বিনোদন

ববিতা : আমাদের সাংস্কৃতিক ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী

আমিনুল ইসলাম

“মোরা নতুন একটি কবিতা লিখতে যুদ্ধ করি, মোরা নতুন একটি গানের জন্য যুদ্ধ করি, মোরা একখানা ভালো ছবির জন্য যুদ্ধ করি।”(মুক্তিযুদ্ধের গান/গীতিকার: গোবিন্দ হালদার, শিল্পী, আপেল মাহমুদ) —–তার মানে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধু একখানা নিজস্ব ভূগোল আর রাজনৈতিক স্বশাসনের জন্যই ছিল না, একইসাথে সাংস্কৃতিক সমদ্ধি অর্জন ও স্বাত্যন্ত্র নির্মাণও আমাদের সমান গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল। স্বাধীনতার আগে ও পরে এই লক্ষ্য অর্জনের মূল কারিগর আমাদের কবি-কথাশিল্পী, নাট্যকার-চলচ্চিত্র নির্মাতা, কণ্ঠশিল্পী ও অভিনয়-শিল্পীগণ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ( যা আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ) এর অধিকাংশ মানুষ ধর্মের দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের স্বজাতি-স্বগোত্রীয় ছিলেন। কিন্তু তারা আমাদের আপন মনে করতেন না। তার মূল কারণটাই ছিল তাদের সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক ব্যবধান, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির নিজস্বতা। আসলে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের মধ্যেই আমাদের স্বাধীনতার বীজ রোপিত ছিল। কোনো দেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য দুর্বল হয়ে গেলে তার রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে যেতে বাধ্য। এটা লক্ষ করেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এখন বিশ্বব্যাপী “ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’’-কে সাম্রাজ্যবাদিতার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন, কেন সাহিত্য- সংস্কৃতির অঙ্গনের মানুষগুলো একটি জাতির জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম নয়, শুধু ভাষাও নয়, আসলে সমৃদ্ধ সংস্কৃতিই একটি জনগোষ্ঠীকে জাতিতে পরিণত করতে, স্বাধীন জাতিতে উন্নীত করতে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। তারাই একটি জাতির, একটি ভূগোলের প্রাণ-নদীর স্রোতধারার গতিদানকারী শক্তি। তানসেন- গালিব-আমির খসরু- লালন শাহ–রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-দিলীপকুমার- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়- অমিতাভ বচ্চন–শাহরুখ খান- মধুবালা-মীনাকুমারী-সত্যজিত রায়— কে আসিফ—কামাল আমরোহী-লতামুঙ্গেশকর-মহম্মদ রফি–তালাত মাহমুদ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-রবিশঙ্কর-বিসমিল্লহ খাঁ—বিলায়েত খাঁ—আকবর আলী খাঁ- নুরজাহান-মেহেদি হাসান- নুসরাত ফতেহ আলী খান-দেবব্রত বিশ্বাস– এ আর রহমান-আব্বাস উদ্দিন- ফিরোজা বেগম- হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-আবদুল আলীম (এবং এমন আরও অনেকেই)—–এই সংস্কৃতজনেরাই বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের স্বতন্ত্র পরিচিতির ধারার প্রাণভোমরা।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে তেমনি একজন গুণী ও অত্যন্ত শক্তিমান অভিনয়শিল্পী ববিতা। সেই প্রিয় নায়িকা ববিতার আজ জন্মদিন। বিশ্বচলচ্চিত্রে বোম্বের অভিনয়সম্রাট দিলীপ কুমার সূচিত Method Acting বা “জীবনধর্মী অভিনয়”-কে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠাদান, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীতকরণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তোলা, বাঙালি সংস্কৃতিকে সমদ্ধকরণ, নারীর মুক্তি ও ক্ষমতায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে একজন ববিতার অবদান শ্রদ্ধার সাথে আলোচনার, মূল্যায়নের এবং স্মরণ করার প্রয়োজন অপরিসীম। “আবার তোরা মানুষ হ”, ” পিচঢালা পথ”,” অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী” ” নয়নমণি”,” পোকামাকড়ের ঘরবসতি”,” সংসার” ” গোলাপী এখন ট্রেনে”,” স্বরলিপি”,” সুন্দরী “, ” জন্ম থেকে জ্বলছি”, মানুষের মন”, ” আলোর মিছিল” অশনি সংকেত” এমন আরও ডজন ডজন সিনেমার সফল এবং দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। বিশেষত সত্যজিৎ রায়ের ” অশনি সংকেত ” এ ” অনঙ্গ বউ” এর অভিনয় তাঁকে জগতজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল।

ববিতাই বাংলাদেশের একমাত্র সিনেমা নায়িকা যিনি আনন্দের বা বেদনার, লজ্জার বা উচ্ছলতার অনুভূতিকে উচ্চারণের সাথে সাথে বডি ল্যাংগুয়েজের মাধ্যমে ষোল আনা ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। লজ্জার অভিনয়ে লজ্জাবতী লতার ছবি এবং শারীরিক কামনার দৃশ্যে সেই রিরংসময়তাকে তিনি কেবল Facial expression দিয়ে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতেন যে, সেটা যদি সবাক না হয়ে নির্বাক যুগেরও চলচ্চিত্র হতো, তবুও দর্শক পুরো অনন্দ-বেদনার স্বাদ উপভোগ করতে পারতেন বলে আমার মনে হয়। আমি আর একজন অভিনেত্রীর অভিনয়ে এই বিষয়টি দেখেছি; তিনি হচ্ছেন হিন্দি ছবির ট্রাজেডি কুঈন খ্যাত মীনা কুমারী। ববিতা যদি বাংলাদেশে না জন্মে ভারতে বা ইউরোপে জন্মগ্রহণ করতেন, তবে তিনি তার অভিনয়-প্রতিভার যথাযথ বিকাশের সুযোগ পেতেন বলে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস।

আমাদের কৈশোর ও যৌবনকে কতভাবে নাড়া দিয়েছেন তিনি! আমি যখন রাজশাহী কলেজে ইন্টারমেডিয়েটের ছাত্র, ববিতা অভিনীত ছবি দেখে ভাবতাম, এমন কোনো মেয়ের সাথে প্রেম বা বন্ধুত্ব হলে কত না ভালো হতো ! ববিতা এবং আরও কিছু শক্তিমান অভিনয়শিল্পী থাকার কারণে তখন আমাদের বলিউড-হলিউড এর দিকে সারাক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকতে হতো না। হায়, সেদিন আবার ফিরে আসবে কবে! শুভ জন্মদিনে অনেক অনেক শ্রদ্ধা জানাই প্রিয় অভিনেত্রী ববিতা আপনাকে।

Comment here