সলিমুল্লাহ খান : বন্ধু ও শিক্ষক

আলম খোরশেদ

আমি তখন চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট কেডেট কলেজের নবম কি দশম শ্রেণির ছাত্র। একদিন শোনা গেল, চট্টগ্রাম কলেজের পড়ুয়া, মহেশখালির কোনো এক গ্রামের ছেলে নাকি আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বোর্ডসেরা শিক্ষার্থীটিকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। এই নিয়ে বেশ হাসাহাসি হলো শিক্ষক ও ছাত্রমহলে। কিন্তু, ফল বেরুনোর পর সত্যি সত্যি দেখা গেল সেই ছেলেটি বিপুল নম্বর পেয়ে আমাদের কলেজের সেরা ছাত্রটিকে ডিঙিয়ে মানবিক বিভাগে প্রথম হয়েছে। প্রবল আত্মবিশ্বাসী, দুর্দান্ত মেধাবী সেই মানুষটিই হলেন আজকের সলিমুল্লাহ খান, আমাদের খান ভাই। কে জানত, আর কয়েক বছর বাদেই ঢাকায় পড়তে গিয়ে সামান্য লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুবাদে সেই মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হবে; কালক্রমে যা দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিন মহাদেশে, এবং শতাব্দীর সীমারেখা অতিক্রম করে পরবর্তী শতকেও প্রসারিত হবে!

১৯৮৮ সালের গোড়াতে আমি উচ্চশিক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাই। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল এক ধ্যাদ্দেড়ে গোবিন্দপুর, তথা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম রাখালরাজ্য, ওকলাহোমায়। পাণ্ডববর্জিত সেই বিশ্ববিদ্যালয়-পল্লীতে উন্নত সাংস্কৃতিক আবহের অভাবে, বিশেষ করে মন খুলে আড্ডা দেওয়ার সঙ্গীসাথী না পাওয়াতে অল্প কদিনের মধ্যেই আমার মনপ্রাণ হাঁপিয়ে উঠল; তা সে লাইব্রেরি থেকে ধার করে এনে যতই মার্কেস-য়োসা আর কুন্ডেরা-আচেবের পাঠ চলুক না কেন। সলিমুল্লাহ খান ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বামপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় বলে খ্যাত নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চ-এ মার্কসীয় অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার সুবাদে নিউইয়র্কে বেশ ভালোভাবেই আসন গেড়ে বসেছেন। মাঝেমধ্যেই তাই দূরালাপনীতে মনের দুঃখ উগরে দিই তাঁর কাছে। তিনি এক পর্যায়ে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় পাল্টে নিউইয়র্কের দিকে কোথাও চলে আসার পরামর্শ দিলেন। বস্তুত, তাঁর কাছ থেকে অভয় পেয়েই আমি কোনোমতে প্রথম সেমিস্টারটা শেষ করেই এক মধ্যরাতে দূরপাল্লার গ্রে হাউন্ড বাসে চেপে বসি তল্পিতল্পাসহ। এবং দীর্ঘ চল্লিশ ঘন্টার বিরতিহীন ভ্রমণশেষে, গ্রীষ্মের এক কাকডাকা ভোরে, পা রাখি নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইমস স্কোয়ারের জনারণ্যে।

খান ভাই তার ব্রংক্স-এর ঘরের দরজা যেন খুলেই রেখেছিলেন এই অধমের জন্য। সেখানে তিনি সাদরে বরণ করে নেন আমাকে এবং স্থান দেন একেবারে তাঁর নিজের শয়নকক্ষে। সেখানে অবশ্য শয়নের জায়গা ছিল খুব কমই, যতটা চোখ যায়, মেঝে থেকে ছাদ অব্দি, দেয়ালের সবটুকু জুড়ে কেবল বই আর বই। আর কী তার বিষয়বৈচিত্র্য! তাঁর তখনকার অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার বিষয় ’অর্থশাস্ত্র’র বইপত্রাদি তো ছিলই, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ছিল দর্শন, রাজনীতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থসমূহ। সেই নিরিবিলি বাড়িতে, খান ভাইয়ের ছত্রছায়াতেই সত্যিকার অর্থে বই তথা জ্ঞানচর্চা ও বৌদ্ধিক সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে অচ্ছেদ্য এক আত্মিক বন্ধনে বাঁধা পড়ি আমি। তাঁর সক্ষম ও সমৃদ্ধ দূতিয়ালিতেই ক্রমে ভাষা, সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি ও শিল্পের প্রায় প্রতিটি শাখার সঙ্গে গড়ে ওঠে এক দীর্ঘস্থায়ী মধুর মিতালী আমার।

সৌভাগ্যক্রমে, নিউইয়র্ক শহরেরই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ভর্তির ব্যবস্থা হয়ে যায়, যার কাছাকাছি দূরত্বেই ছিল খান ভাইয়ের শিক্ষাঙ্গন। এই শহরে তখন আরও থাকতেন আজকের স্বনামধন্য আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন ভাই। আর, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এসে উপস্থিত হয়েছিল আমাদের পুরনো বন্ধু তারেক মাসুদ, তার নবপরিণীতা মার্কিন-বাঙালি বধূ ক্যাথরিনকে নিয়ে। সঙ্গে তার সদ্যসমাপ্ত ছবি, আদমসুরত। সলিমুল্লাহ খান আর দেরি করলেন না, একই স্কুলে অধ্যয়নরত তাঁর সতীর্থ চলচ্চিত্রকার বন্ধু মাহমুদ হকের সঙ্গে মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘরেই দ্রুত এই ছবিটি প্রদর্শনের আয়োজন করে ফেললেন। খবর পেয়ে নিউইয়র্কের বাঙালি চলচ্চিত্রানুরাগীরা দলবেঁধে আসেন ছবিটি দেখতে। মনে পড়ে, আমি ছবিটি দেখার পরপরই একটি আলোচনাও লিখেছিলাম, ’আদম সুরত: দিকনির্দেশনার চলচ্চিত্র’, এই শিরোনামে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠগ্রহণ এবং জীবিকার তাগিদে খণ্ডকালীন কাজের সময়টুকু বাদ দিলে আমাদের দিন ও রাত্রির বাকি প্রহরগুলো ছিল শিল্প আর সাহিত্য আর সমাজ-রাজনীতি-ইতিহাসের সম্মিলিত চর্চা ও আড্ডায় উন্মাতাল। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, দেশে থাকতে আমার সাহিত্যচর্চার বিষয়টা নিতান্তই সৌখিন ও অনেকটা ব্যক্তিগত আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। খান ভাইয়ের সান্নিধ্যে এসে, তাঁর মনোজগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হয়ে এবং তাঁর বৌদ্ধিক সাধনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পেরেই সত্যিকার অর্থে আমি এর রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে শিখি, সেইসঙ্গে অনুধাবন করতে পারি এর সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার সম্পর্কটি। তাঁর কাছ থেকেই আমি পাই মার্কসীয় অর্থনীতি, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের প্রথম পাঠ; সেইসঙ্গে শিল্প ও সাহিত্য সমালোচনার দর্শন ও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক বিদ্যায়তনিক জ্ঞান; ভাষাদর্শন, অনুবাদকর্ম ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ে স্বচ্ছ ও সম্যক ধারণা। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, তাঁকে আমার প্রথম ও সত্যিকার বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষক হিসাবে মেনে নিতে কোনো সংকোচ নেই আমার। আমার এই অসামান্য মেধাবী শিক্ষক-বন্ধুটির ষাট বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে প্রকাশিতব্য পুস্তিকার জন্য লিখতে অনুরুদ্ধ হয়ে আমি তাই প্রথম সুযোগেই, তাঁর প্রতি আমার অপরিসীম সাহিত্যিক ঋণটুকু স্বীকার করে নিচ্ছি অকপটচিত্তে।

স্মৃতিচারণপর্ব

এই পর্বে রইল খান ভাইয়ের সঙ্গে নিউইয়র্কে কাটানো আমার স্বপ্নসম দিনগুলোর অল্প কিছু চকিত স্মৃতিকণা।

এক. ছুটির দিনের সাতসকালে নিদ্রা বিসর্জন দিয়ে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিনিচ ভিলেজ ক্যাম্পাসে আমাদের একসঙ্গে স্প্যানিশ ভাষা শিখতে যাওয়ার কথাটা কেন জানি বিশেষভাবে মনে পড়ছে আজ। বিদেশি ভাষা শেখার বিষয়ে খান ভাইয়ের ছিল, এবং সম্ভবত এখনও রয়েছে, এক দুর্মর আগ্রহ আর অভিনিবেশ।

দুই. প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য আমাদের একসঙ্গে ওয়াশিংটন ডিসিতে যাওয়ার সেই শিহরণ-জাগানো অভিজ্ঞতা এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে মিছিল করার সময় বোমা হামলার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার সাংঘাতিক স্মৃতি ভোলা যাবে না কোনোদিন।

তিন. ১৯৯০ এর সাধারণ নির্বাচনে সান্দিনিস্তাদের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ে, নিকারাগুয়ার বিপ্লবের একনিষ্ঠ সমর্থক, তাঁর নীরবে চোখের জল ফেলার হৃদয়ভাঙা ছবিটির কথা গেঁথে আছে মনে আজও। খান ভাই নিশ্চয়ই অবগত আছেন, সেদিনের পরাজিত নেতা দানিয়েল ওর্তেগা বহু বছর বাদে আবারও ক্ষমতায় এসেছেন, এবং আবারও তাঁকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অভ্যন্তরে।

চার. ১৯৯১ সালে প্রকাশিত বাংলাভাষার সম্ভবত প্রথম লাতিন আমেরিকান গল্পসংকলন, ’জাদুবাস্তবতার গাথা’ সম্পাদনা করার সূত্রে অনুবাদ ও সম্পাদনা বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া অমূল্য শিক্ষার কথা মনে থাকবে আজীবন। প্রসঙ্গত, এই গ্রন্থের জন্য তাঁর অনুবাদ-করা আলেহো কার্পেন্তিয়েরের ’রাজনৈতিক আশ্রয়’ গল্পটিকে আমার পঠিত কথাসাহিত্যের অন্যতম সেরা অনুবাদকর্মের একটি দৃষ্টান্ত বলে বিবেচনা করি আমি। মিশরীয় নোবেলবিজয়ী লেখক নাগিব মাহফুজের একটি গল্প, খারাপ পাড়ার মসজিদ অনুবাদ করতে গিয়েও বহুবিষয়ে, বিশেষ করে, সংলাপে ও বর্ণনায় লোকজ শব্দের প্রয়োগের ক্ষেত্রে, মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি লাভ করি তাঁর কাছ থেকে। আমার সেই অনুবাদ গল্পগ্রন্থটি আমি উৎসর্গও করেছিলাম তাঁকেই। মনে আছে, উৎসর্গপত্রে লিখেছিলাম, ’কবিবন্ধু সলিমুল্লাহ খানকে, অনুবাদের অনেক অন্ধিসন্ধি শিখেছি যার কাছে।’

পাঁচ. শিবনারায়ণ রায় সম্পাদিত ’জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার বিশেষ বাংলাদেশ সংখ্যার জন্য আমার অনুরোধে আহমদ ছফার ওপর একটি প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে স্রেফ একটি মোক্ষম শব্দের জন্য তাঁর নিজের লেখাকে অজস্রবার কাটাছেঁড়া, পরিবর্তন ও পরিমার্জনা করার দৃশ্যটি কখনও ভুলবার নয়। আমি তখন বাংলা ভাষার এই মর্যাদাবান পত্রিকাটির নিউইয়র্ক সমন্বয়ক ছিলাম।

ছয়. নিউইয়র্কের সুবিশাল পুরনো বইয়ের দোকান স্ট্রান্ড বুকস্, কুপার ইউনিয়নে অবস্থিত সেন্ট মার্ক স্টোর, রেভুলিউশন বুকস, বার্নস অ্যান্ড নোবেলের অ্যানেক্স বিল্ডিং আর গ্রিনিচ ভিলেজের ফুটপাথ থেকে তাঁর দুহাত ভরে নিত্যনতুন বই কেনার সঙ্গী ছিলাম আমিও, এই কথা আজ আনন্দ ও গর্বভরে স্মরণ করি।

সাত. মনে পড়ে নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির মূল শাখা ও তার রেফারেন্স বিভাগে, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে এবং অন্যত্র বাংলা ভাষার ইতিহাস, ব্যাকরণ, পরিভাষা ইত্যাদি বিষয়ে প্রাচীন গ্রন্থাদি ও ধ্রুপদী লেখকদের রচনাবলির জন্য আমাদের ক্লান্তিহীন অনুসন্ধানের কথা। এভাবেই একদিন প্রখ্যাত শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাংলা ভাষার ব্যাকরণ বিষয়ক একটি বিস্মৃতপ্রায় ঐতিহাসিক প্রবন্ধ খুঁজে বার করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

আট. গ্রিনিচ ভিলেজের বিভিন্ন আর্টহাউজ মুভি থিয়েটার যেমন, সিনেমা ভিলেজ, থালিয়া, ফিল্ম ফোরাম, কোয়াড ইত্যাদিতে এবং নানান ফেস্টিভ্যালে বন্ধুবর তারেক মাসুদসহ আমাদের দলবেঁধে প্রচুর বিদেশি ছবি দেখার উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতা এবং সেসব নিয়ে পরে তুমুল তর্কবিতর্কের কথাই বা ভুলি কেমন করে!

নয়. নিউ স্কুল ফর সোস্যাল রিসার্চে তাঁর উদ্যোগে ভারতের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আসগর আলি ইঞ্জিনিয়ার, পাকিস্তানের নির্বাসিত বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আইজাজ আহমেদ, বাংলাদেশের স্বনামধন্য চিন্তক ও চিত্রসমালোচক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গির প্রমুখের সফল বক্তৃতাসভা আয়োজনের স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল আমার মানসপটে।

দশ. কোনো এক গ্রীষ্মের ছুটিতে তারেক মাসুদ, ক্যাথরিন, নাসির আলি মামুন ভাই সমেত আমাদের একসঙ্গে কানেকটিকাট রাজ্যের সালেমে অবস্থিত ক্যাথরিনের মামার বাড়ি এবং আরও উত্তরে মেইন রাজ্যে তার নানির বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দময় স্মৃতি এখনও অবসরের সঙ্গী আমার। এই স্মরণীয় ভ্রমণের সূত্রেই খান ভাইয়ের আমোদপ্রিয় মন, প্রগাঢ় রসবোধ, প্রকৃতিপ্রেম, বন্ধুবাৎসল্য ও মানবিক সংবেদনশীলতার প্রকৃষ্ট পরিচয় পেয়েছিলাম আমরা সবাই।

প্রত্যাশাপর্ব

সলিমুল্লাহ খান ভাইকে বহুবৎসর ধরে খুব কাছ থেকে দেখে ও তাঁর সঙ্গে দীর্ঘসময় ধরে খোলামনে বহুবিধ প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তাঁর বিপুল পড়াশোনা, অতুলনীয় স্মরণশক্তি, অসাধারণ বিশ্লেষণী ক্ষমতা, প্রশ্নশীলতা, পর্যবেক্ষণকুশলতা, সর্বোপরি মৌলিক চিন্তার সাহস ও সক্ষমতার যে-পরিচয় আমি পেয়েছি, তাতে একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, তাঁর মতো এমন মেধাবী ও মননশীল মানুষ এই ভূখণ্ডে বিরল। কিন্তু সত্যি বলতে কি, সেই তুলনায় তাঁর কাছ থেকে পাওয়া আমাদের বৌদ্ধিক সম্পদসমূহ তথা গ্রন্থ, সন্দর্ভ ও বিদ্যায়তনিক রচনার পরিমাণ প্রত্যাশামাফিক নয় – এটা আমার একেবারেই ব্যক্তিগত, বিনীত অভিমত। এরই আলোকে, তাঁর কাছ থেকে আমার নিজস্ব কিছু সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা ও দাবি রয়েছে। সেই প্রত্যাশার কথাটুকুই এখানে ব্যক্ত এবং একইসঙ্গে তাঁর দীর্ঘ, কর্মময় জীবন কামনা করে আমার এই বিনম্র শ্রদ্ধাবচনের ইতি টানছি।

এক. বিভিন্ন পত্রপত্রিকার জন্য রচিত প্রবন্ধাদি, টেলিভিশনের টকশোসমূহ এবং ইতোমধ্যে গ্রন্থাকারে সংকলিত রচনাসমূহের মধ্যে আমরা বিচ্ছিন্নভাবে ভাষা, দর্শন, শিল্পকলা, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সাহিত্য ইত্যাকার বিষয়ে সলিমুল্লাহ খানের মৌলিক ও মূল্যবান চিন্তাভাবনার সন্ধান পাই। কিন্তু, আমার মনে হয়, তাঁর এইসব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, চিন্তা, বিশ্লেষণ ও বক্তব্যসমূহকে এভাবে বিভিন্ন জায়গায় এলাপাথাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে না রেখে বিষয় ধরে ধরে, প্রয়োজনে আরও খানিকটা বিশদ ও বিস্তৃতভাবে একেকটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ, নিদেনপক্ষে পুস্তিকাকারে পরিবেশন করা হলে বৃহত্তর পাঠকের পক্ষে তাঁকে জানতে ও তাঁর ভাবনাচিন্তাকে ভালো করে বুঝতে আরও সুবিধা হত। আশা করি সলিমুল্লাহ খান নিজে এবং তাঁর সহচর, সহকর্মী ও প্রকাশকবৃন্দ এই প্রস্তাবনার গুরুত্ব অনুধাবন করে তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন অচিরেই।

দুই. আগেই বলেছি, সলিমুল্লাহ খান অসাধারণ অনুবাদক, যার অনুবাদককর্মকে প্রায় মৌলিক লেখার সমতুল্য বলেই মনে হয় আমার। তাই তাঁর কাছে দাবি, বিশ্বসাহিত্য কিংবা বৈশ্বিক জ্ঞানকাণ্ডের দুয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের সটীক অনুবাদ তিনি উপহার দেবেন আমাদের। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সমৃদ্ধ হবে আমাদের অনুবাদ সাহিত্য, তেমনি অন্যদিকে আমরা যারা অনুবাদের কাজে আগ্রহী তারা পাব উন্নত অনুবাদকর্মের জন্য একটি অনুসরণীয় মানদণ্ড ও রূপরেখা। আমি জানি, তিনি মার্তিনিক দ্বীপবাসী মার্কসবাদী চিন্তক ফ্রাঞ্জ ফানোর সমগ্র রচনা অনুবাদের কাজ শুরু করেছিলেন, এবং সম্ভবত রুসোর সুবিখ্যাত ’সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বইখানিও। আর কিছু না হোক, অন্তত এই কাজগুলো তাঁর দ্রুত সম্পন্ন করে প্রকাশের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

তিন. কয়েক বছর আগে, আমাদের শিল্পসংগঠন বিস্তার থেকে তাঁকে আমরা একটি বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম চট্টগ্রামে। সেখানে, আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম, ’আমাদের জটিল ঔপনিবেশিক ইতিহাসের আলোকে এবং স্বাধীনতা-উত্তর কালের আকস্মিক সমাজ-রূপান্তরের পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতির একটি সামগ্রিক ভবিষ্যৎ রূপরেখা’ উপস্থাপন করতে। সময়স্বল্পতা এবং বিষয়টির ব্যাপকতার কারণে সেবার খুব দ্রুত ও সংক্ষেপেই তাঁকে সারতে হয়েছিল বক্তৃতা। আমরা আশা করব, সময়সুযোগ করে অনতিকালের মধ্যেই তিনি এই বিষয়ে তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যটুকু গ্রন্থাকারে উপস্থাপন করবেন আমাদের সামনে। আমরা মনে করি, এটি এই মুহূর্তের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করণীয় এবং তিনিই সে-কাজের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি, কেননা তাঁর রয়েছে এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রগাঢ় ইতিহাসজ্ঞান, সমাজ-পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক দক্ষতা এবং গভীরতর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা। আশা করি, তিনি আমাদের বিমুখ করবেন না।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।