নিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

দুই মহান লেখক লিও টলষ্টয় ও আন্তন চেখভের সাক্ষাৎ

লিও টলষ্টয় ও আন্তন চেখভ

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

দুটি ভিন্ন সামাজিক শ্রেনির এবং ভিন্ন দুই প্রজন্মের ছিলেন। তা সত্বেও দুই মহান রুশ লেখক লিও টলষ্টয় (১৮২৮-১৯১০) এবং আন্তন চেখভের (১৮৬০-১৯০৪) মধ্যে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও প্রশংসা। আরেক বিখ্যাত রুশ লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির মতে, ‘চেখভের জন্য টলষ্টয়ের পিতৃসুলভ ভালোবাসা ছিল।”
পেশায় একজন চিকিৎসক হওয়া সত্বেও চেখভ যক্ষা ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের জন্য কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং যক্ষায় ভুগে তিনি টলষ্টয়ের মৃত্যুর ছয় বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯০১ সালে টলষ্টয় যখন গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, তখন চেখভ লিখেন, “টলষ্টয় মারা গেলে আমার জীবনে বিরাট এক শূন্যতার সৃষ্টি হবে।” চেখভের জন্য টলষ্টয়ও তাঁর হৃদয়ে গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন, বিশেষ করে চেখভের রসিকতা, যা তাঁর গল্পগুলোকে প্রাণবন্ত ও রঙিন করে তুলতো। এটি এমন এক বৈশিষ্ট ছিল, যাকে টলষ্টয় একজন লেখকের সেরা গুণ হিসেবে বিবেচনা করতেন।

বিশ্ব সাহিত্যের এই দুই সেরা ব্যক্তিত্বের যখন ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ ঘটে তখন চেখভের বয়স ২৫ বছর এবং টলষ্টয়ের ৬৭ বছর। টলষ্টয় বাস করতেন তাঁর গ্রামে বিশাল এক বাড়িতে, যে বাড়ির নাম ছিল ‘ইয়াসনায়া পলিয়ানা।’ এই বাড়িতে তাঁর জন্মও হয়েছিল। চেখভ বাস করতেন মস্কো থেকে ৪০ মাইল দক্ষিণে মেলিখোভো’তে। চেখভ ও টলষ্টয় উভয়ের বন্ধু আইভান গরবুনোভ-পাসাডোভ এর দ্বারা উৎসাহিত হয়ে চেখভ ১৮৯৫ সালের ৮ আগষ্ট টলষ্টয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশে ট্রেনে ওঠেন। তাদের এ সাক্ষাতের কোনো ছবি না থাকলেও রুশ লেখক আইভান বুনিন তাঁর গ্রন্থ “মেমোরিজ এ- পোট্রেটস” এ এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। ১৯৩৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আইভান বুনিন চেখভের অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। বুনিন তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে একদিন চেখভ তাঁকে বলেন, সমুদ্র সম্পর্কে বর্ণনা করা অত্যন্ত কঠিন এবং তিনি আগ্রহের সাথে বলেন, “আপনি জানেন, সেদিন এক শিশুর নোটবইয়ে আমি সমুদ্র সম্পর্কে কী বর্ণনা পাঠ করেছি? ‘সমুদ্র বিশাল।’ এটুকুই সে লিখেছে, এবং আমার মনে হয়, বর্ণনাটি চমৎকার।”

অল্প সময়ের ট্রেন ভ্রমণের পর চেখভ টলষ্টয়ের বাড়ি পৌঁছলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগত ভি, এ মাকালাভোভকে বলেন চেখভকে তাঁর বাড়ি ‘ইয়াসনায়া পলিয়ানা’ ঘুরিয়ে দেখাতে এবং তিনি তাঁর পাঠকক্ষে অপেক্ষা করেন। নাশতা করার সময় তারা শাখালিন নামে এক কারাদ্বীপ নিয়ে আলোচনা করেন, যেখানে চেখভ গিয়েছিলেন কয়েদিদের বসবাসের অবস্থা তদন্ত করতে।

মধ্যাহ্নভোজের পর টলষ্টয় যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, চেখভ এবং অপর দুই অতিথি শব্দ করে ‘রেসারেকশন’ পাঠ করছিলেন, যে উপন্যাস টলষ্টয় ওই সময়ে লিখছিলেন। বিশ্রাম শেষে ফিরে এসে টলষ্টয় উপন্যাসটির ওপর তাদের মতামত জানতে চাইলে চেখভ যে সমালোচনা করেন টলষ্টয় তাতে মুগ্ধ হন এবং সংশোধন করে নেন। উপন্যাসের নায়িকাকে কারাদ-ে দ-িত করা হয়েছে। শাখালিন কারাগার পরিদর্শনের পর কারাদ-ের সম্ভাব্য মেয়াদ সম্পর্কে যেহেতু চেখভের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেজন্য তিনি টলষ্টয়কে পরামর্শ দেন নায়িকার কারাদ-ের মেয়াদ পরিবর্তন করতে। টলষ্টয় তাঁর তরুণ বন্ধুর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জানান।

এই সাক্ষাতে চেখভকে টলষ্টয় বলেন যে তাঁর পক্ষে অন্ধ হয়ে যাওয়া একজন বৃদ্ধ সৈনিকের জন্য কোনো ধরনের আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব কিনা। চেখভ তাঁকে সাহায্য করতে সম্মত হন এবং মেলিখোভো’র বাড়িতে ফিরে তাঁর ভাই আলেকজা-ারকে এ ব্যাপারে লিখেন, যিনি অন্ধদের জন্য এক ইন্সটিটিউটের পরিচালককে জানতেন, যার পক্ষে বৃদ্ধ সৈনিককে সহায়তা করা সম্ভব।

আইভান বুনিনের মতে চেখভ তাঁকে তাঁর সাক্ষাতের শেষ মুহূর্তের কথা বলেছেন, “আপনি কি জানেন, আমি টলষ্টয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গাসপ্রা গিয়েছিলাম। তিনি এখনো তাঁর বিছানায়, কিন্তু তিনি আমার নিজের প্রসঙ্গসহ সবকিছুর কথা বলেছেন। আমি যখন বিদায় নেয়ার জন্য ওঠে দাঁড়াই, তিনি আমার হাত তাঁর হাতে রেখে বলেন: ‘আমাকে বিদায় চুম্বন করো।’ আমি ঝুঁকে তাঁকে চুম্বন করি এবং তিনি সহসা আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বৃদ্ধ মানুষের শীতল কণ্ঠে বলেন, ‘তুমি কি জানো, আমি এখনো তোমার নাটকের কথা বুঝতে পারি না। শেক্সপিয়র অত্যন্ত বাজেভাবে লিখেছেন, কিন্তু তুমি তাঁর চেয়ে অনেক বেশি বাজে লিখেছো।’”

আমরা কল্পনা করতে পারি যে চেখভ ঘোড়ার পিঠে ওঠে রেলওয়ে ষ্টেশনের দিকে যাচ্ছেন, ঘোড়াকে খোঁচা দিয়ে তাগিদ দিচ্ছেন, যাতে ট্রেন ফেল করে বাড়ি ফিরে আসতে তাঁর বিলম্ব না হয় এবং বিজয়ীর উচ্ছাসে চিৎকার করছেন, “আমি শেক্সপিয়রের চেয়ে বাজে লেখক! আমি শেক্সপিয়রের চেয়ে বাজে লেখক!” যেন তাঁর আনন্দপূর্ণ চিৎকার রাশিয়ার রাতের বিশালতার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে।