বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘দালিয়া’

মনির ইউসুফ

‘মানব জাতির ইতিহাসে ষোল শতক অতীব লক্ষণীয়’। ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটেও ষোল শতক বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই শতকে এসে মানুষের ইতিহাস নতুন দিকে মোচড় দিতে শুরু করে। হিন্দুস্তানে মোগল সাম্রাজ্যের ভেতর ভাতৃঘাতী যুদ্ধ শুরু হয়, সেই হৃদয়হীন যুদ্ধে একে একে বলী হয় প্রবল প্রাণশক্তি সম্পন্ন রাজপুত্রগণ। ইউরোপের দেশে দেশে রেনেসাঁস এবং সমুদ্রপথে মানুষের পৃথিবী পরিভ্রমণও শুরু হয় এই শতকে। পৃথিবীর এই উলম্ফনের মধ্যে শাহজাদা আওরঙ্গজেবের রাজ্যাভিষেকের যে রক্তাক্ত অভ্যুদয় ঘটে, পূর্বের সাম্রাজ্যসমূহের রাজবংশের ইতিহাসেও আমরা তা দেখেছি। সিংহাসনের জন্য ভাতৃহত্যা তখনও পর্যন্ত রাজরাজাড়া জায়েজ করে নিয়েছিল। তলোয়ারের শক্তিতে তখনকার দিনে সিংহাসন নির্ধারিত হতো। ভারতবর্ষের প্রবল পরাক্রমশালী সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হওয়ার পর মোগল সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র শুরু হয়; সেই ষড়যন্ত্রে জয়ী হয় শাহাজাদা আওরঙ্গজেব। সিংহাসন অধিকারের যুদ্ধে ‘আওরঙ্গজেবের সঙ্গে বিভিন্ন রণাঙ্গনে পরাভূত হয়ে তারই ভাই শাহ সুজা বাংলাদেশ থেকে পলায়ন করেন। তার সঙ্গে ১৫০০ অশ্বারোহী ছিল। তিনি আসাম সীমান্তের দিকে অগ্রসর হন, মীর জুমলা তখন তাকে অনুসরণ করছিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদ অতিক্রম করে তিনি রাঙামাটির পার্বত্য অঞ্চলে প্রবেশ করেন। দুর্ভেদ্য অরণ্য রুক্ষ পার্বত্য অঞ্চল অতিক্রম করে তিনি অতি অল্প সংখ্যক সহযাত্রী নিয়ে আরাকানে উপস্থিত হন। শাহ সুজা আরাকান রাজের আশ্রয় গ্রহণ করেন বটে, কিন্তু আরাকান রাজ প্রথম থেকেই তাঁকে সন্দেহ ও ভীতির চোখে দেখতে থাকেন। তাছাড়া মীর জুমলা অনবরত সুজাকে প্রত্যাপর্ণ করবার জন্য আরাকান রাজের উপর চাপ দিচ্ছিলেন। আরাকান রাজ ভীত হয়ে সুজাকে আরাকান ত্যাগের অনুরোধ করেন। তখন বর্ষাকাল এবং পার্বত্য অঞ্চলে ঝড়বৃষ্টি অনবরত হচ্ছে। এই দুর্যোগের অবস্থায় সুজার পক্ষে আরাকান ত্যাগ করা অসম্ভব ছিল। দীর্ঘ যাত্রায় সুজা তার অনেক সঙ্গীকে হারিয়েছিলেন, আবার অনেকে আরাকানে এসে সুজাকে পরিত্যাগ করেছিলেন। মাত্র চল্লিশ জন অনুচর নিয়ে শাহ সুজা তাঁর দ্বিতীয় পত্নী, তিনটি কন্যা এবং একটি পুত্র নিয়ে আরাকানে অবস্থান করেছিলেন। আরাকানের রাজা সুজাকে দেশত্যাগের জন্য অল্প যে কয়দিন সময় দিয়েছিলেন সে সময় অতিক্রান্ত হলে তিনি সুজার নিকট প্রস্তাব করেন যে যদি সুজা তার এক কন্যার সঙ্গে রাজার বিবাহ দিতে প্রস্তুত থাকেন তবেই তাকে আশ্রয় দেওয়া হবে অন্যথায় নয়। সুজা এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এবং চল্লিশ জন অনুচর নিয়ে আত্মসম্মান রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে নিহত হবেন বলে প্রস্তুত হন। যুদ্ধে তার অনুচরের প্রায় সকলেই নিহত হন। সুজা আত্মরক্ষার শেষ অবলম্বন হিসেবে নৌকা করে পেগুতে আশ্রয় নেবার চেষ্টা করেন। তিনি যে নৌকায় আরোহণ করেন সে নৌকা প্রকৃত প্রস্তাবে আরাকান রাজেরই ছিল। রক্ষী হিসেবে যারা এ নৌকায় তাঁর সঙ্গে আসছিল তারাই নদীমধ্যে নৌকা ডুবিয়ে সুজাকে নিহত করে। এ ঘটনা ঘটে ১০৭০ হিজরিতে বা ইংরেজি ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে বর্ষাকালে। দুর্গম পাহাড় দুর্ভেদ্য অরণ্যে শাহসুজার তৈরি করা রাস্তা ‘শাহ সুজা সড়ক’ নামে এখনও তাঁর বেদনাময় স্মৃতি বহন করছে।’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতবর্ষের মোগল ইতিহাসের এই ট্র্যাজেডি ভালোভাবে জানতেন। মোগল শাহজাদা সুজার এই অমানবিক মৃত্যু তাঁর মনেও আঘাত করেছিল। শাহ সুজার হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর দু’মেয়ের অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এবং জনৈক ধীবরের ঘরে বেড়ে উঠা বিষয়কে কেন্দ্র করে তিনি লিখেন ‘দালিয়া’ ছোট গল্পখানি। মহাকবি আলাওল পরবর্তীকালে কোনো বড় প্রতিভাবান কবি আরাকান ও শাহ সুজার হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রথম কলম ধরেন। ভারতবর্ষ, আরাকান ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই ঘটনা ব্যাপকতার দিক দিয়ে অনেক বড়। তিনি গল্পেরও একটি মানবিক পরিণতি দেন। গল্প তো গল্পই, কিন্তু সেই গল্পে যদি ঐতিহাসিক উপাদান থাকে, তা আবার রবীন্দ্রনাথের মত বড় প্রতিভাবানের কলমে উঠে আসে তাহলে, সেই গল্প নিয়ে অনেক ভাবনার বিষয় থাকে; ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনার একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতও থাকে। শাহ সূজার মৃত্যু ঘটেছে, আশ্রয়দাতা এবং সুজা হত্যাকারি আরাকান সম্রাটেরও মৃত্যু হয়েছে। সুজার সঙ্গে যারা আরাকান পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছিল তাদের মধ্যে অনেকে প্রাণ হারিয়েছে, কেউ কেউ সেখানকার জনসমাজের সঙ্গে মিশে গেছে, আর কেউ কেউ রাজ দরবারে স্থান পেয়েছে; রাজ দরবারে স্থান পাওয়া এ রকম এক ধীবরের জালে আটকে পড়ে প্রাণে রক্ষা পায় শাহজাদী আমেনা, এবং ধীবরের ঘরে বড় হতে থাকে। শাহজাদী আমেনার বেঁচে থাকা এবং বেড়ে ওঠা সম্রাট জেনেছেন ঐ ধীবরের কাছে। তারপর পাহাড়ি উপজাতির ছদ্মবেশে ‘দালিয়া’ নাম ধারণ করে আপন হতে থাকে ধীবরের পালিত কন্যা আমেনার সঙ্গে। আমেনা এই বর্বর বন্য পাহাড়ি সহজ সরল যুবকের প্রেমে পড়ে যায়। কিন্তু তখনও পর্যন্ত জানে না এই যুবক রাজকুমার, তার বাবার হত্যাকারী আরাকান সম্রাটের পুত্র। কাহিনি এগিয়ে যায়। শাহসুজার আরেক মেয়ে জুলেখাও অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় এবং বোনের খোঁজ করতে করতে ধীবরের ঘরে গিয়ে পৌঁছে। জুলেখা বোন আমেনাকে তার রাজকীয় জীবন-যাপনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সুযোগ পেলে আরাকানের বর্তমান সম্রাটকে হত্যা করে পিতৃ-হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলে, জুলেখা-কুমারী আমেনার রাজ রক্তকে উসকে দেয়। এই কারণে একটি ছুরিতে প্রতিদিন শান দেয় জুলেখা। দালিয়া যথা সময়ে আমেনার কাছে আসে এবং জুলেখার সঙ্গেও পরিচয় হয়, আমেনা জুলেখাকে দালিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই নির্জন বনে সবুজে সবুজে ছেয়ে যায় প্রান্তর। কৈলু বৃক্ষের ঘনছায়ায় পাহাড়ের নির্জনে প্রবল পরাক্রমশালী মোগল শক্তির দু’কন্যা নিয়তিকে মেনে নেন। জুলেখা একদিন দালিয়াকে জিজ্ঞেস করে আরাকান রাজদরবারে কিভাবে পৌঁছানো যায়। দালিয়া হাসে এবং জিজ্ঞেস করেÑ কেন? কেন রাজদরাবরে যেতে হবে? জুলেখা সরাসরি বলেÑ পিতৃহত্যাকারীর বুকে ছোরা ঢুকিয়ে দিতে। এরি মধ্যে রাজদরবারে আমেনার বিয়ে ঠিক হয়ে যায় সম্রাটের সঙ্গে। কিন্তু, আমেনার মন পড়ে থাকে পাহাড়ি যুবক ‘দালিয়া’র কাছে। বিয়ের সানাই বাজিয়ে রাজ-দরবারে আমেনাকে নিয়ে যায়, ‘দালিয়া’র জন্য আমেনার প্রাণ কাঁদে। পিতৃহত্যাকারীর সঙ্গে বিয়ে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ, বুকের বাঁ পাশে শান দেওয়া ছুরি লুকিয়ে রাখে অমেনা। কিন্তু দরবারে পৌঁছে দেখে বর সেজে বসে আছে স্বয়ং দালিয়া। আমেনা মুহূর্তেই মূর্ছা যায় এবং বুক থেকে ছোরাটাও খসে পড়ে। দালিয়া মূর্ছিত আমেনাকে কোলে তোলে নিয়ে বিছানায় শুয়ে দেয়। দালিয়া হাসেÑঝিলিক দিয়ে হাসে ছোরাটাও। এই হচ্ছে গল্পের আপাতত সমাপ্তি। কিন্তু আরাকানের নতুন ইতিহাসের শুরু।
‘বুদ্ধদেব বসু মেঘদূত কাব্যের ভূমিকায় লিখেনÑ সংস্কৃত কবিতার সঙ্গে আজকের দিনে আমাদের বিচ্ছেদ ঘটেছে। সেই বিচ্ছেদ দূস্তর না হোক, সুস্পষ্ট। আর তার কারণ শুধু এই নয় যে সংস্কৃত ব্যাকরণের চর্চা আমরা করি না। চর্চা করি নাÑ এ কথা সত্য কিনা তাও সন্দেহ করা যেতে পারে। ইংরেজ আমলে সংস্কৃত শিক্ষার মর্যাদা হ্রাস, আধুনিক যন্ত্রযুগে আর্থিক মূল্যের অবনতি, কর্মক্ষেত্রে ও সামাজিক জীবনে সংস্কৃতের ক্ষীয়মান প্রয়োজনÑ এইসব নৈরাশ্যকর তথ্য সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে অনেকেই সংস্কৃত ভাষার চর্চা ক’রে থাকেন। এমন নয় যে দেশশুদ্ধ সবাই সংস্কৃত ভুলে গেছে, স্কুল-কলেজে তা পড়ানো হয় না, কিংবা আধুনিক বাংলার সঙ্গে সংস্কৃতে কোনো যোগ নেই। বরং আধুনিক বাংলা ভাষায় দেশজ শব্দের বদলে তৎসম ও তদভবের প্রচার বেড়েছে (তথাকতিত বীরবলী ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়) এবং রবীন্দ্রনাথ, যিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর বিরাট মূলধনের বৃহত্তম অংশটিও সংস্কৃত থেকে আহৃত। অথচ যারা রবীন্দ্রনাথ পড়েন, তাঁদের মধ্যে হাজারে একজনও কোনো সংস্কৃত কাব্যের পাতা ওল্টান কিনা সন্দেহ। যে-সব শিক্ষাপ্রাপ্ত বা শিক্ষালাভেচ্ছু বাঙালি ‘হ্যামলেট’ প’ড়ে থাকেন, বা গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ বা এমন কি ‘রাজাঅয়দিপৌস’ অথবা ‘ইনফের্নো’, তাদের মধ্যে ক’জন অছেন যাঁদের ‘মেঘদূত’ বা ‘শকুন্তলা’ পড়ার কৌতূহল জাগে, কিংবা যাঁরা ভাবেন যে সংস্কৃত সাহিত্যের সঙ্গে কিছু পরিচয় না- থাকলে তাঁদের শিক্ষা সম্পূর্ণ হ’লো না? মানতেই হয়, তাঁদের সংখ্যা অকিঞ্চিৎকর।

ত্রিশীয় আধুনিকদের প্রধান পুরুষ বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকাটি এতই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় যে, তা এখানে তোলে ধরতেই হল, কেননা, আজকে যারা তরুণ এবং পালিশ করা আধুনিকতার মধ্যে বড় হয়ে সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত তাদের এ বিষয়টা নিশ্চতভাবে জানা উচিত, ইউরোপীয় আাধুনিকতার যাত্রায় সংস্কৃত বা ভারতের প্রাকৃতজনের ভাষার অবদানও কম নয়। বুদ্ধদেব বসুর গভীর পর্যবেক্ষণ ও সংস্কৃত ভাষার শক্তি ও বৈভব এখানে তোলে ধরার কারণ হলো বাঙালি, বাংলাভাষা আরাকানের রাজসভা, আমাত্যবর্গের কাছে এমনভাবে ঋণী যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। যে রাজসভায় বাংলা ভাষার অমর মহাকাব্য ‘পদ্মাবতী’ রচিত হলো এবং মধ্যযুগে বাংলাভাষা পরিপুষ্টি লাভ করলো। আরাকানিদের প্রতি ইউরোপীয় অবজ্ঞা দিয়েই আমরা তাঁর দায় শোধ করছি। মানবিক দায়িত্ব নিয়ে তাদের কথা আমরা কেউ ভাবিনি। বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব করতে করতে তাদের মাতৃভাষা রোঁয়াইকে বাংলা বলেই চালিয়ে দিয়েছি। বুদ্ধদেব বসু সংস্কৃত ঐতিহ্যের অবহেলাকে যেমন অপরাধ হিসেবে দেখছেন তেমনি আরাকানিদের লোকমনকে আমরা না বুঝে তাদের যে অবজ্ঞা করছি তাও কি অপরাধ নয়! বাংলা ভাষা কি আরাকানি জনজীবন ও সমাজ থেকে কিছু নেই নি। বুদ্ধদেব বসুর মতের সঙ্গে মিলিয়ে বলতে পারি সংস্কৃত ভাষার কাছে বাংলা সাহিত্যের যেমন ঋণ বা সংস্কৃত ভাষার কাছে ইউরোপীয় সাহিত্যের যেমন ঋণ, তেমনি আরাকানি মাগধী প্রাকৃত রোঁয়াই ভাষা ও রাখাইন জনজীবন বা রাজসভার কাছে বাংলা ভাষারও তেমন ঋণ। যদি বলি আজকের এই দিনে সাহিত্যিক মতবাদের এত ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে গ্যাটে, ভলতেয়ার, মার্কেজ, দেরি দা, তলস্তয়, গোর্কি, দস্তয়ভস্কি, হেমিংওয়ে ইত্যাদি নিয়ে যারা পড়ে থাকেন তাদের মধ্যে কয় জনই বা আছে আধুনিক ফাউস্টের সমতুল্য ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের কথা জানি বা পড়ি।

বাংলাভাষী ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সারস্বতীয়রা বঙ্গোপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটিকে বর্বর বলেই এড়িয়ে গেছে বার বার। এখনও এড়িয়ে যাচ্ছে। আলোকায়নের গর্বে তাহলে আমাদের আর ইউরোপিয়ানদের মধ্যে কি পার্থক্য থাকলো। যারা কথায় কথায় ইউরোপিয় আলোকায়নকে নিয়ত অভিযুক্ত করে।

আরাকান কিভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তার একটি প্রামাণ্য বিবরণ আমরা দেখি মহাকবি আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যে

নানা দেশী নানা লোক শুনিয়া রোসাঙ্গ ভোগ
আইসন্ত নৃপ ছায়াতল।
আরবী মিসরী শামী তুর্ককী হাবশী
খোরাসানী উজ্বেগী সকল।।
লাহুরী মুলতানী কাশ্মীরী দক্ষিণা সিন্ধী
কামরূপী আর বঙ্গ দেশী।
ভুপালী কুদংসরী কান্নাই মলআবারী
অচি কোচী কর্ণাটকবাসী।।
বহ সৈয়দ শেখজাদা মোগল পাঠান যোদ্ধা
রাজপুত হিন্দু নানাজাতি।
আভাঈ বরমা শাম ত্রিপুরা কুকির নাম
কতেক কহিমু জাতি ভাঁতি।।
আরমানী ওলন্দাজ দিনেমার ইঙ্গরাজ
কাষ্টিলান আর ফরাসিস।
হিসপানী আালমানী চোলদার নাসরানী
নানা জাতি আর পর্তুগীস।।

তখনকার সময়ে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে লোকজন এসে আরাকানে বসবাস করতে থাকে। ৮ম শতক থেকে তা পরিব্যাপ্ত হতে হতে আজকে রোহিঙ্গা ও রাখাইন জাতি হিসেবে বিস্তৃত হয়।

১৯ শতকে নতুন আধুনিকতা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে তার যাত্রা শুরু করে। ইউরোপীয় মনোজগত একটু একটু করে সবার মন অধিকা করে নেয়। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘দালিয়া’ গল্পখানি লিখে মোগল সাম্রাজ্যের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে সারস্বত সমাজের সামনে নিয়ে আসেন। বাংলা সাহিত্য এবং রাজনীতিতে আরাকানের গুরুত্ব কতখানি তা উপলব্ধি করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আরাকান ভারতবর্ষের বাইরের কোন অঞ্চল নয়, এখানে ভারতীয় রক্তে সিক্ত হয়েছে মৃত্তিকা। গৌতম বুদ্ধ দক্ষিণের অঞ্চল পরিভ্রমণ কালে আরাকানে আসেন। বৌদ্ধ ধর্ম ও উজালী ( বৈশালী) রাজবংশের শাসনকার্য পরিচালনার মধ্য দিয়েও হাজার হাজার বছর আরাকান ভারতীয় দর্শন, চিন্তা, ধর্ম, রক্তধারার উত্তরাধিকারী। আজকের সময়ে মায়নামারের বার্মা সরকার ও আরাকানি রাখাইন বৌদ্ধ জাতি তা অস্বীকার করলেও ইতিহাস সমহিমায় তা ধরে রেখেছে। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘দালিয়া’ ভারত বর্ষের মানুষকে ইতিহাসের সেই দিনগুলির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বারবার।

আরাকান তথা বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার এই ইতিহাস এখনও লেখা হয় নি। অথচ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার শিল্পী মন নিয়ে শিল্পের বোধিবৃক্ষতলে বসে বুদ্ধের ধ্যানে শাহ সুজার ট্র্যাজেডিকে নীরবে ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক পরম্পরায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেন এবং আরাকানের সঙ্গে ভারতীয় সম্পর্ককে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন। আরাকানে ইতিহাসের এত উত্থান পতন এত রক্ত প্রবাহিত হয়েছে; পৃথিবীর আর কোথাও তা কল্পনা ও করা যায় না। সেই রক্তপ্রবাহ এখনও শেষ হয় নি। এখনও নির্যাতিত হচ্ছে রোহিঙ্গা জাতি। রবীন্দ্রনাথ জানতেন এই রক্তপ্রবাহ শেষ হবে না কোনদিন, যদি না একটি মানবিক প্রেম এই দু’জাতিকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ না করে। কিন্তু আরাকানবাসীর দুভার্গ্য শাহ সুজার হত্যাকাণ্ডের পর আরাকান একশো বছরও তার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে পারে নি। ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বার্মা (মায়ানমার) পরাক্রমশালী আরাকান সাম্রাজ্য দখল করে নেয়, তখন আরাকানের বুকে নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। বিজয়ী বার্মা-বাহিনি আরাকানের সম্রাটকে হত্যা করে এবং তার রাজ-আমাত্য রাখাইন, রোহিঙ্গাসহ সবাইকে এমন কচুকাটা করে ইতিহাসে এ রকম হত্যাকাণ্ড খুব কমই ঘটেছে। বাধ্য হয়ে আরাকানি রাখাইন ও রোহিঙ্গারা হিজরত করে প্রতিবেশি বাংলাদেশে। বর্তমান ককসবাজার শহরটি আরাকানি রাখাইন ও রোহিঙ্গাদেরই সৃষ্টি। ইতিহাসের অনেক ট্রাজিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে পৃথিবীর এই প্রান্তীয় অঞ্চল। আরাকানের সঙ্গে গৌড়ীয় বাংলা এবং ভারতবর্ষের সম্পর্ককে একটি মানবিক প্রেমে উদ্ভাসিত করে মনোগত ঐক্য নির্মাণের চেষ্টা করেছেন তিনি। পৃথিবীর সব বড় শিল্পীই নিজ নিজ শিল্পকর্মে হৃদয়বৃত্তিকে প্রাধান্য দিয়েছেন বলেই মানুষ মহৎ শব্দটি নিয়ে গর্ব করতে পারছে আজও। রবীন্দ্রনাথ সংস্কৃত ভাষা থেকে শুরু করে বাংলার প্রাকৃত জনের লোকভাষার স্নায়ু বা নার্ভ ধরতে পেরেছিলেন এবং কালের মহত্ত্বকে বুঝতে পেরেছিলেন। আরাকানের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল অনেক বেদনাময়। আরাকান, শাহ সূজার করুণ মৃত্যু নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘দালিয়া’ গল্পটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি হিসেবে প্রতিভাত হয়ে থাকবে।

দোহাই :
১. পদ্মাবতী-আলাওল- প্রথম প্রকাশ, সৈয়দ আলী আহসান মেÑ১৯৬৮, প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ জুলাই- ১৯৯৭
২. রাজর্ষি-: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩. মেঘদূত-কালিদাস, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত, জুলাই ১৯৭৫, পঞ্চম সংস্করণ।
৪. বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার ভাষা- মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ছিদ্দিকী, কবিতার রাজপথ
৫. দেশে- রাহুল সাংকৃত্যায়ন
৬. ইসলামি বাংলা সাহিত্য-সুকুমার সেন
৭ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য-আহমদ শরীফ
৮. রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস-এম এন হাবিব উল্লাহ
৯. আরাকানের মহারানী-অশ্রুকুমার সিকদার, (প্রবন্ধ সংগ্রহ-২)
১০. রাজনৈতিক মতবাদের ইতিহাস-আধুনিক কাল, (প্রগতি প্রকাশন মস্কো)
১১ রামুর ইতিহাস-আবুল কাসেম
১২. আরাকানের পথে পথে – মুহম্মদ নূরুল ইসলাম
১৩. পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস- বারট্টার্ন্ড রাসেল.
১৪. বাংলাদেশে রাখাইন জাতির লোকসংস্কৃতি- মংছেনচীং (মংছিন্)
১৫. ককস্বাজারের প্রবাদ প্রবচন- সম্পাদনা, মুহম্মদ নূরুল ইসলাম, প্রথম প্রকাশ একুশে বইমেলা,২০১১
১৬. ককসবাজার জেলার লোকসংস্কৃতি- মুহম্মদ নূরুল ইসলাম, মুহাম্মদ মনির আলম (মনির ইউসুফ ) মাস্টার শাহ আলম, (বাংলা একাডেমি)
১৭. মৈনপাহাড়- মুহম্মদ নূরুল হুদা
১৮. রোহিঙ্গাদের ঘর : কম জরুরী নয় মানবতা, মুহম্মদ নূরুল হুদা, কবিতার রাজপথ রোহিঙ্গা সংখ্যা, ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৭
১৯. ধানবতীর দেশে- মনির ইউসুফ প্রথম প্রকাশ-২০১৪, আজমাইন পাবলিকেশন্স

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।