উখিয়াকক্সবাজারটেকনাফ

রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফে ছড়াচ্ছে কলেরা, ঝুঁকিতে কক্সবাজার

রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ফাইল ছবি

শহীদুল্লাহ্ কায়সার / শফিক আজাদ: রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফে ছড়াচ্ছে কলেরা রোহিঙ্গাদের কারণে সংক্রামক ব্যাধি কলেরার ঝুঁকিতে পড়ছে জেলার মানুষ। বিশেষ করে উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলায় বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ উপজেলা দু’টির স্থানীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে এই রোগের ঝুঁকিতে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে এই রোগের জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

১৯১ জন মানুষের নমুনা পরীক্ষা করে ১৩৩ জনের শরীরে পাওয়া যায় কলেরার জীবাণু। যাদের মধ্যে রোহিঙ্গা রয়েছে ৭৭ জন। অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫৬ জনের শরীরে রয়েছে এই রোগের জীবাণু। উখিয়া এবং টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা এবং উপজেলা দুটির স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই পরীক্ষা চালানো হয়।

সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সংগৃহীত
এদিকে, রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কলেরা মুক্ত করতে ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন চালু হচ্ছে। ক্যাম্পেইনের আওতায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশাপাশি উখিয়া এবং টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের খাওয়ানো হবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভ্যাকসিন। আগামি ৮ ডিসেম্বর শুরু হতে চলা ক্যাম্পেইন শেষ হবে ৩১ ডিসেম্বর। ক্যাম্পেইনে যারা ভ্যাকসিন খাবেন অদূর ভবিষ্যতে তাঁদের কলেরার ঝুঁকি থাকবে না। ক্যাম্পেইনে ১ বছর থেকে ৫ বছরের প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা শিশুকে খাওয়ানো হবে ভ্যাকসিন। পাশাপাশি উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলার ১ বছরের বেশি বয়সের প্রায় ৫ লাখ স্থানীয় মানুষকে এই টিকা খাওয়ানো হবে।

গতকাল ৪ ডিসেম্বর (বুধবার) জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক প্রেসব্রিফিং এ এই ঝুঁকির কথা জানান ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডাঃ মহিউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। সভায় প্রজেক্টরের সাহায্যে ক্যাম্পেইনের সার্বিক দিকসহ উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলায় কলেরার চিত্র তুলে ধরেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তা ডাঃ রঞ্জন বড়–য়া রাজন।

প্রেস ব্রিফিং এ জানানো হয়, কেউ যাতে ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন থেকে বাদ না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। বাড়ী বাড়ী গিয়ে খাওয়ানো হবে ভ্যাকসিন। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বাস স্টেশন, হাট-বাজার, নৌকাঘাটসহ জনসমাগম ঘটে এমন স্থানেও খাওয়ানো হবে ভ্যাকসিন। ক্যাম্পেইন সফল করতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৪’শ টিম কাজ করবে। পাশাপাশি ১’শ টিম কাজ করবে উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলায়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, উখিয়া-টেকনাফে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (ওসিভি) ক্যাম্পেইন ৫ম বারের মত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এবার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির চেয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠি বেশি থাকবে ওসিভি ক্যাম্পেইনের আওতায়।

এবারের ক্যাম্পেইনে কলেরা টিকা খাওয়ানো হবে ৬ লক্ষ ৩৫ হাজার ৮৫ জনকে। এরমধ্যে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠি ৪ লক্ষ ৯৫ হাজার ১৯৭ জন আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ১ লক্ষ ৩৯ হাজার ৮৮৮ জন। স্থানীয়দের ক্ষেত্রে ১ বছরের উর্ধ্বে সকল বয়সী লোকজন আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ১ বছর থেকে ৫ বছরের নিচে শিশুরা ওসিভি টিকা পাবে। উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠিকে টিকা খাওয়ানো ৮ ডিসেম্বর শুরু হয়ে শেষ হবে ৩১ ডিসেম্বর। আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে টিকা খাওয়ানো ৮ ডিসেম্বর শুরু হয়ে শেষ হবে ১৪ ডিসেম্বর।

সিভিল সার্জন অফিসের স্বাস্থ্য সমন্বয়ক ডা. জামশেদ বলেন, সর্বশেষ ওসিভি ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বর। সেই ক্যাম্পেইনের আওতায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ছিল বেশি। আর রোহিঙ্গা শিবিরের আশপাশের কয়েকটি এলাকায় স্থানীয় কিছু সংখ্যক স্থানীয় লোকজনকে খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু এবার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ওসিভি ক্যাম্পেইনের আওতায় কম থাকবে। বেশির ভাগ স্থানীয় লোকজনকে খাওয়ানো হবে কলেরা টিকা।

তিনি আরও বলেন, গত জানুয়ারী থেকে এখন পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফে ১৩৩ জন কলেরা রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ৫৬ জন স্থানীয় আর ৭৭ জন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি। উখিয়াতে কলেরা রোগী সনাক্ত হয়েছে স্থানীয় ৮ জন আর রোহিঙ্গা ১৩ জন। টেকনাফে কলেরা রোগী সনাক্ত হয়েছে স্থানীয় ৪৮ জন আর রোহিঙ্গা ৬৪ জন।ডা. রনজন বড়–য়া রাজন বলেন, এবারের ক্যাম্পেইনে টিকাদান কেন্দ্র সকাল ৮ টা থেকে ৩ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকবে। ক্যাম্পেইন সফল করার জন্য ব্যাপক কর্মযজ্ঞ গ্রহণ করা হয়েছে। এরমধ্যে সচেতনতা, মাইকিং, সভাসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন হচ্ছে। সফলভাবে ওসিভি ক্যাম্পেইন সম্পন্ন হলে কলেরা ঝুঁকি থেকে মুক্ত হবে উখিয়া-টেকনাফ। এজন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার সবাইকে সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন মো. আলমগীর বলেন, নিরাপদ পানি এবং সঠিক পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার অভাবে কলেরা রোগ হচ্ছে। এটি একটি পানিবাহিত রোগ। এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বড় ধরণের ক্ষতি হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, উখিয়া-টেকনাফে গত এক বছরে ১৯১ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে ১৩৩ জনের কলেরা রোগ সনাক্ত হয়েছে। তবে জেলার অন্যকোন উপজেলায় এখন পর্যন্ত কলেরা রোগি পাওয়া যায়নি। এই দুই উপজেলায় দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পুরো জেলাকে কলেরা থেকে নিরাপদ করা সম্ভব। তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে সঠিক সময়ে কলেরা টিকা খাওয়ার আহ্বান জানান।