এমপি জাফর ও লিটুকে আওয়ামী লীগ থেকে অব্যাহতি, চকরিয়ায় বিক্ষোভ-যান চলাচল বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক :
চকরিয়ার সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে চকরিয়া- পেকুয়া আসনের সাংসদ জাফর আলমকে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি থেকে সাময়িক অব্যাহতি এবং চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটুকে সংগঠন থেকে কেন স্থায়ীভাবে বহিস্কার করা হবে না মর্মে নোটিশ প্রদান এবং তাদেরকে দল থেকে চুড়ান্ত ভাবে বহিস্কার করার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের নিকট সুপারিশ প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বৃহস্পতিবার (১০ জুন ) বিকাল ৪ টায় কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উপস্থিত সকল সদস্যবৃন্দের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এবং সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সভায় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখার জন্য চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সরওয়ার আলমকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয় বলে জেলা আওয়ামী লীগের উপ প্রচার সম্পাদক প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা এবং স্থাগিত ১৫ ইউনিয়ন পরিষদ ও ২টি পৌরসভা নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করা হয় সভায়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়. সভায় উপস্থিত সকল জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি হিসাবে গত ৮ জুন চকরিয়া পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলমের নেতৃত্বে চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের অব্যাহতি প্রাপ্ত সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটু ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী চকরিয়া পৌরসভার বর্তমান মেয়র এবং আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী আলমগীর চৌধুরী, চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক উদ্দিন চৌধুরী ও অনেক ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং নৌকা প্রতীকের সমর্থক কর্মীদের জাফর আলম, জাহেদুল ইসলাম লিটু সহস্তে মারধর করে মারাত্মক ভাবে আহত করে মর্মে আলোচনা করেন এবং এধরনের ন্যাক্কার জনক ঘটনা ঘটানোর জন্য জড়িত সকলের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তাব করেন। বক্তাগণের আলোচনায় চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম পূর্বে এ ধরনের আরো অনেক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটানোর কথাও বলেন।
জাফর আলমকে বিগত সময়ে আরো ২ বার বিভিন্ন অপরাধ জনক কর্মকান্ডের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয় এবং ভবিষ্যতে সংশোধনের স্বার্থে তাকে ক্ষমা করা হয়। এতে হিতে বিপরীত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে আরো বেশী স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে এবং ৮ জুন ২০২১ইং তারিখের ঘটনার মত একটি ন্যাক্কার জনক ঘটনা ঘটিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। তদুপরি তিনি সবসময় জেলা আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জনসম্মুখে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে দলের ভাবমূর্তিকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার মত কাজ করে। তিনি স্থগিত পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় ভাবে মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিজ ভাতিজা কুখ্যাত সন্ত্রাসী জিয়াবুল হককে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধি হিসাবে দাড় করিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তৃণমুল স্থরের নেতাকর্মীদের তার পক্ষে কাজ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনের মারাত্মক ক্ষতি করতে থাকে। জাফর আলম বিগত সময়ে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে চকরিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতিকে মারধর করে মারাত্মক ভাবে আহত করে। এ ব্যাপারে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক চকরিয়া থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে তাকে নিজ হাতে মারধর করে।
সভায় ২১ জুন অনুষ্ঠিতব্য জেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নির্বাচন স্থগিত হওয়ার বিষয়ে নেতৃবৃন্দ আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন। সভায় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভবিষ্যতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলে দলীয় ভাবে মনোনীত প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সভায় বক্তব্য রাখেন-অধ্যাপিকা এথিন রাখাইন, শাহ আলম চৌধুরী রাজা, রেজাউল করিম, কানিজ ফাতেমা আহমদ এমপি, লেঃ কর্ণেল অবঃ ফোরকান আহমদ, মাহবুুবুল হক মুকুল, এড. আয়াছুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার বদিউল আলম, খালেদ মাহমুদ, এ.টি.এম. জিয়া উদ্দিন চৌধুরী, এড. মমতাজ আহমদ, মেয়র মকসুদ মিয়া, গিয়াস উদ্দিন, আমিনুর রশিদ দুলাল, সোনা আলী।
উপস্থিত ছিলেন-এড. বদিউল আলম সিকদার, এম. আজিজুর রহমান, মোঃ শফিক মিয়া, জাফর আলম চৌধুরী, এড. আব্বাস উদ্দিন চৌধুরী, নুরুল আবছার চেয়ারম্যান, আবুহেনা মোস্তফা কামাল, এড. ফরিদুল আলম, হেলাল উদ্দিন কবির, ড. নুরুল আবছার, এড. তাপস রক্ষিত, কাজী মোস্তাক আহমদ শামীম, নুসরাত জাহান মুন্নি, এম.এ. মনজুর, আদিল উদ্দিন চৌধুরী, শফিউল আলম চৌধুরী, এড. আবদুর রউফ, মিজানুর রহমান, জি.এম. আবুল কাসেম, বদরুল হাসান মিল্কী, উম্মে কুলসুম মিনু প্রমুখ।

এই দিকে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলমকে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি এবং চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুল ইসলামকে বহিষ্কার করার প্রতিবাদে চকরিয়ায় মহাসড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে জাফর ও জাহেদ সমর্থকরা। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের জরুরী সভায় কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলমকে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়ার খবরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনতা। বৃহস্পতিবার রাত ১১ টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মহাসড়কের দুইপাশে যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জয় বাংলা শ্লোগান ও জাফর ভাইয়ের কিছু হলে মুহুর্মুহ শ্লোগানে মহাসড়কের একাধিক স্থানে মহাসড়কের ওপর টায়ার জ্বালিয়ে এবং লাঠিসোটা হাতে নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সড়ক অবরোধ করে। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানভীর হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ মহাসড়ক থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সরিয়ে দিতে গেলেও তারা পিছু হটে।
প্রসঙ্গত বিকেলে সংসদ সদস্য জাফর আলমকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে মর্মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে জাফর আলমের নির্বাচনী এলাকা চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ জনতা রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে।
চকরিয়া উপজেলার বিভিন্নস্থানে মহাসড়ক অবরোধ করার সত্যতা নিশ্চিত করে চকরিয়া থানার ওসি শাকের মোহাম্মদ যুবায়ের বলেন, ‘মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার প্রায় ৩৯ কিলোমিটার মহাসড়কের একপ্রান্তের আজিজনগর এবং অপরপ্রান্তের খুটাখালী পর্যন্ত কিছুদূর পর পর অসংখ্য ব্যারিকেড দেয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা।’ ওসি বলেন, ‘অল্পসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।
চকরিয়া পৌরসভা আওয়ামী লীগের সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটু বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগ সিন্ডিকেট নির্ভর রাজনীতি করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। এরই অংশ হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের বলয়ের নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে অগণতান্ত্রিক পন্থায় ও অন্যায্য সিদ্ধান্তের আলোকে বিএনপি-জামায়াত ও আগুন সন্ত্রাসীদের আতঙ্ক এমপি জাফর আলমকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন মর্মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপরেই দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনতা রাস্তায় নেমে এসেছে।
অপরদিকে চকরিয়া পৌরশহরে বিক্ষোভ চলাকালে রাত সাড়ে দশটার দিকে উপস্থিত হন সাংসদ জাফর আলম। ওইসময় তিনি ক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, দলীয় সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। গঠনতন্ত্রপরিপন্থী সিদ্ধান্ত আমরা মানি না। গাদ্দারি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমরা লড়ে যাব।
তিনি বলেন, সাবধান হয়ে যান। হয় আমি থাকব, না হয় মুজিব থাকবে। আর ছাড় দেয়া হবে না। জীবন দিয়ে হলেও আমরা রাজপথে থাকব। দলের জন্য আমি জেল জুলমের শিকার। প্রধানমন্ত্রী আমাকে যে সিদ্ধান্ত দিবেন, তা মেনে নেব না।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।