পাঠকের কলামরোহিঙ্গা সংকট

রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতা স্থানীয়দের অস্তিত্ব সংকটের কারণ হবে কি?

সাইমুম শারিক হিমেল

সাইমুম শারিক হিমেল : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হত্যাযজ্ঞ ও অত্যাচারের শিকার হওয়ার পর ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ১১ লক্ষেরও অধিক রোহিঙ্গারা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

প্রবেশের সাথে সাথেই উখিয়া-টেকনাফের জনগণ জরুরি ভিত্তিতে সাধ্য মোতাবক খাদ্য, বস্ত্র এবং বসবাসের জায়গা দিয়ে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তখন।

বাংলাদেশ সরকারের যথাসাধ্য চেষ্টার পরও একার পক্ষে এই সংকটের সমাধান সম্ভব হয়ে না উঠার ফলে, বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফের জনগণের কাছে এই মানবতাই দুর্দশা ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ফলে এলাকায় নানা ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। রোহিঙ্গাদের কারণে ইতিমধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠী নানাভাবে ক্ষতিগস্থ হওয়ার পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি বহু প্রভাব নিয়ে আতংক বেড়েই চলেছে জনগনের মধ্যে।

১. দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিঃ
দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটি পরিবার কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে নির্বাহ করবে তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা এবং দ্রব্যমূল্যের ওপর। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আসার পর হতে, উখিয়া টেকনাফে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হার আশঙ্কাজনক পর্যায়ে উপনীত হওয়ায় জনজীবনে নেমে এসেছে কষ্টের কালো ছায়া। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাকে অতিক্রম করে অশ্বগতিতে বেড়ে গেছে। নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিই (প্রাথমিক শিক্ষক, মাধ্যমিক শিক্ষক, কলেজ শিক্ষক সহ সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মাচারী, মাঝারি ব্যবসায়ী) মূল্যের এরূপ বৃদ্ধিতে বেশি অসহায় ও নিরুপায় হয়ে পড়েছে। কারণ দ্রব্যমূল্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়লেও তাদের বেতন বা আয় সেই অনুযায়ী বাড়ে নি। ফলে এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি তাদের জনজীবনের গতিকে অচল ও আড়ষ্ট করে তোলেছে। অথচ তারাই মূল্যবোধ দিয়ে সমাজকে ধরে রাখে; তারাই গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে।

২. রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাওয়াঃ
ইতোমধ্যে রোহিঙ্গারা চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ সহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে উখিয়া- টেকনাফে জনগণের মনের মধ্যে আতংক দিন দিন বেড়েই চলেছে।

৩. কক্সবাজার-টেকনাফের প্রধান রাস্তা যেন স্থানীয়দের জন্য পাতা মৃত্যু ফাঁদঃ
রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত দেশি-বিদেশি সংস্থার অতিরিক্ত গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াতের ফলে উখিয়া টেকনাফের রাস্তা মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ফলে স্থানীয় প্রতিটা পরিবারের অভিভাবকগণ, তাদের শিশু স্কুল থেলে বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত উদ্দিগ্নতায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কাটাচ্ছে।

৪. রাস্তার স্থবিরতা যেন নিত্যসঙ্গীঃ
অতিরিক্ত গাড়ী চলাচলে সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। তীব্র যানজটের কারণে স্থানীয়দের যাতায়াত করতে এখন আগের চেয়ে তিনগুণ-চারগুণ সময় বেশি ব্যয় হচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছানোও সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে স্থানীয়রা পরিক্ষাকেন্দ্রে নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাতে পারবে কিনা এই ভীতি নিয়েই পরিক্ষা দিতে যাওয়ায় স্থানীয়দের রেজাল্ট ভাল না হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।

৫. স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রভাবঃ
রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় শ্রমবাজারেও বড় প্রভাব অনেক বেশি লক্ষণীয় । রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শরণার্থী শিবির থেকে স্থানীয় লোকালয়ে এসে স্বল্প মজুরিতে শ্রম দিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাজের সুযোগ সংকুচিত করে চলেছে। ফলে স্থানীয় শ্রমজীবীরা আয়ের উৎস হারিয়ে অস্তিত্বহীনতার মুখে পড়ছে প্রতিনিয়ত।

৬. অতিরিক্ত পানি সংকটের ভয়ঃ
শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন বিশাল আকৃতির অসংখ্য গভীর নলকূপ স্থাপন করার কারণে একসময় বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে রয়েছে উখিয়া টেকনাফের জনগণ।টেকনাফে আগে থেকেই বিশুদ্ধ পানির সংকট ছিল। বাড়তি লোকের চাপে সেই পানিতে এখন আরো টানাটানি পড়ছে।
অন্যদিকে দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সাগর কাছে থাকায় লবন পানি ঢুকার সম্ভাবনা আছে তখন খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে উখিয়া-টেকনাফের বিশুদ্ধ পানি।

৭. প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকারঃ
ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা, বাংলাদেশের পাসপোর্ট তৈরি করা, এমনকি ভুয়া ভাবে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তিকরণের তৎপরতায়ও রোহিঙ্গাদের লিপ্ত হওয়ার ফলে স্থানীয়দের আইডি কার্ড, জন্মনিবন্ধন সনদ সাথে নিয়েই সব সময় যাতায়াত করতে হচ্ছে। নতুবা চেকিংএ স্থানীয়দেরই হয়রানির শিখার হতে হচ্ছে।

৮. বসবাসের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্টঃ
ধুলোবালি স্থানীয়দের কাছে এক বিভীষিকা হয়ে উঠেছে। কক্সবাজার-টেকনাফ রোডে প্রয়োজনের তাগিদে নিয়মিত যাতায়াতের ফলে, অনেকের বিভিন্ন ধরণের ডাস্ট-এলার্জির সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ধুলোবালির পরিমাণ এতটাই বেশি যে অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগিরা রোড দিতে যাতায়াত করতে পারছে না শ্বাসকষ্ট হওয়ার ভয়ে। শরণার্থী শিবিরে চলাচল করা মাত্রাঅতিরিক্ত গাড়ির উচ্চ শব্দে হর্ণ বাজানোর ফলে প্রচন্ড পরিমাণ শব্দ দূষণ হচ্ছে। ফলে রাস্তাত পাশে দোকানি, এবং বসবাস করা স্থানীয় জনগণের মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

৯. কৃষি জমি ধ্বংসঃ
রোহিঙ্গারা কৃষি জমিতে আশ্রয় নেবার কারণে কৃষি কাজ বন্ধ রয়েছে অনেকের। এর মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা শুধুমাত্র নিজের জমিতে ফসল ফলিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব কৃষকদের রোহিঙ্গাদের অন্য স্থানে সরিয়ে যদি, এসব কৃষি জমি স্ব স্ব মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া না হয় তাহলে তাহলে তাদের বেচে থাকায় অসাধ্য হয়ে উঠবে।

এছাড়াও শিক্ষা সমস্যা, বেকারত্ব সমস্যা সহ আরো অনেক সমস্যার কারণে স্থানীয় স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।

বর্তমানে তাদের জনসংখ্যা এগারো লাখ। বাংলাদেশ প্রতিদিন এর সুত্র মোতাবেক প্রতিদিন শরণার্থী শিবিরে গড়ে জন্ম নিচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ শিশু। তাদের জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, এতে করে বছর দুই তিন পরেই তাদের আসা মোট জনসংখ্যা দ্বিগুন হবে।

রোহিঙ্গা সমস্যা যদি এভাবে দীর্ঘস্থায়ীত হওয়ার পাশাপাশি তাদের এই জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে স্থানীয়রাই হয়তো সত্যিই একদিন উদ্বাস্তুু হয়ে যাবে। আর তখন রোহিঙ্গাদের প্রতি দেখানো মানবতাই হবে স্থানীয়দের অস্তিত্ব সংকটের কারণ।

লেখক: ছাত্র- তৃতীয় বর্ষ, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম ।

‘পাঠকের কলাম’ বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন: risingcoxbd@gmail.com এই ঠিকানায়।

(বিঃ দ্রঃ পাঠকের কলাম-এ প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব রাইজিং কক্স ডটকম এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য রাইজিং কক্স ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।)

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন