কক্সবাজারপ্রধান সংবাদরোহিঙ্গা সংকট

বাংলাদেশের উদার মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা ও আন্তর্জাতিক ঐক্যের তাগিদ

সংগৃহীত ছবি

রাইজিং কক্স ডেস্ক : জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি ক্লেমেন্টস গতকাল বাংলাদেশে তাঁর চার দিনের সফর শেষ করলেন। কক্সবাজারের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎকালে তিনি চলমান মানবিক কার্যক্রম ও স্থানীয় বাংলাদেশীদের সহায়তায় নতুন অনুদানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি তরুণ ও নারীসহ অনেক শরণার্থীর সাথে কথা বলেন, এবং তাদের আশা-আকাংখা ও আরও কিভাবে ইউএনএইচসিআর তাদের সাহায্য করতে পারে তা নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করেন।

কেলি ক্লেমেন্টস ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন; এবং শরণার্থী ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের উদার মানসিকতার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় সামনের বছরেও বাংলাদেশের নেতৃত্বকে সাহায্য করার, সকল অংশীদারি সংস্থার কাজের প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করার, এবং এর সাথে ভাসান চর নিয়ে সরকারের সাথে যে কোন সময় গঠনমূলক আলোচনায় বসার জন্য ইউএনএইচসিআর-এর দৃঢ? প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে তাঁরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সমান্তরাল কাজের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। কেলি ক্লেমেন্টস মিয়ানমার সরকার ও অন্যান্য সকল পক্ষের সাথে মিলে শরণার্থীদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ ও সুষ্ঠ পরিবেশ তৈরিতে কাজ করার জন্য ইউএনএইচসিআর-এর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন।
কেলি ক্লেমেন্টস শেষবার বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে । এবারের সফরে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় মানবিক কর্মকান্ডের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পর্যেবেক্ষণ করেন। এর সাথে স্থানীয় বাংলাদেশী জনগণের উপর রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব ও মানবিক কর্মকান্ডের চ্যালঞ্জগুলো সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করা হয়। তিনি নয়াপাড়া ও কুতুপালং ক্যাম্পে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা প্রস্তুতি, রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনে তাদের ভলান্টিয়ারদের চলমান কাজ, এবং বাংলাদেশ সরকারের সাথে ইউএনএইচসিআর-এর যৌথ নিবন্ধন কার্যক্রমের ব্যাপক অগ্রগতি লক্ষ্য করেন। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সাথে ইউএনএইচসিআর-এর যৌথ নিবন্ধন প্রক্রিয়া প্রায় সমাপ্তের পথে; ইতিমধ্যে ৮০০,০০০-এরও বেশি রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে।

কুতুপালং রেজিস্ট্রেশন সেন্টার পরিদর্শনের পর কেলি ক্লেমেন্টস বলেন, “শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিরাট অর্জন। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও মানবিক সাহায্য পুরোপুরি নিশ্চিত করা যাবে । এদের অনেকের জন্যই এটি তাদের সারা জীবনে পাওয়া প্রথম পরিচয়পত্র।“
জয়েন্ট রেসপন্স-এর জন্য আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্বেও, যেখানে প্রয়োজনীয় ৯৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাওয়া গেছে ৬১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, মানবিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের ও স্থানীয় বাংলাদেশীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। কক্সবাজার সফরকালে কেলি ক্লেমেন্টস জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সাথে টেকনাফে স্থানীয় বাংলাদেশী জনগণের জন্য একটি নগদ অর্থ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।

ইউএনএইচসিআর ও ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ১৭০০ স্থানীয় পরিবারকে প্রায় ১২,৫০,০০০ মার্কিন ডলার নগদ আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য অতিরিক্ত সাহায্য দেয়ার মাধ্যমে এই কার্যক্রম বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম (সোশ্যাল সেফটি নেট স্কিম)-এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, “স্থানীয় বাংলাদেশী জনগণের জন্য এই সাহায্যের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ, এটি মানুষের জীবনে বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা ইউএনএইচসিআর-এর সাথে কাজ করে যাবো এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করবো।“

ইউএনএইচসিআর-এর ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি ক্লেমেন্টস ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে দেখা করেন। শরণার্থীরা তাঁকে জানান মিয়ানমারের রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়। তবে বেশিরভাগ শরণার্থীই তাঁর কাছে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন; যদি তাঁদের নিরাপত্তা, চলাফেরার স্বাধীনতা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়া হয়। কেলি ক্লেমেন্টস শরণার্থীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়াতে ইউএনএইচসিআর ও অংশীদার সংস্থাগুলোর চলমান কর্মকান্ডের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেন, এবং তিনি বলেন এটি প্রত্যাবাসনের পর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করবে সে দেশের সমাজে একীভূত হতে।

কেলি ক্লেমেন্টস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহবান জানান রোহিঙ্গাদের জন্য চলমান মানবিক কর্মকান্ডে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে, এবং সেই সাথে টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার সরকারকে সাহায্য করার জন্য।