বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

রাশেদুলের ডিভাইসে নৌদুর্ঘটনায় বাঁচাবে প্রাণ

রাশেদুল ইসলাম। -ফাইল ছবি

রাইজিং কক্স ডেস্ক : নৌদুর্ঘটনার শিকার মানুষকে উদ্ধার সহায়তায় দারুণ একটি স্মার্ট ডিভাইস তৈরি করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) শিক্ষার্থী রাশেদুল ইসলাম। সেই ডিভাইস উপস্থাপন করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ‘টেক্সটাইল ট্যালেন্ট হান্ট’ প্রতিযোগিতায়। তাঁর গল্প শোনাচ্ছেন কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব…

শুরুর গল্প

দুর্ঘটনার খবর রাশেদুলের মনে সব সময়ই নাড়া দিত। বিশেষ করে নৌদুর্ঘটনার উদ্ধার অভিযান নিয়ে সুযোগ পেলেই ভাবতেন।

২০১৭ সালে তিনি যখন তৃতীয় বর্ষে পড়েন, তখন টেক্সটাইলভিত্তিক ম্যাগাজিন ও ট্রেনিং সেন্টার ‘টেক্সটাইল টুডে’ আয়োজিত ‘টেক্সটাইল ট্যালেন্ট হান্ট’ প্রতিযোগিতার নিবন্ধন চলছিল। তিনি নাম লেখালেন। নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। সেটি এই ট্যালেন্ট হান্টের প্রাথমিক বাছাইয়ে বেশ কাজে দিল। সাড়ে পাঁচ শ প্রতিযোগীর মধ্যে দ্বিতীয় হলেন তিনি। প্রতিযোগিতাটির পরের ধাপ গবেষণাপত্র জমা দেওয়া। রাশেদুল তাই নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক দেওয়ান মোর্শেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এই শিক্ষক এবং ফাঞ্জিওন ওয়ার ইনক.-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও চিফ টেকনোলজি অফিসার ড. হাসান শাহারিয়ারের সাহচর্যে শুরু হলো তাঁর নতুন মিশন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তিলে তিলে তৈরি করলেন একটি বিশেষ ফ্লোটেশন ডিভাইস—‘স্মার্ট পারসোনাল ফ্লোটেশন ডিভাইস উইথ লোকেশন ট্র্যাকিং (এসপিএফডি)’! নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর এ বছর অনুষ্ঠিত সেই ট্যালেন্ট হান্টের চূড়ান্ত পর্বে এই ডিভাইসের জন্য তিনিই হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন।

বাধা পেরিয়ে

‘টেক্সটাইল টুডে’র অর্থায়ন থাকলেও গবেষণাগারের পর্যাপ্ত সুবিধা ছিল না। সেই বাধা পার করতে এগিয়ে আসেন ক্যাম্পাসের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী। তাঁদের সহায়তায় ডাইসিন কেম লিমিটেড, এনজেড ফ্যাব্রিকস লিমিটেড এবং ম্যাক্রোফাইবার গ্রুপের গবেষণাগার ব্যবহার করতে পেরেছেন রাশেদুল। প্রকল্পটি নিয়ে মজার এক স্মৃতি আছে তাঁর। জানালেন, ‘রিভিউর জন্য প্রথমবার প্রকল্পটি জমা দেওয়ার পর বিচারক প্যানেল থেকে বলা হলো, সাঁতার পারে না—এমন কাউকে দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। তখন আমি এক বন্ধুকে নিয়ে গেলাম আফতাবনগর লেকে। ওকে জ্যাকেটটি পরিয়ে পানিতে নামিয়ে দিলাম। শুরুতে খুব ভয় পাচ্ছিল। যখন দেখল সে ডুবছে না, তখন পুরো লেক আমার সঙ্গে মজা করে সাঁতার কেটেছিল। ওর কাণ্ড দেখতে লেকের চার পাশে ভিড় জমে গিয়েছিল মানুষের!’

সাধারণ থেকে অসাধারণ

রাশেদুল বললেন, ‘সাধারণ লাইফ জ্যাকেটগুলো বেশ বড়সড় এবং খুব একটা আরামদায়ক নয়। তাই জলপথে যাত্রীরা সব সময় এগুলো পরে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। অথচ এই সামান্য সচেতনতার অভাবে নৌদুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ে। অন্যদিকে আমাদের এই স্মার্ট পারসোনাল ফ্লোটেশন ডিভাইসটি একেবারে সাধারণ পোশাকের মতো। এটি তৈরি হয়েছে মাল্টিলেয়ার ফ্লোটেশন ম্যাটেরিয়াল ও এয়ার টিউবের মাধ্যমে। এরগোনমিক স্টাডির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে এর কার্যকারিতা। যেকোনো ওজনের মানুষকে ভাসিয়ে রাখতে এটি সক্ষম। তা ছাড়া জলপথে দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে যত দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব, তাঁর বাঁচার সম্ভাবনাও যেহেতু ততই বেড়ে যায়, তাই এতে রয়েছে জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম। এই ফ্লোটেশন ডিভাইসের খরচও তুলনামূলক কম। যাত্রীদের পাশাপাশি সাঁতার শেখানো এবং নদী ও সাগরে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ডিভাইসটি ব্যবহার করা যাবে। ’

সাধারণ মানুষের কাছে ডিভাইসটির সুফল পৌঁছানোর ব্যাপারে তিনি জানালেন, ‘শিগগিরই এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা যাবে। তখন নৌযান কর্তৃপক্ষ চাইলে এটি কিনে যাত্রীদের কাছে ভাড়া দিতে পারবেন। এতে প্রতি ট্রিপে যাত্রীদের সাত-আট টাকা বাড়তি খরচ হলেও প্রাণ বাঁচার সম্ভাবনা বাড়বে। ’