সাগরের কবিতা

মনির ইউসুফ

আমার বেদনার রঙ
আত্মার বৈচিত্রে ভরা
সে রঙ মেখেছি আমি
আমার হৃদয়ে
ভীষণ গর্জন- ঢেউ
কথা বলে
সে কথা বুঝে না
বুঝে না কেউ
আমি কি এ সাগরের
বিহ্বল সন্তান
আমার বুকের মাঝে
কেন তবে গুঞ্জরণ করে
সমস্ত বিকেল
আমার আত্মায় ঢেউ
উঠেছে ভীষণ
আমাকে আমার বেদনার কথা
বলতে হবে না…
কারো কারো জীবনের রঙ
দারুণ ব্যথার
বেদনার রঙে নীল
আমার আত্মা যেন
সাগরের ডানা মেলে উড়া
সে রকম ঝড়ো গাঙচিল

২.
মানুষের শক্তি অফুরন্ত আর সীমাহীন
বিস্ময়ের বৈভবের চেয়ে
আরও বিস্ময়ের
আরও বিস্ময়ের
আরও বেশি বিস্ময়ের
বঙ্গোপাসগরের তীরের এই শহরে
আমি একা ঢেউ গুনে গুনে
কাটিয়ে দিয়েছি এ রকম কত বিস্ময়
কত ঘোর
আমার উজ্জ্বল ঝিনুকবেলা
আমার মুক্তো খসানো দিন
আমার বুকের স্রোতে তীব্র আকুলতা
আমি কাউকে বুঝতে দেয়নি
আমি সেই উজ্জ্বল ভোরের দিগন্তে
মন মেলে দিয়েছি
তীব্ররোদে কুচকে যাওয়া মুখে
কুড়িয়েছি বেদনার মুক্তা
মানুষের বেদনার কত রকম ধরন
আমি ছাড়া সহজে তা কেউ বুঝতে পারেনি
কেননা, আমি পৃথিবীর তাবৎ মানুষের
বেদনা ও বিলাপকে আমার নিজের
জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছি
আর আমার আত্মায় একান্তে অনুভব করেছি
জগতের সমস্ত বেদনা বুকে নিয়ে
বঙ্গপোসাগরের সাত ঘাটের পানি খেতে খেতে
আমি মানুষ হওয়ার মিছিলে হেঁটেছি
আমার বেদনার রঙে বঙ্গোপাসগর হয়েছে নীল
আমার স্বপ্নের রঙে তার প্রবল প্রমত্ত প্রকাশ
দিগন্তের বিপুল বিস্ময়
আকাশের সাতবোন সুরতী
প্রাগৈতিহাসিক বেদনার গুঞ্জরণ
আমাকে কাছে ডাকে
আমি আধুনিক বেদনার সব যন্ত্রণা
বুকে নিয়ে বলেছি
সাম্রাজ্যবাদের যুগে মানুষের মন
যে অবাক শান্তির খোঁজে দিওয়ানা হয়েছে
তার রূপ ও রূপান্তরের সরূপ কি
মানুষের শক্তি অফুরন্ত আর অন্তহীন
আমি সেই আশ্চর্য শক্তির কাছে
বর্তুলোকার এই গতিময় গ্রহকে
জগতের সামনে দাঁড় করে দিয়েছি

কক্সবাজার সদর হাসপাতাল
রাত : ১১টা ২৭ মিনিট, বেড ২৪, বুধবার

৩.
আমি সারেং, আমি সাগরের পাহারাদার
আমি সারেং, আমি উন্মুক্ত এই দিগন্তের পাহারাদার
আদম সুরত জ্বলে
শত শতাব্দীর আলোক ভুবন যায় কি খসে!
সাগরে হল্লা করে জলের স্রোত
আকাশে উলে শুকতারা
আমি শুকতারার ভাই তুমি কি তার নতুন প্রেমিকা!
সবদিক কেন এত ফর্সা ফর্সা লাগে
চারদিকে আকাশ আর জল
চারদিকে নীলের প্রলোভন
আমি তো মাছ শিকরী জেলে, নিষ্ঠুর
তুমি কি জানো!
জগতের সব শিকারীই নিষ্ঠুর, প্রায় হৃদয়হীন
আমার জীবনটাই গেলো মাছের ভাষা বুঝতে বুঝতে
জোয়ার ভাটা আর ঋতুর প্রত্যেক তিথি
আমাকে মুখস্থ রাখতে হয়
আমি সাগর সন্তান
সমুদ্রের হৃদয় খুড়ে তুলে আনি
মাছ জীবনের হৃদপিণ্ড
উন্মুক্ত দিগন্তে থরে থরে ভেসে চলা গ্রহগুলো
আমি তাদের বেদনার আত্মীয়
আমি সারেং জীবনের ঘাটে ঘাটে নোঙর ফেলেছি
আমি মাছ শিকারী গভীর সাগরের তীব্রতাকে
ধরাসয়ী করেছি
কক্সবাজার সদর হাসপাতাল
৩.১০ মিনিট, বেড ২৪

৪.
আমি বঙ্গোপসাগরীয় জেলে, জালের কারিগর
প্রতিদিন স্বপ্ন বুনি সূতায় সূতায়
আর গিট দিই হাজার হাজার
আমার সিসার পৃথিবী বর্ণিল সুষমায় ভরে ওঠে
আর তৈরি হয় ঘন গিটের বড় জাল
জাহাজের আলকাতরায় ঘষে ঘষে সূর্য কিরণ
আমার মুখ কুচকে দেয় বঙ্গোপসাগরীয় সূর্য
আমি বঙ্গোপসগরীয় সন্তান আর জাহাজের মিস্ত্রী
বৃক্ষ বাটম পেরেক নিয়ে আমার কারবার
জাহাজের খোল আর আকিল বানাতে বানাতে
আমার পৃথিবী এখানে ঘামের রেণুতে দীর্ণ
চাঁদ খুব কাছ দিয়ে উলে, শুকতারাও

৫.
সারারাত আমি ও নক্ষত্র মনে মনে কথা বলি
এই তারাভরা রাতে কেউ নেই সাগরে
আমি বাবার দিকে চেয়ে থাকি বাবা আমার দিকে
দৃষ্টির নীরবতায় আত্মার আশঙ্কা
আমাদের কাতর করে তোলে
বাবাও দেখি হয়ে উঠে গভীর বঙ্গোপসাগর
বাবার বুকে সাঁতার কাটে ঝাঁক ঝাঁক সামুদ্রিক মাছ
মানুষেরা বড় বেশি ঘুম কাতুরে সঙ্গম প্রিয়
তাই গভীর রাতের সাগর দেখে না তারা
বিছলিত মাছের সন্তরণ আর গ্রহের বিস্তার
দেখে না, তারা সাঁতার কাটে আরও বেশি
গোপন বেদনার প্রাগৈতিহাসিক নদীর কিনারে
মানুষের দর্শনের অত গভীরে যাই কি করে আমি
আমি তো সামান্য মানুষ
জাল টোনা, লবণ চাষ আর মাছধরা
এইতো আমার জীবন, এ জীবন বাবারও
সাগরে মাছ ধরি আর ঘাটেও বাজারে বিক্রি করি
ঝাঁইডোলা হাতে নিয়ে আশা ও আশঙ্কায় নত হয়
মানুষের এত কাজ এত লড়াই সংগ্রাম
আমি তাতে শরীক হই, আমিও তার ভেতরে থাকি
সদর হাসপতাল, কক্সবাজার
রাত ২.২৩, শুক্রবার।

৬.
নার্স, হাসপাতাল ঘুমায় না
আমিও ঘুমাতে পারি না
হাসপাতালের হাতে ইনজেকসন
পাশের সমুদ্রের গভীর ব্যথা
বেঁচে থাকার আকুলতায়
রক্ত নিংড়ে নেওয়া
অসংখ্য দুঃখী গরীব মানুষ
জীবনের এত জখম এত কষ্ট
কাসি, কাসির ধমক মৃত্যু
আহ! জীবনের ব্যকুল কাতরানী
সমুদ্রের ঢেউয়ের চেয়েও
তীব্র আর্তনাদ
মানুষের জীবন তার চেয়ে
ব্যকুল তৃষ্ণায় ভরা
নার্স নক্ষত্রের যন্ত্রণার চেয়ে
যন্ত্রণাময়
মানুষ ঢেউয়ের গর্জন
মানুষ সাগরের গর্জন

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।