্তের মালিক হওয়া সত্ত্বেও নিজের কাজ নিজেরা করতেই বেশি অভ্যস্ত। ফলে এই কায়িক শ্রম তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক সুস্থ রাখে। ভালো রাখে। আত্মবিশ্বাসী করে। আমাদের মতো কার্বোহাইড্রেট প্রধান খাবারে অভ্যস্ত বড়ো ভুঁড়িওয়ালাও তারা নয়। এ বিষয়ে সামান্য ভাবার বা উপলব্ধির ভ্রক্ষেপটুকু পর্যন্ত আমাদের নেই। আমাদের সীমাহীন দৈন্য এখানে। তেমনি বলা বলা যায়, নিজের সুন্দর
ও সৌন্দর্যের চেয়ে বহিরাগত সুন্দর ও সৌন্দর্য আমাদের কাছে বড়ো। এছাড়াও ঘোর আলস্য, আরামপ্রিয়তা, পরচর্চা, পরনির্ভরতাও নিজেকে চেনার পথকে রুদ্ধ করেছে। বহিরাগত কেউ যখন আমাদের মূল্যায়ন করে, তখনই নিজের সুন্দরের গুরুত্ব বেড়ে যায়। তখনই পাশের ঘরের মানুষ এবং আঙিনাটি আমার কাছে ফর্সা ও সুন্দর হয়ে ওঠে। উল্লেখিত লোক শিল্পী, লোক গান, লোক কথার বেলাতেও যা সত্য।

বাউল ধারার ইমেজ এবং আবহে-যেমন নগরে এসে নগর বাউল হয়েছে। এবং অনেকেই নাগরিক মেজাজ কে ধারণ করে নিজের শেকড়, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে মেলানোর চেষ্টা করছেন। যা ইতিবাচক বলা যায়। তাই বাউলিপনা শতো রঙে থাকলেও মাটিজাত সংস্কৃতির এই কাণ্ড উপড়ে ফেলা কোনোমতেই সম্ভব নয়। তার ভেতরের রস ঠিক। ই মাটির সাথে মিশে থাকে। বাংলার লোকগান এবং লোক কথার ক্ষেত্রেও যা সত্য।

এক পল্লীকবি জসীম উদ্ দীন মাঝখানে ছিলো বলেই জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদ, ওমর আলীসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কবি কে আমরা আলাদা স্বরে চিহ্নিত করতে পারি। উল্লেখিত কবিগণ তাদের নিজস্বতা দিয়ে বাংলা কবিতার লোকজ ধারাকে নানা শব্দে, বাক্যে, ফর্মে ভেঙেছেন। তাদের ভাষার স্মার্টনেস ও নিজস্ব আইডেনটিটি রচনায় জসীম উদ্ দীনকে বড়ো সহায়ক শক্তি হিসেবে পাওয়া যায়। (চলবে…)

 

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক এবং শিক্ষক