সামাজিক দায়বদ্ধতার কবি-সম্পাদক অমিত চৌধুরী

(সত্তর দশকের কবি ও সম্পাদক অমিত চৌধুরীর ৭০ তম জন্মদিন আজ বুধবার। ১৯৫২ সালের ১৪ এপ্রিল কবি অমিত চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ পাশ করা কবি অমিত চৌধুরী সত্তর দশক থেকে লেখালেখি করে আসছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আরাকানে প্রফেসর মোশতাক আহমদসহ অনেকের সাথে আশ্রয় নেওয়া কবি ও সম্পাদক অমিত চৌধুরী সম্পাদনায় ১৯৭৬ সাল থেকে মূল্যায়ন সাহিত্যপত্র প্রকাশ করছেন। এ পর্যন্ত গবেষক আবদুল হক চৌধুরী মূল্যায়ন, আবুল ফজল, শামসুর রাহমান সংখ্যা, যুদ্ধাপরাধী বিরোধী কাব্য সংকলন, শিবনারায়ণ রায় সংখ্যা, নজরুল সংখ্যা, রবীন্দ্র্র সংখ্যা, নজরুল বন্ধু সূফী জুলফিকার হায়দার সংখ্যা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাসহ বিভিন্ন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। অমিত চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিবাদে দুই বাংলার কবিদের নিয়য়ে শেকল ছেড়ে কাব্য সংকলন, দুই বাংলার যুদ্ধবিরোধী কাব্য সংকলন কোথাও বেজেছে পাখোয়াজ। দীঘদিন ধরে কবিতা লিখছেন। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে চোখ চোখে তোমার চোখে (১৯৮৪), জুঁই নয়, পৃথ্বী (১৯৮৮), ঘাতক মহিমাকে ফেরত চাই (২০০৪), ধোঁকাবাজ ধোঁকারাজ (২০১০)। ২০১০ সালে কবির ৬০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক বণাঢ্য অনুষ্ঠান এবং নুরুল আবছার চেয়ারম্যানের সম্পাদনায় কবি অমিত চৌধুরীর কর্মকৃতি মূল্যায়ন’ প্রকাশিত হয়েছে।
দীঘ ৫০ বছর ধরে লেখালেখির সূত্রে উপমহাদেশের অনেক গুণীর সান্নিধ্য পেয়েছেন। এবং দেবীপ্রসাদ বন্ধ্যোপাধ্যায়, প্রতাপ মুখোপাধ্যায়, ড. আহমদ শরীফ, সৈয়দ মোস্তফা সিরাজ, আজাহার উদ্দিন খান, ড. প্রীতি মুখোপাধ্যায়, গীতা রায়সহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও গুণীজন উনাকে চিঠি লিখেছেন। কবির ৭০ তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে রাইজিং কক্স ডটকমের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা হলো- কালাম আজাদ)

অমিত চৌধুরী : সামাজিক দায়বদ্ধতার কবি-সম্পাদক
অরুণ দাশগুপ্ত

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে মূল্যায়ন-এর অবদান সর্বার্থেই স্মরণীয়। লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম কূলধর্ম, অনিয়মিত প্রকাশনা সত্ত্বেও তার চারিত্র্য। ‘মূল্যায়ন’-ওর সেটা রয়েছে। মুল্যায়ন অনিয়মিত হলেও প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৭৬ সাল থেকে। প্রথমে বেরিয়েছিল কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধের সমন্বয়ে সাহিত্যচর্চা বিষয়ক পত্রিকা হিসেবে। এরপর থেকে মূল্যায়ন একটি বিশেষ বিষয় ও স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কীর্তিলব্ধ ব্যক্তিদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে।
১৯৯২’র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আমাদের লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশর ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অব্যবহিত পরে ‘ শেকল ছেড়ে’ নামধেয় একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এটা ছিল উভয় বাংলার সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কবিতা সংকলন। এই সংকলন দুই বাংলায় যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেছিলো। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবি ও কবিতার সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ শুধু এ কালে নয়, বিভিন্ন কালে হয়েছে। তবে এ ধরনের ঐতিহাসিক দলিল চোখে পড়েছে ক্বশ্চিৎ কদাচিৎ। এটা সম্ভব হয়েছে সম্পাদক কবি অমিত চৌধুরীর অক্লান্ত শ্রমে। তার সামনে পেছনে কেউ ছিল না যে একটু সাহায্য করবে। আসলে কবি অমিত চৌধুরী সামাজিক দায়বদ্ধতার কবি বলেই সে বিভিন্ন সময়ে এভাবেই পথ চলছে।
এ ক্ষেত্রে মূল্যায়ন’ এর ‘ কোথাও বেজেছে পাখোয়াজ’ নামের দুই বাংলার যুদ্ধ বিরোধী কবিতা সংকলনটির কথাও উল্লেখ করা যায়। মূল্যায়ন-এর আর যেসব বিশেষ সংখ্যা এ পর্যন্ত বেরিয়েছে এগুলো হলো চট্টলবিদ গবেষক আবদুল হক চৌধুরী, মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল, কবি শামসুর রাহমান, শিবনারায়ণ রায়, নজরুল ও বিদ্রোহী কবি সুহৃদ সুফী জুলফিকার হায়দারের ওপর। এভাবেই সে একের পর এক করে করে যাচ্ছে যেগুলো অনাগত দিনেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে আমার স্থির বিশ^াস। সম্ভবত কবি অমিত চৌধুরীর কবি ও কবিতাকর্মীর বিরললভ্য সমন্বয় বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
সম্পাদনা কর্ম সহজ নয়। তা সত্ত্বেও অমিত চৌধুরীর সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের রয়েছে। স্ত্রী-পুত্র ঘর সংসার সবকিছু বজায় রেখে এত কাজ সে কবে করলো, ভেবে অবাক হই! সে তো সাধারণ মধ্যবিত্ত, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। আসলে জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও মূল্যবান এবং সে মূল্য শ্রমের বিনিময়ে অর্জন করতে হয়Ñ এই চিরন্তন সত্যটি সে জীবনে ধারণ করতে পেরেছে।
স্নেহভাজন অমিতের সত্তর বছরে পদার্পন করছে এ বছরে। এই বিশেষ ক্ষণে আমি তার আরও আনন্দ-উজ্জ্ল পরমায়ু কামনা করি।

কবি-সম্পাদক অমিত চৌধুরী
প্রফেসর মোশতাক আহমেদ

কক্সবাজারের সাহিত্যাঙ্গনে অমিত চৌধুরী এক কিংবদন্তী পুরুষ। সত্তর দশক থেকে কাব্য চর্চা করে আসছে অমিত। যে সময়ে তার কাব্যাঙ্গনে পর্দাপণ সে সময়টা বাংলাদেশের এক ক্রান্তিকাল, বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে বাংলার ভাগ্যাকাশে নেমে আসে দুর্যোগের অমানিশা। গণতন্ত্র বিকাশের পর হয়ে যায় রুদ্র। ভূলণ্ঠিত হতে থাকে মানবাধিকার। অর্থচিত্ত, ক্ষমতার মোহে সমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণী জড়ো হতে থাকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তথাকথিত নেতৃবৃন্দের চারপাশে। আর ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করার জন্যে ও ক্ষমতাধরেরা ধর্মকে ব্যবহার করে শুরু করে দেয় অপরাজনীতি। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের প্রান্তিক মানুষ দিনদিন দরিদ্রসীমার নিচে নেমে যেতে থাকে। আর অমানুষেরা তরতর করে উঠে যেতে থাকে ঐশ্বর্যের চূড়ায়। স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি, সমাজ ও ব্যক্তি মানুষের অধঃপতন ক্ষুদ্ধ করেছে অমিত কে।
আহতচিত্তে দেশপ্রেমের স্বদেশের জন্য উজ্জীবিত চেতনায় মাটির মমতার টানে কাব্য করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে। শঠামি, ধোঁকাবাজী, অপশক্তির অপরাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠে তার কণ্ঠ। যুগজ্বর, যুগচেতনা এভাবেই উঠে এসেছে তার কবিতায়-
১. রাজপথে আজ রাজা আসছে/ তেমন কইরে উৎসুখ?- (রাজা আসছে রাজা কার?/১৯৯৩)
২. না-পাক বাহিনী এসেছিলো একবার সেই/ উনিশ শ’ একাত্তরে……..
যাদের এখনো ‘পাক-বাহিনী বলেই/ জানা হয় পাঠান্তরে! বাঁশখালীর বীভৎসতা/
(ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরৎ চাই/ ২০০৪).
৩. ধোঁকাবাজ আজ ধোঁকা দেবে/ ধোঁকা দেবে কাল ও
ধোঁকাবাজরা রাজনীতিতে/ অজগর হা কালো। (ধোঁকাবাজ ধোঁকারাজ-১ (২০১০)
৪. শেখ মুজিব মানে কী জানি না।/ জানি কেবল তার নামে নড়ে উঠছে বাঙ্গালীর টনক
স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবর জাতির জনক…….. (দৈনিক রূপসী বাংলা/কক্সবাজার, ১৬/০৮/২০১১)

এভাবেই কবিতায় উঠে আসে যুগজ্বর, যুগচেতনা আর সদেশের চিত্রে বঙ্গবন্ধুর বিষয় আশয়।

রাজনীতি ও স্বদেশের পঠপরিবর্তনের খেয়ালে তার কাব্যালোকে সুদূর প্রসারী চেতনা উজ্জ্বল হয়ে উঠে কবিতার বাকময়তায়। এর শিল্পমূল্য যতই না, তার বিষয়গত দিকের গুরুত্ব সাধারণ বলা যাবে না।

তার লেখা কাব্যগুলো ধারণ করে আছে তার দ্রোহী চেতনার মানসলোক। যে চেতনা প্রত্যেক শিক্ষিত বাঙালিকে নাড়া দিয়ে যায়। কাব্যগুলোর ধারাবাহিকতায় ও একতার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়-চোখ রেখেছি তোমার চোখেু (১৯৮৪), রাজা আসছে রাজা কার (১৯৯৩) ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরৎ চাই (২০০৪), মরণ বাংলাদেশটায় (২০০৫) আর ধোঁকাবাজ ধোঁকারাজ (২০১০), কাব্য গ্রন্থনায় স্বদেশ, স্বদেশের রাজনীতি, স্ববিশ্বের আঙ্গিনায় অমিতের কাব্যময়তা স্পষ্ট। অন্যদিকে ‘শিপ্রা যুমনার ধারা জুঁই নয়, পৃথ্বী’ প্রেমময় উচ্চারণে স্পর্ধিত অহংকারে গাথা।

তার অন্যদিক সম্পাদনা কর্ম। সম্পাদনা কর্মে যারা যুক্ত এবং লেখালেখি করে তারা কিছুটা মাতাল হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। দেখতে লিখিয়ে স্বভাবের বিধায় ঢিলে ঢালা পোষাক, অবিন্যস্ত চুলের বাহার সব মিলিয়ে সাধারণের চোখে মনে হবে যেন একটা পাগলই। অমিত লেখালেখির ক্ষেত্রে সম্পাদনা কর্মে যখন ছুটাছুটি করতে দেখতাম আর আমার কাছে এসে অনুবাদ কিংবা আমার মৌলিক লেখা নিয়ে যাবার জন্য বিরক্ত করতো তখন মনে হতো একটা পাগলই। সাহিত্য চর্চায় যুক্ত এমন পাগলদেরকেই বার্ণার্ড শ’ বলেছেন- ঊাবৎু মবহরঁং রং ধ শরহফ ড়ভ ষঁহধঃরপ’ অর্থাৎ প্রত্যেক মেধাবী ব্যক্তিত্ব এক ধরনের পাগল। এ রকম পাগলের সংখ্যা সর্বদেশে, সর্বকালে জ্ঞানীগুণীদের ভিতরেই দেখা যায়। তবে প্রথম দর্শনে বুঝা যায় না। আলাপ-আলোচনা করলেই বুঝে নিতে হয় জ্ঞানচর্চার পাগল।

অমিত মূল্যায়ন নামে একটি সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করে আসছে প্রায় তিন যুগ ধরে। প্রথম দিককার সংখ্যাগুলো সাধারণ চর্চা বিষয়ক হলেও নব্বই দশকের দিকে যখন বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে, তখন থেকেই তার মানসিকতা মানবিক চেতনার পরিচয় আস্তে আস্তে পাঠক বুঝে উঠতে পারে। ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে ‘শেকল ছেড়ে (১৯৯৪)’ আর যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কোথাও বেজে পাখোয়াজ (২০০৬), দু’বাঙলার কবিদের লেখা নিয়ে প্রকাশ করেন। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী, কাব্য সংকলন ‘শেকল ছেড়ে’-র ভূমিকা লিখে দেন কবি শামসুর রাহমান। এটা অমিতের বড় অর্জন। সম্পাদনা কর্মের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।

অন্যত্র ব্যক্তি বিষয়ক সংখ্যাগুলোর মধ্যে গবেষক আবদুল হক চৌধুরী স্মারক, আবুল ফজল স্মারক, শিবনরায়ন রায় স্মারক উল্লেখযোগ্য। আবুল ফজল স্মারকে দেখা যায় ১৯৩৯-১৯৫৩ সালের মধ্যে সাহিত্য বিশারদকে লেখা আবুল ফজলের বারটি পত্র ডাঃ আহমদ শরীফের বাসা থেকে উদ্ধার করে টীকাটিপ্পুনীসহ সম্পাদনা করেছে। আর শিবনারায়ণ রায়ের মতো মনীষীর উপর সম্পাদনার যে যোগ্যতা অমিত দেখিয়েছে তা ধর্তব্যে না আনার নয়। তৎসঙ্গে নজরুল-সুফী স্মারক ও একই অর্থবহ। একাজ সাহিত্যের জন্য একটা মাইলফলক। মফসল শহরে বসে শিবনারায়ণ রায় সম্পাদনা সাধারণ কর্ম নয়। আমি তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।
রচনাকাল ঃ ২৬/০৫/২০১১, কক্সবাজার।

আপামস্তক এক কবি
মুহম্মদ নুরুল হুদা

পা থেকে মাথা পর্যন্ত কবিতা যাকে কাঁপায়, যাকে দাপায়, তেমন এক উন্মাতাল কবিতামানুষ অমিত চৌধুরী।
আমি তাকে দেখছি প্রায় চার দশক ধরে। না অতিপ্রজ না বিরলপ্রজ। এই কবি লিখে যাচ্ছেন গদ্যে-পদ্যে, মাতাল শব্দ তরঙ্গে। দরিয়ানগর কবিতাঙ্গনের জন্য পরম সুসংবাদ এই যে, ষাট পেরিয়েও এই মানুষটি তুমূল সৃষ্টিশীল হয়ে আছেন। সৃষ্টি ও সংগ্রাম তার জীবনের দুই সমান্তরাল প্রবাহ। যে হাতে লিখছেন সেই হাত লড়ছেন তাবৎ অসঙ্গতির বিরুদ্ধে। তাই তাঁকে বলতে চাই সৃষ্টিসংগ্রামী। তার এই সৃষ্টিদ্রোহ মূলত জীবনের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে আর সুনীতিবোধে উজ্জীবীত মানববিন্যাস অঙ্গীকারে। নিজের ভেতর তো বটেই, এমনকি সমাজের অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল প্রতিটি ব্যক্তির ভিতরেও আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ খুঁজে চলেছেন তিনি নিরন্তর। তাইতো জীবনে ও শিল্পযাপনে সর্বপ্রকার ধোঁকাবাজির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্ছ্বার।
কবিতা তার কাছে যতোটা নান্দনিক শিষ্টাচার, তার চেয়ে অনেক বেশি স্বদেশে ও স্ববিশে^ ভারসাম্য মানবপ্রগতির অঙ্গীকার। দ্রোহের পাশাপাশি ব্যঙ্গবিদ্রুপ বিদ্রুপ কটাঙ্গ কোনো কিছু বাদ যায় না তার রচনায়। তাই তিনি আপোসহীন। এই আপোস হীনতার কারণে জীবনে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি তাঁকে। সবকিছু অগ্রাহ্য করে ‘একলা চলো’ নীতিকে গ্রহণ করেছে বারংবার।
শব্দশিল্পে শতভাগ সত্যসন্ধ হতে চেয়েছেন, শুদ্ধতম কবি হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেছেন। শুদ্ধতম কবি হওয়া তো কোনো কবির পক্ষেই এক অসম্ভব কল্পনা, কিন্তু চলনে বলনে জীবন যাপনে অমিত যে শতভাগ কবিতাচারী, এ কথা নিঃসন্দেহে স্বীকার্য্য।
দশটি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা তিনি, সেই সঙ্গে মূল্যায়ন শীর্ষক একটি অনিয়মিত সাহিত্যপত্রের সম্পাদক। প্রকাশ করেছেন এই পত্রিকার বেশ কিছু বিষয়ভিত্তিক ও ব্যক্তিত্ব বিশেষ সংখ্যা। এই আয়োজনে তাঁর পরিকল্পনা, মেধা ও প্রয়োগ-ক্ষমতার পরিচয় মেলে। একজন সৃষ্টিনিষ্ট শিল্পীর জন্যে এটিও কম অর্জন নয়।
অমিত সৃষ্টিশীলতায় আরো উচ্ছ্বল হোক, আরো উজ্জ্বল হোক। তাঁর কাব্যসাধনা চিরায়ু হোক।

অমিত প্রশস্তি
সলিমুল্লাহ খান

মহাত্মা অমিত চৌধুরীর আয়ু সত্তর বছর পদার্পণ হইতেছে জানিয়া একাধারে আনন্দিত আর অন্যাধারে কাতর হইয়াছি। আনন্দিত, কেননা আমাদের এই অল্পায়ুর দেশে সত্তর বছর বাঁচিয়া থাকাটাও বড় কম গৌরবের কথা নহে। অমিত চৌধুরীর সহিত মনে হইতেছে আমিও বড় হইতেছি। মাঝখানে অনেকদিন তাঁহার সহিত যোগাযোগ ছিল না। তাহার পরও জীবনের নানান মোড়ে ও গলিতে তাহার দেখা বার বার পাইয়াছি।
আমার যখন জন্ম হইয়াছিল তখন আমাদের জেলার নাম চট্টগ্রাম ছিল। এখন সেই বড় জেলা ভাগ হইয়া কক্সবাজার নামে নতুন মেলা গজাইয়া উঠিয়াছে। তবু আমি নিজেকে সবসময় চট্টগ্রামের লোক মনে করিয়া থাকি। ইহার গভীর কারণ কি জানি না। বাহ্য কারণ হয়তো ভাষা। চট্টগ্রামের ভাষাই আমার মাতৃভাষা। বাংলা যদিও আজ আমার লেখাপড়ার এক নম্বর অবলম্বন তবু আমি সবসময় চট্টগ্রামের ভাষায় স্বপ্ন দেখি।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক কোণায় বলিয়া কিনা জানি না, আজ বাংলা জাতীয় সাহিত্যে চট্টগ্রামের জায়গা অতি সামান্য। অথচ শুনিয়াছি একদা চট্টগ্রাম বাংলা সাহিত্যে বিশেষ ছিল। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বাংলা জাতীয় সাহিত্যের যে নমুনা আবিস্কার করেছিলেন তাহার গৌরব আমাদের যুগে আর বজায় নাই কেন? এই প্রশ্ন আমি মধ্যে মধ্যে করিয়াছি। জবাব পাই নাই।
আমার কখনো কখনো মনে হইয়াছে অমিত চৌধুরীর মতন যদি আরও চারিজন সাধক মহাত্মা চট্টগ্রামে জন্মাইতেন তো আমাদের যুগের বন্ধ্যাদশা ঘুচিত। খানিক হইলেও ঘুচিত। তিনি যে একাগ্রতার সহিত শুদ্ধ সাহিত্যের পিছনে ছুটিয়া চলিয়াছেন, চলিতে চলিতে উনসত্তর বছর পার করিয়াছেন, তাহা আগেই বলিয়াছি শ্লাঘার বিষয়।
এখন বলি কাতর হইলাম কেন। একজন গুণী সাহিত্যসাক যিনি শুদ্ধ বছরের পর বছর নয়, যুগের পর যুগ ধরিয়া কেবল বড় বড় সাহিত্যসাধকের মূল্যায়ন করিয়া পত্রিকা ছাপাইতে ছাপাইতে বুড়া হইলেন তাঁহার দেশবাসী তাঁহার কি মূল্য দিলেন? এই প্রশ্ন করা যায় বলিয়াই আমার মনে হইয়াছে।
এমন স্বার্থলেশশুন্য, এমন মহাপ্রাণ, এমন সাধক মহাত্মা আমাদের দেশে কেন জন্মাইবেন যদি আমরা তাঁহার জন্মের উপযৃক্ত মাটির ঘরও তুলিতে না পারি? অমিত চৌধুরীর মূল্যায়ন পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যাই অসাধারণ। আমি বিশেষ করিয়া তাঁহার প্রকাশিত আবদুল হক চৌধুরীর কর্মকৃতি মূল্যায়ন নামক গ্রন্থটির নাম উল্লেখ করিব।
সম্পাদনাও যে এক প্রকারের সৃষ্টিশীল কাজ, এক জাতীয় ধর্মের কাজ তাহা আমরা আর কখন স্বীকার করিব? এই বছরের গৌড়ার দিকে চট্টগ্রাম হইতে তাহার একটি কবিতার বহিও ছাপা হইয়াছে। বইটি তিনি উৎসর্গ করিয়াছেন কক্সবাজার পৌরসভার জনপ্রিয় চার চার বার নির্বাচিত সভাপতি নুরুল আবছার আর কবি রাজনীতিবিদ রুহুল কাদের বাবুলকে। সেই বইয়ের নাম মজার ধোঁকাবাজ ধোঁকারাজ।
আমি অবাক হই অমিত চৌধুরী কোন জাতীয় পুরুষ্কার না হোক, কক্সবাজার জেলা হইতে একটি জাতীয় সংবর্ধনা পাইলেন না কেন? এখানে কে কাঁহাকে ধোঁকা দিলেন?
যে দেশ গুণীর কদর করিতে জানে না, সে দেশে গুণীর জন্মও হইবে না। এই পুরানা সত্য আমার নতুন করিয়া মনে পড়িতেছে। আমি জানি এই দেশের একাধিক সরকার অমিত চৌধুরীকে বছরের পর বছর নির্যাতন করিয়াছে। তাঁহার এক টুকরা ক্ষুদ্র সরকার নিয়ন্ত্রিত শিল্প কারখানার স্কুল এন্ড কলেজে চাকুরি ছিল। সেই চাকুরি কাড়িয়া লইয়াছে স্বয়ং সদাশয় সরকারই। বলা যায় আমলাতন্ত্রই এই সাধুকর্মটি করিয়াছেন।
এখন তাঁহার অবসরে যাইবার কাল আসিয়াছে। রাষ্ট্র কি গুণীজনের পুরস্কার কেবল মরণোত্তর পদক দিয়াই দিতে থাকিবে?

অমিত চৌধুরীর মতন মহাত্মা মানুষকে বাঁচাইয়া রাখিবার দরকার আছে।

একটি কবিতার স্মৃতি
মোশতাক আহমদ

চোখ রেখেছি তোমার চোখে
তুমি আমার অনেক কিছু
(অমিত চৌধুরী, তুমি আমার অনেক কিছু, চোখ রেখেছি তোমার চোখে)

আশৈশব কাতরতা ছিল রঙের প্রতি, অথচ পরিধেয় ছিল সাদা-কালো কিংবা ধুসর। কবি ছিলাম তো, স্ববিরোধ আর কোমল বিদ্রোহের বীজ ছিল অন্তর্গত স্বভাবে। আমাদের তারুন্যে কতইনা রঙ ছিল ক্যাম্পাসে! গান ছিল, কবিতা ছিল, ক্রিকেট ছিল, ব্যাডমিন্টন ছিল, ক্যান্টিন ছিল, মোজাম্মেল চত্বর ছিল; সমান্তরালে ছিল অসুখের মিছিল আর লাশ কাটা ঘর। আমরা আমাদের জগৎটাকে রঙিন রাখতে সচেষ্ট থাকতাম। প্রতি বছর সাংস্কৃতিক সপ্তাহে বছরের সব রঙের কুঁড়িগুলো একসাথে ফুটে উঠতো যেনবা। আমরা বিতর্ক সঙ্গীত নৃত্য দেয়ালিকা ইত্যাদির সাথে একক-দ্বৈত-বৃন্দ আবৃত্তির প্রতিযোগিতা করতাম। তিতাস আর দিশা আপা বনাম নাসরিন আপা আর আমি দ্বৈত আবৃত্তির প্রতিপক্ষ হতাম। একবার আমরা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘নীলকন্ঠ’ কবিতার ‘হেই ডি হাই ডি হাই!’ এর হাওয়াই দ্বীপের মোহিনী মূর্চ্ছনায় দর্শক ধন্য হলেও হেরে গেলাম শাহাদুজ্জামান ভাইদের বিচারে। পরের বার (নব্বই এর উত্তাল দিনগুলোর মুখোমুখি, উৎসবের শ্লোগান হলো ‘আমরা আবহমান ধ্বংসে ও নির্মানে’) কণ্ঠে নিলাম ‘রাতের চাদর দিয়ে ঢেকে দাও আলোর কফিন’ (নোটনের জন্য শোক, খোন্দকার আশরাফ হোসেন)। তিতাস- দিশা এবারে নিয়ে এলো ‘চোখ রেখেছি তোমার চোখে’ অমিত চৌধুরী বই; ছিল ফয়সলের সংগ্রহে। কে হারলো কে জিতলো তা বলার চেয়ে জরুরী হচ্ছে, সেই কবিতা নব্বই এর উত্তাল সময়ের বিপরীতে সবাইকে জয় করে নিল। নাকি ‘এখন একটু চোখে চোখ রাখো/দিনগুলো ভারি দামালো’র (শঙখ ঘোষ) নব্বই-সংস্করণ খুঁজে নিয়েছিল সবাই! আসলে, আমাদের হৃদয়গুলো কোমল-পেলব ছিল, মিছিল-শ্লোগানে চাপা-পড়া নিজেদের অনেক কথাই ওই কবিতায় খুঁজে পেতাম।

এখন বন্ধু বান্ধবীরা অধিকাংশই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নানা মহাদেশে। আমি এই বাংলায় রয়ে গেছি, বহু ক্রোশ ঘুরে ফিরে শেষে সমুদ্র-সারস। তিতাস মাহমুদ বন্দরে বন্দরে ধাক্কা খেয়ে এখন আমেরিকায় ডাক্তারি করে। এখনো পহেলা বৈশাখে মায়ের কাছে ফেরার আকুতিভরা পংক্তিমালা আবৃত্তি করে- ইউটিউবে পাঠালো সেদিন সবাইকে। দিশা আলী এখন ইথিওপিয়ার জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। নাসরিন কাদেরও বিদেশ-বিভূঁয়ে, মানুষের মানসিক ব্যাধির নিদান দিয়ে থাকেন। এখনো ওরা আমার নতুন কবিতা নিয়ে আগ্রহ দেখান। এখনও, এই একুশ বছর পরেও, আমরা সেই অমিত-লাবন্যভরা হীরের টুকরো কবিতাটির স্মৃতিচারণ করি ফেসবুকে। ক্যাম্পাস-কাঁপানো স্মৃতিজ কবিতা এখন ফেসবুকের নীলাভ পৃষ্ঠায়। সেই কাব্যগ্রন্থের গর্বিত মালিক (বইটা অবশ্য জনগণের সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল) ফয়সলকে কি লন্ডন শহরের বিশ্রী বৃষ্টির দিনে কবিতাটির স্মৃতি হঠাৎ এক পশলা দোলা দিয়ে যায়?

একুশ বছর পর, আমার সৌভাগ্য, কবিকে পেয়ে গেলাম হঠাৎ করেই, ব্যস্ত কোলাহলে দরিয়ানগরের ঘর্মাক্ত চা-খানায়। দেখলাম, ‘মূল্যায়ন’ আজও বের হচ্ছে। কুড়ি বছর আগে আমার ‘বালিকার উৎসব’ ছাপা হয়ে আমাকে একদিন উৎসবের উপলক্ষ এনে দিয়েছিল পত্রিকাটি। আজ মেঘনা চাইতেই জল ! কবির সাথে ক.বি.র পরিণয় কাহিনীও জানা হলো। সেই রোমান্টিক কবির আজ বয়স হয়েছে। সে জন্যেই কি তিনি রোমান্টিকতা বিসর্জন দিলেন? – না। এই বয়সে কবিদের পৃথিবী নানা রঙের স্বর্গভূমি হয়ে ওঠে। আমার জননী-জন্মভূমি-স্বর্গাদপী-গরিয়সী কবিকে সে সুযোগ দেয় নাই। কবিকে কেন আজ ‘ধোঁকাবাজ-ধোঁকারাজ’দের শ্রাদ্ধ করতে হচ্ছে?-আমি জেনেছি। কিন্তু আমার মহাদেশে মহাদেশে ছড়িয়ে থাকা ক্যাম্পাসের বন্ধুরা না জানুক; ওরা ‘তুমি আমার অনেক কিছু’র স্মৃতি চর্চায় সুখী থাকুক। আমরা যারা এ দেশে রয়ে গেছি, তারাই না হয় দেখবো কবিকে অকাব্য-অসুরের আগ্রাসনের শিকার হতে; এটাই কি নিয়তি! দেশ মাতৃকার কাছে কবির জীবন আরেকটু নিরাপত্তা পাবার অধিকার কি রাখে না? আজ আমি অনেক স্ববিরোধিতা কাটিয়ে, অনেক বিদ্রোহের উপলক্ষ পাশ কাটাতেও শিখেছি (!!)। রঙের বিকল্পে এখন আর ধুসরতা খুঁজিনা। সে নীল হলে নীল, লাল হলে লাল…..
কবিতা ও মূল্যায়ন নিয়ে অমিত চৌধুরীর অপাত্য স্নেহ আর নিরন্তর উদ্রমের ছায়া দেখতে পাওয়া যায় বিষয়ভিত্তিক একনিষ্ট প্রকাশনাগুলোয়। বিশেষ সংখ্যাগুলো (শিবনারায়ন সংখ্যা, নজরুল -সুফী জুলফিকার, বিনোদবিহারী সংখ্যা, বুলবুল চৌধুরী সংখ্যা তার শ্রমলব্ধ সম্পাদনার স্বাক্ষর রেখেছে। বিরল ঘটনা হচ্ছে, বাংলাদেশের ছোট কাগজেরে ভবনে একটি জেলা শহর থেকে ১৯৭৬ থেকে এ পযন্ত নিরলসভাবে মানসম্মত মূল্যায়ন বের হচ্ছে এবং প্রতিসংখ্যাতেই অপ্রকাশের ভার নিয়ে হাজির হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় রুচিশীল পাঠকদের। কোনো মন্ত্রে সচল থাকেন একজন পোড় খাওয়া সত্যবদ্ধ সম্পাদক, আমার জানা নেই।

অমিত চৌধুরী ও তার কাব্যের রাজনৈতিক মানস
মানিক বৈরাগী

কবিতার বিষয় কবির মনোযন্ত্রণা উৎসারিত। এজন্য বলা হয় কবিতার জন্ম বেদনাময়। অর্থাৎ-যিনি কাব্যে নতুন বিষয়আশয়কে তার কাব্যের বাকময়তায় শিল্পরূপ দেন তিনি কবি। অমিত চৌধুরীও এমন একজন কবির নাম। তার প্রকৃত নাম কিন্তু অন্য আরেকটা। ছদ্মনামে লিখেন। ছদ্মনামে লেখার প্রসঙ্গে বলেন, আমার নামের অর্থ অদম্য। দেশকে ভালবাসার চেয়ে অন্যকোন প্রেম বড় প্রেম নয়।’ এতেই তার মানস চেতনা কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে কি রকম পর্যায়ে অগ্রসর হচ্ছে তা অনুমেয়। যিনি প্রথমত: মানুষ, মানবীয়গুনে রক্তমাংসে মানবীয় সত্তায় প্রেমময় উচ্চারণে কাব্যের বাক প্রতিমা নির্মাতা। যিনি অন্তর্লোকে যা অনুভব করেন এবং তা দেখে শব্দশিল্পে প্রকাশ করেন তিনিই কবিসত্তায় উজ্জ্বল। সে মানস চেতনা রাজনৈতিক দেশজপ্রেমে ভিন্ন স্বরে শরনিক্ষেপ করে যায়। আর সেটি কিন্তু প্রেমময় হলেও দেশপ্রেমে যদি দ্রোহের স্বরে লেখা হয় তাহলে দেশ ও শের কিংবা বিশ্বের যে কোন শে জাতির কল্যাণ বয়ে আনে। যাকে সাহিত্যে আন্তর্জাতিকতাবাদের ( ওহঃবৎহধঃরড়হধষরংস) বিষয়ে উপনীত দিক বলা যায়।
অমিত চৌধুরী সত্তর শক থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম শহরে বসেই কাব্য চর্চা করে আসছেন। তবে তার সম্পানা-কর্ম শুরু হয়েছে কাকতালীয়ভাবে ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে। এ দিন তার সম্পাদিত ‘মূল্যায়ন’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। তার নিজের কবিতাসহ অন্যান্যের লেখায় প্রকাশ পেয়েছিল। তার কাব্যে মূল বিষয় দেশপ্রেম, নিপীড়িত মানুষের মনোযন্ত্রণায় স্বাধীনতার চেতনা প্রতিফলিত। তিনি কোন রাজধানীর পৃষ্টপোষকতা মানে- সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক না হলেও পত্রপত্রিকায় চাকুরী করেননি। এ সুযোগ হলে হয়তো ভিন্ন মাত্রায় বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীতে গড়ে উঠা এবং প্রতিষ্ঠা কবি সাহিত্যিকদের মত সাধন-ভজনে পরিচিত পর্বের বৈতরণী পেরিয়ে যেতেন।
অমিত চৌধুরী-অমিত তেজের মানুষ। আজন্ম প্রকৃতি বিরূপতা ও শ্রেণী বৈষম্য বিরোধী চেতনার কবি।
বঙ্গোপসাগরের পূর্ণিমা-অমাবস্যায় ফুঁসে ওঠা জোয়ার জলের প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে লঘুর প্রতি সংখ্যাগরিষ্ট সাম্প্রদায়িক চেতনায় ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা নির্মাণ করেছেন। তার পথ চলা কখনো মসৃণ ছিল না। তিনি এগিয়েছেন অদম্য পুরুষ সিংহের মানসিকতায়। কাব্যের যে ভাষা নির্মাণ করেছেন তাতে দেশপ্রেমের শুদ্ধতম উচ্চারণ প্রতিধ্বনিত। বিভিন্ন জাতের মানুষের চেয়ে মনুষ্যত্বহীনতায় প্রশাসনের দাসত্বে গোলাম হোসেনগিরি করে যারা মাকড়সার মত চক্রান্তের জাল বুনে যায় তাও তার কবিতায় ষ্পষ্ট-
‘অতিথি পাখি শিকারে যারা তা’দের/শীতকালে পূর্বাহ্নে কোন মায়ামমতা কী থাকে?
………..
পাখি শিকারের নেশা জাগানোই তার নিত্য পেশা
(- গোলাম হোসেন/ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরত চাই)
যে কথা না বললেই নয়, প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থনা তালিকা দেখলে বোঝা যায় দেশপ্রেম ও প্রেমের কবিতা লিখেছেন বিগত তিন চার শক ধরে। তার কবিতায় উঠে এসেছে ভাষা আ›োলন, গণঅভ্যূত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা। ঘাতক কসাইয়ের অধিকারে যাওয়া অনৈতিক রাজনীতির কথাসহ জানির জনক বঙ্গবন্ধু, ৭৫ এর বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ ও মধ্যপ্রাচ্যে প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার অনুসঙ্গ। জাতির জনক মুজিবের সাথে প্রয়াত ইয়াসির আরাফাতের জাতির পিতাতূল্য মর্যাদার অন্তমিল-
‘স্বাধীনতা সংগ্রামে আজ মুজিবর-আরাফাত
স্বর্গমর্ত্য থেকে করে এক শপথেই মোলাকাত’। (অন্তমিল/রাজা আসছে রাজা কার)
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের কবিকূলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার প্রতিবাদে কাব্য রচনা করেন নির্মলেন্দু গুণ। তার ধারাবাহিকতায় অমিত চৌধুরীর উচ্চারণ ভিন্নমাত্রার-
টুঙ্গিপাড়ার কবর খুঁড়েছি হৃদয়ে
যে হৃদয়ে জ্বলে উঠে অনির্বাণ চিতা
বাংলাদেশে মুজিবর বাঙালির পিতা
বলে যেতে চাই গণতন্ত্রের বিজয়ে।
২.
যতবার তোমার দুয়ারে যাই তুমি ডাকো
ভিন্ননামে ডাকো
জারজ সত্যের লাশ
কেন জেগে ওঠে?
৩.
রাজদ্বারে ঘুরে ফিরে দুর্বিনীক মানুষের পণ-
রুখে দিয়ে স্বৈরাচার ফিরে পেতে স্বরাজ-শাসন। (রাজা আসছে রাজা কার)
অত:পর স্বৈরাচারের দুরাবসস্থা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে অসীম সাহসে উচ্চারণ করেছেন-
সিংহাসনে সিংহকে আজ
বাঙালির না রাজাকার?
বিশ্ববাসী সবাই বুঝে
স্বৈরাচারী সে রাজা কার?
রাজা আসছে কবিতার উচ্চারণে যে দৃঢ়তা তা প্রকৃত অর্থে কত গভীর ছিল সেটি অনুধাবন করা যায় কবি মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত ‘ স্বৈরাচার বিরোধী কাব্য সংকলনে স্থান পাওয়ায়। রাজা আসছে কবিতার উচ্চারণে প্রতিধ্বনিত-
ঢোঁক গিলেছি ঢোঁক
রাজপথে আজ রাজা আসে তেমন কইরে উৎসুক?
রাজা আসছে রাজা
ভুল করে তুই চললে আবার দেবে ভীষণ সাজা
এ কথাটি বলতে আমার কাঁপছে না তো বুক;
রাজা আছে রাজপ্রাসাদে রাণী ভীষণ ঘুম
তাইনা দেখে রাজা দিচ্ছে অধো চুম….
ভুল করে তই চললে আবার দেবে ভীষণ সাজা
স্যার অফিসার উজির নাজির পাইক পেয়াদা আর কেরানী
কাজ করে যা ঠিক মতে ভাই নয়তো বোঝা বাড়ছে ঘাড়ে
ভিক্ষে করার দেশও যে নেই কোন কূলে পাচ্ছি নাতো ঠাঁই
………………..
ঢোক গিলেছি ঢোঁক এত্তোসব
বলতে আমার কাঁপছে না তো বুক
দেশের মানুষ বোকার মতোন আছিস কেন চুপ?
তারপরও কবি অর্ন্তলোক রাজনীতির পটভূমিকে স্পষ্ট করে দেখেছেন যে পঁচাত্তরের পনের আগস্ট রাজনৈতিক যে বিষবৃক্ষ বাংলার দ্বিতীয় তৃতীয় মীরজাফর তূল্য খোন্দকার ও তার সহযোগিরা বপন করে গেছেন তার প্রকৃতি দু’ধারায় বিভক্ত।
ক. পাকিস্তানের পদলোহী রাজাকার-চাটুকারের বংশবদ কসাইজাত রাজনীতিক
খ. রাজাকারে সুবিধা ানকারী াসানুদাস ঘাতক জাতের সুবিধাবাদী শ্রেণী।

এরা প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী চক্রান্তকারী নৈতিকতাহীন চক্র। তারা বিশেষভাবে ক্ষমতার খলে আমারে স্বাধীনতাবিরোধী মার্কিনীর ালাী করেই ২০০১ সনে শিখন্ডী তূল্য পঞ্চম বিশ্বাসঘাতকের নিরপেক্ষতাহীনতায় বঙ্গভবন খল করেছিল। আর তাদের উজ্জ্বল সন্তানেরা আওয়ামী রাজনৈতিকদের ষোড়শী কন্যার যৌবন রসের সুরা পান শেষে মহিমাকে হত্যা করায় অমিত চৌধুরী তার চতুর্থ কাব্য গ্রন্থনার নাম রাখেন ‘ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরত চাই’। ঘাতক কসাই রাখলেও চলত কিন্তু রাজনীতিতে মহিমাকে ধর্ষণ করে হত্যার পরে বর্তমান প্রধানমন্তী শেখ হাসিনা রাজশাহীতে মহিমাকে দেখতে গেলে পরদিন পত্রিকায় তার ছবি দেখেই নাকি এ কাব্যের নাম পাল্টিয়ে ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরত চাই রেখেছিলেন। এ কথা মৌখিকভাবে আমাদের জানিয়েছেন। অর্থাৎ মহিমা মানে তো গৌরব। কবি এ মহিমাকে ফেরত চাওয়ার যে বাকময়তা নির্মাণ করেছেন তাতে জাতীয় গৌরবকে ফেরত চাওয়ার দাবি শব্দশিল্পে উঠে এসেছে। তার উচ্চারণে-

ঘাতক কসাই তোমরা মশাই কী মানুষ নও?
ঘাতক কসাই তোমরা সবই বোঝ, বোঝ নাকি একটুও
নারীর মর্যাদা আর মায়ের মর্যাদা একই সমান
………………….
কলঙ্কের গ্লানি অসহ্য বিধায় সিমির পথের ঠিকানায়
অমরত্বের মহিমা খুঁজে ফেলে দিয়ে জাতিকে লজ্জায়…
মহিমাকে ফেরত চাই
২.
ঘাতক কসাই যারা তাদের কী
কৃতজ্ঞ শব্দের অর্থ জানা প্রয়োজন
৩.
আমরা কেউ দেশপ্রেমিক নই
আমরা ঘাতক কসাই
যখন বুঝি সুযোগ এলো
গলায় ছুরি বসাই
ঘাতক কসাইয়ের তন্ত্র
অন্যত্র ঘাতক কসাই সিরিজের ভিন্ন একটি উচ্চারণে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির ভেতরে সবুজ সাপের চেহারায় লুকে থাকায় আওয়ামী-রাজাকারদেরও কটাক্ষ করতে অমিত পুরুষজাত কবি দ্বিধা করেননি। তার উচ্চারণে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে প্রথম প্রতিবাদকারী কবি নির্মলেন্দু গুণকে আক্ষেপ করে কবি যেন সুধাতে চায়-
আবহমান নদীমাতৃক বাংলার দু’পাড়ে
নগ্ন পায়ে বহু দিন তো নৌকার গুণ টেনে টেনে
কাটিয়ে দিলেন জীবন যৌবন গুণ’দা
নৌকা তো স্বাধীনতার প্রতীকই জানি
এ নৌকাটি টানবে এবার
সন্ত্রাসী ও আওয়ামী রাজাকার গুন্ডা
ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরত চাই/৫
ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরত চাই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় (২০০৪) তখন কিন্তু কবিতার বিক্ষুব্ধ স্বর অবৈধভাবে চাকরিহারা কবিকে মুক্ত বিহঙ্গের মত স্বাধীন সত্তায় লেখালেখি করতে প্রেরণা যুগিয়েছে। বাঁধন ছেঁড়ার গান’ কবিতার উচ্চারণেও এ রকম শর নিক্ষেপ্ত হয়েছে-
হে জীবন্ত ঈশ্বর, নও তুমি পরমেশ্বর কখখনো
কৃত্রিম চিড়িয়খানায় কেবল বনরাজ সিংহ
ব্যাঘ্র, হরিণ-হরিণী কিংবা শিয়াল চাতুর্যে প্রভুভক্ত কুকুরের আদলে রুদ্র
প্রতিরোধ্য
বৃত্তাবদ্ধ সীমানার বাইরে এখন যেনো সব্যসাচী
অপ্রতিরোধ্য….
অথবা স্বদেশে ফেরার মতো যদি হারানো ঐতিহ্যের অহংকার ফিরে পেতে পারেন তবেই দাবী তুলতে উচ্চারণ করেছেন-
স্বদেশে ফেরার মতো যদি ফিরে আসি
একটি ছবি খুঁজিব ফের
সে ছবি তাহা জানো ‘ গোয়ের্নিকা’ ঠিক
জাতির জনক মুজিবের
বাঁধন ছেঁড়ার গান।
তারপরও কবি স্বৈরাচারের স্বজন বংশবদ বিকৃতবাদী একবিংশ শতাব্দীর প্রথম প্রহরে জঙ্গিকে সঙ্গে করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে লঘু সম্প্রদায়কে অত্যাচার করার মধ্য দিয়ে যে তান্ডব শুরু করে দিয়েছিল তার ইতিহাসও কাব্যের বাগময়তায় তুলে ধরেছেন-
শ্লোগান ধরে, চিকা মারে আপনে মনে খেয়ালে
পাকা বাড়ির ছাদের পাশে না হয় রাস্তার দেয়ালে
আমরা সবাই রাজাকার-
মুক্তিযোদ্ধারা বাংলা ছাড়!
…দেয়ালের লিখন।
বিগত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারায়নগঞ্জ এভাবেই শ্লোগান ধরে মিছিল করার ু:সাহস িেখয়েছিল একাত্তরে পরাজিত ও তাদের পদলেহী সুবিধাবাদী শ্রেণী। লজ্জায় কবির সংখ্যালঘু ও মুক্তিযোদ্ধাদের লজ্জা দিতেই যেনো কাব্যশিল্প নির্মাণ করেছেন-
‘জন্মভূমির বুকে ভাই সংখ্যালঘুর ললাট
অবৈধদের সন্ত্রাসে ফের বন্ধ হচ্ছে কপাট
……
সব লিখন তো নয়রে দেয়ালেরই লিখন
মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যালঘুর কপালেরই লিখন ( দেয়ালের লিখন)
কবিতার নিচে স্পষ্ট যে নারায়নগঞ্জের যে রকম শ্লোগান দিয়েছিল স্বাধীনতা বিরোধীরা। সূত্র-সাপ্তাহিক ২০০ সংখ্যালঘু সংখ্যা ১৯/১০/২০০১। আর জঙ্গীদের সঙ্গী করে ু:শাসনে পিষ্ট হয়ে গুণ ার মতো ‘দূর হ ু:শাসন’ না লিখলেও ‘মরণ বাংলাশেটায়’(২০০৫)। ২১ আগস্ট/২০০৪ তারিখে শেখ হাসিনাকে হত্যার চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু এভেন্যুতে বোমা হামলা ও ডিসম্বরে এস এম কিবরিয়া হত্যার প্রতিবাদে যখন রাজপথে বাংলার অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীকে টেনে হেছড়ে নিয়ে যাবার ৃশ্যসহ আইভী রহমানের অর্ধমৃত রক্তাক্ত লাশ খোর পর তিনি রচনা করেন ‘মরণ বাংলাদেশটায়’ নামক লিমেরিক কাব্যগ্রন্থনা। এতে তিনি জঙ্গিদের সঙ্গীতূল্য পুতুল সরকার বিরোধী চেতনায় উচ্চারণ করেন-
বিকৃতরাজ জামাই তাদের দ্বন্দ্বে
বোমা ফাটায় একটু হলে সন্ধে
কেড়ে নিতে কিবরিয়া বা আইভি আপার প্রাণ (মরণ বাংলাদেশটায়/৬)
বোমা হামলার সব আলামত দেয়নি বলে রোকা
সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শুনছে কি হে খোকা?
খোকা নয় হয় অবুঝ, এখনো খায় দুধ
কিন্তু বুঝছেনা কেন ব্যারিষ্টার ওদুদ
ভাবছে কী সব দেশের মানুষ অস্ত্র দেখে বোকা (মরণ বাংলাদেশটায়/১১)
অথবা যমজ বোনের ছবির মতো দেখছি অদ্ভুত মিল
বাংলাদেশ বা মধ্যপ্রাচ্য ‘ইঙ্গো-মার্কিন চিল
বাহ কী দারুন! উড়ছে ডানা মেলে
টিক্কা আযম বৈঠক করে জুড়োয় জোটের দিল।
অমিত চৌধুরীর ওত্তোসব বাকময়তায় স্পষ্টভাবে দেশপ্রেমের জয়গান প্রতিধ্বনিত। কবিরা মূলত প্রেমিক হলেও অমিত চৌধুরী কিন্তু প্রেমের কবিতা লেখার পাশাপাশি সামাজিক ায়বদ্ধতায় শেপ্রেম তার কাব্যের স্বরে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে স্বদেশ, স্ব-বিশ্বের চেতনাকে আন্তর্জাতিকতাবাদে উপনীত করে কাব্যচর্চা করেছেন। এখানে অমিত চৌধুরীর কাব্যের মানসলোকে সূর্যোদয়ের সকালের মত উজ্জ্বল। তিনি যেন নতুনভাবে গোর্কি কিংবা নজরুল সুকান্তের চেতনায় পেছনে ধাবমান গতিতে এগোচ্ছন।

নজরল-সুফী গবেষণার জন্য “মূল্যায়ন” ভিন্নমাত্রার কণ্ঠস্বর
মাসউদ শাফি

যেকোন দেশের সাহিত্যপত্রেই সাহিত্যচর্চা ও গবেষণার অনুষঙ্গ যুক্ত থাকে। বাংলাদেশে প্রকাশিত অন্যান্য সাহিত্যপত্রের মধ্যে মূল্যায়নও কমগুরুত্বপূর্ণ নয়। সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে (জুন’১০)-এ কবি অমিত চৌধুরীর সম্পাদনায় “কবি নজরুল, নজরুলবন্ধু, সুফী জুলফিকার হায়দার ও বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে “মূল্যায়ন”। এই সংখ্যাটি প্রকাশনা যথেষ্ট গুরুত্বের দাবী রাখে। এজন্য সম্পাদককে ধন্যবাদ দিতে হয়। না বললে নয়, সম্পাদক অমিত চৌধুরী বাংলাদেশের দক্ষিণের সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে বসবাস করেও দেশের পুঁিজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় তথা রাজনীতি, সমাজনীতি সর্বোপরি এক সংকটাপন্ন ও সমস্যা প্রাক্কালে একটি লিটলম্যাগ ১৯৭৬ সাল থেকেই নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে বিধায় তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। এ জন্য তাঁকে সম্মানিত করা দরকার আছে বলে মনে করি।

আর, এবারের সংখ্যায় তিন মূলধারার বাহক কাজী নজরুল, নজরুলবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দার ও বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী’র জন্মশতবর্ষে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করে উৎসর্গিত। উল্লেখ্য, এরও আগে তিনি আমাদের জন্যে বিশেষ সংখ্যা হিসাবে উপহার দিয়েছেন মনীষী, র‌্যাডিকেল হিউম্যানিস্ট শিবনারায়ণ রায়-এর মৃত্যুপরবর্তী এপার-ওপার বাংলার লেখকদের লেখার সমন্বয়ে সর্ববৃহৎ যে কাজটি সম্পাদন করেছেন তিনি কক্সবাজারের আমাদেরই অমিত দা।

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে- বইয়ের প্রচ্ছদেই দেখা যায় তিন গুণী প্রাজ্ঞস্বর কবি কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুলবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দার ও বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর চমৎকার স্কেচ। যা দেখে পাঠক মুগ্ধ না হয়ে পারবে না। এটি সহজেই বোধগম্য যে এবারের “মূল্যায়ন” সংখ্যাটিতে তাঁদের মূল্যায়িত করা হচ্ছে। সম্পাদকীয় ও সূচিপত্র পরবর্তী চোখে পড়ে- ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর অসাধারণ একক স্কেচ- যা শিশিরের আঁকা। নজরুলের স্কেচটি করেছেন প্রাণেশ মণ্ডল। দু-স্কেচ ও ছবি সুফীর ছবি ব্যবহারে প্রচ্ছদ করেছেন সবুজ আচার্য। জীবন্তকিংবদন্তী বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী’র জন্মশতবর্ষ পালনের সংবাদ-পরিক্রমা, চিত্রালোক সমগ্র ও বিপ্লবীকে নিয়ে প্রথমেই গদ্য লিখেছেন অজয় দাশ গুপ্ত “বিনোদ বিহারী:শতবর্ষের মহীরুহ” শিরোনামে। দু’পৃষ্ঠার হলেও বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী’র মূল্যায়নে-এ লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ। এতে পাঠক বিনোদ বিহারী সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভে সক্ষম হবে। এরপর সাজানো হয়েছে বিপ্লবী বিনোদ বিহারীকে উৎসর্গিত তিনটি কবিতা। কবি আহাম্মদ খালেদ কায়সার, কবি নিতাই সেন ও দেবেন্দ্র মালাকারের কবিতা বিপ্লবীকে সম্পর্কে যথেষ্ট বাগ্ময়। অতঃপর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর উপর লেখালেখিতে পর্যায়ক্রমে- মাহবুবুল আলম চৌধুরী লিখেছেন “নজরুল এবং আমার কিছু স্মৃতি”। লেখাটিতে নজরুল প্রসঙ্গে লেখকের স্মৃতি-বিধূরতাময় কথন (নস্টালজিয়া) ও নজরুল প্রসঙ্গে নিজস্বমত গুরুত্ববহ। এটি নজরুল পাঠকদের মননের খোরাক যোগাবে। ওপার বাংলার কবি-ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন “কোন ভগবানকে লাথি মারলেন ভৃগু”। এ লেখায় পাঠক বুঝতে পারবেন নজরুল উচ্চারিত “আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন” উচ্চারণে কতটুকু যথার্থতা ছিল তৎবিষয়ে হিন্দু পৌরাণিক মিথের আলোচনা। প্রকৃত অর্থে নজরুল ওই সময়কার মূর্ত ও পার্থিব ভগবান “সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসক” গোষ্ঠীকেই ‘ভগবান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এটিও নজরুল অনুসন্ধানী গবেষক ও পাঠকদের ঋদ্ধ করবে। অতঃপর যতীন সরকার লিখেছেন “কবি নজরুল ও লৌকিক বাঙ্গালির ইসলাম” শীর্ষক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। কবি নজরুলকে নিয়ে তাঁর সম-সাময়িক ধর্মান্ধ কিংবা এক শ্রেণীর মৌলবাদীরা যে ‘ধর্মদ্রোহী’ কিংবা ‘কাফের’ আখ্যা দিয়েছিলেন তার বিবরণ পাবেন এ লেখায়। কবি নজরুলকে নিয়ে যে ধর্মান্ধগোষ্ঠী তথা উগ্রবাদীদের টানাটানি শুরু হয়েছিলো, যেমন- হিন্দুদের কবি, মুসলমানের কবি কিংবা নাস্তিক কবি ইত্যাদি বলে যে কুৎসা ও অপব্যাখ্যা দিয়েছিলেন- তার লিখিত বিবরণ লেখাটিতে স্পষ্ট। নজরুলের প্রথা বিরোধীতা-অসম্প্রদায়িকতা বুঝতে গিয়ে লেখক এখানে প্রথাবিরোধী লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ এর প্রসঙ্গও এনেছেন। ১৯৭২ সালে নজরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর থেকে মৃত্যুকাল পর্যন্ত ঢাকার পি.জি. হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে থাকাকালীন সময়ে প্রখ্যাত অধ্যাপক ডাঃ নুরুল ইসলাম নজরুল ও নজরুলবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দার প্রসঙ্গে লিখেছেন। “পি.জি. হাসপাতালে কবি নজরুল ও সুফী জুলফিকার হায়দার প্রসঙ্গে” শীর্ষক একটি দীর্ঘ লেখা। যদিও ১৯৮৩ সালের ২৭ মে ‘বিচিত্রা’ তে “পি.জি. হাসপাতালে নজরুল” নামে ছাপা হয়েছিল। সম্পাদক এখানে জুলফিকার প্রসঙ্গ থাকায় এই শিরোনামটি পরিবর্তন করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর যে স্মৃতি নজরুলের সাথে ছিল ও নজরুলবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দার প্রসঙ্গে তাঁর স্মৃতিচারণ নজরুলের জীবনে মৃত্যুমূহুর্তকালীন সময়ে একটা রেকর্ড এ লেখায় তুলে ধরেছেন। যা-পাঠকের কাছে ও নজরুল গবেষকদের নিকট মূল্যবান হবে বলে বিশ্বাস।

কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের রূঢ় সমালোচনা করতেন তাঁরই সমসাময়িক দু’লেখক সজনী কান্ত দাস ও কবি গোলাম মোস্তফা। এই দু’ব্যঙ্গলোক লেখক “শনিবারের চিঠি” সম্পাদক সজনী কান্ত দাস ও “নওবাহার” সম্পাদক কবি গোলাম
মোস্তফা- সম্পর্কে নজরুল গবেষক তিতাশ চৌধুরী লিখিত “নওবাহার পত্রিকার নজরুল বিরোধী ভূমিকা” শীর্ষক চার পৃষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণধর্মী লেখা সম্পাদক ছেপেছেন সাহসিকতার সাথে। এই লেখাটিতে নওবাহার পত্রিকায় গোলাম মোস্তফা এবং অন্যান্য পূর্ব বাংলার ধর্মান্ধ পাকিস্তানপন্থী লেখকরা নজরুলকে কি রকম ব্যঙ্গ করতেন তার একটা দালিলিক ভাষাচিত্র অংকনে তিতাশ চৌধুরী প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। একইভাবে সম্পাদক অমিত চৌধুরীর “বিদ্রোহীঃনজরুলব্যঙ্গ সজনী কান্ত দাস ও শনিবারের চিঠি প্রসঙ্গ” শিরোনামে লেখায়ও নজরুলব্যাঙ্গ প্রসঙ্গ ও নজরুলব্যাঙ্গকরণের জন্য সজনী কান্ত দাস তথা গোলাম মোস্তফার লেখা উদ্ধৃতি সহকারে তৎকালীন সময়ে অসারজ্ঞানতায় তারা যে প্রকৃত লেখালেখি না করে নজরুলকে ব্যাঙ্গ করতেন তৎবিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। “মূল্যায়ন” এবারের সংখ্যায় নজরুল ব্যঙ্গলেখক সজনী কান্ত দাস ও কবি গোলাম মোস্তফার উপর লেখা, ছবি ও অন্যান্য তথ্যাদি সন্নিবেশিত করায় ম্যাগাজিনটি পাঠকের কাছে গুরুত্ববহ বলে মনে করি। এটিও না বললে নয় যে, লেখা দু’টির আগের পৃষ্ঠায় নজরুলের ছবি উপরে ও নিচে দু’ব্যঙ্গলেখকের ছবি ছেপেছেন। যা পাঠকের কাছে আলাদা সংযোজন হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটিও সম্পাদকের কৃতিত্ব যে পাঠকচিত্ত অকপটে তা স্বীকার করে নেবে। এরপর কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা “নজরুলের ভাষা-বিদ্রোহ” শীর্ষক একটি লেখা স্থান পেয়েছে। তথ্য ও বিশ্লেষণধর্মী এই লেখায় পাঠক খুঁজে পাবেন বুদ্ধদেব বসুও নজরুলের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কিছুটা কটাক্ষ ও অবমূল্যায়ন করেছিলেন যে, তৎবিষয়ে আলোচনা। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কণ্ঠস্বর ড. সলিমুল্লাহ খান লিখেছেন, “কাজী নজরুলের অজ্ঞান” শীর্ষক একটি অতীব জরুরী ও ইরাকযুদ্ধের সমকালীন ঘটনা প্রবাহ ও তৎসম্পর্কিত লেখা নজরুলও অজ্ঞাতসারে লিখে গেছেন। এ প্রবন্ধ পাঠ পাঠকের বোধোদ্বয় হবে যে, হিন্দু-মুসলমান পূরাণ-এর মাঝামাঝি যে, চিপাগলি গেছে তার নাম নজরুল ইসলামের গলি। একেই বলা হয় কাজী নজরুলের অজ্ঞান। এটি হিন্দু-মুসলমান প্রকৃতির বাইরে-এর নাম স্বাধীনতা। এছাড়াও লেখকের মতে-নজরুলের কোন্ কোন্ বিষয়ে অজ্ঞানতা ছিলো-তারও স্বরূপ তিনি উম্মোচন করেছেন। লেখাটি বোদ্ধাপাঠক-সমালোচক, দ্বান্দিক বস্তুবাদী, স্পষ্টবাদী, সত্যনিষ্ট ও যুক্তিনির্ভর পাঠকের কাজে লাগবেÑআশা করি।

পাঠকের জন্যে বর্ধিত ক্রোড়পত্র হিসেবে সম্পাদক মুহম্মদ নিযামুদ্দীনকে লেখা সুফী জুলফিকার হায়দার-এর দুঃ¯প্রাপ্য পত্রাবলি সংযুক্ত করে সম্পাদকীয় দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। সুফী জুলফিকার হায়দার-এর সাথে তোলা নজরুলের দুঃস্পাপ্য ছবি, সুফী জুলফিকার হায়দারকে লেখা তাঁরই পীর অলি আহমদ-এর হস্তালিখিত চিঠিটি এ সংখ্যার গুরুত্ব অনেকাংশে বৃদ্ধি করেছে। উল্লেখ্য যে, জুলফিকার হায়দারের পত্রাবলিগুলো পূর্বেও একটি সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এবারে সুফী জুলফিকার হায়দারের ওপর আরো ৭/৮টি লেখা সহ সুফী জুলফিকার হায়দারের জীবনী এ সংখ্যাকে প্রায় স্মারক গ্রন্থনার পর্যায়ে টেনে নিয়েছে। সঙ্গে মুদ্রিত হয়েছে সুফী জুলফিকার হায়দারের স্ত্রী রাবেয়া হায়দারের ছবিও। যা গবেষকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ বলে মনে করি।

বর্ধিত ক্রোড়পত্রে প্রথমেই নজরুবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দারকে নিবেদিত কবিতামালা। শওকত ওসমান লিখেছেন “অগ্রজ জুলফিকার হায়দার,” আব্বাস উদ্দিন লিখেছেন “বন্ধুবর জুলফিকার হায়দার”, কবি মতিউল ইসলাম চয়ন করেছেন, “ভাঙ্গা তলোয়ারের কবি” মোশাররফ হোসেন খান লিখেছেন, “ভাঙ্গা তলোয়ার” চার কবির কবিতায় সুফী জুলফিকার হায়দারকে একাগ্রতায় ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। এতে অনুরাগ ও প্রীতিময়তার স্বরূপ পরিলক্ষিত হয়েছে। এরপর সুফী জুলফিকার হায়দারের উপর গদ্য লিখেছেন অনেক প্রাজ্ঞস্বর লেখক-দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লিখেছেন, “সুফী জুলফিকার হায়দার”,। সাহিত্য কর্মকান্ডের ব্যাপ্তি ও প্রাপ্তি সম্পর্কেও সাজানোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে লেখাটিতে। লেখাটি পড়লে অন্তত সুফী জুলফিকার হায়দার-এর প্রারম্ভিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাবেন পাঠক। পরক্ষণে দেখা যায় সৈয়দ আলী আহসান লিখিত ‘প্রসঙ্গ’ সুফী জুলফিকার হায়দার” এ লেখা পাঠে সাধারণ পাঠক, বোদ্ধাপাঠক ও নজরুল-বন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারবে। নজরুল ও নজরুলবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দারের দ্বৈত সেতুবন্ধন সম্পর্কিত বিষয়েও ধারণা পাবেন পাঠক এবং নজরুল ও সুফী জুলফিকার হায়দারের সাথে সরাসরি সাক্ষাতে যা জ্ঞাত হয়েছেন তারও বর্ণনা রেখেছেন লেখক এখানে। যা গবেষক ও পাঠকের জন্যে সংগ্রহে রাখার মতো লেখাটি ১৯৮৩ সালে বই পত্রিকা ও পরে “শতত স্বাগত” পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল। আবু রুশদ লিখেছেন “সুফী জুলফিকার হায়দার স্মৃতি” এক পৃষ্ঠার এই লেখাটিতে সুফীর সাথে লেখকের নানা স্মৃতি বিজড়িত আখ্যান স্থান পেয়েছে। লেখাটি এপ্রিল/জুন’৮৭ সালে “উত্তরাধিকার”-এ প্রকাশ হয়। আনিসুজ্জামান লিখেছেন, “জুলফিকার হায়দার ‘ভাঙ্গা তলোয়ার’ কাব্যগ্রন্থ প্রসঙ্গে”। এক পৃষ্ঠার হলেও এখানে সুফী জুলফিকার হায়দার-এর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘ভাঙ্গা তলোয়ার’ প্রসঙ্গ ও তাঁর কাব্যসত্তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন যথার্থভাবে। একইভাবে সুফী জুলফিকার হায়দারের নানা স্মৃতি-বিস্মৃতি নিয়ে লিখেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ “খাপ খোলা তলোয়ার” শীর্ষক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা। এরপর সন্নিবেশিত করেছেন সম্পাদক নিযামুদ্দীন সুফী জুলফিকার হায়দার-এর লেখা ৩৫টি পত্রাবলি। এরপর “ভূমিকাঃসুফী জুলফিকার হায়দারের পত্রাবলি” শীর্ষক ভূমিকা লিখেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ আবুল কাসেম। ভূমিকা পাঠে পাঠক পত্রগুলির গুরুত্ব অনুধাবন করবেন বলে আশা করি। সুফী জুলফিকার হায়দার লিখিত এই দুঃ¯প্রাপ্য পত্র সম্পাদক ছেপে যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন তা নজরুল গবেষণার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এটিও সম্পাদকের একটি সক্ষম যোগ্যতার স্বাক্ষর বহন করে। এরপরেই দেখা যাবে সুফী জুলফিকার হায়দার-ফাউন্ডেশন-এর উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে সুফী জুলফিকার হায়দার যা বক্তৃতা করেছিলেন তার পুর্নঃমুদ্রণ পাঠকদের কাছে দালিলিক উদ্ধৃতি। এই অনুষ্ঠানটি ২৮ শে জানুয়ায়ী’৮৪ সালে হোটেল পূর্বাণীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পত্রাবলি পাঠে সুফী জুলফিকার হায়দার সম্পর্কে অগাধ ধারণা জন্মাবে পাঠকের। পাঠককে আশ্বস্ত করার জন্যে মুহম্মদ নিযামুদ্দীনকে সুফীর হাতে লেখা পত্রের পাণ্ডলিপিও যুক্ত করেছেন শেষে। অতঃপর সুফী জুলফিকার হায়দারের উপরে বিশদ আলোকপাত করে একটি তথ্য নির্ভর-গবেষণাধর্মী লেখা উপস্থাপন করেছেন মনিরুজ্জামান “বিস্মৃত এক নজরুল সন্ধানী পথিক সুফী জুলফিকার হায়দার (১৮৯৯-১৯৮৭)” এই শিরোনামে। দীর্ঘ আট পৃষ্ঠার এই লেখা পাঠে সুফী জুলফিকার হায়দার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে সহজেই। নজরুল-সুফী সম্পর্কের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সহ জানতে পারবেন পাঠক। এ লেখায় জুলফিকার হায়দারের পত্নী রাবেয়া হায়দারকে নিয়ে লেখা নজরুলের একটি কবিতার পাণ্ডলিপি মুদ্রিত হয়েছে। যার মূলকপি উপামা সম্পাদক মোঃ নিযামুদ্দীনের বাসায় রয়েছে। এটি নজরুল ইনষ্টিটিউটের সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করার প্রয়োজন আছে। পরের লেখাটি জুলফিকারের হায়দারের প্রসঙ্গে অমিত চৌধুরীর। এ লেখায় নজরুলের জন্মতারিখ প্রকৃত অর্থে ১১ ই বৈশাখ ১৩০৬ বাংলা যে পন্ডিত কে.আর. ব্যানার্জি’র তোলা কুষ্টির পাণ্ডুলিপি মুদ্রিত, যা পাঠক ও গবেষকদের কাজে লাগবে। অতঃপর স্মৃতিচারণ লিখেছেন মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন। বর্তমানে বর্ধিত সংখ্যায় আরও লিখেছেন শান্তানু কায়সার, সিদ্দিক আহমদ, মুহাম্মদ ফেরদৌস খান, ড. মাজিদ খান, সওগাতের পুরনো সংখ্যা ঘেঁটে সম্পাদক সংকলন করেছেন সুফী জুলফিকার হায়দারের ‘ভাঙ্গা তলোয়ার’ কাব্য সমালোচনা যা লিখেছেন কলকাতার তৎকালীন প্রখ্যাত সমালোচক নেপাল শংকর সেন। আর যুক্ত হয়েছে সুফী জুলফিকার হায়দারের জীবনী। সঙ্গে রাবেয়া হায়দারের ছবিও। সবশেষে গ্রন্থালোচনায় মোঃ আবুল বাশার আলোচনা করেছেন, ‘কারা জীবনের তিনটি গ্রন্থনা’Ñ ১. বিনোদ বিহারী চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনীগ্রন্থ ‘শতবর্ষে সন্ত’ লিখেছেন অলাকানন্দিতা ২. ঊল্লাসকর দত্তের সংক্ষিপ্ত জীবনী ‘অগ্নিপুরুষ’ ৩. অধ্যক্ষ মুহাম্মদ সাজু’র ‘শেখ হাসিনা যখন কারাগারে’। অতঃপর বঙ্গবন্ধুর অপ্রকাশিত চিঠিপত্র (১৯৪৮-৬৬) গ্রন্থনা ড. সুনীল কান্তি দে। আলোচনা করেছেন অমিত চৌধুরী এবং বঙ্গবন্ধুর লেখা তিন চারটি পত্র বিভিন্ন নেতার কাছে লিখিত পাণ্ডুলিপিসমেত মুদ্রিত হয়েছে। সবশেষে উপন্যাস-প্রথমটি আত্মাজ ময়ূখ লেখক শেখ মোর্শেদ আহমদ, আলোচনা করেছেন সন্তোষ দাঁ। অন্য উপন্যাসটির লেখিকা নাসরিন জাহান, ‘সেই সাপ জ্যন্ত’ আলোচনা করেছেন শেখ মোর্শেদ আহমদ। তাঁর আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় মূলতঃ নাসরিন যে তাঁর লেখায় প্রকারান্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধাপারাধীদের এখনো বিচার হয়নি তৎসম্পর্কে পাঠক ও দেশবাসীকে সচেতন করে তুলেছেন এই উপন্যাসের আলোকে। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধীরা মূলত সেই একাত্তরের ঘাতক সর্পতূল্য। আলোচক তাই বলেছেন সাপের লেজেও প্রাণ রাখতে নেই। সর্বোপরি বলা যায় ‘মূল্যায়ন’ সম্পাদক বিনোদ বিহারী চৌধুরীর প্রতি জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধা নিবেদন, কবি নজরুলের সমসাময়িক ব্যঙ্গ লেখকদের সম্পর্কে আলোচনায় তৎকালীন ব্যঙ্গ লিখিয়েদের স্বরূপ উদ্ঘাটন সহ নজরুলবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দারের অপ্রকাশিত চিঠির বর্ধিত স্মারকে আরো ৭/৮ জনের লেখা যুক্ত করে বলা যায় একক না হলেও নজরুল সুফীর উপর গবেষণার প্রয়োজনে লাগে মতো একটি তথ্য নির্ভর সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করে উপহার দিয়েছেন।

এতকিছুর পরও বলতে হয়, সম্পাদক অমিত চৌধুরী তাঁর “মূল্যায়ন” এ বিজ্ঞাপন নির্ভরতাকে প্রধান্য দিয়েছেন। বিজ্ঞাপন ছাড়া শিল্প-সাহিত্যের সৃজনশীল ও মৌলিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা দূরহের ব্যাপার হলেও তার মধ্যে একটা সীমানা রাখা দরকার। এই সীমানার কথা ভুলে গিয়ে সম্পাদক লেখার শেষে একটুখানি জায়গা খালি পেলেই তা পূর্ণ করে দিয়েছেন বিজ্ঞাপন-এর মাধ্যমে। তা না করে বরং খালি রাখলে আরো নান্দনিক মনে হতো বৈকী। বিজ্ঞাপন ছাপাবেন না সেটা নয়, তবে এর জন্যে আলাদা কয়েক পৃষ্ঠা বরাদ্দ করলে দৃষ্টিকটু লাগে না এবং সৌন্দর্য্যবোধও ক্ষুন্ন হয় না। আর কোন কোন বিজ্ঞাপন ছাপাবেন সেটারও একটা নির্বাচনবোধ থাকা দরকার। “মূল্যায়ন”-এ প্রকাশিত লেখা সংকলিত বলে প্রকাশ করা হয়েছে বেশিরভাগ। কষ্ট হলেও বিষয়ভিত্তিক লিখা লেখকের কাছ থেকে লিখিয়ে নিয়ে সংগ্রহ করতে পারলে আরো ভালো হতো। কিছুটা মুদ্রণজনিত ত্র“টি লক্ষ্য করা গেছে যা না থাকলে পাঠকটু লাগতো না। এইবারের সংখ্যাটি নজরুল বিশেষ সংখ্যা করার কথা থাকলেও জানিনা কেন সম্পাদক তার মতের পরিবর্তন করলেন।

প্রচ্ছদে যেহেতু “নজরুল, নজরুলবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দার ও বিনোদ বিহারী” সংশ্লিষ্টতা দেখানো হয়েছে-সেই নিরীখে ভেতরের ম্যাটারও সাজানো হলে আরো এপ্রোপিয়েট হতো। নজরুল, নজরুলবন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দার ও বিনোদ বিহারী সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও কিছু অপ্রাসঙ্গিক লেখাপত্র স্থান পেয়েছে যা পাঠকের কাছে বিরক্তির উদ্রেগ সৃষ্টি করতে পারে। নজরুলের বিশেষ কবিতার মধ্যে দু’য়েকটি কবিতা নজরুল বহির্ভুত। নজরুল ইসলাম-এর সংশ্লিষ্ট লেখাগুলি প্রথমে ও পরে অন্যান্যদের বিষয়ে সংযুক্ত করলে মন্দ হতো না। ভালো হতো। যেকোন সাহিত্যকর্ম তথা লিটলম্যাগ রাজনৈতিক দর্শন-এর ঘ্রাণ বর্হিভূত হতে হয়। যাই হোক, ঞড় বৎৎ রং যঁসধহ. তারপরেও এই মৌলিক সৃজনশীল লিটলম্যাগ নিয়মিত প্রকাশ করার জন্যে যদি তাকে পূর্নবার ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা না জানাই তাহলে অকৃতজ্ঞ হবোÑপাঠক হিসেবে। পরবর্তীতে আরো আরো শিল্পামান সমৃদ্ধ মৌলিক সৃজনশীল সংখ্যা স্বরূপ “মূল্যায়ন” দেখতে পাবো এই প্রত্যাশায় রইলাম।
(২০১০ সালে প্রকাশিত অমিত চৌধুরীর সম্পাদনা কর্ম ও কাব্যকৃতি মূল্যায়ন থেকে সংকলিত। )

অমিত চৌধুরীর কবিতায় প্রেম
কালাম আজাদ

অমিত চৌধুরী সত্তর দশকের কবি। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম থেকে লেখালেখি ও মূল্যায়ন সম্পাদনা করেছেন। তার কবিতায় স্বদেশ প্রেম সহ অন্যান্য দিকগুলোও বাকময়তায় প্রাঞ্জল। তবে তার যে সকল কবিতায় প্রেম মূখ্য তাতে অনুভব করি মনীষীর একটি উক্তি- Saddest thought are the sweetest song. অর্থাৎ প্রেমময় বাকময়তার যে প্রাণ তার উৎস দহন যন্ত্রণা থেকে। এ দহন যন্ত্রণা থেকে সৃষ্ট বেদনা আর যে বেদনা থেকেই জন্ম নেয় প্রেম। প্রেমের কবিতা। বিভিন্ন মনীষী বিভিন্নভাবে প্রেমের সংজ্ঞা দিয়েছেন। সব সংজ্ঞাতেই প্রেম প্রেমিক-প্রেমিকাকে করে মহান। কখনো কখনো বঞ্চিতও। কিন্তু যিনি প্রবঞ্চিত তিনি দহন যন্ত্রণায় ভোগেন। আর এ রকম দহন যন্ত্রণায় কবিকে প্রকৃত প্রেমিক করে তোলে এবং প্রেমের কবিতা লিখিয়ে নেয়। এই জন্য মনে হয় শেক্সপিয়র উচ্চারণ করেছিলেন A man is poet, When he is in love’ অর্থাৎ একজন মানুষ যখন প্রেমে পড়ে তখনই কবি হয়ে উঠে। কবিগুরু রবীন্দ্রণাথ ও তার শেষের কবিতা উপন্যাসে অমিত-লাণ্যের কথোপকথনের ফাঁকে দোঁহারীর ভূমিকায় বাক্যবানে উচ্চারণ করেছেন- ‘যে যাকে বেশি ভালবাসে, সে তাকে বেশি অত্যাচারও করে’। কিন্তু এ অত্যাচার অনাবশ্যক নয়। শিল্প সৃষ্টিতে প্রায়োজনীয় এবং উপজীব্য।

প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাস করলেও দেশের রাজধানীর পত্র-পত্রিকার প্রসাদ গুণ ব্যতিরেকে যারা কাব্যচর্চা করেছেন, তাহাদের মধ্যে কক্সবাজারের জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার পরবর্তী যার নাম উচ্চারণ করতে হয় তিনি কবি সম্পাদক অমিত চৌধুরী। তার পরে কাব্যে এগিয়ে যান সলিমুল্লাহ খান এবং অন্যান্যরা। যদিও তিনি কবিতার চেয়ে সম্পাদনা কর্মে দেশবিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন বেশি। তার পরেও কবি অমিত চৌধুরীর কবিতার বাকময়তায় প্রেম মূখ্য হলেও স্বদেশ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, অসম্প্রদায়িক চেতনা মর্মযাতনা তথা নষ্টালজিয়া বিদ্যমান। তৎসঙ্গে অসম্প্রদায়িক চেতনা আর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা দোষেগুণে রহস্যময় যেহেতু আমি তৎবিষয়ে আলোচনা না করে শুধুমাত্র তার দগ্ধবুকের বিদগ্ধ চেতনা উৎসারিত যে দহন জ্বালা বাক প্রতিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সে সব প্রেমের কবিতা সম্পর্কে আলোচনায় প্রয়াসী।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ‘চোখ রেখেছি তোমার চোখে (১৯৮৪), শিপ্রা যমুনার ধারা (১৯৮৬), জুঁই নয়, পৃথ্বী (১৯৮৮), রাজা আসছে রাজা কার (১৯৯৩), ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরৎ চাই (২০০৪), মরণ বাংলাদেশটায় (২০০৫) এবং ধোঁকাবাজ ধোঁকাবাজ (২০১০)। ধোঁকাবাজ ধোঁকারাজ কাব্যগ্রন্থনার গ্রন্থ তালিকা থেকে অবগত যে, আরো দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিতব্য (বিবেকবন্ধকী মানুষ না ও নন্দিনী, পড়ে আছে পদচিহ্ন)। প্রকাশিতব্য গ্রন্থের মধ্যে নন্দিনী পড়ে আছে পদচিহ্ন। নাম দেখে মনে হয় এটিও প্রেমের কাব্য। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থনায় ‘চোখ রেখেছি তোমার চোখে’ নাম কবিতাটিতে প্রেমিক কবি অমিত চৌধুরীকে আত্মস্ত করতে পারি বলে মনে হয়। তার প্রথম উচ্চারণ- চোখ রেখেছি তোমার চোখে/ তুমি আমার অনেক কিছু/ তুমি আমার আদিকালের অনাদি এক চিরসত্য সুন্দরেরই বহিঃপ্রকাশ বাকপ্রতিমা……। এ কাব্যগ্রন্থনার মনের হরিণী সিরিজ কবিতাগুলোতে নায়িকা হিসাবে দেখতে পাই ‘কৃষ্ণাকে’। কৃষ্ণা একাধরে কাব্যের নায়িকা ভিন্নঅর্থে কবির যেন মানসপ্রিয়াও। বলা ভালো কাব্যলক্ষ্মীয়ও। এখানে উল্লেখ্য যে, ক্রিকেটের গ্রেট মাষ্টার শচীন টেন্ডুলকার যে দিন সেঞ্জুরী করে সেদিন কিন্তু ভারত কিংবা তার দল হেরে যায়। তার চেয়েও রূঢ বাস্তব সত্য রহস্যময়তার কুরাশার আস্তরণে যে কথা আলো-আঁধারিতে জ্বলে উঠে তা হলো কবির মানসপ্রিয়ার জন্য শব্দশিল্পীর চরণগাথা। অর্থাৎ কাব্যলক্ষ্মী যদি গৃহলক্ষ্মী হয় তাহলে তো কাব্য হয় না। অর্থাৎ প্রিয়ার কাছে কবির হার মানেও প্রেমিক কবির বিজয়ই। তারপরেও কবি কৃষ্ণা নামের মহাত্ম বিশ্লেষণে উচ্চারণ করেছেন-
‘কৃষ্ণ পক্ষে জন্ম বলে হয়েছো কী কৃষ্ণা
জানার ইচ্ছায় জাগে কালিদাসী তৃষ্ণা।’ (মনের হরিণী/ চোখ রেখেছি তোমার চোখে)।

এখানে কবির অর্জন হচ্ছে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার শুক্লাশকুন্তলা কাব্যের একটি উচ্চারণে আমরা অনুরণিত হই- ‘শুক্ল পক্ষে জন্ম বলে হয়েছে কি শুক্লা………………….।

অতঃপর তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থনায় শিপ্রা যমুনার ধারা কাব্যের সূচনায় স্পষ্ট। অমিত চৌধুরী প্রেমময় উচ্চারণে ইট খোলার ভাটিতে অন্তর দহনে জ্বলার যন্ত্রণা। শিপ্রা মহাভারতের কাহিনীতে বহমান এক জলপ্রবাহ উজ্জ্বয়িনীর শাখা নদী। কিন্তু যমুনা কে? কবি মুখে শুনেছিলাম শিপ্রাার কুষ্ঠির নাম। অর্থাৎ এখানেও অরহরহ বৈদগ্ধতায় কাব্যের বাকময়তা নির্মাণে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করেছে-
১. নীরবে নিভূত জ্বলে বিদ্বগ্ধ অন্তরে/ যে খোঁজে কেবল নিত্য নতুন উপমা
ভিন্ন রকম ভাষায় কথা বলে যেতে/ প্রতিটি উচ্চারণেই শুনায় কেমন/ ঈশ্বর উপাসনা ‘পরমা-পরমা’।
কবির হৃদয় সে তো পোড়া মাটি জ্বলা/ ইটের খোলার বিশেষ নমুনা- কাব্যলক্ষ্মী যেন কেবলই বয়ে চলা
কৃষ্ণা কাবেরী শিপ্রা যমুনা।- (কবির হৃদয় শিপ্রা যমুনার ধারা (১৯৮৬)।
২. তুমি নেই, নেই বললেই বুঝি/ না থাকাই হলো/ প্রখর স্মৃতিতে?
নেই তুমি! কোন গাঁয়ের পথ খুঁজে/ ফিরে গেলে ছলকরা/ নারীর রীতিতে
-দহন/ শিপ্রা যমুনার ধারা।

এখানে দহন কবিতায় বি˜গ্ধ চেতনা উৎসারিত যে যন্ত্র্যণা তা যেন কবিকে ঐশ্বর্য দান করেছে নারীর প্রতি ক্ষোভে ও কটাক্ষে। এ শিপ্রার বিয়োগব্যতায় কবি নতুন করে কাব্য লক্ষ্মীকে অন্তর আত্মায় ধারণ করেছেন শিপ্রা যমুনার ধারা সিরিজের চার নম্বর কবিতার চরণে চরণে-
কবিতার শিল্পে গড়া কবির সাধনা/ পড়ে থাকে নিঃশব্দেই কাগজের বুকে
কবিতাকুমারী তুমি ও কেমন সুখে/ কবিকে আঘাত দিতে কর আরাধনা।

বিয়োগব্যথায় দগ্ধ কবি পুরাতনের আশা ছেড়ে নতুন কাব্যলক্ষ্মীকে ধারণ করার মানস চেতনায় রাধা নয় অনুরাধাও নয়, কবিতার মতো অন্য কারো কর স্পর্শে কবির শুদ্ধতম উচ্চারণ-
আমার অযোগ্য দিক যোগ্য হয়ে যায়
যখন কবিতার কর স্পর্শ পায়। (শিপ্রা যমুনার ধারা/৪)।
বিয়োগব্যতায় কবি এখানেও যেন পাগল হয়ে স্বর্গ মর্তো পাতাল ত্রিভুবন ঘুরে এসে ক্লান্ত শ্রান্ত এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মানসচেতনার দ্বারস্থ হয়ে সান্ত্বনার প্রসাদ লাভে উচ্চারণ করেছেন স্বর্গ নগরীর চাবি কবিতার বাকময়তায়-
এখন কবি সুনীল কিংবা আমার হাতেও নয়;
স্বর্গ নগরীর চাবি এখন তোমার হাতে
তুমি তার দ্বার খুলে দেখো
ভেতরে কি সব আছে
স্বর্গের আলো
না মর্ত্যালো
তুমি ভালে করে দেখে নাও
কাঁসা, পিতল না তামা
ঊষার প্রহর না অমা?
দেখো নাও, ভালো করে দেখে নাও শিপ্রা…………… (স্বর্গ নগরীর চাবি/ শিপ্রা যমুনার ধারা)

তারপরেও যেন কবি মনোযন্ত্রনায় মহত্বের মহিমায় কালজয়ী লেখক শেক্সপিয়ারের কবিতার চরণধ্বনি আত্মস্থ করে উদ্ধৃতি সহকারে স্বগৌরবে উচ্চারণ করেছেন-
এ আমার ভালবাসা, কাব্যে অহংকার দেখো কই?
তোমারি ভালোর জন্যে, সত্য-মিথ্যা নিজে শুধু বই (শিপ্রা যমুনার ধারা/৭)

আমরা জানি যে, মহত্মা শেক্সপিয়র মহান নাট্যকার হলেও একজন নায়িকাকে মানসপ্রিয়ার আসনে রেখে শিল্পসত্যে একাগ্রচিত্তে ১৫৪ টি সনেট লিখেছিলেন। তার ৮৮ নং সনেটের উচ্চারণে নায়িকাকে ক্ষমা করে দিয়ে সর্বপুরুষের চেতনাকে উর্ধ্বে তুলে ধরেন এবং নায়িকাকে আত্মসচেতন হওয়ার লক্ষ্যে শেক্সপিয়র উচ্চারণ করেছিলেন- ঝঁপয রং সু ষড়াব, ঃড় ঃযবব, ও ংড় নবষড়হম
ঃযধঃ’ং ভড়ৎ ঃযু ৎরমযঃ, সুংবষভ রিষষ নবধৎ ধষষ ৎিড়হম.
কবির প্রেম অবাধ্য যেমন তেমনিই উত্তরাধিকার সূত্রে অগ্রজ কবির প্রেমময় উচ্চারণের উপমা-অলংকার কিংবা বিষয়-অষয়েও সিদ্ধ অমিত চৌধুরীর প্রেমময় চেতনা। নিজস্ব বাকময়তায় যা প্রকাশ করেছেন সেটির বিশেষত্ব রবি ঠাকুরের উচ্চারণে শুনা যাক-
‘মধুর, মধুর ধ্বনি বাজে/ হৃদয় কমল মাঝে।
এখানে উল্লেখ্য যে, প্রেম অবিনাষী এবং স্মৃতিসত্তা অপরাজিতা ফুলের মতো নীলচোখ মেলে স্বপ্নমগ্ন বিধায় প্রেমিকার কাছে আপাততঃ হেরে গেলেও কবির হৃদয় যেন অনন্তকালের সুধাসদন তথা মৌমাছির মৌতাত- এক মৌছাকই। কেননা, রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণে বলা যায়- ‘বিধাতা দিয়েছেন যারে বেদনার ভার/ জানি, জানি তার বক্ষে আনন্দ অপার। অর্থাৎ নন্দমানে যদি সুন্দর হয় বেদনা উৎসারিত প্রেমময় উচ্চারণও সুন্দর এবং কাব্যসত্যে অপরূপ। কেননা, কবির জুঁই নয় পৃথ্বী কাব্য গ্রন্থনায় এরকম উচ্চারণের মুখোমুখি হই-
১. নারী তোমার কণ্ঠের হার/ স্বর্ণপদক অহংকার
নারী তুমি পাশে সবার/ থাকলে দেখি অলংকার।
২. কবির জীবন শূন্য যদিনা কাব্যের লক্ষ্মী/ ফুল হয়ে মনের বাগানে না হয় ফুটন্ত
কবিতার প্রাণ নি¯প্রাণই হয়/ কথার মালায় শব্দের উচ্ছ্বাস না হলে অনন্ত
৩. দরজায় যে তোমার দাঁড়িয়ে আছি/ দুর্বাশা না হয় হরি-
প্রেমেরই বাণ ছুঁেড়ছি অনেক/ ওতে কী বাজে না হৃদয়ের ঘড়ি? (অপেক্ষা/জুঁই নয় পৃথ্বী)।
৪. এ হৃদয়ে কত ক্ষত, কত বিষজ্বালা/ জোয়ারের নদী বুকে/ ডুবেছে কতক ভেলা
জানতেও চেয় না কখনো সই ……../
অন্তরের সব জ্বালা নিভে জায় জানি/ যখন পুর্ণিমা রাতে একান্তে তোমার হই।

এর পরেই কবি কুমারী কন্যার কালো চোখে চুলে দেয়া বেণী স্পর্শে উচ্চারণ করেন-
১. কালো চুলে দোলে উঠে বেণী/ ও যেন বা বেণী নয়, সর্প ফণা-
ইচ্ছে হয় টান দিয়ে দেখে নিতে/ ঋতুচক্রে তুমি কতোই উম্মনা…………

তারপরেও নারী হৃদয়ে নারীত্বের যে গভীরে যে মাতৃত্বের জ্বালা সে যন্ত্রনা সয়ে সন্তান প্রসবেই নারীরা যে গৌরবে মহিয়ান তাও কবির কাব্য গাথায় উঠে এসেছে অনিন্দসুন্দর চিরায়ত সত্যে-

এত বিষ এত জ্বালা তবু কেন/ হে নারীর হৃদয়
মাতৃত্বের স্বাদ নিতে নিতে কখনো মানেনি/ জয় পরাজয়?
অতপর উচ্চারণগুলো প্রেমগাথার গীতলতায় রহস্যময় এবং ঋদ্বতায় ভাস্বর-
১. আমি নই, ছল করা কোন ভিন্ন প্রাণী নয়-
একমাত্র নারীর হৃদয় জানে
এবিশ্বের মাঝে কে আপন কেবা পর।
২. বৈতরণী বুকে যদি দিতে পারি ঝাঁপ
মনে হয় ঘোচে যাবে আরও কিছু পাপ।
৩. লক্ষ্মী নেই মানে ঘর শূন্য যেই ……………………..
লক্ষ্মী নেই ঘরে
তবু ভাসমান দেখি শেষমেষ
কীর্তিনাশা জলে কাব্যময় সরস্বতী। (জুঁই নয় পৃথ্বী/ ১৯৮৮)

কবির প্রকাশিত পূর্বেকার কাব্যগুলো মূলত দেশপ্রেমের চেতনায় রাজনৈতিক মানসের হলেও কবির চাকুরী ক্ষেত্রে নির্বাসিত জীবনের কারণে দগ্ধ চেতনার বাকময়তা ফুটে উঠেছে ঘাতক কসাই মহিমাকে ফেরত চাই কাব্যগ্রন্থনায়-
১. মেঘবর্তী কন্যা তুমি মেঘালয় তোমার অলংকার
এপাড়ে ছাতক, চাতকের চাহনি আমার অহংকার (মেঘারয়ের মেঘবর্তী কন্যা)
২. ভিখারীকে ভিক্ষা দিলে তোমাকে দেখে ভিখারীও
কবিতার দাস আমি শব্দের শিল্পে তোমাকে সাজাঁই
বেনারসের লাল পাড়ে শাড়ী কেনার সামর্থ কই?
মহত্বের মহিমায় তুমি তাকালেই হোই- ‘পাঁজ-ভিকারিও’ গোলাপ কাঁটায়/ ঘাতক কসাই………………)
৩. অর্ন্তলোকে আছে ভালবাসা শুধু আমার শূন্য আমার পকেট
ডানা মেলা উড়োজাহাজও নেই পাঠাতে তোমার জন্য
আছে এক হৃদরে টানের মতন টাঙানো তারে ‘বাকেট’
এতে চড়ে এপারে এলেই অমিত পুরুষ হয় ধন্য (মেঘরথ বাকেটে এসো/ ঘাতক কসাই…………)
৪. নদীর দু’পাড়ে দুজন দাড়ানো দু’ হাত বাড়ানো
বয়ে যায় জলের কাঁদন
দু’ নৌকায় দু’জন কখনো নয়, এক স্রোতে বয়ে
গড়ে তুলি স্বপ্নের বাঁধন। (রোমিও জুলিয়েন্ট/ ঘাতক কসাই)।

অর্থাৎ এতসব প্রেমময় উচ্চারণে কিন্তু তার কবি হৃদয়ের যে আকুলতা ব্যাকুল হয়ে মানবপ্রেমের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে তারই বাকময়তা এসব উচ্চারণে সার্থক বলা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, ‘ভিখারীকে ভিক্ষা দিলে তোমাকে দেখে ভিখারীও ………… অমিতের কাব্যগাথায় কবি সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ের প্রভাব প্রচ্ছায়ায় প্রলম্বিত। সুনীলের কবিতায় আমরা জ্ঞাত যে ভিখারীকে ভিক্ষা দিলে, অমাকে দিলে না…………….’ অমিতের কাব্যচেতনায় সে রকম উচ্চারণ প্রভাবিত হলেও অর্জিত, অপরাধতুল্য নয়। আরও উল্লেখ্য যে, প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থনা- নন্দিনী পড়ে আছে পদচিহ্ন কাব্যের পান্ডুলিপি পাঠের সুযোগ হয়েছে বিধায় উল্লেখ্য যে, এখানে পুর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথনের জবাবে নায়িকা নন্দিনীকে নিয়ে শুভঙ্কর নয়। কোন এক অমিত পুরুষ সারা বিশ্ব না হলেও বাংলার উত্তর-দক্ষিণে সেন্টমার্টিন থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত ঘুরে দেখতে চান বিধায় কবির উচ্চারণ-

দেখাতো হলো সেন্টমার্টিন উত্তরে সে পঞ্চগড়,
দখিন এত সুন্দর না জানি উত্তর কি রকম………………
উত্তরে আছে বনলতা সেন, নাটোরে পরম
দীঘাপতিয়ার রাজবাড়ী মুক্ত মুজিব নগর (নন্দিনী পড়ে আছে পদচিহ্ন)

সম্প্রতি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতায় কবির যে প্রেমময় চেতনা চিরায়ত রূপ পেয়েছে এমন একটি কবিতার চরণ তুলে ধরতে চাই-

তোমার পূজোয় পুষ্পাঞ্চলি, পুষ্প চুরি ভোর বেলা
তোমার পূজোয় ভালোবাসায় কৃষ্ণ-রাধা খেলপা
……………………………………………..

তোমার পূজোয় হলুদ গাঁদা কনক চাঁপা ফুল
চুরি করে দিলে কী আর হয়রে কোন ভুল?

ফুল তোলাতে চুরির কোন নেইকো তেমন সাজা
পুষ্পচোরা তোমার খোঁপায় দিয়ে হয় সে রাজা। (রাসকি পুষ্পচোরা/ সমুদ্র সংলাপ (এপ্রিল/২০১১,কক্সবাজার)।

এখানেও স্পষ্ট যে, অমিত চৌধুরীর কাব্যে প্রেম, স্বদেশ প্রেম ও রাজনীতি একে একাকার হয়ে মূর্তমান। এ বাকময়তা কবির প্রেমকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করেছে, করেছে মহান। কেননা, দেশকে ভালবাসার ব্যাপারটা প্রিয়তমাকে ভালবাসার চেয়েও বড়। তবুও প্রিয়াকে ভালবাসার চরণগুলো সবার মনে, সবার প্রাণে বাজে বার বার। মধুর মধুর ধ্বনিতে বাজে এখানেই কবির সার্থকতা। প্রেমিক পুরুষের স্বার্থেধন্য প্রেমিক কবির সার্থকতা ত্যাগে। সার্থক অমিত চৌধুরীর প্রেমময় উচ্চারণরেও। এজন্য বলা- সব মানুষই প্রেমিক। তবুও প্রেমময় চেতনা হারালেই হয়ে যায় মনুষত্বহীন, খুনী। এজন্য তিনি বলেন, মানুষের কাছে মানুষ হেরে যায়। কিন্তু স্মৃতির কাছে অপরাজিত প্রেমসত্তা। অপরাজিত অমিত চৌধুরীও।

অমিত চৌধুরীকে লেখা পত্রাবলী

আজ আমি এমন একটি চিঠির কথা উল্লেখ করবো যে চিঠিটা চট্টগ্রাম শিক্ষা কলেজ ছাত্রী সাহানা তার সহপাঠী সন্তোষদার (যাকে আমরা পরবর্তীতে কবি সম্পাদক অমিত চৌধুরী হিসেবে চিনি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী কক্সবাজার দখলে নিলে প্রফেসর মোশতাক আহমদ, তৎকালিন এম এন এ নুর আহমদ, এমপিএ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, বাদশা মিয়া চৌধুরী, একেএম মোজাম্মেল হকসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বার্মায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন) কাছে লিখছেন। ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর লিখিত এ চিঠিতে সাহানা।
১৫ অক্টোবর ‘৭১-এ লেখা এ চিঠিতে বন্ধুকে কাছে না পাওয়ার বেদনা, যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতি, লুকিয়ে লুকিয়ে জীবনযাপন, শরণার্থী হিসেবে ভারত ও বার্মায় আশ্রয় গ্রহণ, দালালের নমুনা, নিজেকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দাবি করে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের অত্যাচারে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বাধ্য হওয়া, শরণার্থী হওয়ার যন্ত্রণাসহ বিভিন্ন বিষয় আসয় উঠে এসেছে।
এ চিঠিটি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে কবি অমিত চৌধুরীর কক্সবাজারস্থ বাসার দু তলার কাজ করার সময় মালপত্র ঠিক করতে গিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকাবস্থায় পেয়ে নিজের করায়ত্ব করি, তারপর আমার চাউলবাজারস্থ বাসায় চলে যাই, পরে রাত্রে শূন্য দশকের কবি, কক্সবাজার জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সহ সভাপতি মাসউদ শাফি (২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রয়াত হয়েছেন) কে দেখাতে গিয়ে কস্টপ নিয়ে ছেড়াচিঠিগুলো বেধে দেয়।
উনি বললেন, তুমি যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে কাজ করো, তাই তোমার কাজে লাগবে।’’ তার কথামতে আমি রেখেও দিয়েছিলাম। পরে অমিত চৌধুরীকে দেখাতে তিনি বললেন, তুরা দু চুকরা আমাকে কী ষড়যন্ত্র করবি কে জানে…মুসলমান ও হিন্দুর প্রেমের কথা বলবি এই তো!। ’ আমি ও মাসউদ বললাম একাত্তরের চিঠি বলে কথা। এখানে অনেক তথ্য রয়েছে….। তিনি সাহানা সম্পর্কে বিস্তারিত বললেন।
আমাদেরকে ২০০টাকা দিয়ে বললো, রেখে দাও…কাজেও লাগতে পারে।,,,পরে আমার কাছে থাকা অবস্থায় একদিন হারিয়ে গেছিলো…পরে আমার বান্ধবী আসমা বর্ষার পানিতে শুকাতে হাত পুড়িয়ে ফেলেছিলেন..তাকে ধন্যবাদ )। ঠিঠিটি ১৫ জানুয়ারি ফেইসবুকে দেওয়ার পর জানতে পারি ওই চিঠি লেখক সাহানা এখনো বে৭চে আছেন। এখন ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুল এন্ড কলেজে ( ওই স্কুল এন্ড কলেজটি দেশ সেরা হন সব সময়) পড়ায়। -কালাম আজাদ )

পনরো দিন, অক্টোবর, একাত্তর
‘জাকিরা মঞ্জিল’ ৬০৫/খ, মেহেদীবাগ রোড চাটগাঁ।

সন্তোষদা,
উহ্. কি দিয়ে আরম্ভ কোরবো বল? চিঠিতে তোমাকে ডেকে শান্তি পাচ্ছি না। দাদা, দাদা কোরে ডেকে গলা ফাটিয়ে চীৎকার কোরতে ইচ্ছে কোরছে। এখনও তোমার ঠিকানা হাতে আসেনি। কলেজে গিয়েছিলাম আজ। স্যার ও দিল্ মোহাম্মদের কাছে লিখা তোমার চিঠি পড়লাম। চিঠিগুলো ওঁদের দিতে ইচ্ছে হয়নি।

ইচ্ছে কোরেছিলো ওঁদের কাছ থেকে চেয়ে নিই। কিন্তু এসব হয়তো ওঁদের কাছে প্রগল্ভতা মনে হবে, তাই পারিনি। দাদা, কবে তোমাকে দেখবো? বিশ্বেস করো, প্রত্যেকটা রাতে তোমাকে স্বপ্ন দেখি। কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলি। যখনই একলা বসে ভাবি কেঁদে পার পাই না দাদা। আন্দাজ কোরেছিলাম, তুমি বার্মাতেই আছ। তোমার জন্যে যখন মনটা বেশী খারাপ লাগতো। তখন পাতার পর পাতা তোমাকে লিখতাম, কাঁদতাম কতক্ষণ। তারপর বিফল কাঁদার নিশ্বাসে বিষময় হোয়ে উঠতো ঘরের বাতাস। টুকরো টুকরো কোরে ছিড়ে ফেলতাম কাগজগুলো, যেনো আমার হৃদয়তন্ত্রীর একেকটা তার টেনে ছিঁড়ে ফেল্ছি।

কতরাতে তোমাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরেছি ‘দাদা’ বোলে। জিজ্ঞেস কোরেছি, সত্যি কোরে বল দাদা আমাকে ফেলে যাবি না? তুমি আমার মাথায় হাত রেখে বলেছো, নারে সানু, এবার আর যাবই না তোকে ফেলে। তোমার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে গিয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেছে। মনে হোয়েছে, ঘুমটা ভাঙ্লো কেনো, স্বপ্নেও তো তবু পেয়েছিলাম তোমাকে। দাদা আমি পারছি না এসব ভাবতে। উহ্, এত নিষ্ঠুর তুই কেমন কেমন কোরে আছিস্ আমাকে ফেলে? দাদা আজ তোমার খবর পেয়ে বাঁধভাঙা কান্নার ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে অশান্ত মনের বালুচরটাতে।

তুমি আমাকে একটা চিঠি লিখলে না কেন এতদিন? যখন প্রথম চিঠিপত্র বিলি আরম্ভ হোয়েছিলো, তখনই কক্সবাজারের ঠিকানায় (পাবে না জেনেও মনকে প্রবোধ দিতে) লিখেছি। বেঁচে থাকার এডভেঞ্চার কি শুনবে? এরচে’ লক্ষ গুণ বেশী অভিজ্ঞতা তোমাদের হোয়েছে। সে হিসেবে শরীরের আঁচড়টি লাগেনি আমাদের। যাক্ পালিয়ে পালিয়ে বেঁচে আছি। হ্যাঁ, দাদা, চিন্তা কোরোনা, ভালোও আছি আল্লাহর রহমতে। তোমার ও করিদার জন্য শাস্তি পাচ্ছি এখনও। পাঁজী মনটা বুঝতে চায় না সব কথা। করিদা নাকি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

আমার অবশ্যি সৌভাগ্য হয়নি তাঁর চিঠি দেখার। অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এটুকু শুনেছি। রিনু, লিলি, স্বপ্না এরা ওপার বাঙলায়। রওশন, কুসুম বাড়ীতে, এর চেয়ে বেশী ওঁদের খবর জানি না। বেবি এখন নাজিরহাট (উদালিয়া চা বাগানে)। শাহীন, মন্ডা, শামসুন, সেলিনা, রুবী, ভাবী এরা সবাই ভালো আছে। দাদা, বিশ্বাসঘাতকের দল, চরম স্বার্থবাদী আমরা পরীক্ষা দিয়েছি। ক্ষমা কোরতে পারবে না জানি। তুমি কেনো, আমি নিজেও আমাকে ক্ষমা কোরতে পারি না, পারবো না।

বিবেকের অন্তর যাবে কোথায় বলো? ছেলেদের মধ্যে যাঁদের খবর জানি, প্রায় ত্রিশজনের মতো (কম বেশী হোতে পারে) পরীক্ষা দিয়েছেন। শামসুল আলম, বেহাইন, জব্বার, ইদ্রিস, জামিল, নাজিমুদ্দীন, সরওয়ার, ইকবাল, নেসার, দিবাস্বপ্ন, ইসহাক, মিলন, রাখাল, তাল্ত ভাই, রাজ্জাক ভাই, বড়দা, সুফিয়ান, কাসেম, কাঁদর কিল্লাই, তালেব, আবু তাহের। কে বোল্লে আমি এত বোকা? (নাম ভুলে গিয়েছি) রাখাল ( সবার কথা খেয়াল নেই আমার) এঁদের সাথে দেখা হোয়েছে। এ চিঠি তোমার কাছে পৌঁছবে বোলে বিশ্বাস হচ্ছে না মনে। কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হোচ্ছে। তোমার কাচে পাঠিয়ে চাতকের মতো হা কোরে বসে থাকবো উত্তরের অপেক্ষায়।

তোমার আগের লেখা চিঠিগুলো পড়ে মনটা গুমরে উঠে, দলে-পিষে একাকার হোয়ে যায় ক্ষত-বিক্ষত মনটা। পেয়ে হারানোর ব্যথা যে কত মারাত্মক তা’ বুঝি এখন। কেনই বা তোমার সাথে পরিচয় হোয়ে এত ঘনিষ্ঠতা হোলো, আর যদিই বা হোলো-ভগবান আজ একটু সাত্ত্বনা কেন দিচ্ছেন না, সহ্য শক্তি কেন দান কোরছেন না?

মার্চের আঠারোতে তোমার সাথে শেষ দেখা। জানি, সেদিন লিলি, রিনুর সাথে দেখা কোরতে গিয়েছিলাম ওদের না পেয়ে মনটা বড় খারাপ হোয়ে যাওয়ায় বাসায় ফিরতে ইচ্ছে হোলো না। রুবাদের বাসায় যাব বোলে ইউসুফকে এ পতে এনে তোমার সাথে দেখা কোরেছিলাম। তাই, দেখতে এসেছিলাম। এসে দেখলাম, মাথা Wash করিয়েছ।

আর এই যে তোমার সাথে শেষ দেখা হবে তা’ যদি বুঝতে পারতাম তবে তোমার পা’র ধূলো মাথায় নিয়ে আসতাম। অনেক সময় বুঝে না বুঝে কত দুঃখ দিয়েছি তোমাকে, না, দাদা, দোহাই তোমার ভুলেও যেয়োনা; ক্ষমাও কোরো না। জানো, লিখছি তোমাকে, আর উদাস হোয়ে যাচ্ছি। কি জানি চিঠি পাবে কিনা। দাদা, কত কথা ভেসে উঠ্ছে আরো। কলেজের বারান্দায়, পেছনে, ক্লাসে, হোস্টেলে তোমার সাতে মান-অভিমানের কত স্মৃতি।

তুমি ডেকেছিলে, ‘এই পাগ্লী শোন এত ঝামেলার মধ্যে আমাকে টানিস্ কেনো? ’ বারে, তোমাকে ঝামেলায় ফেলে কষ্ট দেবো না তো তবে কাকে দেব? তোমাকে দিস্তা ভর্ত্তি কাগজে লিখতে ইচ্ছে কোরছে। এতদিনের জমানো কথা, লুকানো ব্যথা সব কিছু লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে। তুমি চিঠি পারে কিনা কে জানে? দাদা, তোমার লেখা একটা লাইনের চিঠি পেলেও আমি যে কি করব ভাবতে পারছিনা।

দিদি, বৌদি, দাদা আর তাঁদের ছেলেমেয়েরা কে কোথায় কেমন আছেন জানিও। তুমি কেমন আছ? তোমার অবস্থা বিস্তারিত লিখবে, তবে অনেকটা শান্তি পাব। কি অবস্থায় আছ জানিও। খাওয়া-পরা কিভাবে চল্ছে লিখো কেমন?

দাদা, চিঠিতে তোমাকে পেয়ে ছাড়তে ইচ্ছে হোচ্ছে না। দাদা বোল্তে পারিস কি কবে দেখা হবে? আমি যেনো একটা মুহূর্তও সহ্য কোরতে পারছি না। দাদা, আজ যদি তোকে এ দুটো হাতে সেবা করতে পারতাম, তবে আমার বুক ভরে উঠতো মহানন্দে। চিঠি পাবে নাকি তুমি? তোমার চিঠি পেলে আবার লিখবো, কেমন?

উহ্! রিনু, লিলি, কমল, তুমি তোমরা আমাকে বেশী কষ্ট দিচ্ছ। তোমাদেরকে স্বপ্ন দেখে কেঁদে কেঁদে অস্থির হোয়ে পড়ি। আর কত দিন অপেক্ষা কোরতে হবে, তোমাদের জন্যে?
তুমি আমাকে এই ঠিকানায় লিখবে-

নাজমুন নাহার মন্ডা (সাহানা)
প্রযত্নে/আলহাজ্ব মোঃ আবু জাফর
৪১৮/এ, মোগলটুলী, চাটগাঁ

আমি এখন মেহেদীবাগে আছি। তবে খুব শীগ্গীরই হয়তো সবে যাবো। অথবা, আব্বার অফিসের ঠিকানায় দিও-সাহানা, প্রযত্মে/ মোহাম্মদ জাহিদ আলী, সাবহেড (Sub-Head), টি.এ ব্রাঞ্চ (T A Branch) পি, ই, রেলওয়ে, পলোগ্রাউন্ড, চাটগাঁ।
ভালো থেকো। ভালোবাসা জেনো।

তোমার সানু
১৫ই অক্টোবর, ‘একাত্তর।

কবিকে নিবেদিত কবিতা
মূর্খের সমুদ্রদর্শন
নির্মলেন্দু গুণ

আমি এরকম কিছই পাই নি।
কমল পেয়েছে কড়ি, শিশির পেয়েছে শঙ্খ,
আর নারী যা চেয়েছে তা-ই।
দাও দেখি ঘন নীল একটি শামুক,
সঙ্গে সঙ্গে একটি শামুক।
দাও দেখি শো-কেসে রাখার মতো
একটি চিত্রল কড়ি বড়োসরো দেখে,
সঙ্গে সঙ্গে- জলে ভেসে একটি চিত্রল কড়ি
ডোরাকাটা, সাদার উপরে লাল ছোপ।

দাও দেখি একটি ঝিনুক,
সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ ভরা একটি ঝিনুক
আর কথায়-কথায় ছোট বড় ঢেউ,
স্টার ফিস, ওরা তো আছেই।

দেখে দেখে অবাক হয়েছি আমি,
এ যেনো সমুদ্র নয়, স্রেফ কোনো পোষা হাতী,
কিংবা কোনো আলাদীন সার্কাসের বাঘ।
না কড়ি, না শঙ্খ, না শামুক,
আমার দু’ চোখে শুধু শস্যমগ্ন সমুদ্রের জল

‘দ্যাখো দ্যঅখো কী সুন্দর অস্ত’-বলতেই
পশ্চিমের সমুদ্রের ক্ষুধা গিলে খেলো পূর্বের সূর্যকে
অমিত, শিশির, নীরা, আবছার, শাজাহান,
বন্দী হলো কমলের ক্লীকে। তারপর কয়েক মূহূর্ত
শব্দহীন, সমস্ত সৈকত জুড়ে স্তব্ধ নীরবতা।
আর কোনো ছবি নেই।
হঠাৎ তাকিয়ে দেখি আমার পাশেই নুড়ি কুড়াচ্ছেন
বৃদ্ধ নিউটন, তাঁর হাতে ‘সায়মন’ হোটেলের চাবি।

পাহাড়কে প্রণতি জানাও
সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত

যদি পাথরকে পূজা করতে চাও
শালগ্রাম শিলা নয়
পাহাড়কে প্রণতি জানাও
২৯.০৪.২০০৫


জীবন ফিরে এসো
স্বপন দত্ত

অনেক অনেক হেঁটেছো পথ তুমি
সম্ভাবনা উড়ছে পায়রা দল,
দূরের আকাশ দিগন্তলীন বাড়ি
বাতাসে দূলছে অমিত রাতে গাড়ি।

মূল্যায়নের নিক্তিতে মেলে ডানা
ছুঁয়েছে প্রেরণা-না চেনা বাতিঘর,
কালের কপালে বোনা হোল ইতিহাস
নোনা সমাজেও জেগেছে জাতিস্বর।

প্রসারিত ছিলো বহু আকালের দিন
বর্ষণ নেমে ভাসলো রুক্ষ মাটি,
আবাদে ফলেছে সৃজনের সমারোহ
এানুষ তোমার হৃদয়টা বড়ো খাঁটি।

হেঁটেছো অনেক অশেষ নিথর পথ
শিল্প-হরিণী ছুটছে অনধিগত
তাঁকে ছুঁড়ে দাও মহিমান্বিত ল্যাসো
জাগুক জীবন, হে জীবন তুমি এসো।

অমিত পুরুষ
সুলতান আহমেদ

সমুদ্র নগরে দাঁড়িয়ে একা এক কবিতা মানুষ
সাহিত্য সারথী সে’ তো নিয়ত উড়ায়ে যায়
রঙিণ ফানুস
জীবন পাঁচালি লিখে ছন্দে বাক্যে সৃষ্টিশীল
এক অমিত পুরুষ।

ঢেউয়ের পেছনে ঢেউ ধেয়ে আসে তরঙ্গ সিম্ফনি
কাল হাতে কালান্তরে ভেসে যায় অনন্ত জলজ ধ্বনি
ক্রমে ক্রমে পুঞ্জীভূত শব্দে বাক্যে কবিতায়
হাজার বছর ধরে সৃজনের ফল্গুধারা বয়ে যায়
ফুলপাতা সজ্জিত বিচিত্র সবুজ সভ্যতা
রক্তের রোদনে যেন জেগে থাকে অনন্ত কবিতা।

ভেতরে অনন্ত ধারা দ্রুত লয়ে বের হতে চায়।
যেন সে বিষের বালি মুক্তোর ভেতর লুকায়
বাতাসে মধুর গন্ধ জাগ্রত মননে জাগে
চিত্তের বাহাদূরী
বিরুদ্ধ প্রবাহ একা যুদ্ধ করে শুধু
কবি অমিত চৌধুরী।

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।