বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের জন্ম

মৃধা আলাউদ্দিন
এমন অনেক বই আছে যা আমি এক নিঃশ্বাসে পড়েছি। তার মধ্যে প্রথম যে বইটা পড়েছি, আমি যদি ভুল না করি সেটা হলো কবি ফররুখ আহমদের কবিতার বই ‘সাত সাগরের মাঝি’। যখন আমি লেখালেখি শুরুই করিনি, তখনই কিছুটা বুঝে,কিছুটা না বুঝে পড়ে ফেলেছি এই বই। দ্বিতীয় বই নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেম সাহেব; যা পড়ে আমি কেঁদেছি। দোলা বৌদির মতো আমারও অমন অনেক কষ্ট আছে। তৃতীয় বই কবি আল মাহমুদের ‘কাবিলের বোন’। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’, কবি নজরুলের ‘মৃত্যু ক্ষুধা’ ও রবি ঠাকুরের ‘গোরা’, শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলে ডানা’, শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’সহ এমন আরো অনেক বই আছে যা আমি এক নিঃশ্বাসে পড়েছি। আজ আবারো একটা ঐতিহাসিক বই এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম। বইটি আমাকে দিয়েছেন পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেডের স্বত্বাধিকারি কামরুল হাসান শায়ক। বইটির নাম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের জন্ম’। বইটি ১৯৭০ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রথম জীবনীগ্রন্থ দেশ স্বাধীনের পর বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়েছিল। তবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বইটির আর কোনো হদিস ছিল না। আজ এতো বছর পর পাঞ্জেরী বইটি আবার প্রকাশ করল। এ ঐতিহাসিক বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন হাসান খুরশীদ রুমী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানার জন্য, বোঝার জন্য এ এক অনন্য দলিল। যারা তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী (সুলভ)- শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা- শেখ মুজিবুর রহমান, একুশ একাত্তর ও বঙ্গবন্ধু- সরদার ফজলুল করিম, মহাপুরুষ- এম আর আখতার মুকুল, শেখ মুজিব আমার পিতা- শেখ হাসিনা পড়েছেন- পড়েছেন অন্য বই ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ তারা বইটি গো-গ্রাসে গিলবেন এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
বইটিতে লেখক শেখ মুজিবুর রহমানকে তুলে ধরতে গিয়ে বলেন- শেখ মুজিব একজন বাস্তব উপলদ্ধি ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির মানুষ। তার মধ্যে আছে, অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ এবং সূক্ষ্ম মহত্ববোধ। তিনি সত্যিকার অর্থে ছিলেন দুই প্রজন্মের মাঝেখানের সেতুবন্ধন। নিঃসন্দেহে মুজিব ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতীক ও মূলভিত্তি এবং একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ। শেখ মুজিবের মধ্যে দেশ, দেশের মানুষ ও দলীয় কর্মীদের জন্য এতো প্রগাঢ় ভালোবাসা এসেছে একজন মহান নেতার সংস্পর্শে থেকে, যার নাম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মুজিবের এ দেশ প্রেমে মওলানা ভাসানীরও যথেষ্ট অবদান রয়েছে। বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে শেখ মুজিবের বেশ কিছু অসাধারণ উক্তি। তারমধ্যে একটি- ‘মানুষ মাত্রই মরণশীল। আমি যেহেতু মারাই যাব, তবে কেনো সেটা মানুষের কল্যাণে নয়।’
বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনীগ্রš ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের জন্ম’ বইটির লেখক ব্যারিস্টার কাজী আহমেদ কামালের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গত শতাব্দীর সেই চল্লিশের দশকের শুরুতে, যখন তারা দুজনেই কলকাতার বেকার হোস্টেলে থাকতেন। পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন সংগ্রামের বহু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি তার কাছের ভাইবন্ধু, সহচর হিসেবে পাশে থেকেছেন। কাজী আহমেদ কামাল ছিলেন পূর্ব জার্মানিতে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত।
বইটিতে বারবার ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর শক্তি, সাহস ও বীরত্বের কথা। বঙ্গবন্ধু ছাত্র রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে, ক্রমান্বয়ে পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিবীদে পরিণত হয়েছেন। পরিশ্রম ও দেশের জন্য আত্মত্যাগ ছিল তার নিত্যসঙ্গি। বিরামহীন যুদ্ধ ও সংগ্রামের জীবন ছিল বঙ্গবন্ধুর। তিনি ছিলেন এদেশের একমাত্র নেতা যিনি আইয়ুব খান তথা পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরচারী শাসনের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন। তিনি আইয়ুবের সামরিক আইন কখনো মেনে নেননি।
শেখ মুজিবের প্রতি আইয়ুব খানের প্রচণ্ড ঘৃণা গভর্নর মোনেম খানের মাধ্যমে আসত এবং এই ঘৃণা ছিল নিরেট ও পরিপূর্ণ। শেখ মুজিব ছিলেন আইয়ুবের ক্ষমতার সহজ রাস্তায় একটি কাঁটা। আইয়ুব তাই শেখ মুজিবকে রাজনীতিগতভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে উদ্যত হন। এভাবেই একদিন আইয়ুব মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামের একটা হাস্যকর মামলা দায়ের করেন। স্বৈরাচার আইয়ুব খানের গুপ্তচর গভর্নর মোনেম খান শেখ মুজিবসংক্রান্ত সব প্রতিহিংসা বহন করতেন। আইয়ুবের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের রাজনীতি অপরিবর্তিত রেখে মুজিবকে চিরতরে মুছে ফেলা। এ জন্য মুজিবকে অসংখ্যবার জেলে যেতে হয়েছে। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে ঘটে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। স্বপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
শেখ মুজিবুর রহমান তার ৫৫ বছরের জীবনে ১২ বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। জীবনের অর্ধেক কেটে গেছে তার রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-নিপীড়নে। আইয়ুবীয় চক্রান্তে। মুজিবের পুরো জীবন কেটে গেছে দেশের স্বাধীনতা বিনির্মাণে।
নূর চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম, আবদুল মাজেদ, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ ও এ কে এম মহিউদ্দিনরা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রকাশ্য খুনি। নেপথ্য খুনিদের কাহিনি এ বইটিতে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বারবার বলা হয়েছে আইয়ুবের স্বৈরশাসনের কথা। যিনি উচ্চাভিলাসী সেনাকর্মকর্তা থেকে জোর করে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেন। আমাদের এ সোনার বাংলাকে ধ্বংস করার নীল নকশার তিনি অগ্রনায়ক। যদিও ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে আমরা এ দেশ স্বাধীন করেছি। মুক্ত হয়েছি পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র থেকে। তৎকালীন গভর্নর মোনেম খানের একটি প্রকাশ্য উক্তি- ‘আমি যা যা করতে চেয়েছিলাম, তার সবই করেছি। কিš একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মুজিবকে শেষ করতে পারিনি।’ কাজী আহমেদ কামালের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের জন্ম’ হারিয়ে যাওয়া এ গ্রšটি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের অকাট্য দলিল।
বইটিতে বেশ কিছু বানান ও বাক্য বিভ্রাট রয়েছে। উইপোকা বইটির যৎসামান্য ক্ষতি করলেও আমাদের, বর্তমান বাংলাদেশের জন্য এ এক আকরগ্রš। বইটির দামও আপনার হাতের নাগালে; ১৩ ফর্মা বুক সাইজ এ বইটির দাম মাত্র ৩৮০ টাকা। নান্দনিকতায় ভরা, অসম্ভব সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। আমরা বইটির বহুল প্রচার, প্রসার ও সমৃদ্ধি কামনা করছি। বইটি আপনার সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবে।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।