পাঠকের কলাম

গাড়ির হর্ন বিড়ম্বনা অতঃপর হর্নের শব্দে সাধারণ মানুষের পথচলা

ইউছুফ আরমান : ‘জীবনের সার্থকতা পরিবেশ নির্ভর, নির্মল অঙ্গনে সবকিছু মনোহর”। আমরা যেখানে বাস করি তার পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডলকেই বলা হয় পরিবেশ। পরিবেশে যখন অবাঞ্ছিত বস্তুর উপস্থিতি বৃদ্ধি পায় যা জীবজগতের পক্ষে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে তখন তাকে পরিবেশ দূষণ বলে । যন্ত্রযুগের বিষ বাষ্পে  এবং নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার অভিঘাতে, মানব জনসংখ্যার অত্যাধিক বৃদ্ধি এবং নির্বিচার উন্নতি প্রচেষ্টা পৃথিবীকে দূষণ নামক সংকটের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে, বিষিয়ে উঠছে বায়ু নিভে যেতে বসেছে সভ্যতার আলো। কম্পনশীল কোন বস্তু থেকে যে শক্তি জড় মাধ্যমের মধ্য দিয়ে আমাদের কানে পৌঁছে এক বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করে বা জাগায় তাকে শব্দ বলে । শব্দ এক প্রকার শক্তি, যা তরঙ্গের আকারে উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়ে ।

দেশে যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর যৌক্তিক কারণও রয়েছে। বাড়ছে মানুষ, তাদের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে যানবাহন। যে কারণে প্রতিদিন সড়ক, মহাসড়কে ঢুকছে অসংখ্য নতুন নতুন যানবাহন। কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে হর্নের মাত্রাও। হর্নের উচ্চমাত্রার শব্দে পথচলা দায়। জরিমানার বিধান থাকলেও হাইড্রোলিক হর্নের শব্দের দূষণ বেড়েই চলেছে। আকস্মিক হর্নের শব্দ একজন মানুষকে বধির কিংবা বেহুঁশ করে দিতে পারে। তাছাড়া পুলিশের কাছে শব্দ পরিমাপের কোন যন্ত্র না থাকায় তারাও বুঝতে পারেন না কোন গাড়ি অতিরিক্ত মাত্রার ভেঁপু বাজাচ্ছে। প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় সাধারণ মানুষের গাড়িতে প্রশাসনিক গাড়ির হর্ণের বিড়ম্বনা।

শব্দ দূষণ যে কোন মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও এতে শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও ট্রাফিক পুলিশ, অটোবাইট বা গাড়ি চালক, রাস্তার নিকটস্থ শ্রমিক বা বসবাসকারী মানুষ অধিকহারে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। মানুষের শ্রবণ সীমার স্বাভাবিক মাত্রা ৪৫ ডেসিবল। যার বেশি হলে শব্দ দূষণে পরিণত হয়। যা মানুষের শরীরে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে। শব্দ দূষণের ফলে মানুষের শ্রবণ ক্লান্তি এবং সর্বশেষ বধিরতা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া যে সকল রোগ হতে পারে তার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, কণ্ঠনালীর প্রদাহ, আলসার, মস্তিষ্কের রোগ, কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস, বদমেজাজ বা খিটখিটে মেজাজ, ক্রোধ প্রবণতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, রক্তনালীর সংকোচন এবং হার্টের সমস্যা অন্যতম।

রাস্তায় হর্নের আওয়াজে মনে হয় গাড়ি চালকগণ হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। বিনা প্রয়োজনে হরহামেশাই হর্ন বাজানো হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বা সংরক্ষিত এলাকা যেমন মসজিদ, মন্দির, স্কুল এবং হাসপাতালের পাশের রাস্তাগুলোতেও হর্ন বন্ধ করে না। অথচ হর্নের বিকট আওয়াজে যে কারোই ক্ষতি হতে পারে। গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানার সময় নেই চালকদের।

মানুষের উপর শব্দ দূষণের প্রভাবঃ মানব চক্ষুর ওপর প্রভাব- শব্দ দূষণের ফলে অনেক সময় অপটিক স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে । দৃষ্টিশক্তি দুর্বল লক্ষ্য করা যায়।উপযোজন ব্যাহত হয় ।অনেক সময় তারারন্ধ্রের সংকোচন প্রসারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়।

শ্বাস প্রশ্বাসএর প্রভাবঃ শব্দ দূষণের ফলে বহু মানুষের মধ্যে শ্বাস প্রশ্বাস ক্রিয়া ব্যাহত হয়।শ্বাস-প্রশ্বাসের হার পরিবর্তিত হতে থাকে ,উচ্চ মাত্রার  শব্দের ফলে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া চলতে থাকে।

মস্তিষ্কের উপর প্রভাবঃ ৬০ ডেসিবেলের উপর দিয়ে একটানা শব্দ শুনলে মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ড কে প্রভাবিত করে, মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ,অনেক সময় উচ্চ মাত্রার শব্দ স্মৃতিশক্তি হ্রাস করে, মানসিক অবসাদ দেখা যায়, বমি ভাব দেখা যায়, অনিদ্রা দেখা যায়, ফলে শরীরের স্বয়ংক্রিয় নার্ভতন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়। দেহের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ হয় না হয় না।

প্রতিদিন শব্দ দূষণের ফলে তারা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন। হঠাৎ করে হর্ন বাজানোর ফলে অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শব্দ দূষণ সমস্যার নামমাত্র জরিমানা থাকলেও তাও মানা হচ্ছেনা। যে কারণে শব্দ দূষণকারীরা আরো উৎসাহ পাচ্ছে। তাছাড়া সম্প্রতিক পুলিশের গাড়ির হর্ণ ও এ্যাম্বুলেন্সের হর্ণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শব্দ দূষণ তথা গাড়ির হর্নের আওয়াজ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কঠোর আইন ও জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। চালকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সেখানে হর্নের যন্ত্রণা নেই। আমাদের দেশে হর্ন বাজানো আইনত যেখানে নিষেধ সেখানে আমরা দেখতে পাই গাড়ি সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকলে বা যানজটে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক চালক অহেতুক হর্ন বাজাচ্ছেন। এতে রাস্তায় সুস’ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। এই সমস্যা থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ট্রাফিক পুলিশদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে এবং গাড়ির হর্ন নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ বিভিন্ন জরুরি স্থানে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করতে হবে। অন্যথায় আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে গাড়ির হর্ন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। গাড়ি চালকদের মাঝে শব্দ দূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনগণের মাঝেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। সকলেই যদি সচেতন হয় তাহলে শব্দ দূষণ তথা গাড়ির হর্ন নিয়ন্ত্রণ কঠিন কিছু হবে না। সরকারের নজরদারি ও আমাদের সকলের সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

লেখক:
ইউছুফ আরমান
কলামিষ্ট, সাহিত্যিক
বিজিবি স্কুল সংলগ্ন রোড়
০৬ নং ওয়াড, পৌরসভা, কক্সবাজার