বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার রেনেসাঁ পুরুষ প্রফেসর মোশতাক আহমদ

মনির ইউসুফ

নোংরা আর বিষ দিয়ে নয়, আমরা বরং মৌচাক ভরে তুলি মধু দিয়ে, মোম দিয়ে। আর এভাবে মানব জাতিকে আমরা দেই মহত্তম দু’টি জিনিস-মিস্টতা আর আলো।
(জোনাথান সুইফট। বইয়ের লড়াই। অনুবাদ : মাহবুুবুল হক)

মানবজন্মের যে চক্র যে পরিক্রমা সে প্রক্রিয়ায় জনাব মোশতাক আহমদ ঢোকে পড়েছেন মহামানব চক্রের প্রবাহমান গতির ভেতর। সে গতি মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় কেউ জানে না। মাটির দেহ পড়ে থাকে মাটিতে আর আত্মা- বিমূর্ত সচলতা, যেটি শব্দের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়; জীবনের বহুমাত্রিক ঘষামজায় ছিন্নভিন্ন হয় এবং আলোপ্রাপ্ত হয়ে জগতের বেদনার ভাষাকে অনুধাবন করে তা কোথায় স্থির হয়, এখনও কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি, এখনও সে এক বড় বিস্ময়! সে বিস্মযের ঘোর কাটে না মানুষের। সভ্যতার অধরা এই অতৃপ্ত জ্ঞানসূধা পান করতে মানুষ ছুটে চলে এই নক্ষত্র নদী সাগর বৃক্ষশোভিত প্রকৃতির শিরায় শিরায়। সেই শিরার প্রাণই হচ্ছে সভ্যতার প্রাণ। কখনও নক্ষত্রের পানে চেয়ে, কখনও জীবনের পানে চেয়ে মানুষ রক্ত মদ নারী নিজেকে পান করে করে গড়ে তুলেছে সভ্যতা। সে একদিনের ব্যাপার না এক যুগেরও না, না কয়েকটি বছরেরও! ঘনায়মান এই পৃথিবী তার মুখের ভাষা থেকে লিখিত ভাষা বুঝিয়ে দিয়েছিলো মানুষের মত ভাষা বুঝতে শেখা, বুঝতে পারা কিছু প্রাকৃতিক প্রাণিকে। তাই বুঝি পৃথিবী টিকে গেছে, মানুষ হয়ে উঠেছে মানুষ আর ঘাতক। নির্বিচারে মানুষ নিজেদের হত্যা করেছে। সে এক পৃথিবী ছিলো তির, তলোয়ার, লৌহা, তামা, দস্তনায়ভরা আর ছিলো নক্ষত্রভরা আকাশ, বৃক্ষশোভিত সবুজ, ঘাসেভরা মৃত্তিকাভূমি। সেই ভূমিজুড়ে চিন্তাশীল ও সৃষ্টিশীল মানুষ জগতকে জানতে চেয়েছে, সে জানতে চাওয়ার বাসনার অপর নামই কি অজ্ঞান? জ্ঞানের পথে ছুটে চলে অজ্ঞানবাজক মানুষ। অনেক দ্বিধার নদী পেরিয়ে অনেক বাঁশের সাঁকো তৈরি করে, মরুবালিতে পা টেনে টেনে, পাহাড়ে উঁচুনিচু পথ পাড়ি দিয়ে, অথৈ সাগর বক্ষে নিয়ে তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে সময়ের সম্মুখ পানে। সে এভাবে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়েছে, গুহাগাত্রে, পাথরে আঁকিবুকি করছে। মনের অনুভূতি থেকে দিয়েছে শিস, সেই শিসধ্বনির অনুভূতি থেকে মুখে হাতে আঙুলের ভেতর দিয়ে যে ধ্বনি প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে তাই এঁকে রেখেছিলো মানুষ। পৃথিবীর সেই মহাজঙ্গমে মানুষই ঘাটে ঘাটে থামিয়েছে জীবন নৌকা। আত্মার কামারশালায় হাঁপর দিয়ে পুড়ে পুড়ে খাঁটি করেছে তার বোধিসত্তা। সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এখনও পুড়ছে মানুষ। সময় মানুষকে রূপান্তরিত করেছে সংকীর্ণ বৈষয়িক স্বার্থপর প্রাণিরূপে। যার জন্য মানুষ তার জ্ঞান বুকে নিয়ে বাসনার অজ্ঞানকে ধরতে পারেনি এখনও, এখনও জ্ঞানের জগতে মানুষ শিশুই রয়ে গেছে। গভীর ক্ষতের মধ্য দিয়ে মানুষ নিজ নিজ সভ্যতাকে নির্মাণ করেছে। আর এই সভ্যতা নির্মাণ করতে প্রথমে টোটেমে টোটেমে গোত্রে গোত্রে পরে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে কত মানুষের মেধা, প্রজ্ঞা, প্রখর বুদ্ধি, চিন্তা, চেতনা, দ্বান্দিকতা, বিজ্ঞান, দর্শন কাজ করেছে। এই বিরাট জগতের তারাই ক্লাসিক মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে সমাদৃত হয়েছে।
মাটির পোশাকের ভেতর যে সচলতা-আত্মা তাকে দিয়েছে জ্ঞানের পোশাক, আলোর পোশাক। পৃথিবীর সভ্যতাগুলো এ রকম বোধিসত্ত সম্পন্ন মানুষ দিয়ে গড়ে উঠেছিলো। কোটি কোটি মানুষের জ্ঞান ও অজ্ঞানে, কামনায়-বাসানায় আজকের এই কাম ও কামনাভোগ্য বসুধা। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতাও এভাবে বহু টর্নেডো বহু ঝড় তুফান যুদ্ধ রক্তের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এক নান্দনিক সভ্যতা। প্রাচীন কাল থেকেই যার পাথর আর পাহাড়কে সইতে হয়েছে নানা সভ্যতার অভিঘাত। সেই অভিঘাতের ভেতর দিয়ে এখানকার ভুমিপুত্ররা নিজস্ব বেদনায়, নিজস্ব কৌশলে, ত্যাগ তিতিক্ষায় সাধনায় লোকজ্ঞান দিয়ে নিজেদের অজ্ঞনতাকে জ্ঞানের পরিক্রমায় ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাচীনকালের সেই ধারাবাহিকতায় আধুনিক কালেও আমাদের পুর্বপুরুষেরা অনেকে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন জ্ঞানসাধনায়। ক্লাসিক থেকে তারা নিউ ক্লাসিক এবং হয়ে উঠেছিলেন রেনেসাঁ পুরুষ। জ্ঞানের সাধনায় আধুনিক পৃথিবীকে গ্রহণ করেছিলেন জ্ঞানের নিয়ামক হিসেবে। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার ধীমান পুরুষ প্রফেসর মোশতাক আহমদ সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন নিজস্ব বেদনায়, নিজস্ব বোধে। আধুনিক কর্পোরেট পৃথিবী যেমন নোংরা আর বিষে ভরে দিচ্ছে পৃথিবী সে নোংরামির ধারে কাছে তিনি যেতে চাননি। আধুনিকতা তিনি গ্রহণ করেছিলেন বরং অন্যভাবে।
তিনি মানুষের মৌচাক ভরে দিতে চেয়েছেন মধু দিয়ে, মোম দিয়ে। আর এভাবে মানব জাতিকে দিয়েছিলেন মহত্তম দু’টি জিনিসÑমিস্টতা আর আলো। আধুনিক বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যত সেই মিস্টতা আর আলো নিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে বহুভাবে, বহুধারায়। প্রফেসর মোশতাক আহমদ সেই ক্লাসিক মানুষ, একমাত্র- যিনি সভ্যতার সমস্ত ভাঙাগড়া, তার দর্শন, তার রূপ সমগ্রসত্তা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন। তার মুখনিঃসৃত প্রতিটি কথাই হয়ে উঠতো সমগ্রের স্বপ্নে আলোকিত।

মানব জাতির পাখাওয়ালা বন্ধু মৌমাছি যেমন করে মধু সংগ্রহ করে, মৌচাক ভরে তুলে, তেমনি করে মানব জাতির জ্ঞানপিপাসু মানুষ তারও বেশি সুক্ষ্মতায় জ্ঞানান্বেষণে নিজেদের ধ্যানী করে তোলে। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা কে বুকে ধারণ করে প্রফেসর মোশতাক আহমদও নিজেকে জ্ঞান চর্চার ব্যাপ্তির ভেতর ডুবিয়ে রেখেছিলেন। ধ্যান ও জ্ঞান হয়ে উঠেছিলো তার প্রজ্ঞাময় জীবনের নিঃসঙ্গতার অনুসঙ্গ। হৃদয় তারের বীণায় ব্যথার এমন মধু বহন করেছিলেন তা তাকে দিয়েছিলে একজীবনের স্বস্তি। কারও কারও জীবনের অতৃপ্ত বাসনাগুলো অতৃপ্ত থেকে যায়, কারও কারও জীবন বৈষয়িকভাবে ঝলোমলো হয়ে উঠে। সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে মননশীলতার যুদ্ধে জয় হয় অন্তশীলতা। সৃষ্টি হয় নতুন সুন্দর। বঙ্গোপসাগরের তীরে মৈনপাহাড়ের তটে ঘনজঙ্গলে ভরা যে ঐতিহাসিক রম্যভূমি তার সঘন সবুজের ভেতর প্রফেসর মোশতাক আহমদের জন্ম। সম্রাট অশোকের কাল থেকে বুদ্ধের জ্যোতি বা আলো এসে টিকরে পড়েছিলো এখানে। তারপর সনাতন, ইসলাম, নির্বাণ মিলে জনসমষ্টির ভাগ হয়ে যাওয়ার যে সৌন্দর্য এ মাটি তা বহন করেছে। হাজার বছরের সভ্যতার সেই বৈশিষ্ট্য বুকে ধারণ করেছিলেন প্রফেসর মোশতাক আহমদ। কক্সবাজারের তথা দরিয়ানগরেরর তীরে মানবজাতির অগ্রযাত্রার যে সুলক্ষণ তাকে তিনি বিস্তার করে দিয়েছিলেন মানব মহিমায়। জ্ঞান ও মানব মহিমার রেনেসাঁ পুরুষ হিসেবে তিনি আলোকিত করেছেন এ জনপদ। যদিও সভ্যতার এ জনপদ তার জ্ঞানের সাধনা ধরতে পারে নাই তবুও বলা যায় জগতে যুগে যুগে এ রকম রেনেসাঁ পুরুষেরা এসেছিলো বলে সভ্যতা পৌঁছেছিল উৎকর্ষের নতুন এক সীমায়। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা নাফের এই দু’তীর এ রকম বেশি মানুষের দেখা পাই নাই। হাতে গোনা মাত্র। মাগন ঠাকুর, আলাওল, নসরুল্লাহ খন্দকার, বরকেতা গাইন, বংশী গাইন,আজগর আলী গাইনসহ আব্দুর রশিদ ছিদ্দিকী, শহীদ সাবের, প্রফেসর মুস্তাক আহমদ, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, ড.সলিমুল্লাহ খান এ শতাব্দীর সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে যারা সময়কে নিবেদন করছেন আলোক জীবন, সে রকম কিছু মানব সন্তান।

০২
আমি যখন সভ্যতার এ প্রান্ত থেকে কবিতা লেখা শুরু করেছি তখন থেকে উপলব্ধি করেছি সৃষ্টিশীলতাই হচ্ছে মানুষের মৌলিক জীবন। কবিতার ঘোর আর জীবনের ঘোর এক না এখানে দন্ধ থাকে, প্রতিযোগিতা থাকে, হাসি তামাশা, ঠাট্টা, অজ্ঞতার জ্বালা থাকে, জ্বালা থাকে স্বপ্নের, ঈর্ষার, খ্যাতির। বন্ধুদের মধ্যে, শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে প্রবল ঘৃণা জমে ওঠে; সৃষ্টিশীলতা এসব ভাসিয়ে নিয়ে যায় বেদনার মুকুরে। প্রতিটি যুগই সম্ভাবনার নতুন জোয়ার নিয়ে আসে। সে জোয়ারের পলিতে আটকে পড়ে ঝিনুক শামুক সেখান থেকেই সৃষ্টিশীল বেদনামথিত মানুষটিকে খোঁজে নিতে হয় মুক্তা। যে পারে সে হয় কালের আলাওল যে পারে না তার কথা কেউ মনে রাখে না। আধুনিক সমাজ ও সভ্যতা সৃষ্টিশীলতার আয়নায় দাঁড়ানোর মত সৎ সাহস রাখে না। কেননা, সভ্যতার উন্নয়নের নামে আধুনিকতা মানুষের সমস্ত নৈতিক বোধই কেড়ে নিয়েছে। প্রফেসর মোশতাক আহমদ কালের বাঁশীওয়ালা হিসেবে এসব জানতেন বুঝতেন। তাই নির্মোহভাবে আধুনিকতার প্রলোভনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে পেরেছেন তিনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করি নিজেকে। জীবিত থাকতেই আমি আমার কবিতার বই ‘অবাধ্য গোলাপ’ প্রফেসর মোশতাক আহমদকে উৎসর্গ করেছিলাম। বইটি যখন উনার হাতে তুলে দিই উনার কি মনে হয়েছিলো জানি না, আমার মনে হয়েছিলো গ্রীক যুগের সক্রেটিসও মনে হয় ভক্তবৃন্দ কিছু উপহার দিলে এমন নির্মল পবিত্র হাসি দিয়ে গ্রহণ করতেন। প্রফেসর মোশতাক আহমদ কি যে খুশি হয়েছিলেন। তার মুখে সেদিনের আলো আমাকে চমকিত করেছিলো। আমাকে আহতও করেছিলো। ব্যক্তিগত একটি বিষয় তিনি সেদিন আমাকে বলেছিলেন। বলেছিলেন- ‘আমার ছোট্ট মেয়েটি যদি তোমাদের মত এমন সাহিত্য চর্চা করতো, কতই না ভালো হতো। আহ, আফসোস! আমি স্যারের ছোট মেয়েটিকে দেখি নাই, সৃষ্টিশীলতার প্রতি স্যারের দরদ, মায়া আমার ভেতর ব্যাপক এক অনুরণন তৈরি করেছিলো। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার সন্তান হিসেবে স্বভাবতই আমি আলোড়িত হয়েছি। স্যারের সঙ্গে আমার কত কত স্মৃতি। আমরা কয়েকজন তখন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার সঙ্গে ওয়াইপোর (ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচোয়াল প্রপার্টি) প্রজক্টে ফিল্ড ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করছি। প্রথম দফা কাজ জমা দিয়েছি, সে সব নিয়ে ঢাকায় সেমিনার হবে। স্যারসহ অনেকে সেমিনারে পেপার পড়বে। আমরা এখান থেকে প্রাইভেট কার নিয়ে যাত্রা করেছি। তিনদিনের সেমিনারে স্যারের প্রবন্ধই সবচেয়ে ভালো হয়েছিলো। সে সেমিনারে আরও যারা প্রবন্ধ পড়েছিলো প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম, সম্পাদক বাংলাপিডিয়া। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকসহ অনেকে। এভাবে অনুষ্ঠানের সুবাদে স্যারের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরেছি আমি। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও সামাজিক অবাধ্যতা কিছুটা স্যার থেকে শিখেছি। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা যত উজ্জ্বল হবে প্রফেসর মোশতাক আহমদও আমাদের মাঝে মানবিক উজ্জ্বলতায় তত বেশি আলোর পথ দেখাবে। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার রেনেসাঁ পুরুষ হিসেবেও তিনি আমাদের কাছে ততবেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।

হেমন্তিকা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী আয়োজিত শোক সভার মুল প্রবন্ধ

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।