স্মৃতি সঞ্চয় : শৈশব

সুলতান আহমেদ

আমার জন্ম গ্রাম বালুখালী একটি শান্ত ও নিভৃত পল্লী ছিল। এখানে বসবাসকারী মানুষ জন অধিকাংশ গরীব কৃষক বা প্রান্তিক চাষী ও দিন মজুর প্রকৃতির ছিল। মুষ্টিমেয় কতেক লোক ভূমি মালিক ও জোতদার ছিল।

অনেকেই বনের গাছ-কাঠ কেটে বা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। কুমার, কাঠমিস্ত্রি ও অন্যান্য পেশার কিছু লোকজন ছিল। কিছু লোক ব‍্যবসায়ী ছিল।কিছু পরিবার উখিয়া থেকে আর কিছু রামু থেকে আগমন করেছিল। সকলেই মিলে মিশে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন ও কাজকর্ম করতেন। কলহবিবাদ বা হাঙ্গামা ইত্যাদি কখনো হতোনা।

আমার দাদার এবং নানার বাড়ি কাছে বা নিকটবর্তী ছিল। মধ‍্যখানে শুধু একটি টিলা ছিল।গ্রামে টিলা বেশী থাকায় অধিকাংশ বাড়ি টিলার উপর ছিল। ধানীজমি অর্ধেক বনের পাশে ঘোনাজমি ও অর্ধেক নদীর পাশে প‍্যারা জমি।আমাদের ছিল ঘোনা জমি। আমরা কৃষি নির্ভর পরিবার ছিলাম। তবে আমার আব্বা নিজে চাষ না করে মৌসুমী হালিয়া (কামলা) রেখে চাষাবাদ করতেন । তিনি আজীবন ব‍্যবসা করতেন।প্রথম জীবনে চাউলের ব‍্যবসা এবং পরে বিভিন্ন দোকান ব‍্যবসা করতেন।

আমার দাদার ছিল এক ছেলে এক মেয়ে। আমার নানার ছিল তিন ছেলে এক মেয়ে।আমার জন্মের আগে দাদা ও নানা মারা গিয়েছিলেন। তাঁরা নাকি খুব সহজ সরল উদার প্রকৃতির লোক ছিলেন বলে অন‍্যদের মুখে শুনেছি।

আমার দাদার ভিটা অন্য দাদাদের থেকে পৃথক হওয়ায় আমার বাবা আমাদের ভিটায় রামু থেকে আসা আব্দুল মোনাফ নামে একজনকে আমাদের বাড়ির পাশে বাড়ি করে থাকতে দিয়েছিলেন।আমার মা যেন নিঃসঙ্গ না হয়। আমার মা আজীবন পর্দানশীল ছিলেন, পাড়ায় কোথাও যেতেন না বা ভিটার ভিতরে ক্ষেত খোলায়ও কোনদিন যেতেন না। মোনাফ বদ্দার স্ত্রী ছিল মায়ের নিত্য সঙ্গী। আমি ও মোনাফ বদ্দার প্রথম কণ‍্যা আছিয়া একই বছর জন্মেছিলাম।আছিয়া আমাকে কাকু ডাকতো আমি ছিলাম দাদার ও নানার বাড়ির প্রথম সন্তান এবং দু বাড়িরই আদরের ছেলে।তাই মাতৃ দুগ্ধ ছাড়ার পর নাকি রাতে ঘুমাতাম মায়ের পাশে, সকালে জাগতাম নানী বা বড়মামী (খালা)’র পাশ থেকে। আমার মামা গনের কেউ একজন স্থানীয় বাজার থেকে আড্ডা দিয়ে ফেরার পথে ঘুমন্ত আমাকে নিয়ে যেতেন।আমি খুব সকালে মক্তবে যেতাম নানার বাড়ি থেকে এসে।

আমাদের মক্তব ছিল বাজারের মসজিদ ও প্রাইমারি স্কুলের সামনের টিলায় ইমাম মৌলভী মোহাম্মদ ইছমাইল সাহেবের নিজ বাড়ির বারান্দা।সেখানে আমরা শিক্ষার্থীরা নিজের বসার জন্য চাটাই নিয়ে গিয়ে মেঝে দুই সারিতে বসে পড়তাম। হুজুর মাঝখানে হেঁটে তদারকি করতেন। আমি এখানে কোরআন শরীফ শেষ করার পর প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিলাম। এখানে কোন শিশু ছিপারা পাঠ শেষ হলে তার পক্ষথেকে মুড়ি বা খই গুড়সহ নিয়ে সকলকে খাওয়াতে হতো। এ নিয়ম মানতে হতো পর্যায়ক্রমে কোরআন পাঠ শেষ করা পর্যন্ত।

মৌলভী মুহাম্মদ ইছমাইল বার্মা থেকে এসে বালুখালীতে বসবাস করতেন। তিনি বার্মার আরাকানের মুজাহিদ নেতা আবুল কাসেম প্রকাশ কাসেম রাজার আত্মীয় ছিলেন। তিনি বালুখালীর বাজার জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন। এ মসজিদটি আগে মাটির দেয়াল ও ওমপাতার (গোল পাতা) ছাউনির ছিল। পরে সেটি সেমিপাকা করা হয় এবং পুকুরটিও বড় করে খনন করা হয়, যা এখনো আছে। মৌলভীসাহেব, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরা সকলে আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।শান্ত ও মেধাবী হিসেবে আমাকে এলাকার সকলেই আদর করতেন। হুজুরের স্ত্রীকে আমি জ‍্যাটাইমা ডাকতাম এবং তিনি প্রায় সময় পড়াশেষে আমাকে ভিতরে ডেকে নিয়ে আদর করতেন বা ভালকিছু থাকলে খাওয়াতেন। আজীবন তিনি স্নেহ করে গেছেন।আমরা পড়াকালীন তাঁর একটি ছেলে হলে তার নাম সুলতান রেখে আমাকে বলতেন-তোমার নাম ছিনিয়ে নিয়েছি!উনাদের বড়ছেলে বাটুদা (আরেক স্ত্রীর ছেলে), মেয়ে নূরজাহান বুবুও খুব স্নেহ করতো।

আমার শৈশবে নানী জয়গুনবিবি ও খালা রশিদা খাতুন এর স্নেহের ঋণ শোধ যোগ্য নয়। খালা ছিলেন আমার মায়ের আপন মামাতো বোন(বড় মামার স্ত্রী)। মাতৃস্নেহে তিনি আমাকে লালনপালন করেছেন। নানী অনেক বড় হওয়ার পরও আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন। আরেক জন আমার ফুফুর বড়মেয়ে যাকে আমার মাকে কাজে সাহায্য করার জন্য আমাদের বাড়িতে রাখা হয়েছিল, তিনি আমাকে কোলেপিঠে করে বড় করেছেন।তাদের স্মৃতি আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আর একজন মহিলার স্নেহের কথা মনে পড়ে।তিনি অনাত্মীয়, তবে শৈশবে খুব স্নেহ পেয়েছিলাম।তিনি আবদুল হাকিম জ‍্যাটার স্ত্রী যাকে জ‍্যাটাইমা ডাকতাম। আবদুল হাকিমও বার্মা থেকে এসেছিলেন এবং বড় রাস্তা থেকে বাজারে যাওয়ার পথের সন্নিহিত কোনায় বাড়ি তৈরী করে বাস করতেন। বাজারে তাদের একটি হোটেল ছিল যেটি পুত্র ওমর হাকিম এর তত্বাবধানে পরিচালিত হতো।তাদের ছোট ছেলে আজিজুল হক (প্রকাশ ঠান্ডু) আমার সিনিয়র সহপাঠী ছিল। তার সূত্রে তার মা’র সাথেও পরিচয় হয়। তিনি আমাকে নিজের ছেলের মতো আদর করতেন। তাদের একটি বক্সগ্রামোফোন ছিল, যেটি হাটের দিন হোটেলে বাজানো হতো এবং অন্য দিন বাড়িতে জ‍্যাটাইমা বাজাতেন।আমার পছন্দের গান ছিল “আমার স্বপ্নে দেখা রাজকণ‍্যা থাকে–“রেকর্ডটি। আমি গেলেই জ‍্যাটাইমা এটি বাজিয়ে শুনাতেন। তিনি পথে দেখলেই আমাকে ডেকে নিতেন। পরে ওমর হাকিম ছাড়া অন‍্যরা সপরিবারে করাচী চলে যায়।

তৎকালীন গ্রামের প্রবীণদের মধ্যে ছিলেন মহব্বত আলী (আসুআলীর বাপ), আলী মদ্দিন শিকদার (সুলতানের বাপ), কাসেম আলী শিকদার (মেম্বারের বাপ), নূরআলী (আকির বাপ), মছন আলী সর্দার (কালু বলী) প্রমুখ। গ্রামের মেম্বার ছিলেন বুজুরুছ মিয়া। তাঁর সমসাময়িক কালে গণ‍্যমান‍্য ব‍্যক্তি ছিলেন ইয়াকুব আলী সওদাগর (প্রকাশ ইয়াকুবমিস্ত্রি), জমিলার বাপ, আবদুর রশীদ মাঝি, আলী আহমদ সওদাগর, ছৈয়দ নূর, নূর আহমদ শিকদার, উমেদ আলী সওদাগর প্রমুখ।

গ্রামে বাজারের মসজিদ ছাড়া অন্যটি দক্ষিনের জামে মসজিদ। মাটির দেয়ালের দুটি কক্ষ সংযুক্ত ছিল। পশ্চিম এর অংশ নূর আলী (আকির বাপ) এবং পূর্বের অংশ বুজুরুছ মেম্বার নির্মাণ করেন।আমাদের জামে মসজিদ ছিল সেটি। বাল‍্যকালে আমরা জুম্মার নামাজ সে মসজিদে আদায় করতাম।আমার বাবা সে মসজিদে সুরেলা কণ্ঠে জুম্মার আজান দিতেন। সে মসজিদের ঈমাম ছিলেন মৌলভী সুলতান আহমদ। তিনি আমাদের মহল্লার মৌলভী হিসেবে ফাতেহার দিন পাড়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফাতেহা পড়াতেন এবংপিটা মাংস ইত্যাদি তাঁকে রেওয়াজ মতো খেতে দিলে তিনি সামান্য মুখে দিয়ে বাকি গুলি একটি থলে ও ডেকসিতে ভরে নিয়ে যেতেন।তিনি তাবিজও লিখে দিতেন। আমরা সে মসজিদের উঠানে ঈদের নামাজ আদায় করতাম। সেটি এ গ্রামের সবচেয়ে বড় জমায়েত ছিল।অন্য ঈদের জামাত হতো বাজারের জামে মসজিদে। বাজারের দোকানদারগন ও পার্শ্ববর্তী পাড়ার কিছু লোক সে জামায়াতে শরীক হতো।

সে সময় মহল্লার মোল্লার মতো নাপিতও নির্দিষ্ট থাকতো।সারাবছর ঘরে ঘরে গিয়ে ক্ষৌরকাজ করতো এবং ধানের মৌসুমে ধার্য ধান সংগ্রহ করতো। আমাদের নাপিত ছিল রমনী মোহন শীল।বাজারে তার দোকানও ছিল। সেটা বর্তমানের সেলুনের মতো এবং সেখানে তিনটি চেয়ারে তিনজন ক্ষৌরকাজ চালাতো।
এই রমনী মোহন শীলকে আমরা জ‍্যেটা ডাকতাম। তিনি প্রতি মাসে একবার বাড়িতে এসে আমাকে চুল কেটে দিতেন। তিনি একেবারে ছোট ছোট করে চুল কেটে দিতেন। আমি একটু বয়স বাড়ার পর চুল লম্বা রেখে এবং জুলফি রেখে কাটতে অনুরোধ করলেও তিনি গ্রাহ‍্য করতেন না।
অতপর তাকে আমি এড়িয়ে চলতাম এবং দোকানে গিয়ে চুল কাটাতাম।
আর একজন ছিলেন দর্জি পূর্ব বর্নিত কালু খলিফা। আমাদের ঈদের পোশাক সেলাই করার জন্য রমজানের শুরুতে কাপড় কিনে দিলেও সারা রমজান দুই তিন দিন পর পর ধর্ণা দিয়েও ঈদের পূর্ব রাত পর্যন্ত সরবরাহ পাওয়া কষ্টকর হতো।এগুলি ছিল শৈশবের খুব অসহনীয় স্মৃতি।শৈশবের ঈদের আর একটি মজার স্মৃতি মনে আছে। ঈদের প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে আমরা নতুন শার্ট, পায়জামা ধোপার মতো ভাজ করে বালিশের নীচে চাপা দিয়ে রাখতাম।আমাদের গ্রামের হিন্দু পাড়ায় দুটি ধোপার বাড়ি থাকলেও অভিবাবক গন পয়সা দিতেন না, তাই ইস্ত্রিরি করাতে পারতাম না বিধায় এই বিকল্প ব‍্যবস্থা গ্রহণ করতে হতো।আর একটি মনক্ষুন্ন হওয়ার স্মৃতি হলো জুতা সম্পর্কে। আমাদের কিনে দেয়া হতো বাটাকোম্পানীর লালরংয়ের কাপড়ের জুতা।অথচ আমরা পছন্দ করতাম সাদা রংয়ের কাপড়ের জুতা।কিন্তু অপেক্ষাকৃত মূল্য বেশী হওয়ায় সাদা জুতা কিনে দেয়া হতোনা। অবশ্য হাইস্কুলে পড়ার সময় নিজের পকেট খরচের টাকা জমা করে সাদা জুতা কিনতাম। এগুলির সুবিধা ছিল ময়লা হলে সাবান দিয়ে ধোয়ার পর চক বা খড়িমাটি ঘষলে নতুন জুতার মতো সুন্দর হয়ে যেতো।আজকাল সেরকম লাল বা সাদা জুতা তৈরী হয়না এবং প্রচলনও নাই। (চলমান…)

লেখক : কবি ও প্রবীণ আইনজীবী
প্রকাশিত গ্রন্থ: ৭

সুলতান আহমেদের স্মৃতি সঞ্চয় ধারাবাহিক পর্বের অন্যান্য পর্ব পড়তে ক্লিক করুন…

স্মৃতি সঞ্চয় – পর্ব ১ (জন্ম ও জন্মস্থান)

স্মৃতি সঞ্চয় – পর্ব ২ (বালুখালী বাজার ও গ্রাম)

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।