খালেদ মাহবুব মোর্শেদ : স্বপ্ন-শুশুকের ঘর

হাফিজ রশিদ খান
ও অন্ধজলের শিশমহলের ভেতর থেকে মুখ তুলে আকাশের চোখে-চোখে ক্ষণিক কথা বলে। চরের টাইলসে এসে গা এলিয়ে মানুষের গান শুনে আহ্লাদে। তারপর ডুব দিয়ে ফিরে যায়।
আহা মানুষ, তোমার দুখে কাঁদি আমি। আমাকে চেন না, তুমি!
এই শুশুকের ঘর সাগরধারে। খালেদ মাহবুব মোর্শেদ নাম তার। ওর কবিতা, ওর জীবনের কথা যখনই ভাবি আমি একটি অমল-ধবল শুশুকের মুখ ভেসে ওঠে আমার মনের আরশিজুড়ে। ওই শুশুকের কথা কেউ বলে না, তবে ও বলে :

বৃক্ষদের কোনো ভাষা দিলে না গো দয়াল বিধাতা!

যৌনবতী ফুলকালে বিষপেরেকের গান বাজে অহোরাত্রি
দ্রিমিকি দ্রিমিকি
দ্রিমিকি দ্রিমিকি
দ্রিম দ্রিম
সর্বগায়ে ব্যথা পুরে বেচারী বিরিক্ষ ব্যাধিগ্রস্ত, ক্ষতময়

রাজা সুলেমানের দোহাই
রানি বিলকিস আর হুদহুদ পাখির দোহাই
কেবল একদিনের মতো বৃক্ষদের ভাষা দাও দয়াল হে

রঙবেরঙের মনোলোভা ইশতেহারের টীকাভাষ্যসহ সকল গাছের সমন্বিত হাহাকারে অনর্থ আগ্রাসী মুখ
দেখি কোথায় পালায়!
(পেরেকবেঁধা বৃক্ষ, আয়নাজোড়া অন্ধকার, পৃ. ৩০)

দুই

২০০৯-এর শেষদিকে কক্সবাজার শহর হয়ে মহেশখালী চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সপরিবার পৌঁছুই তিন কবির পাহারায় ওই দ্বীপ উপজেলায়। তাঁরা হলেন : প্রয়াত মাসউদ শাফি, নিলয় রফিক, কালাম আজাদ। দূর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন কবি আলম তৌহিদ। সোনালি ভোরে জলযানে আমরা যাচ্ছি কন্দর্পকান্তি তরুণকবি আলম সৈয়দের ডেরায়। ওখানেই শিক্ষকতার অভিকেন্দ্র নির্মাণ করে অবস্থান খালেদ মোর্শদেরও। ও আমাকে আলাদা করে মহাদেবের চাতালে বসালে ঢিঢি পড়ে যায়। অর্ঘ্যের দৌলতে ঋদ্ধ হই আর হয়ে উঠি অভিমানী আদিনাথ। হৃদয়তন্ত্রের উল্লাসের অনুভবে আমি যেন শূন্য থেকে শূন্যতর হয়ে মিশে যাই অন্তরিক্ষে।
মোর্শেদ ওর কবিতার মতোই সান্দ্র, অধিকৃত তালুকবিষয়ে সামন্ত-সচেতন। ওর মর্জি এসেছে কুতুবদিয়ার সিলিকন থেকে। আলি আকবর ডেইলের হলুদ-শাদা ডেইজিফুলের গুলবাগ থেকে।
অতঃপর সদলে আমরা একটি দিঘির পাড় ধরে হাঁটি। দিঘির ধারে বৃক্ষশোভিত ছায়ালু মাটির মাদুরে মনে হলো বসে আছেন শিষ্যপরিবৃত এক ঋষি। তিনি জাহেদ সরওয়ার–‘নীল দানবীর চোখ’ খ্যাত গল্পকার আর রাগী দর্শনচারী। তাঁর গাত্রোত্থানকালে শিষ্যগণ ত্বরিত তাঁর ডান-বামে ব্যূহরচনা করে। আমরাও দাঁড়িয়ে শুনি তাঁর বাণী উতল নোনা হাওয়ায়, উসকোখুসকো চুলের ঝাউয়ে।

তিন

খালেদ মাহবুব মোর্শেদ কবিতায় নিজস্ব ঢক উপস্থাপন করেছেন নগর-নারায়ণগণের থেকে বহুদূরে বসে। উপমা- অনুপ্রাসের নয়াবয়নে তাকে, ওই তো চেনা যায়। কবি ময়ুখ চৌধুরীও ধরিয়ে দিয়েছেন তা : ‘তাঁর যেকোনো কবিতা চোখে পড়লেই আমি তা পড়ে নিয়েছি। আমার মন বলেছে, তিনি মনোযোগ্য কবি। একাধিক কারণে একাধিক কবি থেকে তিনি আলাদা। স্বতন্ত্র পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন বলে নয়, প্রকাশভঙ্গির অনাবিলতাই তাঁকে আলাদা করেছে।’
তাঁর কাব্য : নির্বাণে বিনীত কাঁটা (২০০০), আয়নাজোড়া অন্ধকার (২০০৩), সম্পন্ন সাম্পান (২০১২), মহাপ্লাবনের পলি (২০১৬)।
মোর্শেদের গদ্যও সাবলীল। গহিন রাইতে নীল আসমানের চাঁদের মতো। এই অধমেরে নিয়ে কুতুবদিয়ার কুটিরে বসে তাঁর স্বগতোক্তি : ‘বস্তুত তিনি আদিবাসীদের কবিতা লিখছেন বাংলা ভাষায়। ঙাপ্পি বা সাবারাঙের তরকারি দিয়ে ভরপেট খেয়ে দাবা বা ছিবদাঙের কড়া ঘ্রাণ হাওয়ায় ছড়াতে-ছড়াতে নেমে যাচ্ছেন জুমখেতে। টংঘরে আলো জ্বেলে নিঝুম রাতে পাহারা দিচ্ছেন জুমের ফসল। শীতসূর্যের উষ্ণতা পিঠে নিয়ে শুনছেন রাখাইন পিঠাবুড়ির হাঁক, ‘রে ফ্রি সা মু… ‘
(‘বাংলা কবিতার নতুন আকাশ’; নতুনধারা, পৃ. ৯৫, এপ্রিল ২০১৩, ঢাকা)

৩০/৮/২০২০
দক্ষিণ শুলকবহর চট্টগ্রাম

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।