মাসউদের সপ্তম প্রয়াণ দিবসে এক টুকরো স্মৃতি

আলম তৌহিদ
আমার ছেলে আয়ান এবার দশম শ্রেণীতে। তার বয়স যখন চার, একদিন প্রশ্ন করে বাবা ‘কবি’ কি। আমি তাকে দুয়েকটা ছড়া-কবিতা শুনিয়ে বলেছিলাম, এগুলো যারা লিখে তারাই কবি। জানিনা সেদিন তার শিশুমন কতোটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছিল।

এই ঘটনার কিছুদিন পর ছেলেকে নিয়ে বেরিয়েছি বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। পথে মাসউদের সঙ্গে দেখা। শামসুর রাহমানের মহান পুরুষের মতো এক ঝাঁকা বাবরী দুলানো চুল, পরনে উজ্জ্বল কমলা কালারের শার্টের সঙ্গে জীবনানন্দের ধূসর রঙের মতো জীনস, পায়ে পুরানো চপ্পল, কাঁধে ঝোলানো কবিতার ব্যাগ, যেন এক স্বতন্ত্র নগর বাউল এসে দাঁড়াল আমার মুখোমুখি। আমি ছেলেকে বললাম, তুমি ‘কবি’ কে জানতে চেয়েছিলে না, ও হচ্ছে কবি।

আয়ান বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়েছিল মাসউদের দিকে। কারণ এটি ছিল তার জীবনে প্রথম ‘কবি’ দেখার অভিজ্ঞতা। আজ মাসউদ নেই। ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর অসুস্থ অবস্থায় পৃথিবীর সমস্ত কবিতাকে বিদায় জানিয়ে শুধু মৃত্যুকে নিয়েছে বরণ করে। যদিও জানি মৃত্যুই চূড়ান্ত সত্য, তবু কিছু শূন্যতা, কিছু বেদনার ভার আমাদের বয়ে যেতে হয়।
ছাত্র হিসেবে মেধাবী মাসউদের কবিতায় ছিল প্রখর অন্তর্দৃষ্টি। জীবনবোধে মার্ক্সিয় দর্শনের বিপ্লবী সৈনিক কবিতার ভিত্তিভূমিতে তুলে আনতে চেয়েছে মেটাফিজিক্সের সারৎসার। প্রকৃতি ও বাস্তবতার সাথে আত্মচৈতন্যের অপূর্ব সমন্বয় ঘটে তার কবিতায়। আমি এখানে তার কবিতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করব না। শুধু মাসউদের কবিতার কিছু সংরাগময় পংতি তুলে ধরব।

“ছুরত ধরে কাবু করে আদায় করেছো পাওনা,
মুখোশ খুলে চাবুক মেরে উৎসব করে নাও না
নির্বাক প্রাণ আমি, জিয়ে রাখি যন্ত্রণা।” (ছায়ালোক)

“এখনো কেন প্রতিদিন দেখতে হয়-’৭১এর নরঘাতক
সাম্প্রদায়িক ধর্ম ব্যবসায়ী অপশক্তির উত্থান?
জঙ্গীবাদ, মৌলবাদ, সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদী
বিশ্বায়নের নগ্ন খেলাঘর?” (চাই আরেকটি’ ৭১)

“অগাধ বিচ্ছেদ ভুলে অশ্রুকাতর চক্ষু তুলে হাসে
দ্বৈত মিলিত হই প্রতিদিনের নৈ:শব্দ্যিক কথোপকথনে।” (মাট অথবা মানুষ)

“অস্তিত্বের শেকড় বিসর্জনে গড়ে তোলা কাব্যপ্রাচীর
নৈঃশব্দ্যিক যোজনে ক্রমশ মূক হয় বৈশ্বিক নিয়মে
আমার ভেতরে আমাকে সারথি করে
উজান চিত্তে বাড়িয়ে তুলি সময়ের র্তীথ
চেয়ে রয় পড়শি সাগর আর বিশ্বাসী আদিনাথ।” (আত্মসন্ধান)

“আমার ভেতর সমুদ্র, সমুদ্রের ভেতর আমি,
সমুদ্র ও আমি মহাকালের যমজ সমকামী।” (সমুদ্র ও আমি)

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।