নিবন্ধশিল্প ও সাহিত্য

সে এক পাথর আছে

মোশতাক আহমদ

শামসুর রাহমান ব্রিটিশ কাউন্সিলে গেছেন। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা অনুবাদের বইয়ের কাজ প্রায় শেষ। এখন টীকা টিপ্পনি, ভূমিকা – এসব কেজো কাজের শরণ নিতে প্রায়ই ব্রিটিশ কাউন্সিলে আসেন। আজ কাজ শেষে বসে বসে দৈনিকের সাহিত্যপাতাগুলো দেখছিলেন। বেলাটা পড়ুক। বৈকালিক হাঁটাহাঁটি করতে করতে বাসার দিকে যাবেন।
দৈনিক সংবাদের রবিবারের সাহিত্যপাতায় আবুল হোসেনের কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতাটি পড়ে শামসুর রাহমান ধন্দে পড়ে গেলেন। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া ‘নব বসন্তে’র কবির কাব্যশৈলী এখানে অনুপস্থিত। আবুল হোসেনের কবিতার ভাষা স্মার্ট, ছন্দানুগ। এই কবিতাটা কিছুটা কাঁচা, ছন্দ নড়বড়ে, রচনারীতি সেকেলে। তবু শামসুর রাহমান পুরো কবিতাটা পড়লেন। তৃপ্তি না পেলেও পড়ে ফেললেন।

বেরুতেই এক ‘ক্ষীণকায় তরুণে’র মুখোমুখি হলেন। তরুণের হাতে কিছু পত্রিকা, কাগজের তাড়া। স্বাক্ষর শিকারী হতে পারে। তরুণ এগিয়ে এসে লাজুক ভঙ্গিতে নিজের পরিচয় দিল, “আমি আবুল হোসেন। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে পড়ি।“
“ জেনে খুব ভাল লাগল। আমিও ইংরেজির ছাত্র।“
“ সংবাদে আমার কবিতা বেরিয়েছে। আপনি কি দেখেছেন?”
“ হ্যাঁ। আমি পড়েছি। আপনাদের কবিতার ভাষা আমাদের সাথে মিলবে না ঠিকই, কিন্তু আমাদের কবিতার খোঁজও কিন্তু রাখা চাই। আবুল হোসেন নামে আমাদের একজন সিনিয়র কবি আছেন; তিনি এখনও সচল!”
লাজুক কবিটি আরও গুটিয়ে গেল যেনবা। কিন্তু কিছু একটা পাওয়ার আনন্দ তার মুখে খেলা করছিল যেন বা। লাজুক ছেলেদের হাসি তো দর্শনীয়ই হয়।

এর মধ্যে একদিনের ঘটনা। দুপুরের ক্লাসের জন্য টুকু, খাদেম, কাশীনাথ, শেহাবরা কলাভবনের করিডোরে অপেক্ষমাণ। মাসখানেক হল কেউ ঢাকা মেডিকেলের অস্থায়ী ক্লাসরুম, কেউবা নীলক্ষেতের ক্লাসরুম থেকে একত্র হয়েছেন। পরিচয় অত গাঢ় হয়নি সবার। খাদেমের বেতারে আসা যাওয়া আছে। টুকু তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “ আপনি কি আমার কবিতা পড়েছেন?”
“ পড়িনিতো। কোথায় বেরিয়েছে?’
“ সংবাদে।“
“ আচ্ছা! বেশ তো। কি নামে লিখেন আপনি?”
“ আবুল হোসেন নামে লিখি। যদিও আমার পুরো নাম আবুল হোসেন মিয়া।“
“ আবুল হোসেন খুব কমন নেইম,” তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন খাদেম, “ এই নাম মনে হয় মফঃস্বলের কোনো কবির লিখা। চোখ যায় না।“

পরদিন নির্মলের সাথে টিএসসিতে আড্ডা চলছে। ধুম্রশলাকা সহযোগে চা। বাংলা বিভাগের এক ছেলে এসে ‘এক আবুল হোসেন ভাত পায় না আবার আরেক আবুল হোসেন আসছে’ পাশ থেকে শুনিয়ে চলে গেল!
নির্মলেন্দু উত্তেজিত হয়ে গেল; যাকে নিয়ে এই বিদ্রুপ সে নির্মলের হাত ধরে বসিয়ে দিল। নির্মল রেগে আছে, “ আমি এখনই শায়েস্তা করে দেয়ার ব্যবস্থা করছি। ভেবো না টুকু!”
“ না, বাদ দাও নির্মল। রফিক আজাদ ইত্তেফাকে যেতে বলেছিলেন। কবিতা আছে?”
“ এক ঢিলে দুই পাখি? ঠিক আছে, কবিতা নাই, কবিতা হতে কতক্ষণ? যেতে যেতে ভাবি, পৌঁছে নিউজপ্রিন্টে প্রসব!”
“ চল তাহলে।“
“ ওই দেখ, বাস থেকে একটা মেয়ে নামল। ওর নাম দিলাম বাসন্তী। এইবার চল। যাইতে যাইতে কবিতা লিখি। ধরো, বাসন্তীর কাছে এই কামেলা রোগে ভোগা বাঙালীর চোখের জন্য রক্ত চাইব। একটা আন্দোলন দরকার! আমাদের জেগে ওঠা দরকার!”
“ কামেলা রোগটা আবার কি?”
“ জন্ডিস।“
“ আমি বলি পাণ্ডু রোগ।“

রফিক আজাদ সিঙ্গারা ভেঙে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করতে করতে বললেন, “ কি হইছে আবুল হোসেন টুকু মিয়া ? মুখে শ্রাবণের মেঘ কেন ?”
‘ টুকু’ অধোবদন। নির্মলেন্দু গুণই পুরো ঘটনাটা বললেন।
“ কাল শামসুর রাহমানও বলেছেন নামটা কনফিউজিং।“ টুকু যোগ করল।
রফিক আজাদ হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, “ এই গেরাইম্যা নাম নিয়া কবিতা লেখার দিন শেষ। এখন কণ্ঠস্বরের জামানা। দুইদিন পর রফিক আজাদের স্যাড জেনারেশনের জামানা শুরু হইব। আবুল হুসেন ফুসেন নাম দিয়া চলব না মিয়া! নামটারে আবুল হাসান বানাইয়া ফেল! ঝকঝকা নতুন!”
নির্মলেন্দু গুণ খস খস করে লিখে চলেছেন, “ কোনোদিন চাইনি কিছু/ আজ কিছু রক্ত চাই প্রেয়সি গো/ চেয়ে দেখ বাঙালীর চোখগুলো রক্তহীন/ ভীষণ হলুদ!”
আবুল হাসানও পকেট থেকে বের করে দিলেন একটা আনকোরা কবিতা-
“ দুঃখগুলো উলটে দিয়ে দীর্ঘ একটি পুষ্প কর না,
প্রহর যায়, প্রহর যাক, এখন তুই হসনে ঝরনা।
রক্তগুলি রাঙিয়ে দিয়ে রঙিন একটি আয়না কর না,
প্রহর যায়, প্রহর যাক, এখন তুই হসনে ঝরনা।“

এরপর শামসুর রাহমান বলছেন, “ কিছুদিন পর আঠারো বছরের তরতাজা আবুল হোসেন তাঁর নাম পাল্টে ফেললেন। আবুল হোসেন রূপান্তরিত হলেন আবুল হাসানে। আর কী আশ্চর্য, নাম বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবিতাও গেল বদলে। পুরনোর খোলস থেকে বেরিয়ে এল নতুন। কবিতার জ্বলজ্বলে প্রান্তরের দিকে তাঁর যাত্রা শুরু হলো।“

আবুল হাসান তাঁর এই নতুন নামকরণটি মনে প্রাণে গ্রহণ করলেন। প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতাটি অবিস্মরণীয়, সেই কবিতার শিরোনাম ‘আবুল হাসান’ দিয়েই উদযাপন করলেন –

সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,
মায়াবী করুণ
এটা সেই পাথরের নাম নাকি ? এটা তাই ?
এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী ? উপগ্রহ ? কোনো রাজা ?
পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ ?
মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা ? তীব্র তীক্ষ্ণ তমোহর
কী অর্থ বহন করে এই সব মিলিত অক্ষর ?
.
আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,
যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এঘরে ওঘরে যায়
সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী
তারা কেউ কেউ বলেছে আমাকে-
এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,
একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,
তুই যার অনিচ্ছুক দাস !
.
হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,
নীল দীর্ঘশ্বাস কোনো মানুষের !
সত্যিই কি মানুষের ?
.
তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত ছিল, কোনোদিন
ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল ?
ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল ?

Comment here