কামরুল বাহার আরিফের কবিতা

শোষক

তুমি শুধু রোদ হয়ে প্রতিদিন শুকে নাও
এ শরীরময়,
আমি তো কখনো চাই, চাঁদ হয়ে ফিরে এসে
হও প্রেমময়,
আমি তো কখনো ভাবি আদ্র মেঘের ভেলা
আসুক ফিরে ফিরে, কোনো জলজ খেলায়,
পোড়া যাতনায়।
তবু শুধু সূর্যেরই রূপ হয়ে কেনো সে
আমাকে পোড়ায়?
আমি কি পাথর এক, জল জানি না?
জেনে নাও, আমি এক মেঘ-নদি জলের মানব,
তুমি তবে চৈত্রের খরতাপ রোদের দানব।
শুকে যাও, শুষে নাও শুধু…

অদৃশ্যের উষ্ণ প্রস্রবন

ধরে নেই, প্রেম আরো গাঢ় হলো
দু’টি নয়, এক কাপেই সঙ্গী হলো দু’জনে দু’জন
এক পাশে লাল ঠোঁট জোড়া চুম্বন
আর পাশে অদৃশ্যের শ্বেত চুম্বন
এক হলো, নিঃশ্বাসের উষ্ণ প্রস্রবন।

ধরে নেই, দৃশ্যটা জনম জনম
একই ধোয়ায় মিশে গেলো দু’জনে দু’জন
এক কাপে দু’হৃদয় এক হলো জনম জনম।

তরুণীদের কাছে লিপিবদ্ধ কথা
উৎসর্গ : আমার কন্যা, আমার বোন, আমার মা তনুদের

দেখি, রাত দশটায় দুই তরুণী ত্রস্ত পায়ে হেঁটে চলেছে
মাঝে মাঝেই পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে
চোখে মুখে ভয়ের স্পষ্ট ছাপ হাজার বছরের
এটা কোনো জঙ্গল নয়, এখানে বাঘ নেই,
ভল্লুক নেই, নেই কোনো সরিসৃপ অজগরও;
এমন কি কোনো ধূর্ত শেয়ালও নেই।
রাস্তার ল্যম্পপোস্টের বাতিগুলো আলো দিচ্ছে যথারীতি
তবুও আলোহীন ভীষণ অন্ধকার!
রাস্তায় অনেক মানুষ পায়ে পায়ে কিংবা বাহনযন্ত্রে, তবে ভয় কিসে?
এরই মধ্যে তরুণীরা জেনেছে পুরুষেরা প্রেম জানে,
কাপুরুষেরা জানে শুধু খুবলে খেতে জানোয়ার রূপে।
তরুণীদের চারপাশে পুরুষ নেই, যারা তাদের আগলে রেখে
প্রেম ও ভালোবাসার নিরাপত্তা হবে।

নারী তো পুরুষেরই হাত ধরে হাঁটতে চায় ভয়হীন নগরে
কাপুরুষে ঠাসা এমন জঙ্গলে কার হাত ধ’রে নারী
প্রেম দিবে, প্রেম নিবে নিরবধি?
সে ছুটছে আর্ত আকুল ত্রস্ত পায়ে!
আমরা যে পুরুষ দেখি, তারা দেখে পুরুষ ও কাপুরুষ উভয়ই
তরুণীদের কাছে এ কথাই লিপিবদ্ধ যুগ থেকে যুগে এমনই।

ঈশ্বরীর প্রেমে দোষ নেই

তোমার ঠোঁট থেকে এই মাত্র দু’ফোঁটা অমৃত
গড়িয়ে প’ড়ে স্তনবৃন্তে এসে থেমে গেলো। অমনি
তোমার স্তন এক ঐশ্বরিক সুধায় পরিনত হলো;
তুমি হয়ে গেলে স্তনদাত্রী– এক ঈশ্বরী।
কাম ও ক্ষুধার ঊর্ধ্বে তুমি অনন্যা হয়ে গেলে!

তুমি তখনও চেয়ে আছো আমার চোখের দিকে
আমিও তোমার স্তন থেকে চোখ তুলে
ডুবে গেলাম তোমার চোখের দীঘিতে।
তোমার চোখ আরো গভীরের স্বচ্ছ নদীতে
রূপান্তরিত হলে,
আমি আজীবনের সাঁতারু হতে চাইলাম।
তুমিও টেনে নিলে সেই নদী জলের ঢেউ সঙ্গমে,
তারপর অবিরাম সাঁতার কাটছি তোমার ঢেউনদীতে।
অতঃপর সাঁতারের ক্লান্তি থেকে আমাকে টেনে নিয়ে
তোমার বুকের অমৃত সুধা পান করালে!
আমি আবারও সেই ঈশ্বরীর চোখের নদীতে
সাঁতারে মগ্ন হলাম।

জেনে গেলাম, ঈশ্বরীর প্রেম ও সুধাপানে কোনো দোষ নেই।


প্রেমহীনে ফেরে না প্রেম

পেছনের পাহাড়েরা আকাশের চোখকে ঢেকে দিয়ে
ছায়া হয়ে, মায়া হয়ে, ভরসার দেবী দুর্গা হয়ে
আমাকে বলে যায়, সামনে সাগর তোমার,
তুমি শুধু সাগরের প্রেম, প্রেম-মন্থন
ছুঁয়ে দাও, ছুঁয়ে দেখো, করো যত সুখ রোমন্থন।
চারিদিকে রাবনের অগ্নিতীক্ষè তীরচোখ ঢেকে দিয়ে
কালের কালব্যাপী আমারই সাথী যতো, প্রেমের পর্যটকে
পাহাড়েরা সাগরকে করে দেয় প্রেমের চারণ।

এই পাহাড়েরা আমাকে করেছিল সাগরের জুড়ি
আমিও সাগরের প্রেমে গড়েছি বুকে এক প্রেমেরপুরি।
পাহাড়কে কেটে কেটে যারা করো খুন,
সাগরে জ¦ালিয়ে দিয়েছে যারা প্রেমের চিতা
তারা সব রাবণের জুড়ি।
জেনে রাখো, পাহাড়টা পুড়ে যদি হয়ে যায় সাফ
সে আগুনে পুড়ে যদি সাগরটা দেয় অভিশাপ
তবে পরিযায়ী পাখি হয়ে উড়ে যাবো জীবন ওপার,
প্রেমহীন সাগরের অগ্নিচিতায় কে ফেরে, ফিরবো না আর।

ইচ্ছা কিবা অনিচ্ছা

রঙের প্রসার সামনে নিয়ে রঙতুলিতে
যে ফুলটা আঁকতে গিয়ে এঁকেছি যে ফুল
তা কি ছিল নিছক ভুলে ভুল?

কিংবা কোনো সাদা পাখির উড়াল ডানা আঁকবো বলেই
রঙ-তুলিতে আঁচড় দিলাম; আঁকা শেষে দেখি এ-কী!
এঁকেছি এক হরিষ মুখের রঙহীনা বুলবুল!

কূলের কাছে নদীর জলের কী কামনা;
কোন যাতনায় আছড়ে পড়ে স্বমেহে ঐ কূলের বুকে
পাঁজর ভাঙা কান্না নিয়ে, সে কোন কুলের কূল হারা কুল?

জল প্রবাহে রঙ থাকে না জলের জলজ ভেলা
আমার চোখের রঙ নিয়ে যায় নিত্য অবহেলা।
ভুলের নদী, উড়াল ডানা, প্রেমের গোলাপ ফুল
আমার রঙে হোক না তারা ইচ্ছা কিবা অনিচ্ছারই ভুল!

বন্ধু, ঘুমিয়ে পড়ো না

ঘুমিয়ে পড়ো না মান্ডেলা
চেয়ে দেখো সমস্ত পৃথিবী আজ তোমার
জোহান্সবার্গ প্রিটোরিয়া
দেখো এখানে ভেদাভেদ নেই বৃটিশরাজ থেকে
বাংলার সাঁওতাল মারমায়।
যেহেতু উপাসনালয়গুলোয় বিভক্ত সৃষ্টিকর্তা
তাই একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী যারা, তারাও কেমন
নিজ নিজ সৃষ্টিকর্তার উপাসনায় মগ্ন।
রহস্যের বিভক্তিতে সৃষ্টিকর্তা তাই বহুবচন!
সৃষ্টির সাম্রাজ্যে তাই ভালোবাসাও বহুবচন ও আপেক্ষিক
এই বহুবচন সৃষ্টিকর্তাদের কোনো তত্ত্বাবধায়ক নেই!
বন্ধু, তুমি কিন্তু আজ বিভক্ত নও…
একই আকাশ থেকে যে ভালোবাসার
বৃষ্টি তুমি ঝরিয়েছিলে তাতে ভিজেছে
সব মানবিক মানুষেরা।
বন্ধু, ঘুমিয়ে পড়ো না আজ
এখনে নিরন্তর বয়ে যাওয়া বাতাসে
তোমার আদ্র নিঃশ্বাস থিরিথিরি কাঁপে
ভালোবাসার পৃথিবীর ঘরে।

অনধিকার

বড় বেশি গভীরে যেতে নেই।
হাঁটতে হাঁটতে বড়জোর বেলাভূম পার হওয়া যায়;
জেনে রাখো, দ্রাঘিমা পার হতে নেই।
বেশি কিছু লিখতে নেই।
লিখতে লিখতে পাতা পেরোতেও নেই।
হাতের দু’একটি রেখায় এঁকেবেঁকে নিতে পারো চোখ;
তার বেশি নয়।
জ্যোতিষবিদ্যায় রেখো ভয়।
পূজার প্রসূন থাক দেবীর বেদীতে;
মাথা খুঁটে মরো না সেই সমাধিতে।

বেশি মাখামাখি ভালো নয় মোটেও
জলটুকু জল থাক শুধু;
মুদ্রার ওপারে বাজে, ভুলের নিক্কন ধু ধু।
বেশি গভীরে যায় না আলো
জেনে রাখো, আলোর গভীরেও আঁধার কালো
ভালো বাসতে বাসতে বড়জোর মরে যাওয়া যায়
বেঁচে থেকে থেকে ভালোবাসা হয় না পূরণ
খুব বেশি হলে, মৃত্যু মৃত্যু ছায়ায়
দ্রাঘিমায় পৌঁছানো যায়।

(রাইজিং কক্স/ কেআ/০৮ আগস্ট ২০২০)

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।