রুহমী-রম্যভূমি-রামু: একটি ঐতিহাসিক বির্তক

আলম তৌহিদ

দ্বিতীয় শতাব্দীর দিকে প্রখ্যাত গ্রীক ভূগোলবিদ টলেমির ভূগোলে বড়কৌরা বাণিজ্য কেন্দ্র নামে একটি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। Yule-এর মানচিত্রে ঐ স্থানটি রামাই বা রামু বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুতরাং বুঝা যায় অতি প্রাচীনকাল থেকেই রামুর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ছিল। টলেমী গাঙ্গেয় প্রবাহের মুখে অবস্থিত কয়েকটি শহর ও স্থানেরও উল্লেখ করেছেন। আধুনিক গবেষকগণ তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। তবে তাদের মধ্যে মতবিরোধও রয়েছে।
টলেমির বিবরন থেকে Pentecostalism, katabeda, Barakoura, Tokosanna প্রভৃতি নাম পাওয়া যায়। তাঁর Pentapolis সম্পর্কে ল্যাসেন লিখেন-
Pentapolis (1500-180): Of the city, Lassen remarks: Between the name of the city Pentapolis, i e, the five cities, and the name of the most northern part of Kirradia, i e, Chaturgrama, i e, four cities there is a connection that scarcely be mistaken*.
Mouth of the river katabeda (1510 210- 170): Mc Crindle identified this rever with the Karnaphuli.
Barakoura a mart (1520 300-160): this mart is placed in Yule`s map at Ramai, called otherwise Ramu, a town lying 68 miles s s e of Chittagong.
Mouth of the Tokosanna (1530-1400 300): This river is identified with the Arakan river by Wilfard and Lassen. Yule prefers the Nuf.1

উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী টলেমির পেন্টাপোলিসে পাঁচটি শহর ছিল। সবচেয়ে উত্তর অংশ কিরাদিয়াকে ল্যাসেন চট্টগ্রাম বলে উল্লেখ করেন। অন্যান্য চারটি শহর চট্টগ্রামের সাথে সংযুক্ত ছিল এবং এগুলোর মধ্যে একটিকে তিনি mistaken বা মিরসরাই বলে চিহ্নিত করেন। ম্যাক ক্রাইন্ডল কাটাবেদা নদীকে কর্ণফুলী বলে শনাক্ত করেন। অপরদিকে Yule- এর মানচিত্রে বড়কৌরা বা বারাকৌরা বাণিজ্য কেন্দ্রকে রামাই তে দেখানো হয়েছে, যাকে রামু বলে ডাকা হতো। শহরটি চট্টগ্রাম থেকে ৬৮ মাইল দূরে অবস্থিত। আবার Wilfard and Lassen বলেন- ‘Tokosanna হল আরাকান নদী। কিন্তু Yule -এর মতে, সেটি নাফ নদী।

মধ্যযুগীয় চট্টগ্রামের রুহমী ও রামুর সাথে আরব লেখকদের মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন স্যার এ.পি ফায়ার। তাঁর ধারণা রামু ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের শক্তিশালী রাজ্য, যার নাম নিয়ে আরব লেখকরা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। তারা এটিকে বলেছিলেন রাহমা, রাহমি বা রুহমী। অষ্টম শতাব্দিতে চট্টগ্রামের সাথে আরবদের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। বহুকাল ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকে আসা মশলা, তুলা, কাপড়, মূল্যবান পাথর খনিজদ্রব্য এবং অন্যান্য সামগ্রীর প্রচুর চাহিদা ছিল প্রাচ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে। সমুদ্র যাত্রায় অভিজ্ঞ হিসেবে আরবরা এই ব্যবসাকে একচেটিয়া করে নিয়েছিল দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে, একদিকে প্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো পর্যন্ত।

কেউই জানে না যে চট্টগ্রাম তথা উপমহাদেশের সবচেয়ে পূর্বতম অংশটি কখন প্রথম আরব বণিক ও ভ্রমণকারীদের সংস্পর্শে এসেছিল। কিন্তু মুদ্রা, লিখিত দলিল-দস্তাবেজ, শব্দাবলী, স্থানের নাম, নৃতাত্ত্বিকতা, ভ্রমণ বিবরণ ইত্যাদি সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, চট্টগ্রামের সাথে আরব বন্দরের যোগাযোগ সূচিত হয়েছিল অষ্টম শতাব্দীর গোড়ার দিকে এবং এটি অব্যাহত ছিল ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম প্রান্তিকে ইউরোপীয়দের আগমন পর্যন্ত।

আরব লেখকদের মধ্যে সোলাইমানের নাম প্রাতস্মরণীয়। তিনিই সর্বপ্রথম অনুমানিক, ৮৫১ খৃষ্টাব্দে রচিত ‘সিলসিলাত উত তওয়ারীখ নামক গ্রন্থে এশিয়ার বিভিন্ন উপকূলবর্তী বন্দর সমূহ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ে বর্ণনা করেন। তাঁর গ্রন্থ থেকে জানা যায় তৎকালে ভারতে তিনটি প্রধান রাজ্য ছিল। এদের মধ্যে দুটি রাষ্ট্রকূট ও গুর্জ্জর প্রতীহার। তৃতীয়টি রুহ্মি অথবা রহ্ম। প্রতিবেশী উক্ত দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে রহ্ম দেশের রাজা যুদ্ধে লিপ্ত থাকতেন। যুদ্ধ যাত্রাকালে রাজার সঙ্গে ৫০০০০ রণহস্তী ও দশ থেকে পনেরো হাজার বস্ত্র ধৌতকারী অনুচর থাকত।২ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার সোলাইমানের বর্ণিত রহ্ম দেশকে দেবপাল (৮২১-৮৬১ খৃ:) এর রাজ্য বলে মনে করেন।

প্রাচীন ইতিহাসে লামা তারানাথ চট্টগ্রামকে বঙ্গের অংশ ও কোকিল্যান্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেন, পালদের সময়ে চট্টগ্রাম রম্ম বা রম্যভূমি* নামে পরিচিত হতো।চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশে ছিল রাখান বা আরাকান রাজ্য। লামা তারানাথের বক্তব্য থেকে এ কথা প্রতিয়মাণ হয় যে পাল রাজত্বের কোন না কোন সময় চট্টগ্রামের নাম ছিল রম্যভূমি এবং দক্ষিণ চট্টগ্রাম বলতে শঙ্খ নদীর দক্ষিণ তীর থেকে রামু অবধি ছিল আরাকান রাজ্য। আরব লেখক সোলাইমানের রম্ম ও তিব্বতী লেখক তারানাথের রম্য পাল রাজ্য ছিল এবং তা রামুর সাথে সংপৃক্ত নয়, এ বিষয়ে ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ও তারানাথের মধ্যে মতৈক্য দেখা যায়। আবার অনেক দেশি-বিদেশি ঐতিহাসিক সোলাইমানের রহ্ম ও তারানাথের রম্যভূমিকে রামুর সাথে অভিন্ন মনে করেন।

কিন্তু ড. আবদুল করিম ‘রম্যভূমি’ যে পাল রাজ্য কিংবা রামু এর কোনোটিই মানতে নারাজ। রামু সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত বিধায় অনেক ঐতিহাসিক পালদের সমুদ্রকূলের সাথে রামুর একটা যুক্তিসংগত (?) ব্যাখ্যা খুঁজে পেয়েছেন। নামের ধ্বনিগত বিচার করলে রুহমী, রামু এবং রম্ম শব্দ ত্রয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে বৈকি। কিন্তু মনে হয় আধুনিক পণ্ডিতেরা ঐতিহাসিক তথ্যের বদলে নামের সামঞ্জস্যের প্রতি বেশী জোর দিয়েছেন। এমন কোন শক্তিশালী রাজা যিনি একই সঙ্গে জুর্জ ও বলহারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, যার অধীনে পঞ্চাশ হাজার হাতী ছিল এবং যার সৈন্য বাহিনীতে দশ হাজার লোক শুধু ধোলাই কাজে নিযুক্ত ছিল-আদৌ রামু রাজ্যের অধিপতি ছিলেন কিনা তার কোন প্রমাণ নাই।৩ ‘সিলসিলাত উত তওয়ারীখ’-এ বর্ণিত সার্বিক তথ্য বিবেচনায় ড. আবদুল করিম মনে করেন এই রাহমী বাংলাদেশ।

তারানাথ বাংলার ইতিহাস লিখেছিলেন তিব্বতে বসেই। তার গ্রন্থ থেকে জানা যায় তিনি কখনো চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেন নি। বই-পুস্তক পড়ে ও লোকমুখে শুনে তিনি চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। সোলাইমানের বর্ণিত ‘রহ্ম ও তারানাথের ‘রম্যভূমির মধ্যে একটা ঐক্য দেখা যায়। উভয়ের বক্তব্য পাল রাজত্বের সময়কে নির্দেশ করে। তাই তারানাথের রম্যভূমি চট্টগ্রাম নয়, রামুই হওয়া উচিৎ। তার রম্যভূমি নাম বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত নয় বলে একটা ঐতিহাসিক বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে।

আবার হোদালিয়া রুহমীকে ‘ধরহমীতে রূপান্তরিত করে রাহমী সমস্যার একটা সমাধান টানার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে,ধর্মপাল (মালিক-উদ-ধরহমী) সোলাইমানের সিলসিলাত-উত-তওয়ারীখে রুহমী রাজ্যে (মালিক উর-রুহমী) পরিণত হয়েছে, অর্থাৎ ‘দাল এর স্থলে ‘রে হওয়ায় এই পাঠ বিভ্রান্তি হয়েছে। আবার আল-ইদ্রিসীর সাক্ষ্য মত এও হতে পারে যে এই শব্দটি ‘রুহমী বা ‘ধরহমী রাজ্য ও রাজা উভয়ের নাম বুঝায়। পাল রাজাদের আমরা পাল বা পাল বংশের লোক বলে অভিহিত করি, কারণ সকল রাজার শেষে পাল শব্দটি যুক্ত আছে। কিন্তু সমসাময়িককালে তাদের কি নামে ডাকা হত বা তাদের রাজ্যের নামই বা কি ছিল তা জানা যায় না। তাদের অনেক তাম্রলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু এগুলিতে “পালরাজ্য বা “পালবংশ উল্লেখ নাই। বাংলা বা বাঙ্গালা নাম অর্থাৎ যে নামে বিভাগ পূর্বকালের বাংলা প্রদেশ বা মোগল আমলের সুবা বাঙ্গালা পরিচিত ছিল, তা প্রচলিত হয় পাল রাজত্বের অনেক পরে, মুসলমান আমলে। বাংলাদেশ তখন রাজধানী গৌড়ের নামে গৌড় রাজ্য নামে পরিচিত ছিল এবং তাম্রলিপিতে রাজাদের গৌড়েশ্বর বলা হত। সুতরাং সমসাময়িক আরব ভৌগোলিকদের বিবরণে রাজার নাম বা গৌড়ের নাম পাওয়া স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে হোদালিয়ার মত অনুসারে মালিক-উদ-ধরহমী বা ধর্মপালের রাজ্য লিখিত হয়েছে মনে করাই যুক্তি সংগত।৪

উপরোক্ত ব্যাখ্যাটিকে ইতিহাসের কাল বিচারে খাপ খাওয়ানো যায় না। কারণ হোদালিয়ার বর্ণিত ‘মালিক-উদ-ধরহমী অর্থ যদি ধর্মপাল ও ধর্মপালের রাজ্য (?) দুই বুঝানো হয়, তবে সোলাইমানের ‘সিলসিলাত-উত-তাওয়ারীখ গ্রন্থ রচনাকাল (৮৫১ খৃ:) বিচারে এর সমর্থন মিলে না। তখন রাজা ছিলেন ধর্মপালের পুত্র দেবপাল (৮২১-৮৬১ খৃ:)। এক্ষেত্রে ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদারের বক্তব্যকে সঠিক বলে মনে হয়। ড. হোদালিয়া পাঠ বিভ্রান্তির কথা বলে ‘রুহমী’শব্দের ‘রে’হরফ এর স্থলে ‘দাল’হরফ বসিয়ে ‘ধরহমী’করে ধর্মপালের সাথে একটা যোগসূত্র তৈরি করে রুহমী সমস্যার সমাধান টানা চেষ্টা করেছেন। তার এই প্রকৌশলিক প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় সমস্যার সমাধান তো হয়নি, বরং আরো একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। ‘রুহমী’শব্দে ‘রে’হরফকে ‘দাল’হরফে পরিবর্তন করলে শব্দটি হয় ‘ধুহমী’বা ‘ধহমী, কখনই ‘ধরহমী’হয় না। ‘রুহমী’শব্দকে ‘ধরহমী’শব্দে রূপান্তর করতে হলে ‘রুহমী’শব্দের ‘রে’হরফ পরিবর্তন করা যাবে না; বরং ‘রে’হরফের পূর্বে ‘দাল’হরফ বসাতে হবে। তাহলে এই পরিবর্তীত শব্দটি হবে ‘ধরহমী। কিন্তু এক্ষেত্রে পাঠ বিভ্রান্তি বা মুদ্রণ প্রমাদের অজুহাত তো আর খাটে না। তাহলে ‘সিলসিলাত-উত-তাওয়ারীখ গ্রন্থের ‘রুহমী’শব্দটিকে ‘ধরহমী’শব্দে রূপান্তর করলেন কোন যুক্তিতে? অথচ বড় বড় পণ্ডিত-লেখকরা হোদালিয়ার ‘পাঠ বিভ্রান্তি’ধারণাটিকে গ্রহণযোগ্য বলে মত দিয়েছেন।

যাহোক, সোলাইমানের ‘রুহমী’ধর্মপাল বা ধর্মপালের রাজ্য না হলেও, সময় বিচারে তা পালবংশের রাজত্বকালকেই নির্দ্দেশ করে। আর পাল সাম্রাজ্য রামু পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। বাস্তবতার নিরিখে বলা যায় যে, অত্র অঞ্চলে (প্রাচীন বৃহত্তর রামু) বর্তমানেও অধিক সংখ্যক পাল সম্প্রদায়ের (Cast) বসতি (পাল পাড়া) বিদ্যমান। রামুকে কেন্দ্র করে পাল রাজত্ব গড়ে না উঠলে কিংবা রামু পাল শাসনাধীন রাজ্য না হলে এখানে অধিক সংখ্যক পাল সম্প্রদায়ের লোকদের আগমনের হেতু কি? সুতরাং অনেক ঐতিহাসিকদের মতে রামু অবধি পাল সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল একথা দ্বিতীয়বার ভাবতে আমাদের বাধ্য করে। আবার ড. আবদুল করিমের বক্তব্যও ফেলনা নয়। তাঁর মতে সোলাইমানের রুহমী রাজ্য যে বাংলাদেশ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশ পাল সাম্রাজ্যের বাইরে ছিল একথা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।

কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। কেননা আমরা ভারত সম্পর্কে বিদেশী লেখকদের রচনাতে অতিকথন ও অতিরঞ্জিত বর্ণনা পেয়ে থাকি, যেগুলো ভারতের ইতিহাস ও বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই সোলাইমানের বর্ণিত ৫০ হাজার রণহস্তী কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করি। আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি প্রাচীন ভারতে কয়েকটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল। তাদের সামরিক শক্তি সম্পর্কেও আমরা অবগত। প্রাচীনকালে কলিঙ্গ খুব শক্তিশালী রাজ্য ছিল। মেগাস্থেনীসের ভারত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, কলিঙ্গ রাজার রণহস্তী ছিল ৭০০। মোদকলিঙ্গ (গঙ্গার দ্বীপাঞ্চল) রাজার হস্তীর সংখ্যা ৪০০ এবং অন্ধ্ররাজের হস্তীবাহিনী ছিল এক হাজার। গঙ্গার তীরবর্তী সমস্ত ভূভাগ তৎকালে পাটালিপুত্র নামে পরিচিত ছিল। এই রাজার ৯ হাজার হস্তী ছিল। হোরাত (সৌরাষ্ট্র) রাজার রণহস্তী ছিল ১৬০০টি।৫
খৃষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডার দি গ্রেট পাঞ্জাব জয় করে বিপাশা নদীর তীরে শিবির স্থাপন করলেন। তাঁর শিবিরে খবর এলো পূর্বদিকে গঙ্গারিডি নামে এক দেশ আছে,যার বিশাল হস্তীবাহিনীর কারণে কোনো রাজাই সেই দেশ জয় করতে পারেনি। এই রাজার ছিল ৪০০০ হস্তীবাহিনী।৬

সুতরাং সোলাইমানের কথিত ৫০ হাজার রণহস্তী ও ১৫ হাজার কাপড় ধৌতকারীর ঐতিহাসিক ভিত্ খুঁজে পাওয়া যায়না এবং খুঁজে পাওয়া সম্ভবও নয়। সম্ভবত তিনিও লোকমুখে শুনে এই বর্ণনা দিয়েছেন বলে মনে হয়। আরব লেখকদের মধ্যে রাহমী রাজ্য নিয়ে যে একটা বিভ্রান্তি ছিল তা এ.পি. ফায়ার বুঝতে পেরেছিলেন।

দশম শতাব্দীতে আরব ভৌগোলিক ইবন খুর্দাদবার বর্ণনায় সামন্দর নামের উল্লেখ আছে। তিনি এ অঞ্চলকে ‘রুহম’বা ‘রুহমী’রাজার শাসনভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। আরাকানী শাসনকালেও বেশিরভাগ সময় চট্টগ্রাম প্রদেশ দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে শাসিত হতে দেখা যায়।এর উত্তরাংশ চট্টগ্রাম ও দক্ষিণাংশ রামু নামেই পরিচিত ছিল। ইবন খুর্দদবা প্রমুখ এবং অন্যান্য ভৌগোলিকরা সমুদ্র উপকূলবর্তী বাণিজ্য কেন্দ্রসমূহের তালিকা ও বিবরণ দিয়েছেন।এদের বর্ণিত যে সব বাণিজ্য কেন্দ্র বাংলাদেশে অবস্থিত বা বাংলাদেশের আশে পাশে অবস্থিত বলে মনে করার যুক্তিসহ কারণ আছে।৭
ইবন খুর্দদবার বর্ণিত রহমি বা রহম দেশকে Elliot বঙ্গদেশের সাথে অভিন্ন মনে করেন। কিন্তু ড.নীহার রঞ্জন রায় তাঁর এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, রহমি বা রহম প্রাচীন আরাকান। তিনি ব্যখ্যা দেন, রহম্ (রহম্ > রহন > রখন্ > আরাকান)৮ থেকেই আরাকান নামের উৎপত্তি। কিন্তু আমাদের বিচেনায় নীহার রঞ্জন রায়ের বক্তব্য যথাযত নয় বলে মনে হয়। কেননা রহম্ শব্দের ধ্বনিগত ক্রম বিবর্তন থেকে আরাকান হতে পারে না, বড়জোর তা হতে পারে রাখান বা রাখাইন।

খুর্দদবা আরো লিখেন, রহমি রাজ্যে ৫ হাজার হাতি আছে এবং কার্পাসবস্ত্র উৎপন্ন হয়। রামুর প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রচীনকালে এই অঞ্চলে প্রচুর হাতি ছিল এবং খেদার মাধ্যমে হাতি ধরা হত। দূরযাত্রার অন্যতম বাহন ছিল হাতি। বর্তমানেও বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রামুতে হাতির আধিক্য চোখে পড়ে। প্রাচীনকালে রামুতে কার্পাস বা তুলার চাষও হত। রামু পানের ছড়া এলাকায় তুলা বাগান নামে একটা জায়গা আছে। আজো সেখানে তুলার চাষ হয়। সুতরাং খুর্দদবার বর্ণিত রহমি ও বর্তমান রামু অভিন্ন মনে হয়।
অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে ধর্মপাল দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় দাপটের সাথে রাজত্ব করতেন। অনেক ইতিহাসবিদ ধারণা করেন আরবদের বর্ণিত রাহমী সম্ভবত তাঁর অধীনস্ত রাজ্য ছিল। ঐতিহাসিক হোদালিয়া মনে করেন, রাহমি রাজ্য বাংলার পাল বংশের রাজা ধর্মপালের রাজ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আধুনিক লেখকরা হোদালিয়ার মতকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু এ ব্যপারে আমাদের ব্যাখ্যা পূর্বে উপস্থাপন করেছি। অনেকে বলেন রাহমি তখন স্বাধীন রাজ্য ছিল। কিন্তু এর সপক্ষে কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা পাওয়া যায় না। আমাদের ধারণা যেহেতু জাহাজ ডুবি থেকে উদ্ধার প্রাপ্ত আরব বণিকদের স্থানীয় লোকেরা আরাকান রাজদরবারে নিয়ে গিয়েছিল, তাই রাহমী আরাকান অধীনস্ত রাজ্য ছিল, এবং এটিই ঐতিহাসিক সত্য। কেননা জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেছিল অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে।

আরাকানের ইতিহাস থেকে জানা যায় অষ্টম শতকে মুসলমানদের সাথে আরাকানের যোগাযোগ ছিল।আরাকান রাজা মহা ত্যাঙ স্যাঙ দায়া (৭৮৮-৮১০ খ্রী:) এর সময়ে ‘রনবী’নামক দ্বীপে বেশ কয়েকবার কু-ল বা জাহাজ বিধ্বস্থ হয়েছিল। স্থানীয় লোকেরা কিছু মুসলমানদের উদ্ধার করে আরাকানে পাঠিয়েছিল বসবাস করার জন্য। আরব জাহাজগুলো প্রায় এই অঞ্চলে দুর্ঘটনার শিকার হতো এবং তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিত। তাদের মধ্যে অনেকেই এই অঞ্চলে স্থায়ী বসবাস শুরু করেছিল এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। এই অঞ্চলের ‘ডিঙ্গা ভাঙ্গার বিল, ‘ডিঙ্গা ভাঙ্গার চর’ প্রভৃতি স্থানের নাম আরবদের জাহাজ দুর্ঘটনার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এই ‘রনবী’ দ্বীপকে ইতিহাসবিদগণ রামু বলে শনাক্ত করেন। আহমদ শরীফও রনবী দ্বীপকে রামু বলে সিদ্ধান্ত দেন।৯

খ্যাতিমান সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও গবেষক আবদুর রশিদ সিদ্দিকী মনে করেন,“৭৮৮-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মহত ইঙ্গ চন্দ্র নামে এক রাজা রোসাং সিংহাসনে রাজত্ব করিয়াছিলেন। এই সময় একদল আরব বণিক পালের জাহাজে আসিয়া ‘রামরী দ্বীপে’উপস্থিত হইলে ঘটনাক্রমে জাহাজ ভাঙ্গিয়া বণিক দল বিপন্ন হইয়া তীরে অবতরণ করেন। রাজার আদেশে তাহারা এতদঅঞ্চলে বাস করিতে অধিকার পান। উপরোক্ত ‘রামরী দ্বীপ’ চকরিয়ার সুন্দরবনের ‘রিমরং দ্বীপ’বলিয়া অনুমান করা যায়। কেননা কালক্রমে সমরকন্দের অধিবাসী নামের পরিচিত এক মুসলমান পরিবারই এ যাবতকাল রাজকীয় দান স্বরূপ এই বৃহৎ রিমরং দ্বীপ ভোগ দখল করিয়া আসিতেছেন। এই ইতিহাসোক্ত রামরীই যে বর্তমান রামুর প্রাচীন নাম ছিল এইরূপ অনুমান করিতে পারা যায়।১০

যদিও রামুর রামকোট এলাকায় ‘জাহাজ ভাঙ্গা’নামে একটা জায়গা আছে এবং স্থানীয় অধিবাসীরা সেখানে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখেছিলেন বলে দাবী করে থাকেন। কিন্তু সেই জাহাজ যে আরব বণিকদের দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজ তার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এই ব্যাপারে কোনো গবেষণা হয়েছিল কিনা জানা যায় না। আর ‘রনবী’বা ‘রামরী’দ্বীপকে চকরিয়ার সুন্দরবনের রিমরং দ্বীপ মনে করার কোনো ঐতিহাসিক সমর্থন পাওয়া যায় না। যেহতেু উক্ত দ্বীপের ভোগদখলকারীগণ বংশ পরম্পরায় সমরকন্দের অধিবাসী, সুতরাং তাদের পূর্বপুরুষগণ সমরকন্দেরই ছিলেন, আরব ছিলেন না। আরাকান রাজা মহত ইঙ্গ চন্দ্রের শাসনকালে আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গে ছিল না,তখন রাজধানী ছিল বৈশালীতে। রোসাঙ্গের আরো পূর্বে ছিল বৈশালীর অবস্থান।চকরিয়ার রিমরং দ্বীপের কাছে জাহাজ ডুবি হলে এবং উদ্ধারপ্রাপ্ত আরব বণিকদের সুদূর বৈশালীতে নিয়ে যাওয়া, তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থার আলোকে কতটুকু বাস্তবসম্মত তা ভাববার বিষয়। আমরা জানি তৎকালীন রামুর আরাকানী প্রশাসক পমাজার বেশ কিছু স্বাধীন ক্ষমতা ছিল। তৎমধ্যে বিদেশীদের রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি প্রদান অন্যতম। এই অঞ্চলে যেহেতু আরব বণিক বংশোদ্ভুত কোনো গোত্রের সন্ধান পাওয়া যায় নাই, তাই মনে হয় এই অঞ্চলে জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেনি।

আরাকানের আকিয়াব শহরের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় থাম্ভইক্যা (Thambukya) নামে একটি মুসলিম গোত্র বাস করে। এরা রোহিঙ্গা নয়, বরং রেহিঙ্গারা তাদের বলে থাম্ভইক্যা মগ। থাম্ভইক্যা শব্দের অর্থ হলো ‘জাহাজ ডুবি থেকে উদ্ধারপ্রাপ্ত মুসলমান’। এই গোত্রের সংখ্যা মাত্র কয়েক শত। তারা বর্মী ভাষায় কথা বলে। যদিও দীর্ঘকাল রোহিঙ্গা সংস্পর্শে এসে রোহিঙ্গা ভাষা রপ্ত করেছে, তবে উচ্চারণে আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। সমুদ্রে মাছ ধরা তাদের মূল পেশা। এই থাম্ভইক্যা গোত্রই হলো জাহাজ ডুবি থেকে উদ্ধারপ্রাপ্ত আরব বণিকদের বংশধর।
১৯৭৬ খৃষ্টাব্দে আরাকান মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ও সম্পাদক যথাক্রমে জহিরউদ্দিন ও নজির আহমদ আরাকানে বসতি স্থাপনকারী আরব নাবিকদের বংশধর সম্পর্কে লিখেন- a few hundreds of Muslims along the sea-shore near Akyab, known as THAMBUKYA Muslims meaning ship wrecked Muslims. They were Magh dress and speak Maghi language. ১১
টেকনাফের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় কিছু মুসলিম জেলে পরিবার বাস করে। স্থানীয় লোকদের কাছে তারা থাম্ভইগ্যা নামে পরিচিত। পূর্বে তারা বর্মী ভাষায় কথা বলতো। বর্তমানে তারা চট্টগ্রামের উপভাষায় কথা বলে। ধারণা করা হয় তারা অনেক পূর্বেই বার্মা (মায়ানমার) থেকে টেকনাফে আগমন করেছে।

পার্চাস-এর বিবরণ থেকেও চট্টগ্রামের অঞ্চল হিসেবে রামু নামটি পাওয়া যায়। রাহমি নাম আরব বণিকদের দেয়া তাতে কারো দ্বিমত নেই। রাহমি যে দক্ষিণ চট্টগ্রমের অংশ ড. আর. সি. মজুমদার এ.পি ফায়ার-এর মতকে সমর্থন করেন।
‘’Sir A P Phayer`s view is supported by Dr. R C Majumder who wants to establish an identity of these two names. Dr. Rahim also records with their opinions. “The name Rahmi” recording to him, traces its origin from Ramu, a place in Cox’s Bazar in the southern part of the Chittagong District .”১২
সুনীতি ভূষণ কানুনগো বলেন, রামুকে একটি রাজ্য হিসেবে সনাক্তকরণের সমস্যা এই যে, পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বে রামুকে কখনই আধিপত্য বিস্তারকারী রাজ্য হিসেবে দেখা যায়নি। এটি প্রায় সময় আরাকান শাসিত ছিল। বাস্তবতা হলো রামুকে কখনই স্বাধীন রাজ্য হিসেবে ইতিহাসে আবির্ভূত হতে দেখা যায়নি। যদি একথা মনে করা হয় যে রাজ্যটি নবম-দশম শতাব্দীতে বিদ্যমান ছিল, তবে আত্মবিশ্বাসের সাথে একথা বলা যায় যে এটি উপমহাদেশীয় শক্তি হতে পারে এরকম কোনো রাজ্য ছিল না। উপমহাদেশের সর্বশেষ কোণে হতে পারে এটি একটি ছোট রাজ্য, তবে উত্তর ভারতীয় অন্যান্য শক্তিধর রাজ্যের মতো এর সামরিক শক্তি ছিল না।

প্রকৃতপক্ষে, আরব লেখকদের রাহমি রাজ্যেরে বর্ণনা থেকে রামুর আধিপত্য সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তাছাড়া রম্ম বা রম্যভূমি নাম নিয়েও অনেক বিভ্রান্তি আছে। শরৎচন্দ্র দাসের বক্তব্যেও রম্যভূমি চট্টগ্রামকেই নির্দেশ করে ‘Rai Bahadur Sarat Chandra Das observed long ago that the country to the south of Tripura and north of Rakham (Arakan) was called Ramma (Sanskrit Ramya).” ১৩

শরৎচন্দ্র দাসের এই বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে দক্ষিণ ত্রিপুরা ও উত্তর আরাকানের অংশ নিয়ে যে রাজ্যের অবস্থান তার নাম রম্ম বা রম্য। কিন্তু ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর এই বক্তব্যের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাননি। সুতরাং এই বক্তব্য তাঁর একান্ত নিজস্ব বলেই মান্য। তবে ১৫৮৩ থেকে ১৫৯১ খৃষ্টাব্দে ভারত সফরকারী রাল্ফ ফিচ তাঁর রচনায় চট্টগ্রাম ও আরাকানের মধ্যবর্তী রামি রাজ্যের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম, রামি ও আরাকান একই রাজার শাসনাধীনে ছিল। ম্যানরিকের বর্ণনা থেকে জানা যায় তিনি দেয়াঙ থেকে আরাকান যাওয়ার পথে ৫ জুলাই ১৬৩০ খৃষ্টাব্দে রামু এসেছিলেন। হোসটেনের বর্ণনা থেকে আরো কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন রামু সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত এবং দেয়াঙ থেকে রামু পর্যন্ত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ছিল। দক্ষিণ চট্টগ্রামের শাসনকেন্দ্র ছিল রামু। ম্যানরিক ও রালফ ফিচ রামুকে শাসনকেন্দ্র দেখেছেন।১৪ পরবর্তীতে বিদেশী লেখকদের লেখার মধ্যে একটা যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন রমেশচন্দ্র মজুমদার।

তবে এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে সোলাইমানের বর্ণিত রুহমী রাজ্য, আর আরব বণিকদের জাহাজ ডুবির রাহমী রাজ্য এক নয়। কোনো এক ঐতিহাসিক ভুলের কারণে সমিল নাম হয়েছে। এই আলোচনা থেকে আমরা কয়েকটি সিদ্ধান্তে আসতে পারি। যেমন-
(ক) প্রচীনকাল থেকেই রামু নামটি বিদ্যমান ছিল। রাখাইনদের মুখে উচ্চারিত হতো প্যাঁওয়া নামটি, স্থানীয় লোকেরা বলতো রোঁঅ, আরব লেখকদের কলমে রাহমী বা রুহমী, ইউরোপীয় লেখকদের কাছে রামী বা রামাই, হিন্দু-বৌদ্ধ লেখকদের কলমে রম্ম বা রম্যভূমি। প্যাঁওয়া নামটি ছাড়া বাকি সব নাম রামু নামের বিকৃত রূপ ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ বিদেশী লেখকরা বাংলাদেশের অধিকাংশ নাম সঠিকভাবে লিখতে ও উচ্চারণ করতে পারে না।
(খ) রামুকে যদি পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত রাজ্য ধরা হয়, তবে আরব বণিকদের জাহাজ ডুবির সাথে সংশ্লিষ্ট রনবী দ্বীপ রামু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তখন ঐ দ্বীপকে আরাকানের রামরী দ্বীপ মনে হয়। তবে কতবার জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেছে সেই তথ্য পাওয়া যায় না।
(গ) রামুর রামকোট এলাকায় জাহাজ ভাঙ্গা নামে একটা জায়গা আছে। এতে ধারণা করা যায় প্রচীনকালে ঐ অঞ্চলে বাঁকখালী নদী বড়সড় আকারে প্রবাহমান ছিল। তখন কোনো না কোনো সময় জাহাজ ডুবি বা ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তনে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে হয়ত সেই ইতিহাস কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্য চালালে হয়ত অনেক সত্য উদ্ঘাটিত হতে পারে।
(ঘ) সোলাইমানের বর্ণনার মধ্যে সবকিছু অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা এরকম ভাবার কোনো কারণ নেই। তার বর্ণনার মধ্যে কিছু সত্য আছে ধরে নিলেও, তার রুহমী রাজ্য কিছুতেই রামু হতে পারে না। কারণ ইতিহাস বলে রামু ও চট্টগ্রাম কখনই স্বাধীন রাজ্য ছিল না।
(ঙ) ইবন খুর্দদবার বর্ণিত ‘রহমি’রামু বলে মনে হয়।

সূত্র
১ (ক) A History of Chittagong(Vol-1) – Suniti Bhushan Qanungo. P—49 &
(খ) (L) Mc Crindle, P- 193 -195
*mistaken- means modern Mirsari.
Barakoura : Nevertheless it has phonetic similarity with Barabkunda near Sitakunda.
Katabeda : The river Karnafuly.
Tokosanna: lt may be mentioned that the Portuguese historian De Barros marked in his map a place named Taucosam in the interior of the district.
২ বাংলা দেশের ইতিহাস(প্রচীন যুগ)-ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, পৃ:- ৪৫
ক*Taranath mentions Chittagong as parts of Bangala and Kokiland during the very early time of its history. He further states that about the time of the Palas, Chatigrama was known as Ramma or Ramyabhumi. “To the south of Chatigrama” according to Taranath, “was the kingdom of Rakhan or Arakan.” (A History of Chittagong- Dr Suniti Bhusan Qanungo, P- 10)
৩ রামুর ইতিহাস-আবুল কাসেম, পৃ: ২৫
৪ (ক) প্রফেসর আবদুল করিম-কক্সবাজারের ইতিহাস, পৃ: ১৬-১৭ ও
(খ) রামুর ইতিহাস-আবুল কাসেম, পৃ: ২৬
*It is well-known that in the account of India written by the Arab merchent Sulaiman about 851 A.D. reference is made to three important and rival powers viz.,the Juzr, the Balharas, and Rahma.(The Indian Historical Quarterly, 1940, vol- XVI, No-2, P- 232-233)
৫ (ক) মেগাস্থেনীসের ভারতবিবরণ-রজনীকান্ত গুহ, পৃ: ১৯০-১৯৫
(খ) Plin. Hist. Nat. VI. 21. 8-23. 11.
৬ Gangaridai, Wikipedia
৭ (ক) চট্টগ্রামে ইসলাম-ড. আব্দুল করিম, পৃ- ৩
বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, প্রসিডিং অব দি পাকিস্তান হিষ্টরী কনফারেন্স, ১ম খ-, পৃ: ১৮৪-২০২
(খ) এলিয়ট ও ডউসন, প্রাগুক্ত, পৃ:- ১৬-৯০
৮ বাঙ্গালির ইতিহাস, আদি পর্ব- নীহাররঞ্জন রায়, পৃ: ১৪৮
৯ আহমদ শরীফ রচনাবলী ১ম খ-, পৃ: ৬৪৬
১০ চট্টগ্রামের সমাজ-সংস্কৃতি-আবদুল হক চৌধুরী, পৃ: ১৭
১১ প্রাচীন আরাকান রোয়াইঙ্গা হিন্দু ও বড়–য়া বৌদ্ধ অধিবাসী-আবদুল হক চৌধুরী, পৃ: ১৬৫
১২ (ক) A History of Chittagong(Vol-1) – Suniti Bhushan Qanungo. p- 76
(খ) Social and Cultural History of Bengal –A Rahim, P-41
13 The Indian Historical Quarterly, 1940, vol- XVI, No-2, P- 232-233
১৪ আহমদ শরীফ রচনাবলী ১ম খ-, পৃ: ৬৪৬

লেখক : কবি-প্রাবন্ধিক ও গল্পকার।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।