গল্প

ছোটগল্প: তারা টোকাই নয়, দায়িত্ববান শিশু 

মাহদী হাসান রিয়াদ

মাহদী হাসান রিয়াদ : ভোররাত। চারদিক কুয়াশাচ্ছন্ন। ওজু করে মসজিদে যাচ্ছি। ফজর হতে খানিক দেরি আছে। ল্যাম্পোস্টের নিছে পড়ে আছে একটি সাদা বস্তা৷ পাশে ময়লার স্তুপ। ওই স্তুপে শহরের আবর্জনা ফেলানো হয়৷ দেখলাম একজন বারো-তেরো বছরের কিশোর বোতল কুড়িয়ে ওই সাদা বস্তায় জমাচ্ছে। থমকে দাঁড়ালাম!  এতো রাতে পাগল টাইপের টোকাই আসল কোত্থেকে? এসময় পাগলরাও তো ঘুমায়, সে কি তাহলে আনকমন পাগল? নাকি আনকমন টোকাই? কোনটা আসলে!

নর্দমার অসহ্যনীয় দুর্গন্ধে  আশপাশ ম-ম করছিল। খানিক দাঁড়িয়ে একটু কথা বলার সাহসটুকুও পাচ্ছিলাম না৷ তবুও নাক চেপে ধরে কাছে গেলাম৷ কাছে গিয়ে পাশে দাঁড়ালাম। দুই বস্তা বোতল কুড়িয়ে ক্লান্ত সে। পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটি ছিল। খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসল; ফের বসে বসে ঝিমাচ্ছে। ঘুমের তীব্রতায় চোখ দুটি নিবুনিবু প্রায়। ঢের ক্ষুধার্ত তার চোখ দুটি। ঘুম খাবে।  প্রচুর ঘুম প্রয়োজন। বছর-দুয়েক ঘুমালেও তার  ঘুমের ঘোর কাটবে কিনা সন্দেহ!

পাশে থ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম তার কর্মকাণ্ড। সে সাথে ভাবছিলাম হাজারটা ভাবনা। এইতো, অল্প কিছুদিন আগেও  তার বয়সী ছিলাম আমি; তখন আমার অবস্থা কেমন ছিল? আফসোস!

অবশেষে সে আমার উপস্থিত টের পেলো৷ বুঝতে পারলো তাকে কিছু বলতে চাই, কিছু জানতে চাই তার কাছ থেকে।

-ভাইয়্যা, কিছু বলবেন আমারে?
-না, আপাতত কিছু বলবো না! একসাথে বসে চা- খেতে চাই। খাবা? আমার সাথে একটু যাবা?

বেচারা বস্তাগুলোর দিকে তাকিয়ে হতাশ হল। হয়তো আমার মানসম্মান নিয়ে চিন্তিত সে। কারণ, এই সুশীল সমাজ যে তাকে হীনচোখে দেখে। টোকাইরা যেন ময়লার স্তুপে পড়ে থাকা সামান্য একটি অবহেলিত বোতল মাত্র। কোনো মূল্য নেই তাদের। মূল্য নেই তাদের জীবনের। হয়তো খুচরা একটি দোয়েল মার্কা নোটের মতই  তাদের জীবনের মূল্য। কিংবা এর চেয়েও কম।  তাই আমাদের মত সুশীলদের পাশে বসতে দ্বিধা বোধহয় টোকাইদের।

ছেলেটার চলনবলন দেখে প্রচুর মায়া হচ্ছিল। তার সম্মন্ধে জানার তুমুল ইচ্ছেটা আরো প্রকট আকার ধারণ করল। অবশেষে একটি বস্তা কাঁধে তুলে নিলাম। বললাম আসো; আমার পিছন পিছন আসো। এ কথা শোনার পর তার কমলার কোয়ার মত দুই ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসিরা খেলা করছিল তখন। নির্দ্বিধায় সে পিছুপিছু আসতে লাগল।

পাশে চায়ের দোকান আছে; গন্তব্য সে দোকানের বারান্দা। হেলাল ভাইয়ের দোকান বললে কলাতলিতে এক নামে সবাই চেনে।

এসে পৌঁছালাম। দুইটা চা।সাথে ত্রিশ টাকা দামের একটি ভাল মানের কেক  অর্ডার করলাম। যথাসময়ে নাস্তা হাজির হল টেবিলে। সুযোগটা মিস করা যাবে না, এ ফাঁকে  প্রশ্নগুলো করে নিই৷

– আচ্ছা ছোট ভাই, তোমার নাম কী?
– সাজ্জাদ মাহমুদ।
-বাহ, সুন্দর নাম তো৷ তোমার মতই সুন্দর। অবিকল তোমার মুচকি হাসির মতো মিষ্টি।
– বাড়িতে কে কে আছেন?
– আম্মু। ছোটবোন শরীফা তাবাসসুম। আর ছোটভাই সিফাত মাহমুদ।
-তোমার আব্বু নেই?
-না ভাইয়্যা! আব্বু নেই বলেই তো এতরাতে আপনার সাথে বসে চা- খাওয়ার সুযোগ হয়েছে।
-কেনো? কী হয়েছিল তোমার আব্বুর? আর কেনোই-বা রাত-বিরেতে বোতল কুড়াচ্ছ তুমি?

– ভাইয়্যা, এসব কথা মনে পড়লে ভেতরটা ফেটে যায় আমার; ফেটে চৌচির হয়ে যায়! তাই কাউকে বলি না৷ এসব বলে, বিনামূল্যে একগাদা কষ্ট নেওয়ার ইচ্ছে মোটেও নেই আমার। তবুও আপনাকে বলবো। খুব আপন মনে হচ্ছে। যেনো কাছের কেউ, খুব কাছের।

-আচ্ছা, শুনেন তাহলে। আব্বুর ব্লাড ক্যান্সার ছিল। চার বছর আগে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যাংক মায়ের কোলে আমরা দুইভাই -একবোনকে জমা রেখে, মালিকের ডাকে সাড়া দেন তিনি। বাকি আট-দশটা পরিবারের মতো আমাদের পরিবারেও ছিল অনাবিল সুখ-শান্তি। আমরাও স্কুলে যেতাম।  পাড়ার মাঠে খেলতাম। দিনশেষে বাড়ি এসে বইপত্র নিয়ে বসতাম পড়ার টেবিলে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস,  দুইতিন বছরের ব্যবধানে সবকিছুর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। আমরা হয়ে ওঠালাম পথের ভিখারি! ঋণ হয়েছে অনেক টাকা। পাওনাদাররা প্রতিদিন কড়া নাড়ে। হাজারটা কটুকথা বলতে চুল পরিমাণ দ্বিধাবোধ করে না। তারা যদি পারতো, সম্ভবত আমাদের গোস্ত বিক্রি করে টাকা উসুল করে নিত। অবশ্য এটা করলে আমরাও রক্ষা পেতাম। অনেকদিন হল আব্বুকে দেখি না; এই সুবাদে আব্বুর সাথেও দেখা হয়ে যেত। দুঃখের বিষয়— মানুষের গোস্ত নাকি তিতা, কেউ খাইনা। মূল্য দিয়ে কিনেও না। তাই চরম কষ্টে দিন পোহাতে হচ্ছে। প্রতিদিন হজম করতে হচ্ছে হাজার জনের নানান কথা। নোংরা কথা।  এ কথাগুলো গিলতে গেলে বমি আসে, আফসোস!  বমিও করতে পারি না। ঠিকই পাওনাদারদের কথা শোনতে হয়। শুনেশুনে চোখজলে কপোল ভেজাতে হয়। এখন অবশ্য আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই গলা অবধি তাদের কথা নামেই না৷      

ঋণের ভার কিছুটা কমেছে। আম্মু বাড়িতে সেলাই কাজ করেন। আর আমি রাতদিন বোতল টোকাই। যোহরের পর বীচে গিয়ে বড়লোকদের মাথা টিপে দিই। ভালো বকশিসও পাই। এই হল আমার জীবন। আমার ভাষায় যাকে বলি “জীবন নামে কলঙ্ক!”

ফজরের আজান হলো মাইকে৷ সেসাথে চায়ের কাপও খালি হয়েছে। সাজ্জাদের নির্ঘুম চোখ দু’টি  টগবগে লাল। ঝর্ণার মত অনবরত ঝরছে হৃদয়ে জমে থাকা শতো অব্যক্ত। সেই অব্যক্ত আত্মপ্রকাশ করছে লোনাজল হয়ে। হয়তো আমাদের আশপাশে এরকম হাজারো সাজ্জাদ দুমুঠো অন্নের জন্য দিনরাত যুদ্ধ করে যাচ্ছে নিজের সাথে৷ বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে কাঁদছে নীরবে-নির্জনে বসে৷  সাজ্জাদদের চোখজল মুছে দেওয়ার মতো কেউ কি বেঁচে আছো এই শহরে? বিত্তশালীদের ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত হবে কি কোনোদিন?