বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা : আরাকান রাজসভার কবি কাজী শেখ মনসুর

কালাম আজাদ

সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগ (Medieval age) যুগান্তকারী এক অধ্যায়। আবহমানকাল থেকে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার (চকরিয়া, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার) অঞ্চলটি চট্টগ্রাম ও আরাকানের অন্তর্ভূক্ত ছিল। সাংবাদিক-সাহিত্যিক মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ড. আহমদ শরীফ, অধ্যাপক শাহেদ আলী, মুহাম্মদ সিদ্দিক খান, ড. রতন লাল চক্রবর্তী, মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম, আবদুল হক চৌধুরী, ড. মো.আবুল কাসেম, কাজী জাফরুল ইসলাম, অধ্যাপক মালিক সোবহান প্রমুখের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে এই চট্টগ্রাম ও আরাকান। কক্সবাজারের ক্ষেত্রেও এ কথাটি সমভাবে প্রযোজ্য। এটা সবারই জানা।

বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতায় মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে কক্সবাজারের কবিদের অবদান উল্লেখ করতে হলে নসরুল্লাহ খোন্দকারের পর যার নাম কলমের ডগায় চলে আসে- তিনি হলেন কাজী শেখ মনুসর। মধ্যযুগের বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে এক বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী তিনি। তিনি আরাকান রাজসভারও কবি ছিলেন বলে ইতিহাস পাঠে জানা যায়।

মধ্যযুগের সূফী সাহিত্যের এক আকাশচুম্বি গৌরবের নাম কাজী শেখ মনসুর। তিনি আঠার শতকের প্রথমার্ধের কবি বলে ইতিহাস স্বীকৃত। তৎকালীন রামু(রাম্ভূ)’র কাজী ও সেখানকার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর রচিত ‘সির্নামা’ কাব্যগ্রন্থে তাঁর নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-
‘রোসাঙ্গে আঁছিল আমি রাম্ভু কৈল বাস।
কহত মনসুর কাজী ঈসার তনয় ॥
ভোরমতি হৈয়া জীবর কৈল ক্ষয়।
কবির এ উদ্ধৃতি থেকে ধারণা করা যায়-রোসাঙ্গ রাজ্যভ্ক্তু তৎকালীন রামুতে তাঁর জন্মস্থান। সম্ভবত তিনি পীর সৈয়দ সুলতানের বংশধর ছিলেন। পীর সম্পর্কে কবি বলেন-
সুলতান বংশের কান্তি শাহ তাজুদ্দিন ।
ভাগফল হৈল তাহার অধীন ॥
এই তাজুদ্দিন সম্ভবত কবি পীর সৈয়দ মীর সুলতানের প্রপৌত্র।

মুসলিম সুফীতত্ত্ব ও ভারতীয় যোগতত্ত্বের সম্মেলন ঘটিয়ে ‘সির্নমা’ কাব্য রচনা করেন। ‘সির্নামা’ কাব্যের রচনাকাল ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দ। কাব্যটি ‘আছারুল মুসা’ বা ‘আসরারুল মুসা’ বা বীর্য-রহস্য’ নামক ফারসি কবির বাংলা সংকলনের স্বাধীন অনুসৃতি। আহমদ শরীফের ভাষায়-‘ফারসি গ্রন্থের নাম আহারুল মুসা তথা ‘আসরারুল মুসা’বা বীর্য রহস্য । বাংলা নাম ‘ছিরি’ তথা ‘সির’ কিন্তু এটি যথার্থ অনুবাদ। কবির স্বাধীন অনুসৃতির সাক্ষর সর্বত্র বিদ্যমান। দেশী যোগকে আরবী-ফারসি পরিভাষায় মণ্ডিত করেছেন’’।১.
সিনার্মা রচানকাল সম্পর্কে কবি বলেন-
‘‘আছারুল মুসা এক কিতাব
ছিরনামা রাখিলাম পুস্তকের নাম”।
কবি পুস্তক রচনার তারিখ দিয়েছেন এভাবে-
যত হৈল মঘী সন নও পরিমাণী
এক পরে শূণ্য ছয় পাঁচ দিয়া গণি॥’
অর্থাৎ তাঁর এ কাব্যগ্রন্থ ১০৬৫ মঘী (১০৬৫+৬৩৮)=১৭০৩ খ্রি রচিত হয়।
“আসরারুল মুসা” কাব্যগ্রন্থ রচনার উদ্দ্যেশ্য সম্পর্কে কবি লিখেছেন-
‘‘কহে হীন মনসুরে বচন শাস্ত্র বাণী
পীর মুর্শিদ মুখে শুনি তত্ত্ব জানি।
পীর মুর্শিদ পাএ করি নমষ্কার
অষ্টাঙ্গে প্রণাশ করি বাপ মাও আর।
বচন আরবী ভাষে সব শাস্ত্র মূল
বুঝিতে ফারসি ভাষে কিতাব বহুল ।
যথগুণিগণ সবে মনে প্রীতি বাসি
আরবী ফারসী ভাসে দিলেক প্রকাশি।
বাঙ্গালা না বুঝে সব ফারসী কিতাব
না বুঝি কিতাব কথা মনে হএ তাপ
সবে বোলে বাঙ্গালের ভাষে এ কিতাব
শুনিতে পড়িএ যদি যাএ মনস্তাব।
তে কাজে বাঙ্গালা ভাষে ফারসী বচন
পদবন্দী করি কৈল প্রস্তক গ্রহণ। (প্রস্তাবনা, সির্নামা)
এ উদ্ধৃতি থেকে বুঝা যায়, এটি মূলত আরবী থেকে ফারসির মাধ্যমে বাংলায় অনুদিত হয়েছে। এ গ্রন্থের সুচিক্রম উল্লেককালে বিষয়বস্তু সম্পর্র্কে ধারণা লাভ করা যায়-প্রস্তাবনা, পীরতত্ত্ব, দরবেশী, গ্রন্থোৎপত্তি (আহারুল মাসা), বাব আউয়াল (দরবেশী ককিকত), প্রথম ফয়সাল (দরবেশী কথন), বাবু দুয়ম (বন্দেগীর বয়ান), বাব ছৈয়ম (তনের বিচার), বাব চাহরম (বিভিন্ন তন), বাব পঞ্চম (দীলের বিচার), বাব ষষ্ঠম ( বাবি পরিচয়), বাব সপ্তম (মনির বয়ান), বাব অষ্টম (আরোহা তত্ত্ব) নিরঞ্জন তত্ত্ব (বার নয়)।
এ কাব্যগ্রন্থে শুধু ‘বীর্য-রহস্য’ নয়, মারফতি তত্ত্ব-কথাও রয়েছে। এটি ৯টি ফসল বা অধ্যায়ে বিভক্ত। এই অধ্যায়গুলোতে কি কি বিষয় সন্নিবিষ্ট- তা ‘বাব আউয়াল (দরবেশী হকিকত)-এ উল্লেখ আছে :
‘প্রথম ফ’সলে কহি দরবেশী কথন।
যেমত কিতাবে আছে শুন দিয়া মন ॥
দ্বিতীএ কহিয়া দিমু যত এবাদত ।
একে একে কহিয়া দিবু যত শাস্ত্রমত ॥
তৃতীএ কহিয়া দিব তনের বিচার।
কিতাবেত কহিয়াছে যে মত প্রকার ॥
চতুর্থে কহিয়া দিব নাড়ির (রাবির) বয়ান।
একে একে কহি দিবু তার পরিমাণ ॥
পঞ্চম ফ’সলে যত দিলের বিচার।
যে যে মত যার দীল কহি দিমু সার ॥
ষষ্ঠমে কহিব যথ বাবির কথন।
বিচার করিয়া দিব তার বিবরণ ॥
সপ্তম ফসলে কৈমু ঋতুর কথন ।
যে যে দিনে মনি (ঋতু) আস রহে যেই স্থান॥
অষ্টমে কহিব যত আরোহার বাণী।
আরোহার যত গুণ কহি দিব শুনি ॥
নবম ফছলে আছে ছিরি নিরঞ্জন।
প্রচারিতে আজ্ঞা নাই গোপত বচন ॥
এই কাব্যগ্রন্থটি দরবেশি গ্রন্থের মহাকোষ বলে ড. মুহম্মদ এনামুল হক মন্তব্য করেন।
অস্টম অধ্যায়ে ‘আরুহার’( আরোয়া) বাণী বিকৃত হয়েছে ; ‘প্রাণের আরোয়া বোলে আরবী ভাষাএ।
আরোয়ার আবার চারটি নাম
১).
‘নাতকি’ আরোয়া বৈসে মনুষ্য তনএ
বচন কন যত কহিলে বোজএ।
২.
‘ছামি’ নামে পশুপক্ষী আত্তমা ( আত্মায়) বৈসএ
কহিতে না পারে ফিরি বচন নিশ্চয়।
৩.
জিসিম আরোয়া বৈসে যত বৃক্ষ তরু
তৃণলতা আদি আর সুগন্ধ সুচারু
৪.
ন্মাসি নামে আরোয়া বৈসএ পাথরএ
মণিমুক্ত আদি যত কঙ্কর হএ।
গ্রন্থের পরতে পরতে ‘দম’ কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘দম-র আভিধানিক বিভিন্ন অর্থ থাকলেও এখানে ‘দম’ বলতে শ্বাস-নিঃশ্বাস বা জীবনী শক্তিকে বোঝানো হয়েছে। এ ‘দম’ দ্বারা কবি জীবনীশক্তির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ‘দম’ থেকে সবকিছুর উদ্ভব বলে মনে করেছেন :
কুদরতে কাফে দমে কলম মারিল
অনন্ত অলেখা লেখা লোহতে উলিল।
সে দমে সৃজিল প্রভু এ দু জাহান
সেই দম হোন্ত হৈল আদমের প্রাণ।
সষ্ণারিল দম যদি আদমের কাএ
আদম হইয়া নাম সুকর কহএ।
সেই দমে হইলেক ফিকির আকল
এ থেকে জানাই যথ আদি অন্ত মূল।
সে সবে জানিল যদি সেই দমখানি
আপে কিছু নহে সেই লয় পরিমাণি।
সেই দামে আইসে যাএ সংসার মাঝার
মরণ জীবন কহে মনুষ্য বেভার।
ইচ্ছা হৈলে পরবাসে সুখে চলি যাএ
পুনি ফিরি ঘরে যাএ আপন ইচ্ছাএ।
পলকেত আপনার ইচ্ছা আসে যাএ
বল- জোর নাই নহে কাহার ইচ্ছাএ।
ঈশ্বর পুরান জান সেই এক দম
যে দমে তু হইয়াছে এ দুই আলম।
সেই এক হোন্তে বহু উপর্জএ
সৃজিয়া অনন্ত কোটি একেত মিশএ।
আদি মানব আদম (আ) থেকে শুরু করে ইব্রাহিম (আ), ইদ্রিস (আ), মুসা (আ), ঈসা (আ), মুহম্মদ (দ) প্রমূখ এই দমের দ্বারাই বিপদ-আপদ অতিক্রম করতে সমর্থ হয়েছিলেন। আরব সাগর, পর্বত, অগ্নিবৃক্ষ, লতা, মাটি প্রভৃতি সে-দম পেয়ে ‘ ক্ষেমা ধরি রহিলেক হইয়া অচল’।
কাব্যের প্রস্তাবনায় কবি আল্লাহকে বন্দনা করেছেন সর্বপ্রথম। তারপর রসুলে (দঃ) এবং সেই সুত্র আদম (আঃ) হতে শুরু করে সকল পয়গম্বরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। রসুল (দঃ) সম্পর্কে কবির উক্তি-
‘‘আদম আছিল ছিল একাকার
মিম হোন্তে আহমদ হৈল প্রচার ।
খতম হইল নবী জমানা আখেরে
মুহাম্মদ নাম প্রভূ কৈল যাহারে।
মুহাম্মদ মাহমুদা মোকামে বৈসএ
আত্তমার দীপ তথা সদাএ জ্বলএ। (প্রস্তাবনা, সির্নামা)
রাসুল (দঃ) এর প্রশংসা করে ক্ষান্ত হননি। তিনি ইসালামী শরীয়ত মোতাবেক সৃষ্টিশীলতার একটি বিবরণ গ্রথিত করেছেন। ‘আনাল হক’ বা ‘ সোহম’ তত্ত্ব তথা অদ্বৈত তত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। ‘আনাল হক’ এর মনসুর হাল্লাজ এর স্বরুপ উন্মোচন করতে কবি বলেছেন :
মনসুর হাল্লাজ নামে আউলিয়া প্রধান
আপনার মধ্যে মিশি পাসরি আপন।
মুই ‘হক’ হেন করি সদাএ কহিলা
আপনা পাসরি আপে মিশিয়া রহিল।
যদি সে মিশিয়া গিয়া আপন গোচর
বোবা-কালা হই রহে না দিয়া উত্তর।
শেখ ফরিদ নামের এক মহাপীর অলির ‘মুই খোদা’ দাবি করাকে কতাক্ষ করে কবি কাজী শেখ মনসুর বলেন :
‘শেখ ফরিদ আত্ম নাম মহাপীর অলি
মুই খোদা হেন কৈলা প্রভু ভাবে ভুলি।
কি হেতু কহিল পীরের এমত বচন
তার রুপ ধরি কপে প্রভু নিরঞ্জন।
যদি সে প্রভুর সনে মিলিয়া রহিল
সূর্যের নিকটে যেন চন্দ্র উগি২ গেল
নহে কার শক্তি আছে খোদা বলিবার। ’
মুহম্মদী দীন অনুসারে ‘মুই বোলে খুদা’ দাবিকারীকে শিরচ্ছেদ করার কথা এবং যার যা প্রাপ্য তাই পাওয়ার কথা বলেছেন কবি :
মুহম্মদী দীন নহে কাফির আচার।
মনুষ্য সংসারে যদি ‘মুই বোলে খোদা’
সে ক্ষণে তাহার শির ছেদি কর জুদা
যেবা যেউ চাহে সে অবশ্য সেই পাএ
সেই পাইলে সেইজন সেই মত হএ।
হিন্দু শাস্ত্রে চারবেদ, বাইশ পুরাণ, চৌদ্ধ শাস্ত্রের তুলনাসুত্র উপস্থাপন করেছন এভাবে-
‘হিন্দুয়ানী শাস্ত্রে আছে এমত বচন
চারিবেদে সাক্ষী দিচ্ছে এমনত লক্ষণ।
যজুর্বেদ ঋগে¦দ অথর্ব সামবেদ
দু বিংশ পুরাণে আছে এ চৌদ্দ শাস্ত্র ভেদ।
যে জন ভাবিয়া আপে ব্রহ্মাতে মিশিল
আপনে সে ব্রহ্মা হই সে নর রহিল
ব্রহ্মা সে ভাবিয়া ব্রহ্মা হএ সেই জন।
এ চৌদ্ধ শাস্ত্রে ত চারি বেদের কথন।
সাগরে সে দম পাই প্রভু ভাবে ভুলি
উহু উহু শব্দ করে উথলি উথলি।
সেই ভাব পাই বায়ু শূন্যে চলি যাএ
গোচরে আলোপ থাকে কেহ না দেখএ।
অগ্ন্এি পাইল যদি সেই ব্রহ্ম ভাব
সহিতে না পারে কেহ তার তাজ তাপ।
সুফী সাধনায় পীরের ভুমিকা অসামান্য । সির্নামা’-তে কবি মুসলমান সমাজে পীরের গুরুত্বারোপ করে পীর যে রকম তত্ত্ প্রচার করে সে মতে আল্লাহর বন্দেগী এবং পীরের বন্দনা ছাড়া আল্লাহকে না পাওয়ার কথা বলেছেন :
‘যেই সকলে চাহে যদি খোদা চিনিবার
প্রথমে ভজিব পীর কবি নমস্কার ।
এক জানি কায় মনে পীর হাতে ধরি
তউবা করিব গুনা না করিব করি ।
সংসার-সাগরে ভাসে হই ব্রহ্মা ভোলে
হাতে ধরি পীরে টানি তুলিবেক কোলে।
পীর হস্তে মুরিদ যে যদি সেই হইব
প্রভুত যেমত সেবা তেমত করিব।
পীরে যে প্রচারি দিল গোপত বচন
তত্ত্ব হেন জানি মনে করিব যত্তন।
সেই কর্ম করিবেক এক মনে কায়
সেই পীর মুর্শিদ যে জানিব সদায়।
যদি সে পীরের বাক্য মনে নহি ভাএ
কায়মনে তত্ত্ব ভাবি খাদারে না পাএ। ’ (পীর তত্ত্ব, সির্নামা)
শুধু তাই নয়, পীরকে ‘নায়েব খোদা’ উল্লেখপূর্বক পীরকে অনুসরণ করে আপনকে চিনতে পারলে দুজাহানের মালিক আল্লাহকে পাওয়ার কথা এবং পীর যদি মুরিদকে কোনো অকর্ম করতে বলে তা মহাধর্ম মনে করে মুরিদকে মানার কথা বলেছেন কবি কাজী শেখ মনসুর-
পীর যদি কহে পুনি করিতে অকর্ম
মুরিদে মানিব জানি এই মহাধর্ম।
পীরে যদি নির্মি এক দিলেক দর্পণ
সে দর্পণ নিতি দেখ মুর্শিদ বরণ।
এক ভাবে ভাবিবেক কিবা রাত্রিদিন
সেই দর্পণে পাইবেক আপনার চিন।
আপনা চিনিয়া যদি আপনে মিছিল
দীন-দুনিয়াই দুইসে জনে পাইল
পীর মুর্শিদ জান নায়েব খোদার
স্বরুপে জানিবা বান্দা এই বাক্য স্যার। (পীর তত্ত্ব, সির্নামা)।
তারপর শরীয়ত, যাকাত, অযু, নামায, তরিকত, হকিকত ও মারফতী বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এ কাব্য গ্রন্থে। এ গ্রন্থের ‘ দরবেশী’ ফসল বা অধ্যায়ে দরবেশী তত্ত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে মানুষকে আল্লাহ প্রীতি এবং ফকির ( এখানে ফকির বলতে বান্দা হিসেবে ছোট হয়ে আল্লাহর কাছে চাওয়ার কথা বলা হয়েছে) বেশে আল্লাহর কাছে চাইতে এবং মহান আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে চাওয়ার অধিকার কোনো বান্দার নাই। আল্লাহর কাছে চাইলেই পর্বত সমান পাপও মাফ করে দিতে পারেন। চাইলে, দীলান্তরে যত পরিমাণ মণিমুক্তা, অসুখ-বিসুখ সব দুর হয়। খোদার আশক না হইলে এসব থেকে মুক্তি পাবার আশা ক্ষীণ। এসব দরবেশী কথনের উল্লেখ আছে এ কাব্য গ্রন্থে। কবির ভাষায়-
দীলের অন্তর আছে নানা রত্মমণি
ফকির সকলে তারে করে বেচাকিনি।
এক গোটা মুক্তা যদি জান বেচে মূলে
দাসতুল্য দেওপরী ফিরিস্তা আসি মিলে।
যে মাগে সে পাএ বসি নিজ হুজুরাএ
স্বর্গ মত্য পাতালেত কেহ না এড়াএ।
কোরানে কহিছে প্রভু করিয়া প্রকাশ
যে দেখে মোর রূপ তার স্বর্গ বাস।
পর্বত সমান পাপ সব দূরে যাএ
লেখা আছে যথ পাপ সকল মিটএ।
যে সবের লেখা আছে নেকির অন্তরে
যে সবের বহু শ্রধা দেখিতে মোহোরে।
যার লেখা গেছে বদি ললাট মাঝার
সে সবের দেখা নাই মোহোর তাহার।
দীলান্তরে মণিমুক্তা যদি সে পাইল
অক্ষয় দৌরত তার নিশ্চয় হইল।
মনেত আশক করে কিবা রাত্রি দিন
আশক কুহুক হোন্তে অচিনেত চিন।
কেবল আশক হএ ফকির দরবেশ
আশক না হৈলে নাই প্রভুর উদ্দেশ।
তৃতীয় ফয়সলে সন্তান ধারণ ও জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। আবার নাড়ীসমূহের পরিচয় রয়েছে। তন চার প্রকার আম্মারা, আম, মূলহিম ও মোৎমিন। দীলও চার প্রকার : মোনাফেকের পাষাণ দীল, কর্মকুণ্ঠ অলসের আঁধার দীল, মুমীনের জ্যোতির্ময় দীল ও আউলিয়া আম্বিয়ার দীল।
বায়ুরও চার নাম : শুকাবাবি, মাহেন্দ্রবাবি, আত্মাবাবি ও বরুণাবাবি। এক এক রায়ুর এক এক লক্ষণ। যথা আনল বরণ বাবি মাহেন্দ্র যে জ্ঞান মাহেন্দ্র দীর্ঘল শ্বাস অধিক শীতল। ভিন্ন প্রকার শ্বাস বায়ুর সঙ্গে জিহ্বার স্বাদও পরিবর্তিত হয়। শ্বাসের প্রকার ভেদ আবার দিন-ক্ষণ তিথি নক্ষত্রের উপর নির্ভরশীল। সপ্তম বাবে আরুহার কথা বর্ণিত। এ সূত্রে সুপ্রবৃত্তি ও দু®প্রবৃত্তি তথা সুমতি-কুমতির দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম বর্ণিত হয়েছে।
এই সংগ্রামে দুই পক্ষের সৈন্যদের উত্তেজনা ও প্রেরণা
জানের বাজায় বিয়াল্লিশ বাদ্য শ্রীগোলার হাটে
চৌকি রাখিলেন্ত নিয়া ত্রিপিনীর ঘাটে।
অনাহত শব্দ উঠে করি হুলস্থুল
কাসা করতাল শব্দ আনন্দ বহুল।
আর-
রাত্রিদিন মুমীনে করএ সংগ্রাম
এ যুদ্ধ জিনিলে হএ মুমীন নাম।
এ সংগ্রামে পীর মুর্শিদই সহায়। তাই
‘পীর মুর্শিদ জান নায়েব খোদার’
পীর মুর্শিদের হেন জানিব খোদাএ।৩
কবি কাজী শেখ মনসুর সম্পর্কে বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান তার ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: মধ্যযুগ’ গ্রন্থে বলেন-“কাজী মনসুর তাঁর সির্নামায় সুফীতত্ত্বকে ভারতীয় যোগতত্ত্বের সঙ্গে পরিপূর্ণ করে তুলেছেন এবং শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভারতীয় যোগতান্ত্রিক পারিভাষিক শব্দসমুহকে তিনি পরিবর্জন করেননি। ফলে সির্নামা ফারসি গ্রন্থের অনুবাদ বিপুল ফারসি শব্দ যেমন ধারণ করে আছে তেমনি ভারতীয় যোগতান্ত্রিক শব্দসমুহকে করে তুলেছে সৌন্দর্যসম্পৃক্ত অলংকার।”৪
কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আমির জঙ্গনামা’। এ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। চারজন গবেষক দু’ধারায় কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছেন। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ এর নাম দিয়েছেন ‘‘আমীর জঙ্গ’’ ৫। ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহও ‘আমীর জঙ্গ’ বলে উল্লেখ করেছেন তাঁর বাংলা সাহিত্যের কথা’য়। তাঁর মতে-‘কারবালা যুদ্ধের পরে ইয়াজিদের সঙ্গে হানিফার যুদ্ধের বর্ণনা দিয়া শেখ মনসুর ‘আমীর জঙ্গ’ লেখেন।৬ ড.মুহম্মদ এনামুল হক ও ড. আহমদ শরীফ, শাহেদ আলীও এই গ্রন্থের নাম দিয়েছেন, ‘আমীর জঙ্গনামা’। বিভিন্ন মতামত যাচাই করে ‘আমীর জঙ্গনামা’ বলে গবেষকগণ মনে করেন। এতে ইমাম হাসান-হোসনের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা আমির মোহাম্মদ হানিফার বিজয় কাহিনি বর্ণনা করেন। মদিনা ও দামেস্কে যুদ্ধে আমির মোহাম্মদ হানিফা জয়ী হন এবং এজিদকে বধ করে ইমাম হাসান হোসেনের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম হন। এই পুঁথিকাব্যের প্রথম ভাগে মদিনার ও দ্বিতীয় ভাগে দামেস্কের যুদ্ধ কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কাব্যটির ভণিতায় উল্লেখ আছে-
১.
শেখ মনসুর কহে অর অবধান
আমীর জঙ্গের কথা অমৃত সমান।
২.
কহে সেখ মনসুরেত পাঞ্চালী পয়ার
শুনি গুণিগণ মন হরিষ অপার।
কাব্যের দ্বিতীয় ভাগের আরম্ভ বলা হয়েছে-
প্রথমে প্রণাম করি এক করতার।
দ্বিতীয় প্রমাণ করি রছুল আল্লাহর ॥
তৃতীয়ে প্রণাম করি আছবাব (আসহাব) গণ
চতুর্থে প্রণাম করি ফাতেমার চরণ॥
হাছন হোসেন দুই হৈল স্বর্গ গতি।
মহম্মদ হানিফার জঙ্গের আরতি
মদিনা সহরে যুদ্ধ হইল সুমার
দিমিস্কের যুদ্ধে যায় আলীর কুমার॥৭
কাব্যটির মধ্যে অবান্তর কিছু কথা এবং অপ্রাসঙ্গিক উক্তি থাকলেও অনেক আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগে কাব্যটির সুষমা ও স্বকীয়তা বৃদ্ধি করেছে। ভাষায় কবি শেখ মনসুরের দখল লক্ষ্যণীয়। এ ছাড়াও মানুষের জীবনের রহস্য কী তিনি বারংবার জানাতে চেয়েছেন। কবির এ কাব্যগ্রন্থের ‘জীবন রহস্য’ কবিতার ভাষ্য:
সংসার বসতি জান নিশির স্বপন।
মায়ার বন্দিবাজি; দেখহ আপন॥
পোতলা লইয়া কেনে ফেরে অবিরত।
হাতের ঠমক যেন নাচে তেন মত ॥
তেমতি মুরতি সব সয়াল জুড়িয়া ।
নিরঞ্জনে মূর্তি সব দিয়াছে ছাড়িয়া ॥
মনুষ্যের আয়ু জান শিশিরের পানি।
যমরাজার কাছে জলজাল ভান্ডখানি॥
শিশিরের জল যে হেন ভাস্করে।
তেমতে আছ-এ যম শরীর অন্তরে॥
দিনে দশবার জান ফিরিশতা এ আর্মি ।
ডাকি বলে দেশে যক পরবাসী॥
সংসার অসার জান বুঝ বধূগণ।
পুন:চলিয়া গেলে আপনে আপন॥
শেখ মনসুর কহে মিথ্যা মায়াজাল
অকারণে মায়াজাল মনে করি মন্দা ॥৮(জীবন রহস্য, আমীর জঙ্গনামা)
কবির এ কাব্যগ্রন্থ পাঠে বুঝা যায় তিনি একজন মৌলিক কবি। তাঁর সবকটি কাব্যই সুফি সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। তাই তাঁেক মধ্যযুগের সুফি সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা বলা যায়। যদি সঠিক তথ্য উপাত্ত পাওয়া যেত তাহলে এই কবির আধুনিক সমাজের কাছে পরিচিত হত। তিনি যে মধ্যযুগের সুফি সাহিত্যে অমূল্য অবদান রেখেগেছেন তা অস্বীকার করার মত নয়।

বোধিনী
১. ড.আহমদ শরীফ, বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, পুর্ণমুদ্রণ- এপ্রিল ২০০০, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, পৃ- ৩৯৬/৩৬৭
২. এখানে উগি বলতে ‘যদি’কে বোখানো হয়েছে বলে আহমদ শরীফ ‘ নোট’-এ উল্লেখ করেছেন। (আহমদ শরীফ, বাঙলার সুফী সাহিত্য, ফেব্র“য়ারি ১৯৬৯, ঢাকা : বাংলা একাডেমি, পৃ: ২৪৫, দ্রষ্টব্য)
৩. আহমদ শরীফ, বাঙলার সুফী সাহিত্য, ফেব্র“য়ারি ১৯৬৯, ঢাকা : বাংলা একাডেমি, পৃ: ২৪৫,
৪. সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঃ মধ্যযুগ, মে ২০০৩, বাতায়ন প্রকাশন, ঢাকা, পৃ- ৩১১
৫. ড.ভুইয়া ইকবাল, নির্বাচিত রচনা ঃ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, মে ১৯৯৪, বাংলা একাডেমী পৃ-৫৬।
৬. শাহেদ আলী, বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের অবদান, ১৯৬৫, পৃ. ৯৯।
৭. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বাংলা সাহিত্যের কথা’ (দ্বিতীয় খণ্ড-মধ্যযুগ), প্রথম মাওলা ব্রাদার্স সংস্করণ অক্টোবর ১৯৯৯, পৃ : ৩৬৫।
৮. ড. আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের কাব্য সংগ্রহ,১৯৬৯ পৃ : ২৩২।

‘বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতায় মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য’ নামে অপ্রকাশিত গবেষণাকর্ম-র অংশ বিশেষ সংক্ষেপিত।

লেখক : কবি-গবেষক
প্রকাশিত বই : ৩টি
সবশেষের বই:কক্সবাজারে বঙ্গবন্ধু

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।