জাতীয়প্রধান সংবাদ

মিয়ানমারে নতুন ক্ষেপনাস্ত্র, উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ

মানবজমিন : শিগগিরই চীনের তৈরি স্বল্পপাল্লার এসওয়াই-৪০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপনাস্ত্রের প্রথম চালান গ্রহণের সবরকম প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের প্রতিবেশি মিয়ানমার। বেশ কয়েক বছর ব্যাপক আলোচনার পর এই ক্ষেপনাস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে।

কর্মকর্তা বলছেন, এসওয়াই-৪০০ পরিচালনার জন্য মিয়ানমারে কিছু প্রযুক্তিও স্থানান্তর করা হবে এবং এগুলো কেনার জন্য ঋণও দেয়া হচ্ছে।

২০১৮ সালের নভেম্বরে এয়ারশো চায়নায় এসব স্বল্পপাল্লার এসওয়াই-৪০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। এর আরেক নাম ডিএফ-১২এ। এর স্টান্ডার্ড কনফিগারেশনে আটটি কনটেইনারে সলিড-ফুয়েল মিসাইল থাকে।

কারখানাতেই এসব কনটেইনারে মিসাইল স্থাপন করে দেয়া হয় এবং কোনরকম রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বহু বছর এগুলো সংরক্ষণ করা যেতে পারে। উলম্বভাবে ক্ষেপনাস্ত্র উৎক্ষেপন করা হয় এবং এর পাল্লা ৪০০ কিলোমিটার। এসওয়াই-৪০০ ক্ষেপনাস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের ওয়্যারহেড ব্যবহার করা যেতে পারে।

এসওয়াই-৪০০ ক্ষেপনাস্ত্র জিপিএস/আইএনএস গাইডেন্স সিস্টেম সজ্জিত। চারটি কন্ট্রোল সারফেস ও স্যাবিলাইজিং পাখার সাহায্যে এটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যপানে উড়ে চলে। এর পাল্লা কমানো বাড়ানো যায়।
বিভিন্ন টার্গেটে একাধিক ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব।

মিসাইল ল্যান্সার ইউনিটগুলো ১৬ চাকার অত্যন্ত সচল ওয়ানশান মিলিটারি ট্রাক চেসিসের উপর বসানো। ট্রাকগুলো চলে ৫১৭ হর্স পাওয়ারের দিউজ ডিজেল ইঞ্জিনে। সড়ক পথে এর সর্বোচ্চ গতি ৭৫ কি.মি./ঘন্টা এবং সর্বোচ্চ ক্রুজিং রেঞ্জ ৬৫০ কি.মি.।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে কাতারের সশস্ত্র বাহিনীও চীনের কাছ থেকে এসওয়াই-৪০০ ক্ষেপনাস্ত্র সংগ্রহের কথা ঘোষণা করে। একই বছর কাতার ন্যাশনাল ডে প্যারেডে এই ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবস্থা প্রদদর্শিত হয়।

মিয়ানমার এই ক্ষেপনাস্ত্র সংগ্রহ করায় দেশটির সীমান্ত লাগোয়া বাংলাদেশের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে অনেক দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়ন চলছে।

ইয়াঙ্গুনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র বাংলাদেশী কূটনীতিক বলেন, মিয়ানমার নিশ্চিতভাবে একগুলো তার দেশের বিদ্রোহী বা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না। এগুলো শুধু আমাদের কথা মাথায় রেখে সংগ্রহ করা হয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর কারণে জাতিসংঘ তদন্তকারীরা গত বছর মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে যেসব কোম্পানি আর্থিক সহায়তা দেয় সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানায়।

জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী মিশনের এক রিপোর্টে দেখানো হয় কিভাবে রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংস দমন অভিযান চালানোর জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী তার ব্যবসা, বিদেশী কোম্পানি ও অস্ত্র চুক্তিগুলোকে ব্যবহার করেছে। ওই খেদাও অভিযানে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত দুটি প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১২০টি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৬০টি বিদেশী কোম্পানির লেনদেন রয়েছে।

মিশন প্রধান মারজুকি দারুসম্যান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে সরাতে পারলে অর্থনীতি যেমন উদার হবে তেমনি মিয়ামারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দ্রুততর হবে।

মিশনের রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৭ সালে ‘জাতিগত নিধন’ অভিযান শুরু হওয়ার পরের সপ্তাহগুলোতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে ৪৫টির মতো কোম্পানি ও সংস্থা ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি চাঁদা দেয়।

এতে আরো উল্লেখ করা হয় যে, শীর্ষস্থানীয় দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কেবিজেড গ্রুপস ও ম্যাক্স মিয়ানমার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বেড়া নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

জাতিসংঘ দল মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রির উপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও আহ্বান জানায়। এতে উল্লেখ করা হয় যে, দেশটির সংখ্যালঘু গ্রুপগুলো যখন মানবিক সঙ্কটে নিপতিত তখনও সাতটি দেশের বেশ কিছু কোম্পানি মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে।

রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৬ সাল থেকে চীন, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইসরাইল, ফিলিপাইন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের ১৪টি কোম্পানি মিয়ানমারকে জঙ্গিবিমান, আর্মড ফাইটিং ভেহিকেল, যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপনাস্ত্র ও ক্ষেপনাস্ত্র উৎক্ষেপক সরবরাহ করছে।

জাতিসংঘ উল্লেখ করে, এই অস্ত্র বিক্রি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যার রাইটস (আইসিসিপিআর)-এর পরিপন্থী। এর রাষ্ট্রীয় পক্ষ হলো উত্তর কোরিয়া, ইসরাইল, রাশিয়া ও ইউক্রেন এবং চীন হলো স্বাক্ষরকারী।

উল্লেখিত দেশগুলো কার্যকরভাবে মানবাধিকার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করে জাতিসংঘ।

(সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর)