পাঠকের কলাম

দেনমোহর নিয়ে আমার কিছু কথা

তরুণ আইনজীবী শফিউল করিম মিঠু। -ফাইল ছবি

-শফিউল করিম মিঠু

আরব দেশের মতো বাঙালী মেয়েরা যদি কাবিননামার পুরো অর্থ উসুল/আদায় করতে যায় তবে বাংলাদেশের কোনো পুরুষ’ই বউয়ের সঙ্গে বাসর করতে পারবে না..!

দশ পনেরো লাখ টাকা কাবিন লেখা হয় কিন্তু এর কয় টাকা স্ত্রীকে নগদ দেওয়া হয়?

আমাদের দেশে সিস্টেম কিরকম জানেন?

ধরুন; পনেরো লাখ টাকা যদি দেনমোহর হয় তাহলে যে পরিমাণ গয়নাগাটি দেওয়া হয় সেটাকে উশুল/আদায় হিসেবে ধরা হয় এবং অবশিষ্টাংশ বাকি বা বিলম্বিত..!!

দেনমোহর দুই প্রকারঃ
১। তাৎক্ষণিক দেনমোহরঃ তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্ত্রীর চাওয়ামাত্র পরিশোধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী তাৎক্ষণিক দেনমোহর না পাওয়া পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে বসবাস (দাম্পত্য মিলন) করতে অস্বীকার করতে পারেন..!!

২। বিলম্বিত দেনমোহরঃ যে দেনমোহর বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক)অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া স্বামী সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রী/স্ত্রীদের দাবিক্রমে বিলম্বিত দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে..!!

দেনমোহরের ক্ষেত্রে একটা বিষয় পরিস্কার যে;কখনোই দেনমোহর মাফ হয় না..!!

এক্ষেত্রে পুরো দেনমোহর পরিশোধ না করা পর্যন্ত যেমন মেয়েটি স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেনা তেমনি তাঁর সাথে বাসর ও শারীরিক সম্পর্কও সম্পূর্ণ হারাম..!!

অনেক কেইস স্টাডিতে দেখা গেছে; বাসর রাতে স্বামী বেশ আবেগে গদ গদ হয়ে ধর্মীয় দোহাই দিয়ে স্ত্রীকে দেনমোহর মাফ করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে! সরলা স্ত্রী ইমোশনালী ব্ল্যাক মেইল্ড হয়ে অবগুণ্ঠনে মুখ লুকিয়ে মাফ করে দিয়েছে বটে কিন্তু তাতে দেনমোহর মাফ হয় না..!!

আমাদের দেশের অধিকাংশ (৮০%) মানুষ’ই জানেনা দেনমোহর কি? কিংবা কেনো দেনমোহর দেওয়া হয়..!!

কামার/চামার/শিক্ষিত/অশিক্ষিত কাউকেই নির্ধারিত দেনমোহরের পুরোটা পরিশোধ করে বিয়ে করতে দেখা যায় না..!!

দেনমোহর কিঃ
দেনমোহর হলো স্ত্রীর প্রতি সম্মানসূচক স্বামীর একটি আবশ্যিক দেনা। মুসলিম আইন অনুযায়ী দেনমোহর হলো কিছু টাকা বা অন্য কোনো সম্পত্তি যা স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে বিয়ের মূল্যস্বরূপ পাওয়ার অধিকারী হয়..।

একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে অধিকার প্রাপ্তিতে প্রথমেই দেনমোহর প্রাপ্তির বিষয়টি চলে আসে..!

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছেঃ
☞ ‘আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রদান করবে, সন্তুষ্ট চিত্তে তারা মোহরের কিয়দংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ করবে।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত-৪)।

☞ ‘হে নবী! আমি তোমার জন্য বৈধ করেছি তোমার স্ত্রীদেরকে, যাদের মোহর তুমি প্রদান করেছো।’ (সুরা আল-আহজাব, আয়াত-৫০)।

দেনমোহর নির্ধারণঃ
স্বামীর যেকোনো অবস্থায়’ই (ধনী/গরীব) স্বামী ন্যূনতম ১০ দিরহাম বা সমপরিমাণ অর্থ অপেক্ষা কম নির্ধারণ করতে পারবেন না। কিংবা স্বামীর আয়ের উপর নির্ভর করে দেনমোহর নির্ধারণ করতে হবে; স্বামী স্বাচ্ছন্দ্যে যেনো তা পরিশোধ করতে পারে। (বায়হাকি শরীফ, ৭/২৪০)

কিন্তু আমাদের দেশে সব উল্টো! এই যেমনঃ
☞ ধারণা ১ঃ যদি ৫০ লাখ টাকা কিংবা অস্বাভাবিক দেন মোহর ঠিক করা হয়, তবে ছেলের পরিবার ঐ টাকা কখনো দিতে পারবে না, তাহলে মেয়েও সুখে থাকবে, কখনো ছেলে ডিভোর্স দিতে পারবে না..!!

☞ ধারণা ২ঃ
আমাদের একটা স্যোশাল স্ট্যাটাস আছে, আমরা কি আমাদের মেয়েকে ৫’লাখ টাকা দেন মোহরে বিয়ে দিতে পারি…?

☞ ধারণা ৩ঃ
বড় মেয়ের বিয়েতে ছেলে পক্ষ ২০ লাখ টাকা দেন- মোহর ঠিক করেছিল। মেজ মেয়ের বিয়েতে ২৫ লাখ টাকা ছিল। তাই ছোট মেয়ের বিয়েতে দেন মোহর ৩০ লাখের কম হবে না..!!

☞ ধারণা ৪ঃ
জব্বার সাহেবের মেয়ের দেন মোহর ছিলো ২০ লাখ টাকা। আমার মেয়ের দেন মোহর এর থেকেও বেশি হওয়া লাগবে। আমি বুঝাতে চাই, আমার মেয়েকে বড় ঘরে বিয়ে দিচ্ছি..!!

☞ ধারণা ৫ঃ
দেন মোহর তো আর দেওয়া লাগে না, একটু বাড়িয়ে ধরলে খারাপ কি? শুনতে ভালো লাগে..!!

কথা হলো; দেনমোহর বেশি হবে কেনো? দেনমোহর নির্ধারণ করা উচিত পাত্রের সামর্থ্যের উপর..!!

অথচ যেটা কন্যাপক্ষ কখনো চিন্তাই করে না। কন্যাপক্ষ বিয়ের কথা বলে পাত্রপক্ষের সাথে, পাত্রের সাথে না। তাই তারা পাত্রের সামর্থ্যও জানতে পারে না..!!

ধরুনঃ
☞ বিশ লাখ টাকার কাবিনামায় পাত্রের মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকা। তাহলে বৈধ পথে স্ত্রীকে ঐ টাকা পরিশোধ করতে স্বামীর কতদিন লাগবে…?

☞ ৩০ লাখ টাকা দেনমোহর এককালীন পরিশোধ করতে অপারগ। পাত্র কিস্তিতে মাসে ১০,০০০ টাকা করে দেনমোহর পরিশোধ করবে। তবে দেনমোহর শোধ করতে পাত্রের কত বছর লাগবে..?

তাহলে বুঝেন; দেনমোহর পরিশোধ না করা পর্যন্ত স্ত্রী হিসেবে পুরোপুরি গণ্য হতে কয় জনম লাগবে? এদিকে অবৈধভাবে শারীরিক সম্পর্ক করে কতটুকু পাপ অর্জন করে যাচ্ছেন..?

স্ত্রীকে দেনমোহর হিসেবে গয়নাগাটি দিয়ে সেটা বিয়ের পরে আবার বিক্রি করে, স্বামী অন্যখাতে ব্যবহার করার কোনো অনুমতিও ইসলাম দেয়নি..!!

কারণ স্ত্রী তাঁর দেনমোহর ব্যবহার করুক বা ফেলে দিক এটা তাঁর ইচ্ছা। এটা তাঁর অধিকার। স্বামী যদি সেটা আবার ভোগ করে তাহলে তো সেটা আর দেনমোহর রইলো না..!!

এছাড়া নারী অথবা পুরুষ যে’ই তালাক দিক না কেনো স্ত্রীকে তার প্রাপ্য দেনমোহর বুঝিয়ে দিতে হবে! স্বামীর মৃত্যুর পরেও এই দেনমোহর পরিশোধ বাধ্যতামূলক..!!

এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পরেও যদি স্ত্রী দাবী করে যে; দেনমোহর পরিশোধ করা হয়নি। তবে স্বামীর জাহান্নাম অবধারিত..!!

রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ
☞ “যে ব্যক্তি কোনো মেয়েকে দেনমোহর দেওয়ার ওয়াদায় বিয়ে করেছে, কিন্তু দেনমোহর দেওয়ার ইচ্ছে নেই, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট ব্যাভিচারী হিসেবে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।”- (মুসনাদে আহমাদ)।

এখন আপনিই বলেন; অনর্থক লোক দেখানো একটা অপরিশোধিত দেনমোহর নির্ধারণ করে হারামভাবে স্ত্রীকে গ্রহণ করবেন; নাকি সারাজীবন মাথায় একটা দায় নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন..?

দেনমোহর ডিভোর্সের সাথে সম্পৃক্ত নয়। ডিভোর্স দিলেও দেনমোহর দিতে হবে; ডিভোর্স না দিলেও দেন- মোহর দিতেই হবে বাধ্যতামূলক! তাছাড়া যে ডিভোর্স দিবার সে ডিভোর্স দিবেই..!!

তাছাড়া ডিভোর্স দিয়ে যদি বলে; সে তো আর স্ত্রী নাই। তাঁকে আবার কিসের দেনমোহর? ভাহে উপরওয়ালা বাংলাদেশী সরকার নয় যে পক্ষপাতীত্ব করবেন..!!

 

লেখক:

শিক্ষানবিশ আইনজীবী,

জজ কোর্ট, চট্টগ্রাম।