কবিতাশিল্প ও সাহিত্য

বঙ্গোপসাগর ও মৈনপর্বতমালা

মনির ইউসুফ

বাঁশী বাজে বাঁশী, মৈনপর্বতমালাজুড়ে
বাঁশী শোনো বাঁশী বঙ্গোপসাগরের প্রান্তরে
বিস্তৃত পৃথিবী এই দৃশ্যজগতের সীমানা থেকে
আমার বুকের অদৃশ্য সীমানায়
আমার বেদনা ঝরে ঝরে পড়ে

আমার কষ্ট রক্ত শূন্যতা আর এই অনিরুদ্ধ আকাশজুড়ে
আমার হৃদয়ের বিহ্বল আর্তি আমাকে ঘায়েল করে ফেলে

সবুজ ও রূপামাখা-জলের এই ভূগোল এ জনপদ
আমার বাবার সবচেয়ে বড় বুক পাটাতন
সবচেয়ে বড় টিলাবুক
আমাকে আশ্রয় দেয়, আমাকে আশঙ্কিতও করে
তবুও পারি নাই বাবাকে বড় কোন জয় এনে দিতে
বাবা চেয়েছিলো, আমি যেন বিশ্ব জয় করি
অগ্রগতির এ পৃথিবীতে আমার বাবা বড় স্বাপ্নিক
আহ! বাবা কি দুদার্ন্ত তোমার জীবন

আমার বেড়ে ওঠার সঙ্গে ভেঙে গেলো সোবিয়েত
মানুষের পৃথিবীব্যাপী স্বর্গ
পুঁজির দাবানলে পুড়তে লাগলো পৃথিবী
তৈরি হতে লাগলো ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র
মানুষের বুকে জমতো লাগলো হিংসার বারুদ
বাবা, শেষ জীবনে তাই দেখলো

আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে বয়ে গেলো
দানবাকৃতির রাস্তা
ভিটে জমি সব তছনছ হয়ে গেলো
ছেলেরা পা দুলিয়ে রাস্তার পাশে বসে বসে
আসন্ন নতুন পৃথিবীকে স্বাগত জানালো
আমি দূর থেকে কাছে, কাছ থেকে দূরে
নতুুন বঙ্গোপসাগর নতুন মৈনপাহাড়ের
সহিংস এ উন্নয়ন দেখতে দেখতে ঘুরি
সাম্রাজ্যবাদকে জায়গা করে দিতে আমাদের
কি তোড়জোড়

বাঁশী বাজে বাঁশী নতুন পৃথিবীর বাঁশী
পৃথিবীব্যাপী ভোগবাদ নিরেট ও ঝঞ্ঝাটমুক্ত করতে
মানবিক উন্নয়ন বাদ দিয়ে
বুর্জোয়া বাসনার এ যে মহাবিস্তৃতি
বাবা, আমি তা থেকে তোমার বুকের এ ভূখণ্ড
কি করে বাঁচাবো
এ যে লুটপাট এ যে উন্নয়ন উন্নয়নের নামে
মায়ের আমসত্ত্ব কেড়ে নেওয়া

আহ! আমরা আমসত্ত্বও দিয়ে দিয়েছি
মারণাস্ত্র চোখ রাঙায়, বুলডেজার মাটি কাটে
ডিনামাইট সব স্থান ভয়ঙ্করভাবে দখল নেয়
কতিপয় বিদেশি আর কতিপয় দেশি
দখল করে নিচ্ছে বঙ্গোপসাগর, মৈনপর্বতমালা
মানবিক উন্নয়ন নয় কেন? কেন সহিংস উন্নয়ন!

পৃথিবীর সব সামরিক-আধা সামরিক বাহিনি
ঘির ধরেছে আমার বুকের ভূখণ্ড
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বুর্জোয়া খায়েশের
সামন্তীয় দালাল
ডলার ঢালছে বৃষ্টির চেয়েও বেশি

আমার বুকের মৈনপর্বতমালা
আমার বুকের বঙ্গোপসাগর
কি করে বাঁচাবো বলো এ জনপদ

আমার রূপালী ঢেউমালা অগণন সবুজ বৃক্ষরাজি
অসংখ্য নক্ষত্রের দেশ
বাঁশী শোনো বাঁশী আমার বুকের হৃদস্পন্দন

দরিদ্র জনতা বেড়ে গেলো, বেড়ে গেলো শ্রমিক
মানুষ এমন ব্যস্ত হয়ে পড়লো
পেটের জন্য জান কোরবান হলো
মানুষের ভীড়, গাড়ির ভীড়, মানুষের লানৎ
এ যেন জলজ্যান্ত নরক
আহ! কি উন্নয়ন
বাঁশী শোনো বাঁশী নতুন পৃথিবীর বাঁশী

মৈনপর্বতমালা আর বঙ্গোপাসগর এ দিগন্তের মালিক
জখমের দাগ নিয়ে ফুঁসে উঠবে কখন?
সেই বাঁশীর সুর বাজাবে কখন?
আমার বুকের অনন্তে এই বেদনা ঝরে পড়ে
বাঁশী বাজার অপেক্ষায় কেউ থাকে না
কেননা, সময় বড় নির্মম
চাবুকের আঘাতের চেয়েও নির্মম বিষাক্ত

আমার বুকে সেই বেদনার রক্ত জমে জমে
আমাকে কাহিল করে তুলে
আর বুঝি রক্ষে করা গেল না
বিস্তৃত মৈনপর্বতমালা এই দিগন্তহীন বঙ্গোপসাগর