ধুরুমখালী গণহত্যা

কালাম আজাদ

বাঙালি হয়ে বাঙালি হত্যা, পাক হানাদারের তাবেদারী করে স্বদেশদ্রোহীতার নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনীসহ এ দেশীয় দোসররা। পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক কক্সবাজার দখলে নেওয়ার পর সামরিক চক্রের নিধনযজ্ঞের পর আবার নতুন করে আগুন জ্বালায় এই রাজাকার শান্তি কমিটির অশান্তিওয়ালারা। এদের আচরণ ও কার্যকলাপে বহু বাঙালি দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। বহু পরিবারকে করেছে সর্বহারা, অনেক বাঙালিকে ধরিয়ে দিয়েছে হানাদার দস্যুদের হাতে, মা বোনদের সতীত্ব নষ্ট করার সুযোগ করে দিয়েছে আবার নিজেরা সুবিধামত দলবল নিয়ে বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে নিজেদের সম্পত্তি বৃদ্ধি করেছে। ৫ মে কক্সবাজার পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর দখলে গেলে তাদের দোসরদের সহায়তায় হত্যা করেছে মুক্তিকামী জনতা ও মুক্তিযোদ্ধাকে। সুবেদার বেনারশ খান উখিয়া দখলে নিয়ে সুবেদার আবদুল মালেককে দিয়ে উখিয়ায় চষে বেড়াচ্ছিলেন। একের পর হত্যা, নারী নির্যাতন এবং বহু মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পদ লুট করেছেন। পুরো ৬ মাস শুধু উখিয়ায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এ দিকে হাবিলদার সোবহানের নেতৃত্বে একটি দল বার্মা থেকে এসে সোনাইছড়িতে অবস্থান নিয়েছিলেন। ঠিক তখনি তার গ্রামের বাড়ি থেকে খবর আসে উখিয়া- টেকনাফে শান্তি কমিটি ও পাকিস্তানি দোসরদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনীর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। এমন খবর শুনে হাবিলদার সোবহান সোনাইছড়ি থেকে আবুল কাসেম ও নির্মল কান্তিদে গোয়েন্দার দায়িত্ব দিয়ে ছদ্ধবেশে উখিয়া পাঠান। তাদের বলে দেওয়া হয়েছিলো ‘সাবধান, মানুষের সাথে মিশে শত্রুদের অবস্থান, গতিবিধি ইত্যাদি সংগ্রহ করে এক সপ্তাহের মধ্যে আমার কাছে রিপোর্ট করতে।
হাবিলদার সোবহানের কথামতে সেদিন নির্মল ও আবুল কাসেম মরিচ্যায় রওয়ানা দেন এবং মরিচ্যায় আবুল কাসেমের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে সময় সুযোগ বুঝে ধুরংখালীর দিকে আগান। ধুরংখালীর মুক্তিযোদ্ধা মণিন্দ্র বড়ুয়ার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে। রুমখার হাট বাজারের দিন লোক- লোকারণ্যে ভরা ভীড়ের মধ্যে আবুল কাসেম ও নির্মল দে চিনে ফেলে জাফর আহমদ ও মোজাফ্ফর আহমদের নেতৃত্বাধীন রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। সাথে উখিয়া থানায় খবর দেয় রাজাকার বাহিনী। মোজাফ্ফর আহমদের নেতৃত্বাধীন রাজাকার বাহিনী তাদের ধরতে এগিয়ে আসলে আবুল কাসেম একটি ব্রিজের নিচে আত্মগোপন করে আর নির্মল স্থানীয় নাপিতপাড়ায় পালিয়ে একটি বাড়িতে লূকিয়ে থাকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাজাকার বাহিনী ওই বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং মুক্তিযোদ্ধা নির্মল দে রাজাকার বাহিনীর হাতে তুলে দিতে বলে। ওই বাড়ির মালিক নির্মলকে রাজাকার বাহিনীর হাতে তুলে অস্বীকার করায় বাড়িতে গুলি এবং পরে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ওই সময় নির্মল হানাদার দস্যুদের দোসর নরপশুদের হাতে ধরা পড়ে। এই দিকে পাক বাহিনীও পৌছে যায় ঘটনাস্থলে। রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী নির্মলকে নিয়ে আসার পথে মুক্তিযোদ্ধা মণিন্দ্র বড়ুয়া মনুর বাড়িতে গিয়ে হামলা চালায় এবং তাকেও ব্যাপক প্রহার করে আটক করে। পরে ধুরংখালী মন্দির এলাকায় পৌঁছে মনিন্দ্র বড়ুয়া প্রকাশ ভূট্টো মহাজনকেও আটক করে হানাদার বাহিনী টেকনাফের নাইট্যং পাহাড়ের চূড়াস্থ পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যায় । পরে নির্মল দে, ব্রজেন্দ্র কুমার শীল, ভূট্টো মহাজন ও মণিন্দ্র বড়ুয়া মনুকেও অনেক মুক্তিকামী জনতার সাথে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে।
গঙ্গা দে এর মেধাবী সন্তান নির্মল কান্তি দে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের অন্যতম সাহসী কর্মী। পড়তেন মরিচ্যা জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা শেষে পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মরিচ্যা হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে শুরু হয় উণসত্তরের অভুত্থান এবং পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ভূট্টো মহাজনের অপরাধ ছিলে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া ও মুক্তিযোদ্ধাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করা।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ মনীন্দ্র বড়ুয়া মনুর ছেলে মরিচ্যা মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের কেরানী। তার শহীদ বাবার স্মীকৃতি এখনো পাননি। ব্রজেন্দ্র কুমার শীলের ছেলে প্রদীপ এখনো কক্সবাজারের সেলুনে চাকরি করে। বাবার স্বীকৃতির অনেক টাকা খরচ করেও রাজনীতির ফাঁদে এখনো শহীদ বাবার স্বীকৃতি পাননি।
লেখক : কবি ও গবেষক। সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ : কক্সবাজারে বঙ্গবন্ধু

রাইজিংকক্স.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।