বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা : বৈদিক যুগ থেকে মৌর্য যুগ

মনির ইউসুফ

প্রাচীন মানুষ অবচেতনের দূরচেতনায় সৃষ্টিশীল স্বপ্নের ভেতর দিয়ে বসবাসের উপযোগী যে সব ভূখণ্ড খুঁজে পেয়েছিলেন; সেসব ভূখণ্ডে তারা বসবাস করেছেন। বুদ্ধের জন্মের আগে ভারতবর্ষে তথা গঙ্গারিড্ডির শক্তিশালি জনগোষ্ঠির কথা যবন (গ্রিক) ঐতহাসিকরাও লিপিবদ্ধ করেছেন। সে একই সময়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নরগোষ্ঠি বঙ্গ, মগধ, পুন্ড্র, সমতট, অলিঙ্গ, কলিঙ্গে বসত গড়েছিল। আবার আরেক দিক থেকে মানুেষর স্রোত আরব উপদ্বীপ হয়ে সিল্করোট ধরে এসে এই বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাস শুরু করেছিল। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, নোয়াখালী, ফেনি, আকিয়াব, রোসাঙগিরি, মন্ডু, ইরাবতী, পেগু, নেহ ম্রাই বা নীল নাফ, হুলুদ ফুলের দেশ (রামু বা রম্যভূমি), বাঁকোলী বা পেঁওয়া, ‘পালংকি’ কক্সবাজার এই স্থান সমূহে তখন রীতিমত একটি সভ্যতার পদযাত্রা পরিলক্ষিত হয়। বঙ্গোপসাগরের তীর ধরে এটি যেন আরেক দুনিয়া। ভারতবর্ষের ইতিহাস যারা লিখেছেন তারা বঙ্গের সীমানা সমতটের ময়নামতি বা চট্টগ্রামের ফেনি পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। চট্টগ্রামকে আরাকানের সঙ্গে বা আকিয়াব বন্দরের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। প্রাগৈতিহাসিক ও ইতিহাসের কাল হিসেব করলেও আমরা তা বুঝতে পারি। চট্টগ্রাম স্বতন্ত্র্য একটি রাজ্য হিসেবে শাসিত হলেও মধ্যযুগে তা কখনও বঙ্গের শাসনে কখনও আরাকানের শাসনে অধীনস্ত হয়ে পড়তো। মধ্যে মধ্যে স্থানীয় সামন্তীয় নৃপতিবৃন্দ চট্টগ্রামে স্বাধীনভাবে তাদের নিজেদের শাসনভার চালালেও তা ধরে রাখতে পারতো না। এরপর বিস্তৃত যে পাহাড়ি ভূখণ্ড সে অঞ্চলকে অপেক্ষাকৃত বর্বর বা মনুষ্য বসবাস নেই মনে করে শাসক ও ঐতিহাসিকরা এড়িয়ে গেছেন। মগধ (বিহার) বার্মা ত্রিপুরা তিব্বত চীন মঙ্গোলীয় এবং ভারতবর্ষ শ্যামদেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা বিভিন্ন গোষ্ঠির মানুষও প্রাথমিক ভূখণ্ড হিসেবে এ অঞ্চলকে বেছে নেয়।

ইতিহাস থেকে আমার জানি, বার্মায় তিব্বত থেকে আসা এবং পিউ গোষ্ঠি ১৩ হাজার বছর আগেই নতুন ভূখণ্ড খুঁজে নিয়ে নিম্ন বার্মার বিভিন্নস্থানে বসবাস শুরু করেন। অনেক রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আজাকের আধুনিক বার্মার যাত্রা। এ সকল স্থানের মানুষের রক্তধারা তিব্বতীয় মঙ্গোলীয় আর্যীয় রক্তধারাসহ ভারতবর্ষীয় রক্তধারার সঙ্গে এমনভাবে মিশেছে মানবগোষ্ঠির শংকরায়নের মধ্য দিয়ে সভ্যতা এখানে স্থীতিধ হয়েছে। বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা নামের সভ্যতার সৃষ্টি করেছে। রম্যভূমি রামু, হলুদ ফুলের দেশ, মণ্ডু, আকিয়াব, চকোরিয়া, বাকোলি বা পেঁওয়া এসব স্থানে তখন রীতিমত একটি মনুষ্যগোষ্ঠি তাদের প্রকৃতিদত্ত সুযোগ সুবিধা কাজে লাগিয়ে জনবসতিকে একটি সম্পূর্ণ সংস্কৃতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। জমিচাষ, বলীখেলা, নতুন বছর উদযাপন, পাহাড়ি বড় বড় বেগার উৎসব, বৃক্ষছেদন, বৃক্ষকাটা, লাকড়ি সংগ্রহ, মাছধরা, পশু শিকার, গুহা থেকে বের হয়ে ঘর তৈরি, লোকাচার, ধর্মাচার ইত্যাদি। ‘গুপ্ত যুগের পূর্বে মৌর্য যুগেও বাংলাদেশে বাংলার আদিম অধিবাসীদের প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসই অনুসৃত হত। বঙ্গোপসাগরের দুই তীরে দুই নৃগোষ্ঠির মানুষ – একগোষ্ঠি পিতৃতান্ত্রিক, আরেকগোষ্ঠি মাতৃতান্ত্রিক তাদের অনুসৃত ধর্ম বিশ্বাসের স্তম্ভ ছিল-মৃত্যু পরে আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস, মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, নানান ঐন্দ্রিজালিক প্রক্রিয়া ও মন্ত্রাদি, প্রকৃতি সৃজন শক্তিকে মাতৃরূপে পূজা, লিঙ্গপূজা, কুমারী পূজা, টোটেম’র এর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা এবং গ্রাম, নদী, বৃক্ষ, অরণ্য, পর্বত ও ভূমির মধ্যে নিহিত শক্তির পূজা, মানুষের রোগ, দুর্ঘটনা সমূহ দুষ্ট শক্তি বা ভূত-প্রেত দ্বারা সংগঠিত হয় বলে বিশ্বাস ও বিবিধ নিষেধাজ্ঞা জ্ঞাপক অনুশাসন ইত্যাদি। অতঃপর মৌর্যযুগ থেকে আর্যরা (ব্রাহ্মণ) বাংলায় অনুপ্রবেশ করে, ইরাবতীর তীর ধরে বার্মা হয়ে আরাকানেও তারা নিজেদের বসবাযোগ্য ভূমি খুঁজে নেয়। তবে গুপ্তযুগে তাদের ব্যাপক মানুষ এ অঞ্চলে চলে আসে।’ ক্রমে তারা আরও দক্ষিণপূর্বে পাহাড়ি অঞ্চল বঙ্গোপসাগরের তীরে চলে আসে। ভারতবর্ষ বার্মা চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের ও আরাকনের প্রান্তীয় অঞ্চল ছিল রামু। যে কারণে অপেক্ষাকৃত স্বাধীন জীবন যাপন সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে অনেক আদিম মানুষ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাদের মধ্য দিয়ে পরবর্তীকালে বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়। ইতিহাসে তাদেরকে বাংলাদেশের জাতিসত্তা-আরাকানের জাতিসত্তার সঙ্গে কেউ কেউ মিলিয়ে নিয়েছেন। আবার অনেক ঐতিহাসিক তাদেরকে আলাদা জাতিসত্তা হিসাবে বর্ণনা করেছেন। আমরা শেষোক্ত ঐতিহাসিকদের বর্ণনাকে গ্রহণ করে এ সভ্যতার নির্মাণ, সৃষ্টিশীলতা ও বিকাশের কালকে দেখবো। সরাসারি সাম্রাজ্যবাদের যুগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমরা দেখেছি আধুনিকতার নামে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ- ইতিহাস, ঐতিহ্য সংস্কৃতি শিল্প সাহিত্য সব কিছু আত্মসাৎ করে নতুন করে আবারও তারা মানুষের মনের জগতে সম্রাজ্যবাদ ছড়িয়ে দিয়েছে। এটাকে সাম্রাজ্যবাদ শোষণের যুগ না বলে তারা বলছে আধুনিক যুগ।

এই উপমহাদেশে বার্মাকে (মায়ানমার) মাথায় রেখে আমাদের ইতিহাস চয়ন করতে হবে; কেননা, বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার নিকট প্রতিবেশিই হচ্ছে মায়ানামার। তাদের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় রক্তের সম্পর্ক সংঘর্ষ, সংমিশ্রণ, সঙ্গম হয়েছে বহুধারায়। ইতিহাসের এই দিক ভুললে চলবে না।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখানকার মানুষ তাদের জীবনযাপনকেও ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে নিতো। ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে নানান উৎসব, পার্বন, পূজা-আচারকে সংগঠিত করে তোলে। স্মরণাতীতকাল থেকে মানুষের ইতিহাসের যে ধারাবাহিকতা তা থেকে আমরা দেখতে পাই যে, আদিম মানুষেরা কৃষি জমির খোঁজে ভূখণ্ড থেকে ভূখণ্ডে পরিব্রাজন করেছিল সেই পরিব্রাজনের সময় সমুদ্রের এই তটে তারা স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। আর্যদের আগমনের আগে থেকে সাগরের এই তটে শ্রমজীবী মানুষের নতুন সভ্যতা গড়ে ওঠে। বর্তমান রাখাইন স্টেট (প্রাক্তন আরাকান) ফেনি পর্যন্ত যেহেতু বিস্তৃত ছিল সেহেতু এই ফেনিকে শেষ সীমানা ধরে বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার বিকাশকালকে দেখতে হবে। ভারতবর্ষের বৈদিক যুগ থেকে মৌর্য যুগ এবং পূর্ব এশিয়ার বার্মা, শ্যামদেশ, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলীয় হয়ে ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জসহ আরব উপদ্বীপে ভারতীয় প্রজ্ঞা যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল তা তুলনারহিত এক বাস্তবতা। বুদ্ধের ধ্যানের জ্যোতিকে ইরাবতীর তীরের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ প্রাকৃতিক ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। বৌদ্ধধর্ম সঙ্গে নিয়ে ভারতের নির্বাণপ্রাপ্ত সংঘরামের ভিক্ষুরা পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ভারতবর্ষের আলোকপ্রাপ্ত মহান পুরুষগণ, ধর্মীয় সাধক ও প্রচারক মহাবীরের সাধনা বলে জৈন ধর্মের বিকাশের সূত্রধরে সেই মহান ধর্মের উত্তরপুরুষেরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে মানবতার আরও সনিষ্ঠ সেবা করতে থাকেন। জ্ঞান গরিমায় পৃথিবীকে নতুন আলোকপথে নিয়ে যান। বৌদ্ধধর্মের সূত্র ধরে ভারতবর্ষের প্রজ্ঞা আর্ন্তজাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং পূর্বদেশ সমূহ, আরব উপদ্বীপসহ সে সময়ের নগর রাষ্ট্র সিরিয়া, গ্রীস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল, সারা পৃথিবী বৌদ্ধের জ্যোর্তিবলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। মৌর্যযুগে বৌদ্ধধর্ম ভারতের সীমা ছড়িয়ে পৃথিবীব্যাপি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গোপসাগরের তীরে বসবাস করা পিতৃতান্ত্রিক ও মাতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠিগুলো এই ধর্মগ্রহণ করে। রামুর জাদি, রামকোর্ট, কিয়াং, মন্দির, জ্যোতিসদন, বিহার (বিশ্ববিদ্যালয়) আরাকানের মন্ডু আকিয়াবে কিয়াং মন্দির ইত্যাদি চৈত্য-বিহার এখনও সে সময়ের কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এখনও অনেক বয়োবৃদ্ধ বৌদ্ধ ভান্তে রামুতে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বলে উল্লেখ করেন। রামকোর্ট বা রামফোর্ট ছিল নৌ-শিল্পের জন্য বিখ্যাত এক অঞ্চল। ফ্রান্সের বিখ্যাত জাদুঘরে ‘রাম্ভু’ বা ‘রামুু’ ৬৪অশ্বশক্তি সম্পন্ন একটি জাহাজের নকশা এখনও ঐ জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। বিভিন্ন অংশে আগেই উল্লেখ করেছি ‘পৃথিবীর আবহাওয়া যখন উষ্ণ হয়ে উঠে তখন জঙ্গলে বসবাসকারী আদিম মানুষ খাদ্যের সন্ধানে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ভারত উপমহাদেশ, ইরাবতীর তীর, পেগু, বার্মা, বঙ্গোপসাগরের দুই তীরে আর্যরা কখন প্রবেশ করে তা স্থানীয় অধিবাসীরা সঠিকভাবে জানে না। এই উপমহাদেশের পণ্ডিতদের মতে, আর্যরা খৃস্ট জন্মের তিন হাজার বছর পূর্বে এই ভূখণ্ডে আগমন করেছিল। তার পূর্বে এই ভূখণ্ডে যারা বসবাস করেছিল তারা পুরো সভ্য না হলেও কিন্তু বর্বর ছিল না। তারা প্রাকৃতিক উপায়ে প্রকৃতির শিক্ষা নিয়ে বাস উপযোগী নানা ধরনের লোকাচার, ধার্মচারে নিবিষ্ট ছিল। এই দক্ষিণপূর্ব ভূখণ্ডে একটি লোকায়াত সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন।

পাল বংশের শাসন আমলে বাংলাদেশ-রামু -আরাকানে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বৌদ্ধ ধর্মকে আশ্রয় করে দেশ-বিদেশের সাথে এ সময় যোগাযোগ বিস্তৃত হয়। পাহাড়পুরে প্রাপ্ত আব্বাসীয় বাদশাহ হারুন আল রশীদের (৭৮৬-৮০৯ খৃ.) মুদ্রা থেকে বাংলাদেশ ও আরাকানের সাথে পাল আমলে আরব বণিকদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়। ডক্টরর নীহাররঞ্জন রায় উল্লেখ করেন যে, আট শতকের গোড়া থেকে ভারতের সমৃদ্ধ ব্যবসা-বাণিজ্যে আরব ও পারস্য বণিকদের একটা মোটা অংশীদারিত্ব ছিল। পাল আমলে ভারতের রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ক্রমশ উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারতে সরে আসতে থাকে। পাল আমলের বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপুল সাফল্যের কথা আরব ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকদের বিবরণী থেকেও জানা যায়।
গ্রীস ভূগোলবিদ টলেমি তার নোট বুকে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ বছর আগে রামু ও আরাকানের কথা উল্লেখ করেন।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।