কক্সবাজারনিবন্ধরাজনীতিশিল্প ও সাহিত্য

ফিরে দেখা ১৯৭৫: সূর্যের আলপনায় রাঙানো চিঠি

শাহেদ ইকবাল

ডেটলাইন কক্সবাজার, ২২ আগস্ট ১৯৭৫
জনৈক স্কুলশিক্ষক চিঠি লিখছেন সপ্তমশ্রেণী পড়ুয়া পুত্রের কাছে। এই শিক্ষকের নাম গোলাম রহমান। তিনি লিখছেন অন্তিম শয্যা থেকে। তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যান্সার। ডাক্তার বলেছেন, বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সেই অবস্থায় তিনি চিঠিটা লিখছেন। খুবই বিপজ্জনক চিঠি। এতই বিপজ্জনক যে চিঠির শেষ পৃষ্ঠায় ছোট ছোট অক্ষরে লিখে দিয়েছেন, ‘চিঠিটা সাবধানে রেখো।’
তারপর?
তারপর পঁয়তাল্লিশ বছর কেটে গেছে। প্রতি বছরই আগস্ট আসে। আগস্ট এলেই সেই কিশোর মনে মনে চিঠিটার উত্তর লেখে। কথার মালা সাজায়। কল্পনার খামে ভরে কল্পনার ডাকবাক্সে ফেলে দেয়। জীবন নদীর ওপার থেকে বাবা নিশ্চয়ই সেই চিঠি পেয়েও যান। প্রিয়জন যেমন হারায় না, প্রিয় চিঠিও নিশ্চয়ই হারায় না কখনও।

আজকে যারা নতুন প্রজন্ম, তাঁরা হয়তো ইতিহাস পড়বেন, হয়তো অন্যের মুখে শুনবেন, কিন্তু কখনও পুরোপুরি অনুভব করতে পারবেন না কেমন ছিল সেই দিনগুলো; কেন বাবা এই কথাগুলো লিখেছিলেন। চাক্ষুস দেখা আর অন্যের কাছ থেকে শোনা কি কখনও এক হতে পারে?

ডেটলাইন কক্সবাজার ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
দিনটা ছিল মেঘলা। সূর্য উঠেছে, কিন্তু মনে হচ্ছে ওঠেনি। আকাশে ঝলমলে রোদ নেই। ঘুম ভাঙার পরেও শুয়ে ছিলাম বিছানায়। কেউ একজন রেডিওটা অন করলো। কি আশ্চর্য! স্বাভাবিক কোনো অনুষ্ঠান নেই। অনুষ্ঠানসূচি নেই। মাসের আজ কত তারিখ, কোন্ বার তারও উল্লেখ নেই! বলা নেই কওয়া নেই কর্কশ কুৎসিত কণ্ঠে কেউ একজন এসব কি বলছে? রেডিও কি নষ্ট হয়ে গেছে? এটা কি পরীক্ষামূলক সম্প্রচার?

দেখতে দেখতে বাড়িতে আরও লোকজন এসে জড়ো হলো। সবারই মনে একই প্রশ্নঃ এসব কি হচ্ছে? এসব কি বলছে রেডিওতে? কে এই ঘোষক?

তখনও সেই কুৎসিত কণ্ঠ বেজেই চলেছে। সেই কণ্ঠ থেকে জানা যাচ্ছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শাহাদাত বরণ করেছেন। খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে একদল দুষ্কৃতকারী দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে।

শ্বাসরুদ্ধকর একটি দিন কাটলো। থমথমে রাত নামলো। আবার ভোর হলো। সারাদেশে জরুরি অবস্থা, সামরিক আইন। রাস্তায় রাস্তায় মিলিটারি টহল। নিয়ন্ত্রিত যান চলাচল। রেডিও-টিভিতে প্রতি ঘণ্টার বিশেষ বুলেটিন। সেইসব বুলেটিনে এই বর্বরতম হত্যাকান্ডের পক্ষে নির্লজ্জ ওকালতি।

কিছু মানুষ পাল্লা দিয়ে নেমে পড়লো ভোল পাল্টানোর প্রতিযোগিতায়। স্বজন হয়ে গেল দুর্জন, প্রিয়জন হলো ঘাতক। ফুলের বদলে বিষ, মধুর বদলে হেমলক নিয়ে কেউ কেউ হাঁটতে শুরু করলো। বঙ্গবন্ধু যাদের আপন জানতেন, বিশ্বাস করতেন, তারাই হলো বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক।

তখন আমার কতই বা বয়স? সপ্তমশ্রেণীতে পড়ি। বঙ্গবন্ধু-তনয় শেখ রাসেলের যে বয়স, আমারও সেই বয়স। যা দেখি, যা শুনি, অকপটে বিশ্বাস করার বয়স। সেই আমি স্তব্ধ বিস্ময়ে দেখছি রেডিও-টিভির বদলে যাওয়া, দৈনিক পত্রিকার বদলে যাওয়া, পাঠ্যসূচির বদলে যাওয়া, কিছু মানুষের বদলে যাওয়া। দেখে দেখে বিস্ময়াভিভুত হচ্ছি। কোনটা সত্য? গতকাল পর্যন্ত যা শুনেছি, তা সত্য, নাকি আজ যা শুনছি তা সত্য?

আমার যখন এই অবস্থা, তখন একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। এরচেয়ে অদ্ভুত, এরচেয়ে সুন্দর ঘটনা আমার জীবনে আর কখনও ঘটেছে বলে মনে পড়ে না। বাবা ছিলেন অন্তিম শয্যায়। শরীরে মরণব্যাধি ক্যান্সার। ডাক্তার বলে দিয়েছেন বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সেই রোগশয্যা থেকেই বাবা একটি চিঠি লিখলেন। ডাকযোগে নয়, লোক মারফত। আমাদের গৃহশিক্ষক ছিলেন জহিরুল আলম। তাঁর মাধ্যমে চিঠিটা প্রাপকের কাছে পৌঁছালেন। চিঠির শেষ পৃষ্ঠায় ছোট ছোট অক্ষরে লিখে দিলেন, ‘চিঠিটা সাবধানে রেখো।’

কী ছিল সেই চিঠিতে?

সেই চিঠিতে ছিল সাতদিন আগে ঘটে যাওয়া সেই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার। ছিল বিচার পাওয়ার প্রবল আকুতি। আরও ছিল কারবালার বিয়োগান্তক হত্যাকান্ডের সাথে এই হত্যাকান্ডের তুলনা, যা আমার কিশোর-মনোজগতকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায়।

চিঠিটা শুরু হয়েছিল এভাবে, ‘তুমি চলে গেলে সোমবারে। বৃহষ্পতিবারেই ঘটলো সেই কলঙ্কজনক ঘটনা, যার তুলনা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিরল।’ চিঠি শেষ হয়েছিল এই আশাবাদ নিয়ে-‘আজ হোক কাল হোক এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবেই ইনশাআল্লাহ।’

সপ্তম শ্রেণীর সেই কিশোরের জীবনে ওই পত্রই ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে কারও লেখা প্রথম প্রতিবাদ, প্রথম দিকনির্দেশনা।

পত্রটি এমন এক সময়ে লেখা, যখন দেশে শ্বাসরুদ্ধকর বৈরী পরিস্থিতি। শহরজুড়ে জরুরি অবস্থা-সামরিক আইন। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রেডিও-টিভিতে হত্যাকান্ডের পক্ষে নির্লজ্জ ওকালতি। আমজনতা কিংকর্তব্যবিমুঢ়, দিকভ্রান্ত, সংশয়গ্রস্ত। সাহস যাদের থাকার কথা, তারাও অধিকাংশই যেন হয়ে গেছেন অনুভূতিশূন্য।

আজ চারিদিকে কত আলো! কিন্তু সেদিনের সেই ঘোর অমানিশায়, সেই নিকষ অন্ধকারে, যখন কোথাও কোনো আলো ছিল না, তখন পিতার সেই পত্রই ছিল আমার জীবনে একমাত্র আলো, যা আমাকে দিয়েছিল দুর্জয় সাহসের প্রেরণা। তুমুল ঝড়ের রাতে দিকভ্রান্ত নাবিক যেমন করে পায় বাতিঘরের সন্ধান।

প্রতি বছরই আগস্ট আসে। আগস্ট এলেই আমার জীবনে সেই চিঠিটা ফিরে ফিরে আসে। পিতার শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখ ফিরে আসে।সূর্যের আলপনায় রাঙানো সেই চিঠি আমার চেতনার গভীরে পাতালপুরীর নির্জন হীরার মতো জ্বলতে থাকে। এভাবেই কেটে গেছে দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর।

বাবা আজ নেই। তিনিও হারিয়ে গেছেন। জাগতিক সকল চেষ্টা বিফল করে চলে গেছেন ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন। বাবা বলেছিলেন,আজ হোক কাল হোক এই হত্যাকান্ডের বিচার হবেই। সেই ভবিষ্যদ্বাণীও সত্য হয়েছে। কিন্তু তিনি তা দেখে যেতে পারেননি।

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শন উৎসারিত হয়েছিল গণমানুষের প্রতি অবিচল ভালবাসা ও আস্থা থেকে। তিনি সহজেই মানুষের হৃদস্পন্দন বুঝতে পারতেন। সর্বমানবের দুঃখবেদনা ও অভিলাষ প্রতিধ্বনিত হত তাঁর জীবনদর্শনে। তিনি ছিলেন নীতি ও আদর্শে অটল, লক্ষ্যে অবিচল, ত্যাগ ও অধ্যবসায়ে নিরলস। তিনি ভালোবেসেছিলেন বাংলার মানুষকে। মানুষের ভালোবাসা ছাড়া তাঁর আর কোনো অভিলাষ ছিল না। না রাজ্য না রাজত্ব। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির শুরুতেও ছিল মানুষ, শেষেও ছিল মানুষ। তাঁর রাষ্ট্রদর্শনের কেন্দ্রে ছিল শুধু মানুষ আর মানুষ।

বঙ্গবন্ধু নিশ্চয়ই চির অমর হয়ে থাকবেন সেই গণমানুষের শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়।