নিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

রতন সেন হত্যা: হৃদকম্পনের মূহুর্তটি

অমিত দে
১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই। বেলা বারোটার দিকে দাঁড়িয়ে আছি কপিলমুনি বাজারে গোপাল পালের সাইকেলের দোকানের সামনে। কপিলমুনি খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার একটি প্রসিদ্ধ ইউনিয়ন। হঠাৎ কানে এলো কমরেড রতন সেন আততায়ীর হাতে খুন হয়েছেন। খবরটি শোনার পর পাথরের মত স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম কিছুক্ষণের জন্য। সম্বিত ফিরে পেতেই ভাবলাম কোথাও কি ভুল হচ্ছে? কারণ এরকম নির্লোভ একজন মানুষকে কে খুন করবে? যিনি শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের জন্য গোটা জীবনটা উৎসর্গ করেছেন, এমনকি দ্বার পরিগ্রহ করেন নি, সমস্ত সম্পত্তি মানুষের কল্যানে দান করেছেন তাঁকে খুন করবে কে?
কিছুক্ষণের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল। হ্যাঁ রতন সেন খুন হয়েছেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গণমানুষের নেতা রতন সেনকে খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
কাল বিলম্ব না করে কম্পিতবুকে বাড়িতে ঢুকলাম। তারপর কোনো রকমে ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে বাড়ির কেউ কিছু জানার আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ঠিকানা সোজা দৌলতপুর কমিউনিস্ট পার্টি অফিস। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড, ছাত্র ইউনিয়ন নেতাসহ অন্যান্য গণসংগঠনের নেতারা সমাবেত হয়েছেন। সকলের মধ্যে বিষাদের ছায়া।
বিষাদের বিপন্নতা ভেঙে সিদ্ধান্ত হলো রাতেই দেয়াল লিখন করতে হবে। কিন্তু লিখবে কে? যারা লিখতে পারতেন তারা তো কেউ দৌলতপুরে থাকেন না। দিপংকর দা, চঞ্চল বা বনি ভাই। এরা সবাই ঢাকায় চলে গেছেন। অবশেষে অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন আর আমি লিখবো সেটা ঠিক হলো। আমাদের হাতের লেখা চলনসই। কিন্তু আমরা তো কখনো দেওয়ালে আঁচড় কাটিনি। যে লিখেছে তার সাথে থেকেছি মাত্র। সেটাকে সম্বল করেই সে রাতে আমরা তুলি আর কালির ডিব্বা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ি। সম্বল রতন সেনের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
প্রথম তুলির আঁচড় পড়লো মহসীন মোড় পার হয়ে খালেক ম্যানশনের হলুদ দেওয়ালে। ‘কমরেড রতন সেনের হত্যাকারীর ফাঁসি চাই’। বেশ বড় বড় হরফে লাইনটি লেখার পর রাস্তায় এসে দেখলাম লাইনটি সমুদ্র তরঙ্গের ন্যায় ঢেউ খেলে গেছে।’ তবে আমি আমার হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করে সেদিন লিখেছিলাম এবং মনে মনে প্রত্যাশা করেছিলাম হত্যাকারির শাস্তি।
২৮টা বছর কেটে গেল, আপরাধীরা শাস্তি পেল কি? রাস্তায় শ্লোগান তুলেছিলাম রতন সেনের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। রতন সেনের রক্ত আমাদের কি সফলতার দ্বার উন্মোচন করলো? কিন্তু রতন সেন হত্যার ২৮ টা বছর অতিক্রম হলো। আমরা কি কোনো আশার সন্ধান পেলাম। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাত বদল হলো। এমন কি রতন সেনের সেই সময়কার অনেক বন্ধুরাও বেশ বদল করে নেতা-মন্ত্রী হয়েছেন, তাদের মায়াকান্না দেখেছি। কিন্তু রতন সেন হত্যার বিচার হয় নি।
তবে আশা ছাড়িনি। বিখ্যাত আইরিশ নাট্যকার ব্রায়ান ফ্রেইল দ্য ফ্রিডম অব দা সিটি নাটকে বলেছেন, কোনো রক্তপাত কখনো বৃথা যায় না। যেখানে রক্ত দেখবে মনে করবে তার মধ্যে কোনো আশা লুকিয়ে আছে।
চিরঞ্জীবী কমরেড রতন সেন, লাল সালাম।

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, উদীচী।

Comment here