গবেষণানিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

মুক্তিযুদ্ধে উখিয়ার শহীদ

কালাম আজাদ

বাঙালি হয়ে বাঙালি হত্যা, পাক হানাদারের তাবেদারী করে স্বদেশদ্রোহীতার নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনীসহ এ দেশীয় দোসররা। পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক কক্সবাজার দখলে নেওয়ার পর সামরিক চক্রের নিধনযজ্ঞের পর আবার নতুন করে আগুন জ্বালায় এই রাজাকার শান্তি কমিটির অশান্তিওয়ালারা। এদের আচরণ ও কার্যকলাপে বহু বাঙালি দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। বহু পরিবারকে করেছে সর্বহারা, অনেক বাঙালিকে ধরিয়ে দিয়েছে হানাদার দস্যুদের হাতে, মা বোনদের সতীত্ব নষ্ট করার সুযোগ করে দিয়েছে আবার নিজেরা সুবিধামত দলবল নিয়ে বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে নিজেদের সম্পত্তি বৃদ্ধি করেছে।
পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশিয় দোসর জাতি হিসেবে বাঙালিকে ধ্বংস করার অভিলাষে নৃশংস তৎপরতা চালায় তারই অংশ হিসেবে জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল ও জগন্নাথ হলে আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করে হলে থাকা সব ছাত্র ও কর্মচারীকে। জাতির মেধাবী সন্তানদের নিধনের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে হত্যার শিকার হন ছাত্র শিক্ষক এবং সিএসফি অফিসার। হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক হামলার প্রথম টার্গেটেই হত্যার শিকার হন এটিএম জাফর আলম ( মুক্তিযোদ্ধার আইডি নং- ০২০৬০৫০০৪১, গেজেট নং ৩৩১)।
পুরো নাম আবু তাহের মোহাম্মদ জাফর আলম। উখিয়া উপজেলার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের রুমখাঁপালং গ্রামের ছৈয়দ হোসাইন মাস্টারের সন্তান তিনি। ১৯৪৭ সালের ৫ মে জন্ম গ্রহণকারী এটিএম জাফর আলম ১৯৬৪ সালে মহেশখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্টিক, ১৯৬৬ থেকে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে অনার্স এবং ১৯৭০ সালে মাস্টার্স পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে ১ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। অনার্স পাশের পর তৎকালিন কায়েদে আজম কলেজে (পরে সোহরাওয়ার্দী কলেজ) খণ্ডকালিন অধ্যাপক হিসেবে মহান শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি।
চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত হন এবং কলেজ শাখার দপ্তর সম্পাদক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একজন একনিষ্ট কর্মী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নকালে তিনি ইকবাল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হল) হলের ৩০৩ নম্বর কক্ষে থাকতেন এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ওই হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ও হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে হল বার্ষিকী ‘কষ্টি পাথর’ সম্পাদনা করেন।
১৯৭০ সালে তিনি ছাত্রলীগ কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য হিসেবে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। অংশগ্রহণ করেন ৬ দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে, ৭০ এর নির্বাচনে রামু-উখিয়া-টেকনাফে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।
ছয় দফা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকালে তিনি পাকিস্তান সরকারের পেটুয়া বাহিনী কর্তৃক ধৃত হয়ে চরম নির্যাতনের শিকার হন এবং তাতে তার মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাতজনিত ফ্র্যাকচার হয়। দীর্ঘদিন অর্ধ শরীরে প্ল্যাস্টার নিয়ে তিনি কাল যাপন করেন এবং এই ফ্র্যাকচর নিরাময়ে নিদারুণ কষ্ট স্বীকার করেন।
তৎকালিন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (সিএসপি) পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে এসডিও হন। ২৪ মার্চ ১৯৭১ নোয়াখালী জেলায় যোগদান পত্র গ্রহণ করার পরদিন ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার প্রাক্কালে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাক হানাদারেরা নিরস্ত্র বাঙালির উপর নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।
একাত্তরের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় ইকবাল হল তথা জহুরুল হক হল থেকে। (বস্তুত ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময় থেকে ওই ছাত্রাবাসটি ছিল স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের সদর দপ্তর বিশেষ।) সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের ঐতিহাসিক গণরায়কে নস্যাৎ করার জন্য ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান বেতার ঘোষণার মাধ্যমে ৩ মার্চ ঢাকায় আহূত জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যে অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হয়, স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ একাত্তরের মার্চ মাসে ধাপে ধাপে তা স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় বঙ্গবন্ধু এক রাতে ইকবাল হলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে এক অঘোষিত সভায় মিলিত হন বলে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তাঁর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর’ নামক বইতে উল্লেখ করেন।
তাছাড়া এটিএম জাফর আলমের ছোট ভাই বাংলাদেশ সরকারের সদ্য বিদায়ী মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম ‘স্বাধীনতার প্রথম প্রহরের শহিদ এটিএম জাফর আলম সিএসপি’ নামক প্রবন্ধে জাফরের বন্ধু মো. হোসেন সেরনিয়াবরাতের বরাত দিয়ে ১৯ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁকে (এটিএম জাফর আলম)কে জরুরিভাবে ডেকে পাঠিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহী পত্র তৎকালিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় (১৯২০-২০১০) ও সমামনা নেতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য প্রেরণ করেন বলে উল্লেখ করেছেন। মোহাম্মদ শফিউল আলমের ভাষ্যমতে-
‘বঙ্গবন্ধু ১৯ মার্চ জাফর আলমকে জরুরিভাবে ডেকে পাঠালে তিনি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে হাজির হন। তখন বঙ্গবন্ধু তাঁকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহী পত্র দিয়ে তদানীন্তন পশ্চিমভঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্ধ শংকর রায় ও সমমনা নেতৃবৃন্দের কাছে প্রেরণ করেন। ঐ বার্তাটি পৌছিয়ে দিেেয় তিনি ২৫ মার্চ রাত আনুমানিক ১০টার দিকে হলে ফিরে আসেন। শ্রমসাধ্য ও কঠিন যোগাযোগ ব্যবস্থার সেই দীর্ঘ সফরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর গায়ে ছিলো ১০৩/১০৪ ডিগ্রি জ¦র। সেই জ¦র নিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন বলে তার বন্ধু মো. হোসেন সেরনিয়াবাতের কাছ থেকে জানা যায়।
কিন্তু কিভাবে কোন মাধ্যমে কোন পথে গিয়ে পত্রাদি সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে পাঠিয়েছিলেন তা তিনি উল্লেখ করেননি। তাছাড়া মোহাম্মদ শফিউল আলমের লেখায় সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে পশ্চিমভঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলা হয়েছে। অথচ ১৯৭১ সালে তিনি ভারতের শিক্ষা ও যুব কল্যাণমন্ত্রী। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯ মার্চ ১৯৭২। সেই থেকে ১৯৭৭ সালের ২১ জুন পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মোহাম্মদ শফিউল আলম যে সময় বঙ্গবন্ধুর পত্র নিয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা চালু থাকায় কোনো মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না। তবে ২ এপ্রিল ১৯৭১- ২৮ জুন ১৯৭১ সময় কালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ (১৮৯১-১৯৮৩)।
পাকিস্তান বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল জহরুল হক হল। পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে পাক বাহিনী ২৫ মার্চ কালে রাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে অপারেশনের নাম দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সৌভাগ্যবশত ২৫ মার্চ মধ্যরাতের আগে প্রায় সব ছাত্রনেতা ও কর্মী হল ছেড়ে চলে যান। কক্সবাজারের কৃতি সন্তান আবু তাহের মোহাম্মদ জাফর আলমও ২৫ মার্চ রাতে চলে আসার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার ডাক তাকে আসতে বাঁধা দেয়। সেদিন রাত থেকে ২৬ মার্চ সারাদিন ওই হলে নীলক্ষেত রোড থেকে মার্টার, রকেট, লষ্ণার রিকলেস রাইফেলস এবং ভারী মেশিন গান ও ট্যাংক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ পরিচালিত হয়। এ সময় এটিএম জাফর আলম অন্যান্য স্বাধীনতাকামী ছাত্রনেতাদের নিয়ে ইকবাল হলে অবস্থান করেছিলেন। সেদিন রাইফেল দিয়ে হানাদার বাহিনীর আক্রমণকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু পাক বাহিনীর হামলায় ইকবাল হলে শহীদ হন। , জাফরকে তিন তলা থেকে টেনে হিচড়ে নামাতে নামাতে মেরেছে। নিচতলায় এসে জাফরের মাথা ফেটে যায়। এবং তার মগজ বেরিয়ে সিড়ির সাথে লেগে থাকে। ’ তারই সাথে উক্ত হলের মেধাবী ছাত্র, ছাত্রলীগের কেন্দ্রিয় সংসদের সহ-সভাপতি সাংবাদিক চিশতি শাহ হেলালুর রহমান, সালেহ আহমদ মজুমদার, জাহাঙ্গীর মনির, আবুল কালাম, মো. আশরাফ আলী খান, আবু তাহের পাঠান এবং শামসুদ্দিন ও আবদুল জলিল নামের ২ কর্মচারীসহ নাম না জানা আরো অনেকেই। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেএম মুনির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের বাষিক প্রতিবেদনে ইকবাল হলে ২০০ জন শহীদ হন বলে উল্লেখ করেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ওই তালিকায় এটিএম জাফর আলম পাওয়া যায়নি। তবে এটিএম জাফর আলমসহ ৭জনের নাম সার্জেন্ট জহরুল হলের স্মৃতিফলকে উৎকীর্ণ রয়েছে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এটিএম জাফর আলমের একান্ত বন্ধু যুদ্ধকালীন ছাত্রলীগ নেতা চলচ্চিত্র নায়ক সোহেল রানা তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির শহীদ বলে বিভিন্ন টক শো, সাক্ষাৎকার এবং লেখায় উল্লেখ করেন। ১৯৭১-৭২ সনের ইকবাল হল ছাত্র সংসদের ভিপি মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা) ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় ‘সে রাতে জাফর ও চিশতীকে হারালাম’ নামক এক স্মৃতিকথায় বলেন-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল। বর্তমানের সার্জেন্ট জহরুল হক হল। ২১৬ নম্বর রুমের আবাসিক ছাত্র ছিলাম আমি। মার্চের ২৫ তারিখ রাত সাড়ে ১০ টায় দেখা হলো জাফরের সঙ্গে। ইকবাল হল ছাত্র সংসদের নেতা। স্বাধীনতার প্রচণ্ড সমর্থক। মিছিল মিটিং সাংগঠনিক কাজে তার অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো। তবে রাজনীতির উগ্রতা বা হিংসা সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলতো। প্রকৃতপক্ষে সে ছিল ঠান্ডা মেজাজের ছেলে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে রাজনৈতিক তীব্রতা বাড়তে থাকলে জাফর আলম দেশে চলে যায়। তার গ্রামের বাড়ি সুদূর উখিয়ায়। মার্চের ১০ তারিখ হলের করিডোরে দেখি জাফর আলম। বলে, পারভেজ ভাই- আমি কিছুই সহ্য করতে পারছি না। যুদ্ধ করবো, গ্রামে থাকা কি যে অসহ্যকর- তোমরা সবাই ঢাকায়। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনা বাহিনী ইকবাল হলে ট্রাঙ্ক দিয়ে আক্রমণ করে আর জাফর আলম সরাসরি স্পট ডেড হয়। জাফরের কথা মনে হলে আজো মন কেমন করে। হলে থাকার কথা আমার-ওতো বেরিয়েই গিয়েছিল কিন্তু হলো উল্টো। হলে থেকে গেলো জাফর-আমি চলে এলাম বাইরে।’
‘চোখের সামনে ভেসে উঠলো জাফরের নির্মম দৃশ্য’ শিরোনামের আরেকটি লেখায় বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নায়ক সোহেল রানা হলের দারোয়ানের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন-
জাফরকে তিন তলা থেকে টেনে হিচড়ে নামাতে নামাতে মেরেছে। নিচতলায় এসে জাফরের মাথা ফেটে যায়। এবং তার মগজ বেরিয়ে সিড়ির সাথে লেগে থাকে। দেশ শত্রুমুক্ত হলে যখন ইকবাল হলে যাই, দেখলাম সেই মগজ শুকিয়ে গেছে। ’
শহীদ অধ্যাপক এটিএম জাফর আলম বিবাহে বাগদত্তা ছিলেন বলে শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ ও ড. রীটা আশরাফ লিখিত ‘স্বাধীনতা আনল যারা’ নামক বই এবং কালাম আজাদ লিখিত ‘ মুক্তিযুদ্ধে কক্সবাজার : জানা অজানা তথ্য-নামক গবেষণায় উল্লেখ আছে। এছাড়া এ অঞ্চলের আরেক কৃতিসন্তান কবি সিরাজুল হক সিরাজ শহীদ এটিএম জাফর আলম ও তার মা নিয়ে করুণ কাহিনি নিয়ে ‘শহীদ জাফরের মা’ নামে একটি হৃদয় বিদারক কবিতা লিখেছেন। যেটি দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপানো হয়েছে।
২০১২ সালের ৫ মে দীর্ঘ ৪১ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক শহীদ এটিএম জাফর আলমের ছোট ভাই, তৎকালিন রাষ্টপ্রতি কার্যালয়ের সচিব (পরে মন্ত্রী পরিষদ সচিব) মোহাম্মদ শফিউল আলমের কাছে এটিএম জাফর আলমের বিএসসি অনার্স (১৯৬৯) ও এমএসসি (১৯৭০) পরীক্ষার সার্টিফিকেট হস্তান্তর করেন। মুক্তিযুদ্ধে অমর অবদানের জন্য এটিএম জাফর আলমকে স্বাধীনতা পদক-২০১৯ (মরণোত্তর) প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।
শহীদ এটিএম জাফর আলম’র স্মৃতিকে ধরে রাখার লক্ষ্যে রুমখাপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘শহীদ এটিএম জাফর মিলনায়তন’, মাহমুদুল হক চৌধুরী উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালে রেজু খালের সড়কটিকে শহীদ জাফর আলম সড়ক এবং গত জোট সরকারের আমলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, সড়ক ও রেলপথ বিভাগ সজস-৩ শাখা প্রজ্ঞাপন তারিখ ৫ জানুয়ারি ২০০৯ নং সওরে/সজস-৩/১এম-৮০/ ৯৭-১৩ কক্সবাজার লিংকরোড থেকে টেকনাফ পর্যন্ত (৭৯.০০ কিলোমিটার) আরাকান সড়কের নাম পরিবর্তন করে শহিদ এটিএম জাফর আলম আরাকান সড়ক হিসেবে নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশ গেজেট, ৮ জানুয়ারি ২০০৯-এ অন্তর্ভূক্ত আছে এটিএম জাফর আলম আরাকান সড়কের নাম। কক্সবাজার- টেকনাফ আরাকান সড়কটি এখন শহীদ এটিএম জাফর আলম সড়ক। লিংকরোডস্থ বেতার ভবনের সামনে এ সড়কের নিমিত স্মৃতিসোধ রয়েছে একটা। তাছাড়া মোহাম্মদ শফিউল আলম মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকাকালে রামু উপজেলার খুনিয়া পালং এলাকায় শহীদ এটিএম জাফর আলম মাল্টিডিসিপ্লিন অ্যাকাডেমি, উখিয়া উপজেলার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের ক্লাস পাড়ায় শহীদ এটিএম জাফর স্কুল এণ্ড কলেজ, কোটবাজারস্থ শহিদ এটিএম জাফর আলম বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র ও লাইব্রেরি, তার নিজ বাড়িতে শহিদ এটিএম জাফর আলম ডায়াবেটিক ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে।

দীপক বড়ুয়া
দীপক বড়ুয়ার বাবা ব্যবসায়ী বিজয়শ্রী বড়ুয়া চৌধুরী আওয়ামী লীগের সমর্থক। স্বাধীনতার উত্তাল দিনগুলোতে এনায়েত বাজার মন্দির সংলগ্ন তথা বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর পাশেরই বাসা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আস্তানা। পড়তেন চট্টগ্রাম সিটি কলেজে। ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন (এনএসএফ) নামে একটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসময় মাহবুবুল আলম দোলন গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে কাজ করছিলেন তিনি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক শহীদ আবদুর রব ও বশরুজ্জামান চৌধুরী, মাহবুবুল আলম চৌধুরী, এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো বন্ধুত্বের কারণে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। লেখক খুরশীদ আনোয়ার চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় দীপককে ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে দেখেছেন। খুরশীদ আনোয়ার ‘দীপক বড়ুয়া, স্বাধীনতার প্রারম্ভিক দীপ’ লেখায় বলেন, ‘কলেজে তখন ছাত্রলীগের জয় জয়কার। সেই সুত্রে আমি দেখেছি ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে। আমি তাকে কখনো প্রশ্ন করিনি সে ছাত্র হিসেবে ছাত্রলীগ না ছাত্রলীগের সমর্থক হিসেবে ছাত্রলীগ। তবে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠক হিসেবে সে যে একজন আওয়ামী লীগের নিখাদ সমর্থক এবং কর্মী ছিল তাতে সন্দেহ নাই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা দীপক বড়ুয়া। তাঁর স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগদান আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম গণহত্যার প্রতিবাদে ষোলশহর সেনানিবাসের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। তাঁরা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল (ইপিআর) বাহিনীর সঙ্গে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্য ও ইপিআর বাহিনীর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে রসদ সংগ্রহে নেমে পড়েন দীপক বড়ুয়া, জাফর আহমদ, বশরুজ্জামান চৌধুরী ও মাহবুবুল আলম চৌধুরী। সেনানিবাস থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা বিদ্রোহ করে বেরিয়ে পড়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী চট্টগ্রাম শহর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
কাজীর দেউড়ী স্টেডিয়ামের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত নৌ ভবনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যরা পরপর দু’দিন দু’টি অঘটন ঘটায়। নৌ ভবনে অবস্থান নেয়া পাকিস্তানি সৈন্যরা ২৭ মার্চ ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন ও মোছলেম উদ্দিনকে আটক করার পর নির্যাতন চালায়। মুক্তিযুদ্ধের তৃতীয় দিনে ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি দল বিমান অফিসের পেছনের গলি দিয়ে মেথর পট্টি হয়ে এবং লাভ লেইন দিয়ে ডিসি হিলে উঠে অবস্থান নিয়ে শিকারের অপেক্ষায় ওঁৎপেতে বসে ছিলো। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলতে থাকা পাক হানাদার বাহিনী ও বাঙালি সৈন্যদের যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বহু সৈন্যকে খতম করে। যুদ্ধ যখন চলছিল তখন ২৮ মার্চ প্রতিদিনের মতো দীপক বড়ুয়া ও তার তিন বন্ধু জাফর আহমদ-বশরুজ্জামান মাহবুবুল আলম চৌধুরী গাড়ি নিয়ে বশর-জাফরদের বাড়ি আন্দরকিল্লা থেকে মোমিন রোড হয়ে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন ইপিআর বাহিনীকে সরবরাহ করার জন্য। মোমিন রোডে চেরাগি পাহাড় চত্বর এলাকায় হঠাৎ পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি পড়ে যান তাঁরা। চেরাগী পাহাড়ের সামনে আসতেই হায়েনারা গুলি করে গাড়ি থামিয়ে দেয়। গাড়িতে থাকা চার তরুণ পাক হানাদার বাহিনীকে ইপিআরের সদস্য মনে করে ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুনেই হানাদার বাহিনী দীপক বড়ুয়া ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর ছুঁড়তে থাকে মুহুমুর্হু গুলি। আর সেখানেই শহীদ হন তাঁরা। তাদের বুকে তাজা রক্তে ভেসে যায় রাজপথ।
দীপক বড়ুয়া স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করায় দালাল ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার সহযোগীরা দীপক বড়ুয়ার বাবা বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সহ সভাপতি চট্টগ্রাম শহরের দোকান ও গ্রামের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।
দীপক নামের পেছনে বড়ুয়া পদবী থাকলেও কোনো ধর্মাবলম্বী মনে হতো না। একজন আপাদমস্তক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। চট্টগ্রাম সিটি কলেজে পড়ার সময় তার সাহসকে উপড়ে ফেলে আসা অনেকের পক্ষে ছিলো প্রায় দুঃসাহস।
লেখক খুরশীদ আনোয়ার দীপক বড়ুয়ার একজন বন্ধু হিসেবে তাকে মূল্যায়ন করেছেন বেশ। স্বাধীনতা উত্তর কালে খোরশেদ আনোয়ারের আবাসিক অবস্থান ও দীপকের আবাসস্থান ছিলো খুব কাছাকাছি। খোরশেদ আনোয়ার দীপক বড়ুয়া সম্পর্কে বলতে তিনি লিখেন,
‘স্বাধীনতা উত্তর কালে আমার আবাসিক অবস্থান ও দীপকের আবাসস্থল খুব কাছাকাছি ছিলো। সে সুবাদে পারস্পরিক আবদার আর অধিকারের সীমা ছিল অন্তহীন। প্রতিদিন দুজনের সাক্ষাৎ কোনো না কোনো ভাবে ছিল অবশ্যাম্ভাবী। সুতরাং জীবনের একাধিক ঘটনার স্মৃতি তার জীবনের সঙ্গে আমার জীবন এক হয়ে আছে। দীপক পাহাড় ভালোবাসতো। প্রতি সপ্তাহ অন্তে রাঙামাটি যেতে উদগ্রীব হয়ে উঠতো। আমি সঙ্গে না গেলে যেন তার কিছুই হবে না। আমিও পাহাড় বিলাসী। প্রকৃতি আমাকে ভাবাতো। ফলে এ ছিল যুগল আকাঙক্ষার মহান মিলন।
এক চাকমা বাড়িতে আমরা উঠতাম দুজনে। পরিচয় দীপের কারণে, আমি কাউকে চিনি না। এক পরিবারের দুটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। খুব আবছা হলেও মনে পড়ছে, একজনের নাম সবিতা ও অন্যজনের নাম নমিতা। দুজনের মধ্যে নমিতা না সবিতা কাকে যে ভালোবাসতো, এ মুহুর্তে মনে পড়ছে না। আমকে সঙ্গে করে নেবার একটাই তার মূল উদ্দেশ্য; তা হলো আমি যেন তার দুঃখের ইতিহাসটুকু কখনো লিখি। তার দুঃখের কারণ আমি খুঁজে পাই নি। সম্ভবত এও হতে পারে যে সে হয়তো তার পরবর্তী পরিণতি আঁচ করতে পারতো। হয়তো সে রকম চিন্তা এসে যে সে দীর্ঘজীবী হবে না। নমিতা সবিতাকে নিয়ে সৃষ্ট প্রেম জড়িত ভাবনা আমাকে অনেক অপ্রার্থিত ঘটনার সঙ্গে একীভূত করেছে, বিব্রত হয়েছি তার অতিমাত্রায় আবেগ-তাড়িত কার্যকলাপে। তখন কিন্তু মনে হয়নি এই আবেগতাড়িত যুবকই একদিন হবে স্বাধীনতার সূচনা পর্বের প্রধানতম সৈনিক ।
মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী জানান, মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ এই ৪ ছাত্রনেতার জন্য একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের আবেদন-নিবেদন নিয়ে সাবেক এমএনএ আবু সালেহ, অ্যাডভোকেট এমদাদুল ইসলাম, আমি, কালাম চৌধুরী, দীপক বড়ুয়ার ভাই বাপ্পী, মাহবুবুল আলমের ভাই শামসুল আলম চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রী, মেয়র, জেলা প্রশাসকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু চার শহীদের জন্য বিশ হাত জায়গাও পেলাম না। অবশ্য ২০১৪ সালে চেরাগী পাহাড় এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়। স্মৃতিফলক উদ্বোধন করেন চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান।

নুর আহমদ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শহীদ নুর আহমদ। উখিয়া ভালুকিয়া পালংস্থ খলু বাপের পাড়ার আশরাফ আলী ও কুলসুমার সন্তান তিনি। পারিবারিক অবস্থা তেমন ভালো না থাকায় সংসার চালাতে টিউবওয়েল মেকানিকের কাজ করতেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে কাজের অন্বেষণে সন্দ্বীপে যান। সন্দ্বীপে থাকাকালে শুরু হয় একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন। স্বাধীনচেতা বাঙালি নুর আহমদ, আবুল হোছেন, দুদু মিয়াসহ আরো কয়েকজন মিলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে এ অসহযোগ আন্দোলনে শরীক হন। ৮ মার্চ হাবিলদার আছাদের প্রশিক্ষণে শুরু হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেল চালানো প্রশিক্ষণে নুর আহমদও অংশ নেন। ২৫ মার্চ ভয়াল কালো রাতে পাক হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধুও স্বাধীনতার ডাক দেন। এ ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে নুর আহমদও কুমিরার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। মেজর রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে কুমিরায় শুরু হওয়া প্রথম প্রতিরোধ আন্দোনে শরীক হতে রওয়ানা দিলেও পথিমধ্যে পাক বাহিনীর বহরে পড়ে যান। কোনোক্রমে বেঁচে গিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ৩০ মার্চ সন্দ্বীপ কালাফানিয়া এলাকা থেকে ভালুকিয়ায় নিজ বাড়ি ফেরার পথে সন্দ্বীপ কুমিরাঘাট আসামাত্রই পাক বাহিনীর নজরে পড়ে। সঙ্গে থাকা অস্ত্র, টিউবওয়েল মেকানিকের বড় বড় যন্ত্র দেখে এ পাক বাহনী তাদের গতিরোধ করে। গতিরোধ করার সাথে নুর আহমদ পাক বাহিনীকে দেখার সাথে তেলেবেগুনে রেগে গিয়ে পাকবাহিনীর দিকে যন্ত্র ছুড়ে মারে। পরপরই শুরু হয় পাক হানাদার বাহিনীর অটোমেটিক মেশিনগানের উপর্যপুরি বর্ষণ। এমনভাবে উপর্যুপরি গুলি করা হয় যে নৌকা পড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়ে যায়। পাক বাহিনীর উপর্যুপুরি গুলিতে সঙ্গে ১৮ জন যাত্রীর মধ্যে নুর আহমদ, আবুল হোছেন, আলী আহমদ, দুদু মিয়া, গুরা মিয়া নৌকা থেকে পড়ে যান। আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় নি। পরে বাকী ১৩ জন যাত্রী ভাসমান নৌকা নিয়ে ঢেউয়ের তালে তালে ফের সন্দ্বীপের ঘাটে ফিরত যান। সেখানেও গিয়ে রাজাকারদের লাঞ্চনা গঞ্চনার শিকার হতে হয় বেঁচে যাওয়া ওই যাত্রীদেরকে। অবশেষে টিউবওয়েল নির্মাণ শ্রমিক বলে বোঝাতে সক্ষম হওয়ায় তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৩ জন যাত্রীর মধ্যে নুর আহমদের শ্যালক বশির উল্লাহও ছিলেন। রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনীর থাবা থেকে বেঁচে দীর্ঘ এক মাস পর ভালুকিয়ায় তার বাড়িতে আসেন এবং নুর আহমদ, আবুল হোছন, আলী আহমদ, দুদু মিয়া এবং গুরা মিয়া যুদ্ধে শহীদ হওয়ার ব্যাপারে তাদের পরিবারকে জানান। বশির উল্লাহ এখনো বেঁচে আছেন। তিনি এখনো খলুবাপের পাড়াস্থ নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন। ওই দিনের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বলেনÑ
‘কালাফানিয়া’ এলাকা কুমিরা ঘাটে আসার পথে রাজাকারদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে পথে। অবশেষে কোনোক্রমে বেঁচে কুমিরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে এবং সুবিধা না হলে নিজ এলাকায় নিরাপদে থাকার লক্ষ্যে সন্দ্বীপ ঘাট থেকে কুমিরা ঘাটের দিকে রওয়ানা হয়।কুমিরাঘাটে আসামাত্র নৌকায় আমাদের হাতে মেকানিকের যন্ত্র Ñঅনেকের হাতে রাইফেলও ছিলো। তা দেখতে পেয়ে ঘাটের অদূরে থাকা পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা আমাদেরকে উপর্যুপুরি গুলি ছুঁড়ে। গুলিতে আমার দুলাভাই নুর আহমদ, আমাদের এলাকার আবুল হোছন, দুদু মিয়া গুরা মিয়া নদীতে পড়ে যান। আর তাদের খোঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা যারা ওই নৌকায় ছিলাম তারাও কোনো রকম ভাসতে ভাসতে আবার সন্দ্বীপের ঘাটে গিয়ে পৌছি। কিন্তু ওই ঘাটেও পাকিস্তানি দোসর রাজাকারেরা আমাদেরকে আটকে ফেলে। পরে আমরা টিউবওয়েল মেকানিক বলে বোঝাতে সক্ষম হওয়ায় আমাদেরকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু সবখানে অস্থিরতা। একদিকে আমার দুলাভাইসহ আমার এলাকার বন্ধুদেরকে হারিয়ে একদম বেহাল অবস্থা। প্রতিশোধের স্পৃহা জাগলেও নিজের বোনকে তার প্রিয় স্বামী হারানোর কথা বলতে ভালুকিয়ায় চলে আছি। ভালুকিয়া এসেও দেখতে পাই ভালূকিয়ায় আমাদের পরিবারেও ঘটে গেছে মহাপ্লাবন। পাক বাহিনীর সদস্যরা আমার বোন গোলবাহারকে তারা গণধর্ষণ করে সবকিছু নিয়ে গেছে। আমি কি এখন আমার বোনের স্বামীর শহীদের কথা বলবো নাকি বোনকে ইজ্জ¦ত হারানোতে শান্ত্বনা দিবো । কিছুই বুঝতে পারছি না। এরকম থাকতে থাকতে দশ দিন পর আমি আমার বোনকে তার স্বামী যুদ্ধে শহীদ হওয়ার কথা বলি। শুরু হয় আহাজারি। নিজেকে শেষ করতে চেয়েছিলেন তিনি।
নুর আহমদ দেশের জন্য আত্মোসর্গ করায় ১৯৭২ সালের ১৭ জুলাই শেখ মুজিবুর রহমান তার স্ত্রী গোলবাহার বেগমের কাছে একটি সহানুভূতিপত্র এবং ২ হাজার টাকার একটি চেক।
আমাদের স্বাধীনৎা তা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য স্বামী আত্মোসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দু:খের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি। এমন নি:স্বার্থ মহান দেশপ্রেেিকর স্ত্রী হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যিই আপনি ধন্য হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রান ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার তহবিল থেকে আপনার পরিবারের সাহাযার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট ২০০০/- টাকার চেক প্রেরিত হল। চেক নং- ডি.ই এ ২৯০২২৬।
আমার প্রাণভরা ভালাবাসা ও শুভেচ্ছা নিন।
শেখ মুজিব
এ ছাড়া এমপিএ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর মাধ্যমে এক বান টিনও নতুন বাড়ি নির্মাণের জন্য। এরপর থেকে কোনো ধরনের সুযোগ সুবিধা পায়নি জানান।

আবুল হোসেন
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শহীদ শহীদ আবুল হোসেন। উখিয়া ভালুকিয়া পালংস্থ ফৈয়জা বাপের পাড়ার আবদুল হামিদ ও জলিয়া বিবির সন্তান তিনি। পারিবারিক অনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না। যার ফলে টিবওয়েল মেকানিকের কাজ শুরু করে হেন কোনো কাজ নাই তিনি করেননি।
স্বাধীনতাযুদ্ধের মাস খানেক টিবওয়েল মেকানিকের কাজের অন্বেষণে সন্দ্বীপে যান। সন্দ্বীপে থাকাকালে শুরু হয় একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন। স্বাধীনচেতা বাঙালি আবুল হোছেন নুর আহমদ, দুদু মিয়াসহ আরো কয়েকজন মিলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে এ অসহযোগ আন্দোলনে শরীক হন। ৮ মার্চ হাবিলদার আছাদের প্রশিক্ষণেশুরু হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেল চালানো প্রশিক্ষণে তারই সঙ্গে শহীদ হওয়া নুর আহমদ ও তার সঙ্গীদের সাথে তিনিও অংশ নেন। ২৫ মার্চ ভয়াল কালো রাতে পাক হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধুও স্বাধীনতার ডাক দেন। এ ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে আবুল হোসেন ও তার বন্ধুরা কুমিরার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। মেজর রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে কুমিরায় শুরু হওয়া প্রথম প্রতিরোধ আন্দোনে শরীক হতে রওয়ানা দিলেও পথিমধ্যে পাক বাহিনীর বহরে পড়ে যান। কোনোক্রমে বেঁচে গিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ৩০ মার্চ সন্দ্বীপ কালাফানিয়া এলাকা থেকে সন্দ্বীপ কুমিরাঘাট আসামাত্রই পাক বাহিনীর নজরে পড়ে। সঙ্গে থাকা অস্ত্র, টিউবওয়েল মেকানিকের বড় বড় যন্ত্র দেখে এ পাক বাহনী তাদের গতিরোধ করে। গতিরোধ করার সাথে তার সঙ্গে নুর আহমদ পাক বাহিনীকে দেখার সাথে তেলেবেগুনে রেগে গিয়ে পাকবাহিনীর দিকে যন্ত্র ছুড়ে মারে। পরপরই শুরু হয় পাক হানাদার বাহিনীর অটোমেটিক মেশিনগানের উপর্যপুরি বর্ষণ। এমনভাবে উপর্যুপরি গুলি করা হয় যে নৌকা পড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়ে যায়। পাক বাহিনীল উপর্যুপুরি গুলিতে সঙ্গে ১৮ জন যাত্রীর মধ্যে আবুল হোছেন, নুর আহমদ, দুদু মিয়া, গুরা মিয়া নৌকা থেকে পড়ে যান। আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় নি। বাকী ১৩ জন যাত্রী ভাসমান নৌকা নিয়ে ঢেউয়ের তালে তালে ফের সন্দ্বীপের ঘাটে ফিরত যান। সেখানেও গিয়ে রাজাকারদের লাঞ্চনা গঞ্চনার শিকার হতে হয় বেঁচে যাওয়া ওই যাত্রীদেরকে। অবশেষে টিউবওয়েল নির্মাণ শ্রমিক বলে বোঝাতে সক্ষম হওয়ায় তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
১৩ জন যাত্রীর মধ্যে আবুল হোসেনের প্রতিবেশি ও তার সঙ্গী নুর আহমদের শ্যালক বশির উল্লাহও ছিলেন। রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনীর থাবা থেকে বেঁচে দীর্ঘ এক মাস পর ভালুকিয়ায় তার বাড়িতে আসেন এবং নুর আহমদ, আবুল হোছন, আলী আহমদ, দুদু মিয়া এবং গুরা মিয়া যুদ্ধে শহীদ হওয়ার ব্যাপারে তাদের পরিবারকে জানান। বশির উল্লাহ এখনো বেঁচে আছেন। তিনি এখনো খলুবাপের পাড়াস্থ নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন। ওই দিনের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বলেনÑ ‘কালাফানিয়া এলাকা কুমিরা ঘাটে আসার পথে রাজাকারদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে পথে। অবশেষে কোনোক্রমে বেঁচে কুমিরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে এবং সুবিধা না হলে নিজ এলাকায় নিরাপদে থাকার লক্ষ্যে সন্দ্বীপ ঘাট থেকে কুমিরা ঘাটের দিকে রওয়ানা হয়। কুমিরাঘাটে আসামাত্র নৌকায় আমাদের হাতে মেকানিকের যন্ত্র Ñঅনেকের হাতে রাইফেলও ছিলো। তা দেখতে পেয়ে ঘাটের অদূরে থাকা পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা আমাদেরকে উপর্যুপুরি গুলি ছুঁড়ে। গুলিতে আমার দুলাভাই নুর আহমদ, আমাদের এলাকার আবুল হোছন, দুদু মিয়া গুরা মিয়া নদীতে পড়ে যান। আর তাদের খোঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা যারা ওই নৌকায় ছিলাম তারাও কোনো রকম ভাসতে ভাসতে আবার সন্দ্বীপের ঘাটে গিয়ে পৌছি। কিন্তু ওই ঘাটেও পাকিস্তানি দোসর রাজাকারেরা আমাদেরকে আটকে ফেলে। পরে আমরা টিউবওয়েল মেকানিক বলে বোঝাতে সক্ষম হওয়ায় আমাদেরকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু সবখানে অস্থিরতা। একদিকে আমার দুলাভাইসহ আমার এলাকার বন্ধুদেরকে হারিয়ে একদম বেহাল অবস্থা। প্রতিশোধের স্পৃহা জাগলেও নিজের বোনকে তার প্রিয় স্বামী হারানোর কথা বলতে ভালুকিয়ায় চলে আছি। ভালুকিয়া এসেও দেখতে পাই ভালূকিয়ায় আমাদের পরিবারেও ঘটে গেছে মহাপ্লাবন। পাক বাহিনীর সদস্যরা আমার বোন গোলবাহারকে তারা গণধর্ষণ করে সবকিছু নিয়ে গেছে। আমি কি এখন আমার বোনের স্বামীর শহীদের কথা বলবো নাকি বোনকে ইজ্জ¦ত হারানোতে শান্ত্বনা দিবো। কিছুই বুঝতে পারছি না। এরকম থাকতে থাকতে দশ দিন পর আমি আমার বোনকে তার স্বামী যুদ্ধে শহীদ হওয়ার কথা বলি। শুরু হয় আহাজারি। নিজেকে শেষ করতে চেয়েছিলেন তিনি। ওই সময় শহীদ আবুল হোসেনের বাসায়ও খবর দেওয়ার জন্য গেলে শুনি তার বাড়িতে চালানো পাকিস্তান বাহিনীর তাণ্ডব। হানাদার বাহিনীর দোসরেরা আবুল হোসেনের স্ত্রী চেমন বাহারকেও পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে এবং চেমন বাহারের চালায় অমানুষিক শারিরীক নির্যাতন। এই নির্যাতনের মাত্রা আরেকটি বিষয় যোগ করলে সহ্য করতে পারবে কিনা ভেবে আমি সেখান থেকে চলে আসি। পরে ১০দিন পর চেমন বাহারের স্বামীসহ ৪ জন যুদ্ধে কুমিরাঘাটে শহীদ হওয়ার উল্লেখ করি। তারও অবস্থাও ঠিক আমার বোনের মতো।
শহীদ আবুল হোসেন দেশের জন্য আত্মোসর্গ করায় ১৯৭২ সালের ১৭ জুলাই শেখ মুজিবুর রহমান তার স্ত্রী গোলবাহার বেগমের কাছে একটি সহানুভূতিপত্র এবং ২ হাজার টাকার একটি চেক।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য স্বামী আত্মোসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দু:খের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি। এমন নি:স্বার্থ মহান দেশপ্রেেিকর স্ত্রী হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যিই আপনি ধন্য হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রান ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার তহবিল থেকে আপনার পরিবারের সাহাযার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট ২০০০/- টাকার চেক প্রেরিত হল। চেক নং- ডি.ই এ ২৯০২২৫।
আমার প্রাণভরা ভালাবাসা ও শুভেচ্ছা নিন।
শেখ মুজিব
এ ছাড়া এমপিএ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর মাধ্যমে এক বান টিনও নতুন বাড়ি নির্মাণের জন্য। এরপর থেকে কোনো ধরনের সুযোগ সুবিধা পায়নি জানান। তবে চেমন বাহারের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আবুল হোসনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভূক্তকরণ ও সনদপত্র প্রদানে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ স্বাক্ষরিত ২১. ৬০. ০১.০০.০০০০.০৩.২০০৯ -১৫৬ (৫) স্মারকমূলে পত্রে এ তথ্য জানা যায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ থাকা সত্বেও এখনো মুক্তিযোদ্ধা নামীয় কোনো তালিকায় শহীদ আবুল হোসেনের নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।

ধুরুমখালী গণহত্যা
৫ মে কক্সবাজার পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর দখলে গেলে তাদের দোসরদের সহায়তায় হত্যা করেছে মুক্তিকামী জনতা ও মুক্তিযোদ্ধাকে।
সুবেদার বেনারশ খান উখিয়া থানা দখলে নিয়ে সুবেদার আবদুল মালেককে দিয়ে উখিয়ায় চষে বেড়াচ্ছিলেন। একের পর হত্যা, নারী নির্যাতন এবং বহু মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পদ লুট করেছেন। পুরো ৬ মাস শুধু উখিয়ায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এ দিকে হাবিলদার সোবহানের নেতৃত্বে একটি দল বার্মা থেকে এসে সোনাইছড়িতে অবস্থান নিয়েছিলেন। ঠিক তখনি তার গ্রামের বাড়ি থেকে খবর আসে উখিয়া- টেকনাফে শান্তি কমিটি ও পাকিস্তানি দোসরদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনীর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। এমন খবর শুনে হাবিলদার সোবহান সোনাইছড়ি থেকে আবুল কাসেম ও নির্মল কান্তি দেকে গোয়েন্দার দায়িত্ব দিয়ে ছদ্ধবেশে উখিয়া পাঠান। তাদের বলে দেওয়া হয়েছিলো ‘সাবধান, মানুষের সাথে মিশে শত্রুদের অবস্থান, গতিবিধি ইত্যাদি সংগ্রহ করে এক সপ্তাহের মধ্যে আমার কাছে রিপোর্ট করতে।
হাবিলদার সোবহানের কথামতে সেদিন নির্মল ও আবুল কাসেমকে মরিচ্যায় রওয়ানা দেন এবং মরিচ্যায় আবুল কাসেমের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে সময় সুযোগ বুঝে ধুরংখালীর দিকে আগান। ধুরংখালীর মুক্তিযোদ্ধা মণিন্দ্র বড়ুয়া মনুর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে। রুমখার হাট বাজারের দিন লোক- লোকারণ্যে ভরা ভীড়ের মধ্যে আবুল কাসেম ও নির্মল দে চিনে ফেলে জাফর আহমদ ও মোজাফ্ফর আহমদের নেতৃত্বাধীন রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। সাথে সাথে উখিয়া থানায় খবর দেয় রাজাকার বাহিনী। মোজাফ্ফর আহমদের নেতৃত্বাধীন রাজাকার বাহিনী তাদের ধরতে এগিয়ে আসলে আবুল কাসেম একটি ব্রিজের নিচে আত্মগোপন করে আর নির্মল স্থানীয় নাপিতপাড়ায় পালিয়ে একটি বাড়িতে লূকিয়ে থাকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাজাকার বাহিনী ওই বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং মুক্তিযোদ্ধা নির্মল দে রাজাকার বাহিনীর হাতে তুলে দিতে বলে। ওই বাড়ির মালিক নির্মলকে রাজাকার বাহিনীর হাতে তুলে অস্বীকার করায় বাড়িতে গুলি এবং পরে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ওই সময় নির্মল হানাদার দস্যুদের দোসর নরপশুদের হাতে ধরা পড়ে। এই দিকে পাক বাহিনীও পৌছে যায় ঘটনাস্থলে। রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী নির্মলকে নিয়ে আসার পথে মুক্তিযোদ্ধা মণিন্দ্র বড়ুয়া মনুর বাড়িতে গিয়ে হামলা চালায় এবং তাকেও ব্যাপক প্রহার করে আটক করে। পরে ধুরংখালী মন্দির এলাকায় পৌঁছে মনিন্দ্র বড়ুয়া প্রকাশ ভূট্টো মহাজনকেও আটক করে হানাদার বাহিনী টেকনাফের নাইট্যং পাহাড়ের চূড়াস্থ পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যায় । পরে নির্মল দে, ভূট্টো মহাজন ও মণিন্দ্র বড়ুয়া মনুকেও অনেক মুক্তিকামী জনতার সাথে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে।
গঙ্গা দে এর মেধাবী সন্তান নির্মল কান্তি দে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের অন্যতম সাহসী কর্মী। পড়তেন মরিচ্যা জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা শেষে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মরিচ্যা হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে শুরু হয় উণসত্তরের অভুত্থান এবং পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ভূট্টো মহাজনের অপরাধ ছিলে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া ও মুক্তিযোদ্ধাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করা।
ওই দিন বাপন পাল শীলের ছেলে ব্রজেন্দ্র লাল শীলকেও মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। তার সন্তান প্রদীপ শীল এখনো শহীদ বাবার স্বীকৃতির আশায় দিন দিন গুনে আর কক্সবাজারের সেলুনের দোকানে চুল কাটার কাজ করে সংসার চালায়।
উখিয়ার সন্তান নয় কিন্তু উখিয়ায় শহীদ হয়েছেন এবং পরবর্তীতে তার সন্তানের উখিয়ায় অবস্থান করছেন এ রকম শহীদের মধ্যে রয়েছে শহীদ ইলিয়াছ মাস্টার ও যতীন্দ্র মোহন দে। একজন কক্সবাজার সদরের এবং আরেকজন চকরিয়ার।
ইলিয়াস মাস্টার
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কক্সবাজারের আরেকজন বৃদ্ধ শহীদ ইলিয়াছ মাষ্টার। কক্সবাজার সদর উপজেলার নাইক্ষ্যংদিয়া গ্রামে হাজী হাফেজ মোবারক আলীর সন্তান। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের পর উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এ সময় তিনি কক্সবাজার মহকুমা ন্যাপের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে উখিয়ার ছাত্র ও জনগণের কর্মী হিসেবে বাঙালিত্বের সংখ্যা, সমাজতন্ত্রের পক্ষে কাজ করেন। এ সময় উখিয়ায় বামধারার রাজনীতির চর্চা বেড়ে যায়। তার স্পর্শে এসে উখিয়ার অনেক ছাত্র যেমন ছাত্র ইউনিয়নের শাহাব উদ্দিন চৌধুরী, শাহজাহান চৌধুরী, কামাল উদ্দিন, উখিয়ার ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আবুল কাশেম প্রকাশ মামা কাসেম, কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ইব্রাহিম আজাদ প্রমুখ। ছয় দফা ও উনসত্তরের গণঅভূত্থানের প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় সংগঠক হিসেবে উখিয়ার ছাত্র আন্দোলনের নেতাদেরকে অনুপ্রেরণা যোগাতেন।
ঘুমধুম হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। তাই পাকিস্তানি দোসর গোলাম রসুল এর নজরে পড়ে। ৭ আগস্ট পাকিস্তান ইন্টিলিজেন্স ব্রাঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রসুল খান (যিনি স্থানীয়ভাবে কানকাটা রসুল নামে পরিচিত) স্থানীয় দালালদের সহায়তায় পড়ন্ত বিকেলে রাজাপালং ইউনিয়নের হিজলিয়া পালং খালের পাশে বসে থাকা অবস্থায় ইলিয়াস মাস্টারকে উখিয়া দক্ষিণ ষ্টেশনে নিয়ে এবং পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে তাকে পাকিস্তানি কারাগারে নিয়ে বন্দী রাখে। তাঁকে বন্দী করার ১৫ দিন পর বড় মহেশখালী নিবাসী মোহাম্মদ আমির মিয়া (তৎসময়ে পালং হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক) কে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে মুক্তিবাহিনীকে জায়গা দেওয়ার অপরাধে পাকিস্তানী কারাগারে বন্দী করা হয়। তার সাথে ঐ দিন ঐ কারাগারে ইলিয়াছ মাস্টারের সাথে দেখা হয়। ইলিয়াছ মাস্টার সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোহাম্মদ আমির লিখেন-
‘আমার ঘনিষ্ট বন্ধু মোহাম্মদ ইলিয়াছ। বাড়ী পোকখালী ও ঘুমধুম জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, এক অবাঙালি বিহারীর (কানকাটা গোলাম রসুল) হাতে ধরা পড়ে কক্সবাজার শহরে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে আটক আছেন। তাকে আমার ১৫/২০ দিন পুর্বে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দেখলূম ,তার শরীরের প্রতিটি অংশে অসংখ্য নির্যাতনের চিহ্ন। তার পরেও সেদিন তার হাসি-হাসি মুখ দেখলুম। অনেক চেষ্টা তদবীরের পর সেতিন তাকে ছেড়ে দেওয়া বলে বর্বর সামরিক কর্তৃপক্ষ তাকে কথা দিয়েছিল। জেলের কয়েদিরা তার চুল কেটে দিয়েছিল। তার জন্য বাড়ী থেকে পাঠানো উপহার সামগ্রী অকাতরে কয়েদিদের নিকট বিলিয়ে দিয়েছেন। হায়রে মুক্তির স্বাধ! আমার পাশ ঘেষে বসে তিনি গ্রেপ্তারের ও নির্যাতনের কাহিনী বলছিলেন। বাহিরে আছরের আজান শুনা গেল। আমরা নামাজ পড়ে নিলাম। হঠাৎ জানা গেল। ৩ জন আর্মির লোক সশস্ত্র জেলে প্রবেশ করছে। লকারের পুুলিশ ও মেট আমাদিগকে জেলের পুর্ব পাশে অবস্থিত মেঝেতে ৪ জন করে ফাইল করে বসাল। একজন হাবিলদারের হাতে স্টেন। অপর ২জনের হাতে এসএল আর। পাক পবিত্রভূমির পবিত্রতা সম্বন্ধে ১০/১৫ মিনিট উর্দুতে বক্তৃতা দিল। দেশের বিরোধিতা যারা করছে তাদের গাদ্দার। বেইমান বলে গালি ও দিল। এমনি সময় হাবিলদার জানতে চাইল ‘মাস্টার সাহেব কাহা হায়! ’আমিও মাস্টার ইলিয়াচ ভাইও মাস্টার। কাকে চাচ্ছে বুঝা গেলনা। তখন আমার অবস্থা মুর্চা যাওয়ার মত। কিছুক্ষণ পর হাবিলদার এসে একেক জন করে খুটিয়ে দেখল এবঙ ইলিয়াচ ভাইয়ের নিকট এসে বল¬- তোম হোম ত মাস্টার’। এই বলে ফ্াইল থেতে উঠিয়ে নিল। জেল ফটকের জমাদার ইলিয়াচ ভাইয়ের জামা কাপড়গুলি দেবার প্রস্তাব করলে ওই জল্লাদ পর হাবিলদার মুখের ওপর স্পষ্ট বলল-‘কাপড়কা জরুরত ক্যা,ওসকো ত আবি সুট কর দেগা।’ পরে তার কি হল জানাযায়নি। আমি জেল থেকে মুক্ত হবার পর লোক মারফত জানতে পেরেছি। তার নিজের হাতে খনন করা কবরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
তাঁর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য উখিয়া উপজেলা পরিষদের সৌজন্যে নির্মিত টিন শেড এ পাঠাগারটি ১৯৮৮ সনের এরশাদ সরকারের আমলে উখিয়া মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ‘শহীদ ইলিয়াছ মিয়া পাঠাগার’এবং ঘুমধুম হাই স্কুলে ‘শহীদ ইলিয়াছ মিয়া পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠিত হয়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি ধরে রাখতে উখিয়ার স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের দাবির মূখে উখিয়া সদর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের এক পার্শ্বে স্থাপিত শহীদ মাষ্টার ইলিয়াছ মিয়া গণ-পাঠাগারটি দীর্ঘ এক যুগ ধরে অযত্নে-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। শহীদ মাষ্টারের স্মৃতি বিজড়িত ওই ঘরটির এখন আর কেউ খোঁজ রাখেনা। বতমানে এ পাঠাগারটি বিলুপ্ত করেছে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন।

যতীন্দ্র মোহন দে (১৯৩৪-১৯৭১)

বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের সংগ্রাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শহীদ যতীন্দ্র মোহন দে। চকরিয়া উপজেলার দিগরপানখালী এলাকার ধৈয্য মহাজন দে এবং মৃত মঞ্জুরী রাণী দে এর সন্তান তিনি। নিম্মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে বাবার ব্যবসায় সহযোগিতা করেছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী একজন যুবক। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাপিয়ে পড়ে। চালায় নগ্ন হামলা। এ দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ডাকে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। স্বাধীনতার ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েন বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। দেশকে মুক্ত করার অভিপ্রায় নিয়ে ১০০ জনের অধিক সঙ্গী নিয়ে অংশ নেন কালুরঘাট যুদ্ধে। কালুরঘাটস্থ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র দখল নেয়ার কালুরঘাটের দিকে আসতে থাকে পাক হানাদার বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার ৫দিন পর অর্থাৎ ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট যুদ্ধে পাক হানাদার গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
যতীন্দ্র মোহন দে দেশের আত্মোসর্গ করায় ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান তার স্ত্রী আভারাণী দে এর কাছে একটি সম্মতি পত্র এবং দুই হাজার টাকার একটি চেক পাঠান। যার চেক নং-প্রনাক-৬/৪/৭২ সিভি ১৫৬ তারিখ: ১৪/০১/১৯৭৩ইং মূলে চেক সিএ ০২৭৯৬৫।
যাতে লেখা ছিল:
‘প্রিয় ভাই/ বোন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য স্বামী আত্মোৎসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দু:খের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি। এমন নি:স্বার্থ মহান দেশপ্রেমিকের স্ত্রী হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যিই আপনি ধন্য হয়েছেন।প্রধানমন্ত্রীর ত্রান ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার তহবিল থেকে আপনার পরিবারের সাহাযার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট ২০০০/- টাকার চেক প্রেরিত হল।
আমার প্রাণভরা ভালাবাসা ও শুভেচ্ছা নিন ।
শেখ মুজিব
এ ছাড়া শহীদ হওয়ার পর থেকে উপজেলা প্রশাসনের সামান্য সম্মান ছাড়া কোন ধরনের সুযোগ সুবিধা পায়নি বলে তার কন্যা বেবী প্রভা দে জানান। তাছাড়া এখনো পর্যন্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তার নাম অন্তভ’ক্তি করা হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধে পর শহীদ যতীন্দ্র মোহন দে এর পরিবার প্রথমে গোলদিঘির পাড়ে ছিলেন এবং পরবর্তীতৈ তারা মায়ের বাড়ি উখিয়ার দারোগা বাজারস্থ নানার বাড়িতে থাকছেন।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বেবী প্রভা দে এর সাথে কথা হলে তিনি আক্ষেপের সাথে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবা শহীদ হলো আমরা কী পেলাম। আমার সন্তানরা কী করবে। একাত্তরে আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিলো অথচ আমরা কিছু পায়নি বঙ্গবন্ধুর সেই চিঠিটা ছাড়া। আমার একমাত্র দাবি- ‘শহীদ স্বামীর স্কীকৃতি না পেয়ে আমার মা আভা রাণী দে হাসপাতালে মারা যান। আমার দেখে যেতে পারিনি বাবার স্মৃতি। আমার একমাত্র দাবি আমার বাবা যতীন্দ্র মোহন দে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে দেখে মরতে চাই। ব য়স প্রায় শেষ। মনে হয় দেখে যেতে পারবো না?

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।