নিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

শ্রীরামসি গণহত্যা: পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা আমজাদ আলীর কথা

নজরুল ইসলাম বকসী

তাকে চিনে না এমন লোক খুব কমই আছে সারা উপজেলায়। বিশেষ করে কুবাজপুর গ্রাম সংলগ্ন শিবগঞ্জ বাজারের প্রত্যেক দোকানদার থেকে শুরু করে দোকান কর্মচারী সবাই এক নামে তাকে চিনেন। এমনকি বিভিন্ন কাজে বাজারে যারা আসেন অর্থাৎ আশপাশ এলাকার বিভিন্ন গ্রামের মানুষজন “হাত কাটা আমজাদ” বললেই একবাক্যে সবাই চিনেন।

নাম তার আমজাদ আলী। বয়স ৬২ বৎসর। পিতা মৃত ফয়াজ উল্লাহ্। সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কুবাজপুর গ্রামে তার বাড়ী।
১৯৭১ সালের ৩১ আগষ্ট হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদের কুখ্যাত “শ্রীরামসি গণহত্যা”র ঘটনার শিকার হন তখনকার কিশোর আমজাদ আলী। তখন তার সাথী কয়েকশ’ মানুষ নিহত হলেও গুরুতর আহত আমজাদ আলী ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তার এই বেঁচে যাওয়ার করুণ কাহিনী, চিকিৎসা গ্রহণের জটিলতা ও আজ পর্যন্ত বেঁচে থাকার দুর্বিসহ সংগ্রাম নিয়ে কিছুদিন আগে তিনি আমার কাছে তার স্মৃতিচারণ করেন। এসময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন কুবাজপুরের বিশিষ্ট ব্যক্তি মাস্টার সুজাত মিয়া, আব্দুল হক, রহিমা বেগম কাওসার, আলমারজান সাকু ও রাজিব আল রাজু।

৩১ শে আগস্ট ১৯৭১। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। সকাল থেকেই শ্রীরামসি বাজার ছিল শান্ত নিরুদ্বিগ্ন সুনসান। কিন্তু সাড়ে ৯ টার দিকে হঠাৎ মেঘ না চাইতে বজ্রপাত। বাজারের উল্টো দিক থেকে একাধিক নৌকা বোঝাই পাকি সেনাবাহিনী ও রাজাকারেরা বাজারের দিকে আসতে থাকে এবং জনৈক রাজাকার টিনের এলান চুঙা মুখে দিয়ে এলাকার লোকজনকে বাজারে আসার আহ্বান জানাতে থাকে। বাজারে আজ শান্তি কমিটি গঠিত হবে বলে ঘোষণাও করে। এসময় বাজারে আবস্থানকারীদের মধ্যে আতঙ্কজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়। অনেকেই পালানোর চেষ্টা করেন কিন্তু পালাতে পারেননি। পাকি বাহিনী ও রাজাকারেরা চতুর্দিকে বাজারটি ঘিরে ফেল এবং আশ্বস্ত করে এখানে কোন খুন খারাবি হবেনা। এলাকার শান্তির প্রয়োজনে শান্তি কমিটি গঠনের লক্ষ্যে মিটিং ডাকা হয়েছে। এলাকার লোকজনকে তারা বাজারে আসার নির্দেশ এবং না আসলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গুলি করা হবে বলেও হুমকি দেয়। তাছাড়া বাজারের কেউ পালানোর চেষ্টা করলে তাকেও মেরে ফেলা হবে বলে ঘোষণা করে রাজাকারেরা।

১৫ বছর বয়সের আমজাদ আলী শ্রীরামসি বাজারের নজির মিয়ার মুদির দোকানের কর্মচারী ছিলেন। নজির মিয়ার বাড়ি বাজারের পাশেই। পাকি আর্মি এসেছে শুনে আমজাদ আলী তখন তার দোকান বন্ধ করে ফেলেন এবং পালানোর উদ্দেশ্যে একটি বদনা হাতে নিয়ে পাশের খোলা পায়খানার দিকে যেতে থাকেন। এসময় এক রাজাকার তাকে দেখে আটক করে ফেলে এবং বলে এই মুহুর্তে পেশাব পায়খানা সব বন্ধ। কোথাও যেতে পারবেনা। তখন তাকে নিয়ে গেল বাজারের হাই স্কুলের ক্লাস সিক্সের রুমে। সেখানে বাজারের অন্যান্য লোকজনকে জমা করা হয়েছে। পরে সবাইকে লাইন করে লাইব্রেরী রুমে নিয়ে যায়। এই লাইনে আমজাদ ছিলেন ২৩ নং সিরিয়ালে। লাইনে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সাদ উদ্দিন মাস্টার এবং বিকম স্যারও ছিলেন। লাইব্রেরী রুম থেকে সবাইকে নারিকেলের রশি দিয়ে হাত বেঁধে নৌকায় উঠতে বলে। আমজাদ আলীর হাতের বাঁধন কিছুটা ঢিলা ছিল। তিনি ভেবে ছিলেন পালানোর চেষ্টা করলে হয়তো তিনি সফল হতে পারেন। কিন্তু এসময় পোষ্ট অফিসের গার্ড কিছুটা উল্টাপাল্টা করলে রাজাকাররা তাকে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করে। তাই আমজাদ আলী আর পালাবার চেষ্টা করেননি।

নৌকায় উঠার পর বন্দীদের একেক জন একেক চিন্তা করতে থাকেন। কেউ বলেন থানায় নিয়ে যাবে, কেউ বলেন কারাগারে নিয়ে যাবে। আবার সবাই মিলে নৌকার মাঝিকে অনুরোধ করেন ছেড়ে দেয়ার জন্য। কেউ কেউ নৌকা ডুবিয়ে ফেলারও চেষ্টা করেন কিন্তু অদূরেই রাজাকারের নৌকা থাকায় কেউ আর সাহস করতে পারেননি। এসব কারনে পার্শ্ববর্তী নজির মিয়ার পুকুর পারে নৌকা পৌঁছতে কিছুটা দেরী হয়ে যায়। এনিয়ে নৌকার মাঝিকে কত প্রশ্ন করে রাজাকাররা। এর আগে প্রথম বন্দী দলের নৌকা রহিম উল্লাহর পুকুর পারে পৌঁছে গেছে। তখন সকাল ১০ টা।

আমজাদ আলীর মুদির দোকানের মালিক নজির মিয়ার পুকুর পারে বন্দীদের লাইন করে দাঁড় করানো হয় এবং গুলি করার নির্দেশ দেয় পাকিস্তানী কমাণ্ডার ক্যাপ্টেন বাশারত। কিন্তু প্রথম গুলি উপর দিকে চলে যায়। এসময় বন্দুকধারীর উপর অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে কমাণ্ডার বাশারত এবং বলে আমাদের একটা গুলির দাম একশ’ বাঙ্গালীর চেয়েও বেশি। তারপর অঝোর বৃষ্টি ধারার মত গুলি বর্ষণ হতে থাকে। আমজাদ আলীর গায়ে ৭/৮ টি গুলি লাগে। মারাত্মক আহত হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তারপরই পিন্ পতন নিস্তব্ধতা— । কিছুক্ষণ পর আমজাদ আলী কিঞ্চিৎ মাথা তুলে একটু পরিস্থিতি দেখতে চেয়ে ছিলেন এবং সাথে সাথেই আরেকটি গুলি তার মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। এতে তিনি পুরো অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে থাকেন।

প্রায় ৭ ঘন্টা অজ্ঞান থাকার পর বিকেল ৫ টায় জ্ঞান ফিরে আমজাদ আলীর। আশেপাশে কোন লোকজন দেখা যাচ্ছেনা অথচ পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে। তিনি তখন হামাগুড়ি দিয়ে কোন রকম পুকুরে গিয়ে অল্প পানি পান করেন। পরে আশপাশের দুয়েকজন লোক আসেন এবং আমজাদ আলীকে তার মহাজনের বাড়ীতে নিয়ে যান। কিছুটা শুশ্রূষা করে তাকে তিলক নিবাসী ছত্তার কাজীর নৌকায় তুলে দেয়া হয়। পরদিন অন্য একটি নৌকায় করে তিনি কুবাজপুরের গ্রামের বাড়িতে যান। এদিকে আগের দিন কে না কে আমজাদ আলীর মৃত্যু হয়েছে বলে একটি খবর তার বাড়িতে পৌঁছে দিলে সেখানে কান্নার রোল পড়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় জীবিত আমজাদ আলীকে দেখে আত্মীয়-স্বজন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

শ্রীরামসি গণহত্যার পরদিন ১ সেপ্টেম্বর একই উপজেলার (জগন্নাথপুর) বিখ্যাত নদীবন্দর রাণীগঞ্জ বাজারে ইতিহাসের নৃশংসতম আরেকটি গণহত্যার ঘটনা ঘটায় রাজাকার ও পাকি বাহিনী। জগন্নাথপুর সংলগ্ন হবিবপুর গ্রামের রাজাকার কমাণ্ডার আহমদ আলী খানের নেতৃত্বে রাজাকারদের একটি বড় দল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে নিয়ে এই গণহত্যার ঘটনা ঘটায়। আগের দিনের শ্রীরামসিতে ও আজকের রাণীগঞ্জের অভিযান তারই নেতৃত্বে সফল ভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে সদর্পে ঘোষণা দিয়ে রাজাকার কমাণ্ডার আহমদ আলী খান বলে– শ্রীরামসি ও রাণীগঞ্জে সফল অভিযানের মধ্যদিয়ে দেশদ্রোহী কথিত মুক্তি বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়া হল এবং পাক পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করা হলো।

এদিকে একই ইউনিয়নের ভিতরে রাণীগঞ্জে নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পার্শ্ববর্তী কুবাজপুর গ্রামে মারাত্মক আতংক দেখা দেয়। তাছাড়া ইউনিয়নের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মনোহর আলী এই গ্রামেরই বাসিন্দা। রাণীগঞ্জ গণহত্যায় তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। ফলে আতংকিত এলাকাবাসী আমজাদ আলীর বাড়ী গিয়ে তাকে অবিলম্বে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলেন। কারন আহত আমজাদ আলীকে মুক্তিযোদ্ধা মনে করে পাকি সেনা ও রাজাকারেরা আস্ত গ্রাম পুড়িয়ে দিতে পারে।
উপায়ান্তর না দেখে আহত আমজাদ আলীকে প্রথমে তার মামার বাড়ী কইখাই গ্রামে এবং পরে মৌলভী বাজার পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনদিন পর সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট পাঠানো হয়। কিন্তু সিলেট পাঠানোর সময় আবার মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি হয়। এই ধরণের আহত ব্যক্তিকে এম্ব্যুলেন্সে পাঠাতে পাকি বাহিনীর অনুমোদন দরকার পড়ে। কিন্তু কিভাবে অনুমোদন নেয়া যায় তা ভেবে পাচ্ছিলেননা কেউ। পরে রাজাকার সেজে এবং ভৈরব থেকে আসার পথে মুক্তি বাহিনীর আক্রমণে আহত হয়েছেন বলে দরখাস্ত করলে পাকি বাহিনী অনুমোদন দেয় এবং সেনাবাহিনীর একটি এম্ব্যুলেন্স সরবরাহ করে। তবে এজন্য এক জায়গায় ৩০ টাকা ও অন্য জায়গায় ৫০ টাকা ঘুষ দিতে হয়।
সেনাবাহিনীর এম্ব্যুলেন্স নিয়ে শেরপুর চেকপোষ্টের কাছে আসলে এখানে প্রায় ৫০০ পাঞ্জাবি ও বেলুচ সৈন্য এম্ব্যুলেন্স ঘিরে ধরে। তখন রাজাকারের কাগজ এবং সেনাবাহিনীর অনুমোদনপত্র দেখালে ছেড়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর সিলেট সরকারী হাসপাতালে পৌঁছলে সেনাবাহিনীর এম্ব্যুলেন্সে আহত রোগী দেখে ডাক্তার ও নার্সদের মধ্যে ত্রস্ততা শুরু হয়ে যায়। আমজাদ আলীকে তারা সম্মানের সাথে গ্রহন করে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে শুরু করে। রাজাকর পরিচয়ে হাসপাতালে একমাস চিকিৎসা নেয়ার পর আমজাদ আলী কিছুটা ভাল হয়ে উঠেন ঠিকই কিন্তু তার ডান হাতটি গোড়াতেই কেটে ফেলতে হয়– যা আর কোনদিন জোড়া লাগাবার নয় বা পুরণ হবার নয়।

মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকালে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া গরিবের ছেলে আমজাদ আলী অতি দুঃখ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। দীর্ঘ ৪৯ বৎসর ধরে মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এখনও ঠিকমত তিনি ঘুমাতে পারেননা। ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে আতংকিত আমজাদ আলীর সুখের নিদ্রা ভেঙ্গে যায়। মনে হয় যেন পাকি সেনা ও রাজাকারেরা তাকে ঘিরে ধরেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে পঙ্গু আমজাদ আলী বলেন– মুক্তিযুদ্ধের ৪৯ বছর কেটে গেছে। স্বাধীনদেশের সরকার সমুহে অনেক উত্থান পতন ঘটেছে। ভেবে ছিলাম আমরা যারা যুদ্ধাহত স্বাধীন দেশে আমরা অনেক সম্মান পাবো অনেক মূল্যায়ন পাবো। বর্তমানে সামাজিক সম্মান কিছুটা পেলেও এ পর্যন্ত সরকারী কোন সহযোগিতা বা কোন ধরণের আর্থিক সুযোগ সুবিধা পাইনি। শরীরের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অঙ্গ ডানহাত না থাকায় কোন ধরণের আয় উপার্জনও করতে পারিনা। তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দুর্বিসহ অবস্থার মধ্যদিয়ে দিনাতিপাত করছি।
তিনি বলেন, বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের সরকার ক্ষমতায়। এই সরকার চাইলে আমাদের জন্য অনেক কিছুই করতে পারেন। আশায় বুক বেঁধে রেখেছি– বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের সময় আমরা যারা যুদ্ধাহত তারা হয়তো যথাযথ মূল্যায়ন পাবো। বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহতদের মরণপণ সংগ্রামে এবং ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা এসেছে। তাই বর্তমান প্রজন্ম স্বাধীন দেশে জন্ম গ্রহন করতে পারছে। ফলে তাদের উচিত স্বাধীনতা ও জাতীয় পতাকার সম্মান করা মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক দেশ গড়ে তোলা।

যুদ্ধাহত আমজাদ আলীর প্রতি সমাজ ও সরকারের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আমরা দেখতে পাই তাকে নিয়ে অনেকেই রাজনীতির সিঁড়ি উৎরে যাচ্ছেন। নির্বাচন আসলে কেউ কেউ তাকে সাথে নিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে যান। এই এতটুকুই। নির্বাচনে জেতার পর আমজাদ আলীর খবর কেউ আর নেয়না।
বর্তমানে যারা বিভিন্ন দায়িত্বে আছেন যেমন সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়, সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী সহ সবাইকে আমজাদ আলী ও তার মত যুদ্ধাহতদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে এরাই আমাদের সূর্যসন্তান— স্বাধীনতার জীবন্ত ইতিহাস।

লেখক— সাংবাদিক ও কলামিস্ট