নিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

মাসউদ শাফি : এক জলভরা টলটলে অশ্রুবিন্দু

খালেদ মাহবুব মোর্শেদ

আকস্মিকভাবে অকালে চলে যাওয়া এক অভিমানী তরুণ কবি মাসউদ শাফিকে, তার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর, এক জল ভরা টলটলে অশ্রুবিন্দু বলেই প্রতীয়মান হলো আমার কাছে। শীত সকালে আলস্য জড়ানো শয্যায় মুঠোফোনে এ সংবাদ ভেসে এলে আমি তড়িতাহতের ন্যায় হতচকিত, হতবাক হই। স্বজন হারানোর বেদনায় এ প্রাণে রুদ্ধশ্বাস ছটফটানির যন্ত্রণা যে মর্মছেঁড়া টঙ্কার তুলেছে তা অনির্বচনীয়।

মাধ্যমিক স্তরে প্রখর মেধাবী কিশোর মাসউদ শিল্প ও সত্যের সংগ্রামে উজ্জীবিত হন। শিল্পের কোমল মুগ্ধতা আর বিপ্লবের দূরপ্রসারী স্বপ্নিক আগুন বুকে ধারণ করেই উচ্চ মাধ্যমিকের চৌকাঠ মাড়ান তিনি। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে সাম্যবাদী লাল পতাকার স্লোগানমুখর প্রতিবাদী মিছিলের উজ্জীবক কোরাস সন্তর্পনে তার চেতনায় ফুটিয়েছে কবিতার ফুল। তার মস্তিষ্কের কোটরে লতিয়ে উঠে শব্দশিল্পপ্রেম, শব্দে-শব্দে বিয়ে পড়িয়ে কাব্যকলার ধ্বনিস্থাপত্য গড়ে তোলার কাজে তিনি আত্মমগ্ন হন। এরপর নানাভাবে দিনে দিনে ভেসে যেতে থাকেন জীবনের নানামুখি স্রোতে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়ে তিনি সম্মানসহ স্নাতক হলেন। কিন্তু পাঠ সমাপ্ত করার ব্যাপারে তার মনোযোগ পাওয়া গেল না আর। প্রাতিষ্ঠানিক কোন কাঠামোতে নিজকে জড়ালেন না, আনুষ্ঠানিক কোন চাকুরীতে ঢুকলেন না। চাল-চুলোর তোয়াক্কা করলেন না। প্রাত্যাহিক যাপনে যাবতীয় অনিয়মকেই করে তুললেন নিজের নিয়ম। শুভাকাঙক্ষীদের সব ধরণের শুভ পরামর্শে সায় দিতেন। বলতেন, কিছু একটা করবেন। কিন্তু সে চেষ্টা কখনো করেছেন বলে শুনিনি। একেবারে উচ্ছন্নে যাওয়া, উদাসীন ও বাউণ্ডুলে একটা পিছুটানহীন জীবন তিনি নিছক জুয়ার মতো দু হাতে অনেকটা স্বেচ্ছায় উড়িয়ে গেলেন। মাসউদের জীবনের শেষ দশকের দিন যাপনের সাথে প্রায় হুবহু অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে ষাট দশকের দুই কবি নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসানের সাথে। কবি আবুল হাসান ২৯ বছর বয়সে জীবনের খেলাঘর ছেড়ে যান। মাসউদ শাফিও সম্ভবত প্রায় ২৯ বছর বয়সেই বিদায় নিলেন। আবুল হাসান শক্তিমান কবি ছিলেন। মাসউদের কলমেও শক্তি ছিল, তার ভাষা পরিশীলিত, তার পরিমিতিবোধ প্রশংসনীয়ভাবে লক্ষ্যযোগ্য। তবে ব্যবধান হলো হাসান নিজের লেখাজোকা অনেকটা গুছিয়ে ছিলেন। মাসউদ কিছু গুছিয়ে গেলেন না। অকাল প্রয়াত এ প্রাণবান তরুণ প্রথম দশক থেকেই উজ্জ্বল কাব্য পংক্তি রচনায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার লেখা বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশ পায়। কিন্তু মফস্বলবাস, কবি সুলভ যথার্থ আত্মঅহমিকাবোধ, লেখা প্রকাশের অতি আকূলতা না থাকা, আত্মপ্রচারে অনীহা ইত্যাদি কারণে তিনি জাতীয় ভাবে ব্যাপক পরিচিতি পাননি। জেলার পরিধিতে তিনি যথেষ্ট পরিচিতি ও খ্যাতি সম্পন্ন ছিলেন একজন তরুণ কবি হিসেবে। এ দেশে মফস্বলে বসে সাহিত্য চর্চার কিছু প্রতিকূলতা রয়েছে। মফস্বলবাসী কবি বা লেখক সমসাময়িক রাজধানী কেন্দ্রিক ডামাঢোল ও বিশেষ বিশেষ বৃত্তাবদ্ধতার বাইরে থাকেন বলে আলোচনারও বাইরে থাকেন অনেক সময়। আর কথিত কেন্দ্রে বসবাসের কারণে ও নানান রকম সাহিত্যিক দলবাজির অসিলায় অনেকে নিম্নমানের সাহিত্য সৃষ্টি করেও উঁচু খ্যাতির অধিকারী হয় বটে। তবে সে মেকী খ্যাতির আস্তর বড় ঠুনকো। সময়ের ডাস্টার ব্ল্যাকবোর্ড থেকে অযোগ্যদের চকের চকচকে অক্ষর মুছে দিতে কসুর করে না, সে বড় নির্মম। অন্যদিকে উঁচু মানের সৃষ্টিকর্ম একদিন প্রকৃত মূল্য পেয়েই যায়। সকল অবজ্ঞা-অবহেলা-পাশকাটানোর শেষেও সত্যিকার হীরক ক্রমশ: দ্যূতিমান হতে থাকে। এই দ্যূতিময় হীরকতুল্য সাহিত্য সৃষ্টির জন্যে আর যাই লাগুক, রাজধানীতে বসবাস করা লাগে না। বরং মফস্বলবাসের অন্য একটা সুবিধা আছে। তা হলো মফস্বলে যিনি লেখেন তিনি আসলে সৃষ্টিশীলতায় একা ও একক। তার কোন গোষ্ঠীদায় নেই। ঝাঁকের তেলাপিয়া হয়ে তাকে দল বেঁধে ঘুরতে হয় না। ঝাঁক ছাড়াই তিনি অবলীলায় স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল থাকেন। সময়ের গড্ডালিকায় ভেসে যাওয়ার কোন প্রবণতা তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। চেতনা ও যাপনের প্রাত্যহিকতায় আক্ষরিকভাবে শেকড়ে প্রোথিত থেকে একজন মফস্বলবাসী কবি বা লেখক নিজের কলমকে করে তুলতে পারেন স্নিগ্ধ ও দূরাভিসারী। মাসউদ শাফি এই সত্য উপলব্ধি ও বিশ্বাস করতেন দৃঢ় ভাবে। তাই আত্মপ্রচার দৌঁড়ে আত্মসমর্পনের চেয়ে তিনি আত্মনির্মাণের প্রয়াসেই অধিক আস্থাশীল হয়েছিলেন।

মাসউদ নিজের ব্যাপারে উদাসীন হলেও তার আত্মসম্মানবোধ ছিল টনটনে। স্বভাবে ছিলেন জেদী, রাগী ও নিরাপস প্রকৃতির। তাই বলে তার মধ্যে বিনয়ের অভাব ছিল, তা কিন্তু মোটেই নয়। অগ্রজ প্রতিমদের প্রতি যৌক্তিক আনুগত্য প্রদর্শনে কখনো কার্পণ্য করেননি। আবার অন্যায্যতা বা কারো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যমূলক মনোভাবের প্রতিবাদে সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া প্রকাশে কুণ্ঠিত হতেন না। তার এসব নিরাপস মনোভাবের কারণে পরিবারের সাথে সম্পর্কের বাঁধন একেবারেই এলিয়ে পড়েছিল।

মাসউদ শাফি বসবাস করতেন পর্যটন শহর কক্্সাজারে। মাথায় বাহারি বাবরি চুল আর কাঁধে ঝোলা বা ব্যাগ ঝুলিয়ে কখনো উদাস, কখনো চঞ্চল পায়ে শহরময় ঘুরে বেড়ানো ২৯ বছরের এ যুবক শহরবাসীর কাছে বিশেষ পরিচিত ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নের জেলা কমিটির সহ সভাপতি ও তরুণ কবি হিসেবে শহরের ভদ্র লোকেরা তাকে তো চিনতেনই, এর বাইরে সর্ব শ্রেণির লোকের কাছেও তিনি চেনা-জানা ছিলেন। শহরের পাগল ও ভিখারীদের জন্য তিনি দয়া প্রদর্শন করতেন। অনেক সময় নিজে ক্ষুধার্ত থেকে পকেটের শেষ দশ টাকার নোটখানা কোন ক্ষুধার্তকে অক্লেশে দিয়ে দিতেন। প্রশ্ন করলে বলতেন, ‘আমাকে তো কেউ না কেউ খাওয়াবে, তাকে কে দেবে?’ শহরের ভ্রাম্যমান রূপোপজীবীনিরাও তাদের লাঞ্চনা বা অসহায়ত্বের মুহূর্তে মাসউদকে সামনে দেখলে সহায় বোধ করতেন। এ ছোট শহরে পূর্ণ রজনী জেগে কাটানো এ তরুণের আনুগত্য করতো শহরের বেওয়ারিশ কুকুরেরাও। মাসউদের মৃত্যু শহরের সজ্জন সুধিবৃন্দকে যেমন মর্মাহত করেছে তেমনি এ সব প্রান্তজন ও প্রভূহীন প্রাণীদের মনকেও কী শোকাচ্ছন্ন করবে না? তাদের মনেও কী মাসউদের জন্যে একটা শূন্যতাবোধ দোলা দেবে না?

তার জীবনের শেষ দশ বছর সবচেয়ে অনিশ্চয়তার ভেতর অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু রাজনীতির আদর্শিক পতাকা আর কবিতা চর্চার ফল্গুধারা কখনোই তাকে ছেড়ে যায়নি। যখন যেখানে যে অবস্থায় থেকেছেন, লেখার কাজটা চালিয়ে গেছেন নিষ্ঠার সাথে। আগোছালো, বেহিসাবি, বরাবর ঠাঁইনাড়া এ তরুণের যাবতীয় লেখা-জোকাও তেমনি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খুবই স্বাভাবিক। সে সবের সবটা সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে গ্রন্থিত করাও বোধহয় এক কঠিন কাজ হবে।

সার্বিক ভাবে কবিতাচ্ছন্ন এ তরুণ এক দশকের বেশি সময় ধরে লিখে গেলেও আজোবধি তিনি অগ্রন্থিত। তার সমস্ত কবিতা আর গদ্য রচনা সমবায়ে একটা রচনা সমগ্র প্রকাশ একান্ত জরুরি। পাঠকের সামনে মাসউদ শাফির প্রতিভাকে তুলে ধরার এ দায়িত্বটা কি আমরা কেউ পালন করবো? মৃত মাসউদ শাফির সৎকার করার চেয়েও তার সৃষ্টিচিহ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ অনেক বেশি দরকারি কাজ। আমার বিশ্বাস, সেই দরকারি কাজটি আমরা কেউ না কেউ করবো।

তার অগ্রজপ্রতিম কবি হিসেবে মাসউদ আমার কবিতার প্রতি অনুরাগ পোষণ ও প্রকাশ করতেন অকুণ্ঠভাবে। আমার তৃতীয় ও শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘সম্পন্ন সাম্পান’ নিয়ে একটা বিস্তৃত আলোচনা লেখার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছিলেন স্বপ্রণোদিত হয়ে। আমার বই নিয়ে কখনো তাকে লিখতে বলিনি। তবুও তিনি আন্তরিক ইচ্ছা প্রকাশ করায় আমি খুশি হয়েছিলাম। যতটুকু জানি, সেটা আর লেখা হয়নি। তাই বলে কখনো ভাবিনি এমন অসময়ে তাকে নিয়েই আমাকে কলম ধরতে হবে। এ কর্মনিষ্ঠ, উদ্যমি ও সংগঠক তরুণের এমন অকাল প্রয়াণের বেদনা আমার মতো আরও অনেকের পক্ষেই সইবার মতো নয়। শহরের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও বিভিন্ন সাহিত্যিক সভা-সমাবেশের একজন সুদক্ষ সংগঠক হিসেবে বহুল খ্যাত এ তরুণ বড় অসময়ে, অবহেলায় জীবনকে বিদায় জানালেন। জোছনা এবং কুয়াশায় বিনা নোটিশে জীবনের কুহক থেকে হারিয়ে যাওয়া এ তরুণ কবির প্রতি স্নেহ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করি তারই পুষ্পপংক্তি স্মরণ করে:
‘আমার ভেতর সমুদ্র, সমুদ্রের ভেতর আমি,
আমি আর সমুদ্র মহাকালের যুগল সমকামী’। (মাসউদ শাফি : সুন্দর)

খালেদ মাহবুব মোর্শেদ: কবি ও প্রাবন্ধিক।