স্মৃতি সঞ্চয়

সুলতান আহমেদ

পূর্ব প্রকাশের পর..

(বালুখালী বাজার ও গ্রাম)

দক্ষিনের সারিতে প্রথম দোকান একটি মুদি দোকান এর গোডাউন। তারপর দুটি স্বর্ণকারের দোকান। একজন স্বর্ণকার অন্নদা মোহন ধর শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান লোক ছিলেন। তার একটি হারমোনিয়াম ছিল। প্রায় সময় রাতে তিনি এটি বাজিয়ে গান করতেন। আবার সন্ধ্যায় তার দোকানের বারান্দায় মাটিতে ছট বিছিয়ে শিশুদের প্রাইভেট পড়াতেন। তার লাগোয়া বরদা সেন ও অমিয়সেন ভাইদের পারিবারিক ঘর ছিল ঘেরাবৃত। ঘরের সামনে বরদা সেনের চায়ের দোকান। স্বর্ণকারদের দোকানের সামনে একটি খোলা জায়গায় সাপ্তাহিক হাটের দিন খুচরা পানব‍্যাপারীগন পানভিড়া বিক্রি করতো। তার লাগোয়া তিনটি উত্তর মুখী দোকানের প্রথমটি মুদি দোকান, মাঝেরটি আবুলবশর সওদাগর এর মনোহারী দোকান। এটি যাবতীয় ষ্টেশনারী পণ্যের ষ্টোর।এতে বাটা কোম্পানির কাপড়ের জুতা, স‍্যান্ডল, খড়ম, খাতা কলম পেন্সিল, দোয়াতকালি সহ অন‍্যান‍্য সব ষ্টেশনারী পণ্য পাওয়া যেতো। এটি একমাত্র সেমিপাকা দোকান ছিল।তৎলাগোয়া পূর্ব পাশেরটি প্রথমে চা দোকান, পরে ষ্টেশনারী দোকান হয়।তারপর একটি ছোট পথ, এবং পরেরটি বরদা সেনের চা দোকান। এটাতে রসগোল্লা ও গোলখাজা তৈরী হতো যা খুব জনপ্রিয় ছিল।

এই গোলখাজা বিষয়ে আমাদের কৈশোর কালের এক মজার স্মৃতি আছে। আমরা তিন বাল‍্যবন্ধু প্রতি হাটবার অর্থাৎ রবিবার ও বুধবার সকালে সেদোকানের পিছনের বারান্দায় বসে সদ‍্য বানানো গরম খাজা খেতাম। ইকরামুল কবির চৌধুরী বাবলু, আবু বকর সিদ্দিক ও আমি এটা করতাম। বাবলু তখন তাদের জমিদারী কাছারি বাড়িতে থাকত এবং আমাদের সাথেই সময় কাটাতো। সে সব খরচের টাকা পরিশোধ করতো। আমরা দোকানের পিছনের পথদিয়ে ঢুকতাম এবং কারিগর খাজা কড়াই থেকে নামানোর পর চিনির সিরকায় ফেলার আগে এগুলি খেতাম। গরম মচমচে খাজা খুব সুস্বাদু লাগতো। কারিগরের সাথে গোপন বুঝাপড়ায় আমরা এ কাজ করতাম।

এ সারিতে দুটি দোতলা ভাতের হোটেল ছিল।একটি আলী সওদাগরের এবং অপরটি ওমর হাকিমের হোটেল। আলী সওদাগরের টি ছিল বাঁশের টেংরা ও তরজার পাটাতন বিশিষ্ঠ।নীচে ভাতবিক্রী হতো, উপর তলায় থাকার ব‍্যবস্থা ছিল।উক্ত দোতলায় এককোণে আলী সওদাগরের ছেলে মোহাম্মদ ইছলাম একটি কামরায় থেকে পড়াশোনা করতো। সে আমার এক ব‍্যাচ সিনিয়র ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমরা তখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী পুরনো বই অর্ধেক মূল্যে কিনতাম।পঞ্চম শ্রেণীর বই আমি তার কাছ থেকে কিনেছিলাম এবং তার সে কামরা থেকে সেগুলি সংগ্রহ করেছিলাম।

ওমর হাকিমের হোটেলটি কাঠের তক্তার পাটাতন বিশিষ্ট দোতলা দোকানছিল। এখানে ভাত বিক্রি হতো। এ হোটেলটিতে প্রায় সময় গ্রামোফোন বাজানো হত। তখন অন‍্য কোন দোকানে গ্রামোফোন ছিলনা। তাই এ দোকানে সবসময় লোকজন বেশী বসতো এবং বেচাবিক্রিও অধিক হতো। শেষ প্রান্তের হোটেলটি হাফেজ সদাগরের সস্তা ভাতের দোকান। তাই কম খরচে খাওয়ার জন্য সেখানে সাধারণ লোকজন বেশী খাওয়া দাওয়া করতো।তাঁর পুত্র রহমত আলী পঞ্চম শ্রেণীতে আমার সতীর্থ ছিল যদিও সে আমাদের থেকে বয়সে বড় ছিল।

সে সারির সামনের গলির উত্তর পাশের সারিতে প্রথমটি খিলিপান ও বিড়িসিগ্রেট বিক্রির দোকান, পরেরটি জুনুসদাগরের চা দোকান, তারপরেরটি আবদুল লতিফ মাস্টারের দোতলা ভাতের হোটেল। এটি নীচে ভাত বিক্রি ও কাঠের পাটাতনের ঢালাই বিছানা, এবং উপর তলায় দুটি পৃথক কক্ষে থাকার ব‍্যবস্থা ছিল।একটিতে চৌকি ও লেপ তোষক থাকতো। অভিজাত বা অফিসার শ্রেণীর ব‍্যক্তিগন অধিক ভাড়ায় এটি ব‍্যবহার করতেন।নীচের ঢালাই বিছানায় সাধারণ খদ্দেরগন বিনাভাড়ায় থাকতো। তিনি ভিন্ন জেলার লোক ছিলেন।তাঁর এক পুত্র ফরিদ প্রকাশ বশর চতুর্থ শ্রেণীতে আমাদের সাথে পড়তো।কিন্তু পঞ্চম শ্রেণীতে আমাদের আমাদের সাথে উত্তীর্ণ হয় নাই।অথচ তার বড়ভাই জাফর আলম সে শ্রেণীতে আমাদের সাথে পড়েছিল কিছুদিন।

তারপর দোকানটি আব্দুল বারেক এর বেকারী ও চায়ের দোকান। এ বেকারীতে সবধরনের বিস্কুট, কোকিজ, রুঝ, কেক ইত্যাদি পাইকারি ও খুচরা বিক্রি হতো। এর পরেরটি হাছুমিয়া সওদাগর এর দোতলা ভাতের হোটেল। নীচে ভাত বিক্রি ও উপরে তক্তার ঢালাই বিছানায় বিনা ভাড়ায় থাকার ব‍্যবস্থা ছিল। তাঁর পুত্র মনির আহমদ পঞ্চম শ্রেণীতে আমাদের সাথে পড়তো কিছুদিন। কিন্তু সে আমাদের চেয়ে বয়স্ক ছিল। সে হোটেলের পর একটি খালী দোকান মালপত্র রাখার জন্য ভাড়া দেয়া হতো। তারপিছনে হাফেজ সদাগরের বাড়ি।তারপর একটি লম্বা খোলা বাছাই যেখানে সময়ে মাছ ও অন্য কিছু রাখা বা বিক্রি হতো। তারপর নাফ নদীর শাখা খালে সাম্পানের ঘাট। এ ঘাট থেকে দক্ষিণে সব স্থানে টেকনাফ পর্যন্ত সাম্পানে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করা হতো।

বাজারের মধ্য গলির লাগোয়া পূর্ব পাশে অর্থাৎ বাজারের ঠিক মধ‍্যখানে কাঠের খুটি ও বাঁশের বেড়ায় দুপাশে বারান্দা সহ দোতলা দোকান। এটির মালিক ছিলেন বাজার প্রতিষ্ঠাতা রাজাপালং ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ও জমিদার মকবুল আহমদ চৌধুরী। বারান্দার ছোট ছোট দোকান গুলি ব‍্যবসায়ীরা ভাড়া নিয়ে দোকান চালাতো। দোতলায় থাকার ব‍্যবস্থা ছিল। নীচে অর্ধেক গোডাউন, বাকী অংশ খোলা দরবার কক্ষ। সেটিতে জমিদার বসার ও মিটিং ইত্যাদির জন্য ব‍্যবহার করতেন।

বাজারের মধ‍্যগলির দুপাশে মুদি দোকান ছিল।জমিদার এর দোতলা দোকানের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি বড়ো ঝাকড়া শিশু গাছ ছিল। এর পাশের বারান্দায় উত্তর কোণায় দোকানটি প্রথম দিকে মোঃ নছিম ও পরে খগেন্দ্রনাথ দাশ মুদি দোকান করতেন। তার ছেলেরা বর্তমানে কক্সবাজার এর দাশ ব্রাদার্স, দাশএন্ড সন্স, আস্বাধনী, রাণী ষ্টুডিও ইত্যাদি ব‍্যবসা করেন।তাঁর এক পুত্র বাবুল চন্দ্র দাশ পঞ্চম শ্রেণীতে আমাদের সাথে পড়তো। সে এখন কক্সবাজার শহরের দাশ ব্রাদার্স এর মালিক। তাদের বড়ভাই সাধন দাশ পরবর্তীতে আমাদের সাথ নাটকে অভিনয় করেছিলেন। খগেন্দ্রনাথ দাশের সামনে গলির পশ্চিম পাশে অমিয় সেন এর মুদি দোকান ছিল।এটি ছিল আমাদের পারিবারিক বাকীতে ক্রয়ের দোকান।এ দোকানে সার্বক্ষণিক বসতেন নির্মল সেন।তাদের অন‍্যভাই শম্ভু সেন হাটের দিন এ বাজারে অন‍্যত্র দোকান করতেন এবং অন‍্যান‍্য দিন দক্ষিনের অন‍্যান‍্য হাটে দোকান নিয়ে অস্থায়ী দোকান চালাতো।

মধ্য গলির উত্তর দিকের শেষ প্রান্তে দক্ষিণ পাশে ছিল তিনটি ছোট দোকান ঘর এবং উত্তর পাশে ছিল মজবুত কাঠের নির্মিত প্রায় ৮/১০ টি দোতলা পাইকারি ও খুচরা দোকান। দক্ষিণ পাশের প্রথমটি ছিল আগে কোরআন শরীফ ও ধর্মীয় বইয়ের দোকান পরে অন্য দোকান হয়। মধ্যেরটি ‘বালুখালী ঘাঠ’নামে শাখা পোষ্ট অফিস। পরে পশ্চিম পাশে স্থানান্তরিত হয়। শেষের টি গ্রামীণ এ্যলোপ‍্যাথ ডাক্তার অমিয় সেনএর চেম্বার কাম বাসা।

গলির পশ্চিম পাশের প্রথম দোকানটি ছিল চিত্তরঞ্জন দাশ ও যতীন্দ্র দাশের দোকান। নীচে মাঝখানে পথ রেখে দুপাশে কাঠের পাটাতনের উপর চৌকোনা তক্তার বক্সে মালের নমুনা রাখা হতো। পণ‍্যগুলি ছিল লোহার নানা সাইজের পেরেক, সীসার জালে ব‍্যবহৃত গুলি, তার, সুতলীওদড়ি; কেরোসিন, সরিষা, নারিকেলের তৈলের টিন, নানান বিস্কুটের টিন, নারিকেল ইত্যাদি পণ্য। উপর তলায় মালের গোডাউন হিসেবে ব‍্যবহার ও থাকার ব‍্যবস্থা। এ সারির সব দোকান এক প‍্যাটার্নের। শেষ প্রান্তের দোকানটি ছিল হৃদয় চৌধুরীর।মাঝখানে অমূল্য চৌধুরী ও নারায়নদের দোকান ছিল।

বাজার জামে মসজিদের প্রবেশ পথের দু দিকে দুসারি দোকান ছিল।দক্ষিণ পাশের গুলি সব দর্জির দোকান এবং উত্তর পাশে পথসংলগ্নটি ঈমাম মৌঃ মুহম্মদ ইসমাইল এর ধর্মীয় বই, কোরআন কিতাবের দোকান এবং অন‍্যগুলি নানা কাজে ব্যবহার হতো। এখানে একসময় কয়েকজন কাবুলীওয়ালা থাকত। তারা হাটের দিন এ বাজারে নানা ধরণের জিনিস বিক্রি করত, অন‍্যান‍্য দিন স্থানীয় এলাকায় ঘুরে ঘুরে মহাজনী ব‍্যবসা বা বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করত। এর সামনে তিন সারি খোলা বাছাই ছিল, যেগুলো রবি ও বুধবার হাটের দিন নানা পণ্য বিক্রির জন্য ব্যবহার হত।

এ বাজারের কাপড়, দর্জি, হোটেল ইত্যাদি মুসলিম ব‍্যবসায়ীরা সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এলাকার এবং হিন্দু ব‍্যবসায়ীগন পটিয়া, সাতকানিয়া বা অন্য স্থানীয় ছিল। বড় দোকান গুলিতে রাতে প‍্যাট্রোমেক্স বা মেন্টললাইট এবং বাকীগুলিতে হারিকেন ও ফুকবাত্তি জ্বলত। রাত ৯/১০টা পর্যন্ত লোক সমাগম থাকতো।

বাজারের পাইকারি ব‍্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম থেকে মাল এনে টেকনাফ পর্যন্ত প্রেরণ করতো।অজগ্রামে এটি গঞ্জের মতোই সরগরম থাকতো।

আরো উল্লেখ্য যে চিত্তরঞ্জন চৌধুরীর দোকানের পাশের গলি দিয়ে উত্তর দিকে গেলে পূর্ব পাশে দুটি কামারের দোকান এবং দক্ষিণ পাশে একটি কামারের ও একটি নাপিতের দোকান ছিল।এগুলির পাশে একটি টিউবওয়েল এবং পিছনে একটি পুকুর ছিল। এর পাড়ে ছিল এক বাজিগরের দোকান ও বাড়ি যেখানে আতশবাজি, হাউই,ফটকা ইত্যাদি তৈরী হতো। গলি বা ডি.সি রাস্তার পূর্ব দিকে একটি কাঠের উঁচু পাটাতনের উপর বেড়া ও গোলপাতার ছাউনির ক্লাব ঘর ছিল যেটি গ্রামের মেম্বার বুজুরুছ মিয়া অফিস হিসেবে ব‍্যবহার করতেন।

বালুখালী বাজার তৎকালীন পাকিস্তান আমলের শেষ কাল পর্যন্ত খুব জমজমাট ছিল। বাংলাদেশ আমলের শুরুর দিকে বালুখালী টু টেকনাফ রোডে বাসসার্ভিস শুরু হলে ক্রমশ এ বাজারের গুরুত্ব কমে যেতে থাকে। তখন হোয়াইক্ষং থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বাজার গুলি চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার থেকে সরাসরি মালামাল আনতে শুরু করে এবং নৌপথে যাতায়াত কমে যায় ‌। তাই বালুখালী বাজারের স্থায়ী দোকানদারের বেচাকেনা কমতে থাকায় তারা দোকান বন্ধ করে দিয়ে কেউ কেউ টেকনাফ বাজারে চলে যায় বা অন‍্যত্র দোকান সরিয়ে নিতে শুরু করে। তাই ১৯৭২-৭৩ সনের পর শুধু স্থানীয় বাজারে পরিনত হয়ে কিছুদিন চলার পর ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।এ বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বালুখালী গ্রামের উন্নত আবহ বা জৌলুস কমে যেতে থাকে।শহুরে বা গঞ্জের আবহ কমে গিয়ে অন‍্যান‍্য স্থানীয় গ্রামীণ অবস্থা সৃষ্টি হয়। উন্নত সমৃদ্ধ অবস্থা থেকে অনুন্নত পরিবেশে অবনতি ঘটে। (চলমান…)

আরো পড়ুন: স্মৃতি সঞ্চয় – পর্ব ১ (জন্ম ও জন্মস্থান)

লেখক : কবি ও প্রবীণ আইনজীবী
প্রকাশিত গ্রন্থ: ৭

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।