স্মৃতি সঞ্চয়

সুলতান আহমেদ

(জন্ম ও জন্মস্থান)

আমার জন্ম হয় তৎকালীন কক্সবাজার মহকুমার উখিয়া থানার অন্তর্গত বৃহত্তর রাজাপালং ইউনিয়নের বালুখালীর এক নিম্নমধ‍্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। আমার জন্মের তারিখ লিখিত ভাবে রক্ষিত নেই। এগুলি বা এ ধরণের রেওয়াজ প্রচলিতও ছিলনা।

আমার পিতার নাম জনাব আলী আহমদ, মাতার নাম জনাবা জরিনা খাতুন। তাঁদের বক্তব্য অনুসারে ১৯৫২সনের কার্তিক (অক্টোবর) মাসে কোন এক বুধবার।কিন্তু এস.এস.সি পরীক্ষা র সনদে লিপি মতে ৩১ডিসেম্বর,১৯৫২সন। এটা উখিয়া হাইস্কুলের তৎ কালীন শিক্ষক মোহাম্মদ ইলিয়াস মাস্টার (পরবর্তী কালে শহীদ) আমাদের নবম শ্রেণীর এস,এস,সি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করার সময় লিপি করেছিলেন।আমার পিতা মাতার বক্তব্য মতে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার এক বছর পরে।তাঁদের এক কণ‍্যা হয় বিয়ের তিন বছর পর(সে অকাল মৃত)। দ্বিতীয় সন্তান আমার জন্ম হয়কণ‍্যাজন্মের এক বছর পর।সুতরাং(১৯৪৭+১+৩+১)=১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ।

আমার প্রপিতামহ জনাব আলীমুদ্দিন এর বাড়ি ছিল উখিয়ার হারিশিয়া গ্রামে।অর্থাৎ বর্তমান উখিয়া হাইস্কুল খেলার মাঠ সংলগ্ন শহীদ মিনার এলাকার পশ্চিম দিকে ছড়ার পশ্চিম পাশসংলগ্ন পাড়ায়।সেখান থেকে তিনি পাঁচ পুত্র ও এক কণ‍্যা সহ বর্তমানের বালুখালী গ্রামে গমন করেন।তাঁর পুত্রগন হলেন সর্বজনাব আমির হোসেন, অলীবক্সু,এয়াকুব আলী, এয়ার মুহাম্মদ ও গোলাম হোসেন।

উক্ত আমির হোসেন হলেন আমার পিতামহ।তিনি বাড়ি নির্মান ক‍রেন আমাদের বর্তমান বাড়িভিটার স্থানে অর্থাৎ বর্তমান বালুখালীর পানবাজার জামে মসজিদ সন্নিহিত দক্ষিণ পাশের টিলার উপর। সে বাড়িতে আমাদের পূর্বাপর বসবাস বিদ‍্যমান আছে।

আমার পিতামহের অন্য চার ভাই রাস্তার পূর্ব পাশে যথাক্রমে এয়ার মুহাম্মদ, অলী বক্সু, গোলাম মুহাম্মদ ও এয়াকুব আলী বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করেন।আমাদের পাড়ার নাম বালুখালীর পশ্চিম পাড়া।এখানে আমাদের গোষ্ঠীর লোকজন এবং হাকিম আলীগং গোষ্ঠীর লোকজন প্রাচীন বাসিন্দা।হাকিম আলী, মোছন আলী, সহর আলী তিন ভাই ও এক বোন রত্না পালং থেকে এসেছিলেন। এই দুই গোষ্ঠী মিলে ছিল এক গ্রামীণ সমাজ।পরবর্তীতে লোক সংখ্যা বৃদ্ধি হলে দুই সমাজ পৃথক হয়।

বালুখালী ছিল একটি ছোট আকারের গ্রাম। শৈশবে দেখেছি আমাদের পশ্চিম পাড়ার পশ্চিমে প্রায় এক হাজার গজ পর থেকে ঘন বনাঞ্চল শুরু হয়েছিল। পঞ্চাশ এর দশকে বালুখালীর পশ্চিম পাড়া, পূর্ব পাড়া, দক্ষিণ পাড়া মিলে প্রায় হাজার দেড়-দুই হাজার লোকজন বাসিন্দা ছিল।
এ গ্রামের পূর্বদিকে ঘুমধুম মোটরস্টেশন ছিল দক্ষিণ আরাকান সড়কের শেষ প্রান্ত ও গাড়ির স্টেশন। তারপর একটি কাঁচা রাস্তা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে দক্ষিণ দিকে হাঁটা পথে যাতায়াত করা যেতো।কিন্তু খাল বা ছড়ায় বাঁশ-গাছের সাঁকো ছাড়া অন‍্য কিছু ছিলনা।

বালুখালীর দক্ষিণে টেকনাফ পর্যন্ত নদীতে নৌকা সাম্পান ছিল একমাত্র যানবাহন। তাই বালুখালীতে ছিল একটি বড়ো বাজার। এটাতে সপ্তাহে রবিবার ও বুধবার হাট বসতো।এতে বিপুল লোকসমাগম হত এবং সব দরকারি মালামাল পাওয়া যেত।এ বাজারে স্থায়ী পাইকারি ও খুচরা দোকান ছিল, হোটেল, চাদোকান, বেকারী ইত্যাদি ছিল।বাজার সংলগ্ন পূর্ব দিকে নাফ শাখা নদীতে সাম্পান ঘাঠ ছিল।

জানা যায়, আগে নদী সংলগ্ন ঘুমধুম বা নোয়াপাড়ায় বাজারটি ছিল।সেখানে উখিয়ার লোকজন বেঁচাকেনা করতে আসত।একটি মারামারির ঘঠনায় ক্ষুব্ধ হয়ে রাজাপালং ইউনিয়নের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও জমিদার জনাব মকবুল আহমদ চৌধুরী (প্রকাশ মকবুল আহমদ সিকদার) বাজারটি বালুখালীতে স্থানান্তর করেন। এ বাজারটি সম্পর্কে কিছু বিস্তারিত বিবরণ দিতে হচ্ছে ভবিষ্যত প্রজন্মের অবগতির জন্য।কারণ বালুখালীর মতো একটি নিভৃত গ্রামের কর্মচঞ্চল পরিবেশ ও মফস্বল এলাকায় শহুরে আবহ সৃষ্টি হয়েছিল এ বাজারের কারণে।ঘুমধুম মোটরস্টেশন থেকে প্রায় আধা কিলোমিটারের কম দূরত্বে বাজারটি অবস্থিত হওয়ায় এবং বাজার সংলগ্ন নাফ নদীর শাখায় নৌকা-সাম্পানের ঘাঠ স্থিত হওয়ায় এটি ট্রানজিট পয়েন্ট বা সংযোগ স্থল ছিল।তাই যাত্রী আসা যাওয়ার এবং মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিলো।সপ্তাহের দুই দিন হাটবার ছাড়াও অন‍্যান‍্য দিনেও এখানে লোকজনের সমাগম থাকতো। তাই স্থানীয় ও অস্থানীয় জনসমাগমের কারণে এটি রাতদিন কর্মচঞ্চল ও আনন্দমুখর থাকতো। তাই স্থানীয় অন্য গ্রামাঞ্চলের চেয়ে এখানকার জনজীবন অনেকটা উন্নতমানের ছিল।তাই এ গ্রামের স্থানিক অতীত ঐতিহ্য স্মরণ করার জন্য এ বাজারের বিস্তৃত পরিচিতি আলোচনা করা দরকার। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত এটি একটি উন্নত মানের বাজার ও গঞ্জ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বাংলাদেশ আমলে টেকনাফ সড়ক পরিবহন শুরু হওয়ার পর বাজার টি ক্রমশ গুরুত্ব হারিয়ে শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়।তাই আমাদের শৈশব কৈশোরে এটি কেমন ছিল একনজর দেখা যাক।
বাজার বিলুপ্ত হলেও তার পশ্চিম দিকের সেমিপাকা জামে মসজিদ ও সংলগ্ন পুকুর এখনো আছে।পুকুরের দক্ষিণ পাশে টিলার উপর প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও আছে। আগে এটি পূর্ব মুখী ছিল, এখন পশ্চিম মুখী হয়েছে।

পশ্চিম দিকে বাজারে ঢুকতে প্রথম দোকানটি ছিল কুমোরের তৈরী মাটির হাড়ি পাতিল কলসি ইত্যাদি পন‍্যের দোকান যার মালিক ছিলেন সাতকানিয়া নিবাসী পুতনীর বাপ নামে পরিচিত এক মাঝবয়সী ব‍্যবসায়ী। তার সঙ্গে আলী আহমদ নামে পড়ুয়া আমাদের সিনিয়র মেধাবী এক ছেলে থাকতো। তার গায়কী ও অঙ্কনশৈলী ভালো ছিল। এরপর ছিল কালু খলিফা(দর্জি)নামে এক নামকরা দর্জির দোকান।তার দোকানে দুটি সেলাই মেশিন ছিল।তিনি শার্ট, ফতুয়া, কোর্তা ইত্যাদি অর্ডার নিয়ে সেলাই করতেন।তার সম্পর্কে এমন কথা চালু ছিল যে-কাপড় ছিড়ে যাবে কিন্তু কালু খলিফার সেলাই ছিড়বেনা।তবে বদনাম ছিলযে দশবারের কম তাগাদায় তার থেকে ডেলিভারি পাওয়া যেতোনা।তিনি আমাদের ঠিকা দর্জি ছিলেন।

সে দোকানের পর শুরু পূর্ব-পশ্চিম এক গলি।সে গলির দক্ষিণ পাশের লাইনের সব দোকান ছিল কাপড়ের বড়ো বড়ো দোকান। সে দোকানে নারী পুরুষ সকলের প্রয়োজনীয় সবধরণের কাপড়ের স্টক ছিল।গলিপথ থেকে দোকানের ভিত্তি প্রায় দুহাত উঁচু ছিল। দোকানের সামনে প্রায় পাঁচ ছয় হাত প্রশস্ত বারান্দা ছিল। দোকান ছিল প্রায় দুহাত উঁচু কাঠের তক্তা বিছানো পাটাতন বিশিষ্ঠ। প্রশস্থতা ছিল বড়গুলি দশবার হাত, মধ‍্যমগুলি আট ও ছোট গুলি ছয় হাত প্রায়। তিন দিকে উঁচু তাকে কাপড় সাজানো থাকতো। প্রতি দোকানে মালিক ছাড়া ২/৩জন বয় বা সরকার পোলা থাকতো। সারিতে প্রায় ১৮/২০টির মতো দোকান ছিল।

গলির উত্তর পাশে অপেক্ষাকৃত নীঁচু ও ছোট আকৃতির দর্জির দোকানের সারি ছিল।তাদের বেশিরভাগ রেডিমেড পোশাক সেলাই করতো।আবার অনেকেই অর্ডার মতোও সেলাই করতো।এ গলির শেষ প্রান্তে ছিল উত্তর-দক্ষিণ বালুখালী টু রহমতের বিলমুখী ডি,সি রাস্তা এবং এটি বাজারের মধ‍্যভাগ দিয়ে চলে গেছে।

এই ডি,সি রোড দিয়ে দক্ষিণ দিকের রহমতের বিল,নলবনিয়া,ফারিরবিল, পালংখালী, আনজুমান পাড়া ইত্যাদি গ্রামের লোকজন এই বাজারে আসাযাওয়া করত। অন্য দিকে বাজারের উত্তর দিকে যে কাঁচা প্রধান সড়ক ছিল সেটা দিয়ে থাইন খালি ,গয়ালমারা, পালংখালী এবং বাহারছড়ার মন খালি, ছেপট খালী,চোয়াংখালী ইত্যাদি গ্রামের লোকজন হাটের দিন এই বাজারে আসা যাওয়া করতো। হাটের দিন এই বাজারে অনেক বেশী লোকজনের সমাগম হতো। কথিত আছে যে এই বাজারে হাটের দিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত কোন লোককে সহজে খুঁজে পাওয়া যেত না ।বাজারে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে অনেকক্ষণ সময় লাগতো । লোকজন বাজারে গিজগিজ করতো। অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়ে হারিয়ে গেলে এই বাজার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ বিকেল গড়িয়ে গেলে লোকজন না কমা পর্যন্ত তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যেত না। হাটের দিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় দুই তিন হাজার লোকের সমাগম ঘটতো।

উত্তর দিক থেকে কুতুপালং এবং উখিয়া ও উখিয়ার অন্য গ্রাম তথা রাজাপালং থেকেও এই গ্রামে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসতো। পালং এর মিঠা বা গুড় কলসি ভরে বা টিন ভর্তি করে মিটা বা গুড় এই বাজারে খুচরা বিক্রি করতে আনতো। এই বাজারে যে মাঝখানে অস্থায়ী বাছাই গুলি থাকতো সেগুলো বিভিন্ন পণ্য বিক্রেতা দখল করে অস্থায়ী দোকান বসত। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল প্রকার জিনিস বিক্রয় হতো।সেই বাছাই গুলির মধ্যে শুটকি মাছের একটি বাছাই দোকান ছিলো। সেখানে অনেক বিক্রেতা বসে লাই বা ঝাকা ভর্তি বিভিন্ন ধরণের শুটকি মাছ বিক্রয় করতো। আবার অন্য এক বাছাই দোকানে কাঁচা সুপারি ও শুকনা সুপারি বিক্রি করতো।

আবার কতগুলি অস্থায়ী দোকানে উখিয়া থেকে আগত দোকানদারেরা নানা প্রকার মনোহারী দ্রব্য সামগ্রী বিক্রি করতো। এখানে মানুষের পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিস পাওয়া যেত। সমগ্র উখিয়া থানায় এই বাজারটি বিখ্যাত ছিল ।মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস ক্রয় বিক্রয়ের জন্য এ বাজারটি ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য হাট। তাই হাটের দিন এই বাজারে এত বেশি শোরচিৎকার হতো যে বহুদূর থেকে এই বাজারে শোরগোলের শব্দ শোনা যেত। দক্ষিণ দিকের অনেক লোকজন সাম্পানে করে নদীপথে এখানে বাজার সওদা করার জন্য আসা যাওয়া করত।আর টেকনাফ পর্যন্ত যাওয়া-আসা করার জন্য রাত্রিযাপনের একমাত্র উপায় ছিল বালুখালী বাজারের হোটেলগুলি। সেখানে প্রায় সময় লোকজনের ভীড় লেগে থাকত। (চলমান…)

লেখক : কবি ও প্রবীণ আইনজীবী
প্রকাশিত গ্রন্থ: ৭

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।