সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে : মৃধা আলাউদ্দিনের মানবিক পদাবলি

অঞ্জন শরীফ

আবহমান বাংলা কবিতার ¯্রােতধারায় মৃধা আলাউদ্দিন অন্যতম এক অনুসঙ্গ। যা নব্বই দশক থেকে বহতা নদীর মতো বয়ে চলছে অবিরাম। এই দীর্ঘ কবিতাভ্রমণে তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন নিমগ্র সাধনায়। বারবার ভাঙতে চেয়েছেন তার কবিতা ভাবনাকে। ভেঙে ভেঙে অবশেষে গড়ে তুলেছেন কাব্যের সুবিশাল ইমারত। নায়েগ্রার জলপ্রপাত। মজবুত আর টেকসই জল-পাথরের নির্মিত সেই ইমারতের নাম ‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে’। শিরোনামই জানান দিচ্ছে, গতানুগতিকতার বাইরে এসে বৃত্তের পাঠক-সমাজে তিনি কাব্যের নতুন ভাবনা-বলয় নিয়ে আবির্র্ভূত হয়েছেন। শব্দ-সম্ভারে এবং উপ¯াপনে প্রয়োজনীয় উপকরণাদী প্রয়োগ করেছেন অভিজ্ঞ নিমৃাণশ্রমিকের মতো; যা কবিতামোদিদের অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করেছে, করবে অবলীলায়। কবি মাত্রই জীবন-দার্শনিক। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ তার ভাবনা বলয়ে নিরন্তর খেলে যাচ্ছে। শিরোনামধারী কবিতাটির প্রথমাংশে তা লক্ষ্য যোগ্য ‘মানুষ আর মানুষ থাকবে না/ সামনের শীতে সে রৌদ্র হবে। ঝরনা হবে পৃথিবীর অর্ধেক। অর্থাৎ তিনি তিল তিল করে গড়ে তুলতে চান আলোকিত এক পৃথিবী। পারদের জল-নদী। ভাঙতে ভাঙতে সে আলো নিশ্চয়ই একদিন প্রাণ পাবে। যার মধ্য দিয়ে তিনি ভবিষ্যৎকে অবলোকন করতে চান; যদিও এটি দুরূহ কর্ম। তবু তিনি আশাহত নন কোনোভাবেই।

কবি মৃধা আলাউদ্দিনের অন্য এক পঙ্্ক্তিতে নজর দিলে তা সহজেই অনুভব করা যায় তার জল-পারদ, ইটের ইমারত কতোটা শীলাদৃঢ় মজবুত ‘সুউচ্চ মিনার থেকে আমরা শুনবো আজান/ এবঙ আলো আসবে আমাদের জরাজীর্ণ প্রাসাদে/ যেনো পুড়ে যায় বেহায়া বাতাস’।
ভীষণ ও জগতকে পরিপূণরূপে পাঠ করার পরই তিনি জোতিষীর ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছেন। সামগ্রিক জীবনের যে ধর্মদর্শন, আবহমান কালের যে ভূতদর্শন তা যেনো কবি আত্ম¯ করেছেন গভীর প্রজ্ঞা-পারদ এবং অপরিসীম দরদমাখা কর্মযজ্ঞে। কবি মৃধা আলাউদ্দিন কুসংকারের বেড়াজাল ছিন্ন করে, মূর্খতার কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত বাতাসে ডানা মেলতে চান ডানা মেলতে চান তার ‘চারপাশে ছিটকে পড়া জোছনার আলো’য়। ‘আটষট্টি হাজার গ্রামে কোনো রক্তের গান বা গল্প নেই/ শুধু স্বপ্নের সোনালি ধান-রৌদ্দুর/
পাটখেতে নেচে যাওয়া বাউলা বাতাস আমাকে
স্বাধীনতা দিয়েছে।’

কবি মৃধা আলাউদ্দিন তার কবিতাকে পাঠকের দোর-গোড়ায় হাজির করতে চান। সমযোপযোগী যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে তিনি সিদ্ধহস্ত। করিৎকর্মা কবি পুরুষ। সময়কে ধারণ করা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অর্জনে তিনি সর্বদাই তৎপর। নিত্য-নতুন মোড়কে উপহার দিতে চান তার শহর আর মানব জীবনঘেষা ভাবনার পদাবলি। ‘আমাদের সময়’ কবিতাটি একটি চরণ অনুধাবনযোগ্য ‘তবুও বর্ষকাল বলে একটা কিছু কদম ফুলের মতো সৌরভ ছড়িয়ে দিক/ আমাদের চারপাশে, বিরানবাগানের এখানে-ওখানে, দুপুরে, সন্ধ্যায়’।
কবি যেমন মানুষের জীবনকে পাঠ করেছেন তেমনি প্রকৃতিকেও। এ পাঠের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। নেই কোনো আদি-অন্ত। সামাজিক ও মানবিক অসঙ্গতিগুলো তাই সহজেই ধরা দেয় তার দিব্যজ্ঞানে। যে জ্ঞানের আলোকরশ্মি দ্বারা ভেঙে চুরমার করেছেন ঘুণে ধরা সুউচ্চ প্রাসাদ। হাওয়া ভবন। টাকার পাহাড়। এই মহান কবিতা কর্মযজ্ঞে এতটুকু ক্লান্তি নেই তার, এতটুকু দ্বিধা নেই তার ‘জনৈক মাতালের নগ্নঘোড়া’র প্রথম স্তবকটি দৃষ্টিযোগ্য ‘সময় কোনো রাজা-উজির মানে না/ সে চাপকে থামিয়ে দ্যায় জনৈক মাতালের নগ্ন ঘোড়া/ সে থামিয়ে দ্যায় রুগ্ন ভারবাহী, ভারী নিঃশ্বস/ ঘোড়ায় লাগানো ব্যর্থ জিন…’
গত শতাব্দীর আলো-বাতাস, জল ও আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা কবি মৃধা আলাউদ্দিন সততই চেষ্টা করেন তার কাব্যভাষাকে নিজের মতো করে উপ¯াপন করতে। শব্দগুলোকে সুদক্ষ কারিগরের মতো প্রয়োগ করেন নিপুণ ও সাবলীলভাবে। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অতিশয়োক্তি তৈরিতে তিনি যথেষ্ঠ পারঙ্গম। তবে হ্যাঁ, সৌন্দর্য্যবোধ তাকে নিয়ে গেছে সম্মানীয় এক উচ্চতায়। কাব্যের অন্যতম দিক হলো সৌন্দর্য। মানুষ স্বভাবতই সৌন্দর্যপিপাসু। আর সেই সৌন্দর্যকে তিনি লালন করেছেন মন-মাধুরীতে। নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি শিল্পকর্মকে মহিমান্বিত করে, পরিপূর্ণতা দান করে। কবিতা-শিল্পে তা অপরিহার্য একটি অংশ। ‘জোছনা-জলের ঢেউয়ের সাথে’ সম্পৃক্ত হওয়াটা তাই অগ্রগণ্য ‘আমার চারপাশে, আঁধার ঘরে শুধু কৃষ্ণকালো চোখ/ নাকি সাদা ফুলের কুসুম কলি/ না, জোছনার আলো/ আছড়ে পড়ছে সবখানে’।
এই সৌন্দর্যকে ধারণ করার মন ও মানসিকতাকে অক্ষুণœœ রাখতে কবি মৃধা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তার কবিতায় কাঠামোগত ও গঠনগত দিকটিতে স্বাতন্ত্র লক্ষ্য করি। বোধ করি, ভাবনাগুলোকে শব্দে রূপদানেও তিনি সামান দক্ষ। এই দক্ষতা অর্জনে তাকে আজীবন চর্চা করতে হয়েছে। লেগে থাকতে হয়েছে কবিতার ভেতর-বাহির সর্ব অঙ্গনে। স্বভাবতই তার কল্পনা শক্তিও প্রখর। ‘পাগল মন, মন কেনো এতো কথা বলে’খ্যাত গীতিকার আহমেদ কায়সারকে প্রায়ই বলতে শুনতাম। ‘ও হলো মেধা আলাউদ্দিন।’ মৃধার কবিতাগুলো পাঠ করলেই তাকে শনাক্ত করতে পারি প্রকৃতি কারিগর রূপে। শহরের মানুষ রূপে। ‘মানুষের বোধ-বুদ্ধি’ কবিতার দুটো চরণ স্মরণযোগ্য ‘ঋতুর মতো পাল্টে যায় মানুয়, মানুষের মনন/ সবুজ সবজির মতো গাঢ় হয় মানুষের বোধ’।

এই পর্যবেক্ষণ শক্তি; তা কিš একদিনে অর্জিত হয়নি। ধীরে ধীরে তাকে চারাগাছ থেকে পরিপূর্ণ বটবৃক্ষরূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন নিবিড়তর পরিচর্যা আর কবি-মানসের সমতারগুণে। সততার গুণে। এতে তার আধ্যাত্মচেতনার ও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। গভীর জীবন বোধ আছে বলেই তা তার কলমের অঁাঁচড়ে মহিমান্বিত হয়ে ওঠে ‘পাখিটার ও নদীর জীবন ছিলো’ কবিতায় সেই আভাস দেখি
‘আবার মাটিতে ফিরে এলো পাখি/ মিশে গ্যালো গাছ থেকে গাছে এক, দুই/ যেভাবে মানুষ মিশে যায় এই মৃদুল মাটির ঘরে’। একজন কবিকে, একজন শিল্পীকে তার অন্তরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হয়। সেই অন্তরদৃষ্টি দিয়ে তিনি আলোকন করেন মানুষের সূক্ষèাতিসূক্ষ্ম অধ্যায়গুলো। হানি, কান্না বেদনাগুলো। আচার-আচরণ, ধ্যান-ধারণা, চারিত্র বৈশিষ্ট্য এসবই তার লেখার উপকরণ হয়ে ওঠে সুচারুরূপে। কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস-ঐতিহ্যকে তিনি পুনরুদ্ধার করেন সেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে। তখন গণমানুষের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়ে যায় যা তার কাছে পরম প্রাপ্তি।

মানুষের আদি উৎস বা রূপপরিগ্রহ পর্যালোচান করলে মানব জন্ম ও তার গতিপ্রবাহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেই ধারাবাহিকতা কখন কোন যুগে কেমন ছিল তা অনুধাবন করা যায় সহজেই। কবি তার দিব্যদৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা তাকে প্রকৃত শিল্পী, প্রকৃত কবিতাকর্মী হতে সাহায্য করেছে এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আদি মানবের গতিবিধ লক্ষ্য করেই তিনি চলমান ধাণাকে শানিত করেছেন। ‘কষ্টসংক্রান্ত কাটলেট’ পাঠ করলে সেই ধারণাকে উদ্ধার করা যায়।
‘এবঙ আমাকে একটা কারুকান্ত সুন্দর কান্তে দাও/ আমি মাতৃত্বের বন্ধনকে ছিন্ন করি/ আর কতই না বিচিত্র…/ মাতৃত্বকে কেবল একটি কাস্তেই আহত করতে চায়’।
কবি শুধু শব্দ নিয়েই কাজ করেন না। শব্দ কীভাবে সৃষ্টি জগতকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে তার একটা রূপ-রেখা দাঁড় করান। শব্দ দিয়ে তিনি যেমন মানব মনে প্রেমময় ঝরনার সঞ্চার করেন। তেমনি তার পাষাণবেদিতেও আগাত করতে ছাড়েন না। কবি মৃধা আলাউদ্দিন সেই প্রচেষ্টাই অহর্নিশি করে যাচ্ছেন। নদীর পাড় ভাঙার মতো মানুষের চরিত্রকেও তিনি ভাঙতে ভাঙতে সুপ্রসন্ন বৈশিষ্ট্যে রূপায়িত করতে চান। মানুষের মানবিকবোধগুলোকে জাগ্রত করেন প্রেমময়, সুশীতল পৃথিবী নির্মাণে অগ্রগামী হতে নিরন্তর সাধনায় কবি মৃধা আলাউদ্দিন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
বিপদ-সঙ্কুল এ পথ পারি দিতে কবিকে চাক্ষুস যোদ্ধার ভূমিকা নিতে হয়েছে। তার কলমই সেই রণাঙ্গণের সুযোগ্য আর শানিত অস্ত্র।
কবি মৃধা আলাউদ্দিন বারবার মিডিয়া ও গোষ্ঠীসংক্রান্ত কবিদের কাব্য হিংসার শিকার হয়েছেন। বহুবার ভেঙেছে তার কবিতার পাড়। ঘরবাড়ি। উঠোন। দেউরি। কবিতার তৈজষপত্র। তারপরও তিনি একেবাওে ভেঙে যাননি আরো দৃঢ়ভাবে নির্মাণ করেছেন নিজেকে। তৈরি করেছেন ভিন্নস্বরেভেজা একটি নিজস্ব বলয়। মৃধা এই ভিন্নস্বাদের পদাবলি পাঠক সমাজে অনুসারিত হোক, দীর্ঘজীবী হোক এই প্রত্যাশা কায়মনোবাক্যে আমরা প্রত্যাশা করি। আমরা প্রত্যাশা করি কবি মৃধা আলাউদ্দিন খুব দ্রুতই বিশ^সাহিত্যে ছড়িয়ে পড়ুক। ছড়িয়ে পড়ুক দশ দিগন্তে।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।