উখিয়া

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাজা শাহ আলমের জন্য দোয়া মাহফিল, অ আল্লাহ তারে প্রধানমন্ত্রী বানাই দে

অনলাইন ডেস্ক : মিয়ানমারের আরাকানের স্বাধীনতাকামী রোহিঙ্গা নেতা কাশিম রাজার ছেলে শাহ আলম প্রকাশ রাজা শাহ আলম। তাকে উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ। রোহিঙ্গা নেতার ছেলের বড় পদপ্রাপ্তির খবরে ক্যাম্পগুলোতে খুশির জোয়ার বইছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মসজিদে মসজিদে খতমে কোরান মাহফিল ও দোয়া করা হচ্ছে তাঁর জন্য। এ নিয়ে জেলাব্যাপী তোলপাড় চলছে।

উখিয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গারা আশ্রিত হিসেবে থাকবে। এখন তারা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের মতো রাজনৈতিক দলের বিষয় নিয়ে নাক গলাতে শুরু করেছে ক্যাম্পে।

এদিকে গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর রাত থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মসজিদে দোয়া মাহফিলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে মৌলভী বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘অহ আল্লাহ আঁরার বার্মার কাশেম রাজার পুঁয়া রাজা শাহ আলম আওয়ামী লীগ’র ডর উগ্গা নেতা বইন্যে। অহ আল্লাহ তুঁই তারে আরও ডঅর নেতা ও আল্লাহ প্রধানমন্ত্রী বানাই দে মওলা। অর্থাৎ হে আল্লাহ আমাদের বার্মার কাশেম রাজার ছেলে রাজা শাহ আলম আওয়ামী লীগের বড় নেতা হয়েছেন। তুমি তাকে আরও বড় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দাও।

অপরদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘আরাকানের মুসলমানদের ইতিহাসে’ লিখেছেন- আরকান ন্যাশনাল মুসলিম অর্গানাইজেশন (সুবহান উকিলের নেতৃত্বে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি)। আরকানের মুসলিম যুব সমাজকে ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে নৈতিকতা গঠনের নিমিত্তে মোহাম্মদ কাশিম (রাজা শাহ আলমের পিতা) ও মং মং গিয়াই এর নেতৃত্বে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। রোহিঙ্গা ছাত্রদের মাঝে দ্বীনই চেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালে শাহ আলম (রাজা শাহ আলম) ও শাহ লতিফ এর নেতৃত্বে রেঙ্গুনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত সংগঠনগুলো ১৯৬৪সালে নে উইন কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর রাজা শাহ আলম চৌধুরীকে আহবায়ক ও আরও ৬ জনকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৩৩ সদস্যের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ। সেদিন সন্ধ্যা ৭ টায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির অনুমোদিত তালিকা আহবায়ক শাহ আলম চৌধুরী রাজার হাতে হস্তান্তর করেন জেলা সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান।

ভিডিওর সূত্র ধরে স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজা শাহা আলম রোহিঙ্গাদের বিপ্লবী নেতা কাশেম রাজার ছেলে। ষাটের দশকে মিয়ানমার (তখনকার বার্মা) সরকারের চাপের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন কাশিম রাজা। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাহাড়ি এলাকায় সপরিবারে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে সেই এলাকাতেই বসতি স্থাপন শুরু করেন রোহিঙ্গাদের বিপ্লবী এই নেতা। সেখানে জন্ম হয় কাশিম রাজা তিন পুত্র ও দুই কন্যার। কাশিম রাজার প্রথম পুত্র হলেন শাহ আলম চৌধুরী প্রকাশ রাজা শাহ আলম। সত্তরের দশকে মিয়ানমারের গুপ্তচরেরা উখিয়ার ইনানীর পাহাড়ি এলাকায় কাশেম রাজাকে হত্যা করে।

রাজা শাহ আলম চৌধুরী প্রথমদিকে কক্সবাজারে মাছের ব্যবসা করতেন। এক সময় তিনি কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টে হোটেল মিডিয়া নামের একটি হোটেল নির্মাণ করেন। হোটেল ব্যবসার সূত্রে ধীরে ধীরে আওয়ামীলীগ নেতাদের সংস্পর্শে চলে আসেন তিনি। জড়িয়ে পড়েন জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। একপর্যায়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতিও হন তিনি। তার ছেলে ইমরান আলম চৌধুরী চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ-র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রামের ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের রেজিস্ট্রার

উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালে মিয়ানমার সরকারের চাপের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন আবুল কাশেম ওরফে কাশেম রাজা। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে উখিয়ার ইনানীর পাহাড়ি এলাকায় স্বপরিবারে আশ্রয় নেন কাছিম রাজা। কাশিম রাজার ৩ ছেলে ও ২ মেয়ের মধে প্রথম ছেলে হলেন শাহা আলম চৌধুরী ওরফে রাজা শাহ আলম। পাকিস্তান সরকার এই কাশেম রাজাকে ব্যবহার করে আরাকান রাজ্যের তথা পাকিস্তান-বার্মা সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত রাখতেন বলে জানা গেছে।

মিয়ানমারের গুপ্তচররা ১৯৬৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর উখিয়ার ইনানী পাহাড়ী এলাকায় কাশেম রাজাকে হত্যা করে। রাজা শাহ আলম কক্সবাজারে বিভিন্ন ব্যবসার সূত্রে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ বড় নেতাদের সংস্পর্শে চলে আসেন। এভাবে ২০০৮সালে কক্সাবাজারের জেলা আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত হন।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ সূত্র মতে, গত ৯ সেপ্টেম্বর উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে আহবায়ক করা হয় জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাজা শাহ আলমকে। স্থানীয় সূত্র মতে, এই ঘটনায় উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে শুকরিয়া মোনাজাত হলে চরম অসন্তোষ চলছে আওয়ামী রাজনীতিতে। এমনকি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দারাও রোহিঙ্গা জঙ্গীদের মোনাজাতের ভাষা শুনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে রাজা শাহ আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোনাজাতের ভিডিওটি কে বা কাহারা আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। মূলত: আমি একজন বাংলাদেশী নাগরিক। বাংলাদেশেই আমার জন্ম। যারা ষড়যন্ত্রে শুরু করেছে তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।